পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২০

ওরা পরিযায়ী শ্রমিক

ওরা পরিযায়ী শ্রমিক
                   উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

দলে-দলে বা একা-একা, ওরা আজ নেমেছে পথে-
আজ ওরা অসহায় ভারি;
দুরত্বের কোনো হিসেব নেই, সময়ের তাদের জ্ঞান নেই-
ফিরবেই নিজ-নিজ বাড়ি।
শপথ ওদের বড্ড কঠিন, চিত্ত ওদের ভয় ডরহীন-
আজ ওরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ;
অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান, নেই ওদের ন্যুনতম সংস্থান-
সরকার! সে তো অন্ধ, অজ্ঞ।
বাবা হয়েছে শ্রবণকুমার, ঘুমন্ত শিশু টানছে মা-
বইছে তাকে বাক্স চলমান;
অন্তঃসত্ত্বাও হাঁটছে সাথে, করেছে প্রসব পথের ধারে-
খুইয়েছে তার মান-সম্মান।
অতিমারিকে নেইকো ভয়, জ্বলছে ওরা খিদের জ্বালায়-
আজ ওরা বড্ড ক্ষুধার্ত;
লক্ষ কোটির প্যাকেজ আসে, অশ্বডিম্ব ওদের জোটে-
ধোকাবাজ মন্ত্রীরা ভারি ধূর্ত।
পিচ রাস্তায় জ্বলছে আগুন, মাথার উপর সূর্য প্রখর-
ফোসকা পরে পায়ের তলায়;
নেতারা সব হাড় বজ্জাত, সব ঠগ লুটেরার দল-
চোরেরাই এদেশ চালায়।
এনআরআইদের ফ্লাইট আছে, ওদের আছে দুটি পা-
হয়ে যাক এ দেশ ছাড়খাড়;
শেষনাগের ফণার মতো ওদের কাঁধও শক্তিশালী-
ওরাই বয় এদেশের ভার।
দেশ গঠনের যন্ত্র ওরা, ওরাই দেশের ভুত ভবিষ্যত-
তবু বঞ্চিত ওরা চিরকাল;
লিখতে বসলে ওদের কথা চোখ হতে বয় অশ্রু ধারা-
আসবেই নতুন সকাল।
প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, বড়-মেজো-ছোটো নেতা-
আছে তাদের অনেক গিমিক;
রাজনীতির বিভেদ ভুলে এগিয়ে এসো সকলে মিলে-
ওরা পরিযায়ী শ্রমিক।

সোমবার, ১১ মে, ২০২০

নেশা

নেশা

       উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

ষড়রিপুর অনুঘটক সে, লোভের থেকেও সর্বনাশা;
বিনাশেরই আহ্বায়ক সে, নামটি তার নেশা।
অসম্ভবকে সম্ভব করায় তন-মনকে রেখে নিজ বসে,
সত্যকে মিথ্যা বানায়, দিনকে করে রাত দৃষ্টিভ্রমের যশে।

নেশায় তুমি মজলে পরে জ্ঞানভাণ্ডার হবে শূণ্য,
নেশার ফাঁদে পরলে তুমি ভুলবে পাপ-পুণ্য।
ছোঁয়াচ রোগের প্রাদুর্ভাবেও পথে নামে কেউ মদের খোঁজে,
অতিমারির প্রভাব ভুলে ভীড় জমায় কেউ ঈশ্বরে মজে।

বিড়ি-সিগারেট-মদ-গাঁজা, নেশার বস্তু হেরোইনও,
এসব অতি তুচ্ছ নেশা, ছাড়া অতি সহজ জেনো।
ধর্ম? সেতো আফিং বটে, এ নেশা ভয়ঙ্কর অতি,
ধর্ম তোমায় করবে স্থবির, নয়তো হবে সন্ত্রাসবাদী।

নেশার একটা গুণও আছে, লক্ষ্যে রাখে দৃষ্টি নিবদ্ধ,
চাওয়ার খিদে বাড়িয়ে দেয়, সাহস জোগায় প্রতিনিয়ত।
পূর্ণ স্বরাজের নেশায় ভারত যদি না হতো নেশাগ্রস্ত,
নিশীথ সূর্যের দেশের মানুষ ব্রিটিশরা কি এ দেশ ছাড়তো?

বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২০

মায়াবীনি

মায়াবীনি

                                                                                  উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী


                     অঙ্কন: তন্দ্রা ব্রহ্মচারী
অফিসের কর্মব্যস্ততার মাঝে বারবার ব্যাক্তিগত ফোন এলে অভয় খুব বিরক্ত হয়। যেকোনো কাজের প্রতি তার নিষ্ঠা প্রশ্নাতীত, তা সে ব্যাক্তিগত জীবনের কাজই হোক বা তার পেশাদারী দায়িত্বই হোক। আর সেই জন্য সে অফিস টাইমে কোনো ব্যক্তিগত ফোন আসুক তা চায় না। মোবাইল ফোনটা বেজে উঠতেই বিরক্ত হয়ে অভয় ফোনটা তুলল, "বলো বাবা। কি? কখন থেকে?" অভয় আঁতকে উঠল। "তুমি কোনো চিন্তা কোরো না, আমি এখুনি বেরোচ্ছি" বলেই ফোনটা রেখে দিয়ে এক মুহূর্ত কিছু একটা চিন্তা করল তারপর হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল বড় সাহেবের ঘরে।
"মে আই কামিন স্যার?" ঘরের দরজাটা একটু ফাঁক করে অভয় ভিতরে যাওয়ার অনুমতি চাইল।
"আরে অভয়! এসো-এসো। কি ব্যাপার, এতো টেনশন কিসের?"
"স্যার, আমার একটু ছুটি চাই"
"তা একটু ছুটি কেন? পুরোটাই নিয়ে নাও না, কিন্তু তোমার টেনশনটা কিসের সেটা তো বলো"
"স্যার, আমার খুব বিপদ হয়ে গেছে, আমার স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, সম্ভবত ওকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। ফোনে বাবাকে সান্তনা দিলাম বটে কিন্তু আমার মাথা একদম কাজ করছে না, কি করব কিচ্ছু ভেবে পাচ্ছি না।" কাতর গলায় অভয় জবাব দিল।
"আরে এতো বড় ঘটনা ঘটে গেছে আর তুমি এখনো এখানে দাঁড়িয়ে আছ! তুমি ইমিডিয়েট বেরিয়ে যাও। আর শোন, তোমাকে এখন আর ট্রেনে-বাসে যেতে হবে না আমার গাড়িটা নিয়ে যাও, ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি ও তোমাকে তোমার বাড়ি ছেড়ে দেবে।"
"আপনাকে যে স্যার কি বলে যে ধন্যবাদ দেব......."
"আর ফর্ম্যালিটি করতে হবে না, তাড়াতাড়ি রওনা হও।"

গাড়িটা জাতীয় সড়ক ধরে হু-হু করে ছুটে চলেছে। রাস্তার দু'ধারে সবুজ ধানের ক্ষেত দ্রুত গতিতে পিছনের দিকে সরে যাচ্ছে। মাঝের সিটে ড্রাইভারের উল্টো দিকের জানালার ধারে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল অভয়। বার বার অপরাজিতার মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে, আর সেই সাথেই অজয় আর অর্পিতার কান্নার আওয়াজ তার কানে বাজছে। হটাৎ অভয়ের কানে একটা আপাত নিরীহ, মোলায়েম নারী কন্ঠস্বর ভেসে এল, "আমি কি অভয় মন্ডলের সাথে কথা বলছি?" সে চমকে উঠে চারিদিকে তাকিয়ে দেখল, "আমি তো গাড়িতেই আছি! এটা তাহলে আমার মনের ভুল", মনে মনে ভাবতেই তার বুকের ভেতরটা চিন-চিন করে উঠল, একরাশ নিঃস্বতা ঘিরে ধরল তাকে, দম বন্ধ হয়ে আসছে, অভয়ের এখন হাউহাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কোনো রকমে নিজে কে সংযত করে চোখটা বন্ধ করে বসে রইল অভয়। সময় যেন কাটছে না, আজ রাস্তাটা কেউ যেন রাবার ব্যান্ডের মতো টেনে বাড়িয়ে দিয়েছে, কতক্ষণে বাড়ি ফিরবে ভেবে ভেবে আকুল হয়ে উঠছে সে। চোখ বন্ধ করে মাথাটা এলিয়ে দিল অভয়।

অভয়ের সাথে অপরাজিতার বিয়ে হয়েছিল নাটকিয় ভাবে। যেন সিনেমার গল্প। একটা বেসরকারি কম্পানিতে চাকরি সুত্রে অভয় তখন গুজরাতের কচ্ছে থাকে। একদিন রাতে অভয়ের মোবাইলে একটা ফোন আসে। অচেনা নম্বর দেখে অভয় একটু ইতস্ততঃ করছিল, শেষমেশ ফোনটা ধরল-
"হ্যালো! কে বলছেন?"
উত্তরে ফোনের ওপার থেকে একটা আপাত নিরীহ, মোলায়েম নারী কন্ঠস্বর ভেসে এল, "আমি কি অভয় মন্ডলের সাথে কথা বলছি?"
গলার আওয়াজটা যেন অভয়ের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল, সে কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে জবাব দিল, "হ্যাঁ বলছি। আপনি কে বলছেন?"
"আমি মহুয়া। আমাকে আপনি চিনবেন না।"
সেদিন অপরাজিতা অভয়কে তার সঠিক নামটা বলে নি। হয়তো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল।
"আমার নম্বর কোথায় পেলেন?"
"আপনারই এক বন্ধুর থেকে, তবে তার নাম এখনই জিজ্ঞাসা করবেন না, সময়মতো আমি নিজেই আপনাকে বলব।"
এইভাবে তাদের ফোনালাপ শুরু। ধীরে ধীরে ওরা দুজনে একে অপরের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল, 'আপনি' পরিবর্তিত হয়ে গেল 'তুমি'-তে। সম্পর্কের ঘনত্ব এখন অনেকটা বেড়েছে। এমনই একদিন.......
"স্যার! স্যার!" ড্রাইভারের ডাকে অভয়ের তন্দ্রা ভেঙে গেল,
"হ্যাঁ, বলো!"
"কোন রাস্তায় যাবো, সোজা না ডান দিকে?"
জানলা দিয়ে বাইরেটা একটু দেখে নিয়ে অভয় জবাব দিল, "ডান দিকে ঘোরাও।"

গাড়ি থেকে নামতেই অভয়ের উত্তেজনাটা বেড়ে গেল। হন্তদন্ত হয়ে প্রায় রুদ্ধশ্বাসে বাড়ি ঢুকতেই কানে গেল তার পাঁচ বছরের মেয়ে কাঁদছে, কোন রকমে জুতো জোড়া খুলে ভারি পর্দাটা সরিয়ে ঘরে ঢুকে দেখল অভয়ের মা খাটে বসে অর্পিতাকে ভোলানোর চেষ্টা করছে আর তার সাত বছরের ছেলে অজয় পাসে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। অভয়ের বাবা চেয়ারে বসে আছে, চিন্তায়, ক্লান্তিতে মাথাটা ঝুঁকে প্রায় হাঁটুর কাছে নেমে এসেছে।
ঘরে ঢুকতেই অভয়ের মা অভয়ের দিকে প্রায় ছুটে এলো, "এসেছিস বাবা! দেখ তো আমাদের কত বড় সর্বনাশ হয়ে গেল" বলেই হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করল। বাবা হন্তদন্ত হয়ে উঠে বসে কাতর সুরে অভয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, "কি হল বলত? আমার মাথায় তো কিচ্ছু ঢুকছে না"
দুঃখে, কষ্টে, চিন্তায় অভয়ের ভিতরে যেন কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যাচ্ছে কিন্তু বাবা-মা এতোটাই ভেঙে পরেছে যে তাকে প্রাণপণ চেষ্টা করে সেই ঝড়কে দমিয়ে রাখতে হচ্ছে। এইটাই তো পুরুষ মানুষের জীবন, কেঁদে হালকা হওয়া পুরুষ-ধর্ম বিরুদ্ধ। কষ্টটা ভিতরে চেপে অভয় তার বাবাকে জিজ্ঞাসা করল, "বাবা, অপুকে (অপরাজিতাকে বাড়ির সবাই এই নামেই ডাকত) কখন থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? আমাকে সব ডিটেলে বলো"
"সকাল এগারোটা থেকে। তুই তো গোপালকে তার রিক্সা নিয়ে দশটার সময় আসতে বলে অফিস চলে গেলি। ও সময়মতো এসে অপুকে নিয়ে ইস্কুলে চলে যায়। গোপাল বলল এগারোটা নাগাদ অজয়ের ছুটি হয় তারপর তাদের দুজনকে নিয়ে ও বেরিয়ে পরে, কিছুক্ষণ পর স্টেশন বাজারের কাছে পৌঁছাতেই অপু গোপালকে দাঁড়া করিয়ে ফল কিনবে বলে বাজারের ভিতরে যায়। মিনিট পনেরো অপেক্ষা করার পর দেরি হচ্ছে দেখে গোপাল অপুকে ফোন করে, কিন্তু ওর ফোন বন্ধ ছিল। এখনো বন্ধই আছে। হ্যাঁ রে অভয়, কি হলো বলত?" চেয়ার ছেড়ে বাবা উঠে দাঁড়াল। বাবার কথা শেষ হতে না হতেই মা আবার ডুকরে কেঁদে উঠলো।
"আঃ মা, কেঁদো না চুপ করো। বাবা আমাকে এখুনি থানায় যেতে হবে। বাইকের চাবিটা দাও"
"চল, আমিও তোর সঙ্গে যাই" টেবিলের ড্রয়ার থেকে চাবিটা বের করে অভয়কে বলল ওর বাবা।
চাবিটা তাড়াতাড়ি তার বাবার হাত থেকে নিয়ে অভয় বলল, "না বাবা, তোমাকে যেতে হবে না।"
"না-না তোর বাবা যাক। ওর কথা শুনো না, তুমি যাও" মা নাছোড়।
"আমি বিমলকে বলে দিয়েছি, ও এখুনি এসে পরবে, ওকে নিয়েই যাবো।"
"তা ভালো করেছিস", বাবা একটু নিশ্চিন্ত হলো। "আচ্ছা বেয়াই মশাইকে খবর দিয়েছিস?"
"হ্যাঁ, বাবাকে বলেছি। বাবা বললেন আজ ওনার ড্রাইভার আসবে না, তাই ওরা আজ আসতে পারবে না। কাল সকালে আসবে।"
"ওদের মেয়ে নিরুদ্দেশ আর ওরা ড্রাইভারের অপেক্ষায় বসে আছে?" মা অবাক হয়ে বলল।
মাকে চুপ করিয়ে দিয়ে বাবা বলল, "ওসব নিয়ে চিন্তা করার সময় এখন নয়", তারপর অভয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, "তুই আর দেরি করিস না বাবা, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পর"
কথা শেষ হতেই বিমলের আওয়াজ এলো, অভয়ের নাম নিয়ে ডাকতেই অভয় বেরিয়ে পরল।

থানায় পৌঁছে অভয় বুঝতে পারল যে কোনো না কোনো কারনে আজ থানার মধ্যে কর্ম ব্যস্ততা অন্য দিনের তুলনায় একটু বেশি, সবাই শশব্যস্ত। সে একজন হাবিলদারকে জিজ্ঞাসা করল, "স্যার, এফআইআর করার আছে, কোথায় যাব দয়া করে একটু বলবেন?"
"আজ সবাই ব্যস্ত। সামনে ভোট, সেজন্য নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকরা আসছেন। আপনি পরে আসবেন" নির্দেশে করার মতো করে হাবিলদার জবাব দিল।
এই কথা শুনেই অভয়ের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেল। সে ক্ষোভের ফেটে পরল। চিৎকার করে বলল, "আমার স্ত্রী হারিয়ে গেছে আর আপনারা ভোট দেখাচ্ছেন? কোন সংবিধানে লেখা আছে ভোটের সময় অভিযোগ দায়ের করা যায় না? মনে রাখবেন আপনারা পাবলিক সার্ভেন্ট, জনতাকে সার্ভিস দেওয়ার বদলেই আমাদের ট্যাক্সের পয়সায় আপনাদের মাইনে হয়........." অভয় চিৎকার করতে থাকে। বিমল অভয়কে চুপ করানোর বৃথা চেষ্টা করতে করতেই একজন সাব ইন্সপেক্টর সেখানে পৌঁছলেন।
"কি ব্যাপার, এতো চেঁচামেচি কিসের?"
"স্যার, দেখুন না এনাকে বললাম আজ সবাই ব্যস্ত, কোনো এফআইআর নেওয়া যাবে না, কাল আসতে আর ইনি খামোখা........"
"স্যার, আমার স্ত্রী হারিয়ে গেছে আর ইনি আমাকে ভোটের ব্যস্ততা দেখাচ্ছেন", হাবিলদারের কথার মাঝেই অভয় এসআই সাহাকে বলল।
"আপনারা আমার সাথে আসুন" এসআই সাহা অভয় আর বিমলকে ডেকে নিল।
"বসুন", চেয়ারে বসে টেবিলের উল্টো দিকে রাখা চেয়ারের দিকে নির্দেশ করে এসআই সাহা বলল।
দুজনে দুটো চেয়ারে বসল। বিমল ইন্সপেক্টরকে ধন্যবাদ জানাতেই ইনসপেক্টর বলল, "আপনার সমস্যা কি বলুন এবার।" অভয় সমস্ত ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানাল তারপর শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করল, "অপরাজিতাকে পেয়ে যাব তো স্যার? দয়া করে একটু তাড়াতাড়ি এফআইআরটা দায়ের করে তদন্তটা শুরু করুন"
"দেখুন, সব কিছুর তো একটা সিস্টেমে আছে। আইন অনুযায়ী আমরা আপনার কথায় এফআইআর নথিবদ্ধ করতে পারি না। আপনার শ্বশুরবাড়ির তরফে কাউকে এই এফআইআর করতে হবে।"
"কেন? আমার স্ত্রী নিখোঁজ আর আমি তার অভিযোগ জানাতে পারি না?"
"না। কারন আবার স্ত্রীর নিখোঁজের পিছনে আপনার হাত থাকতেই পরে, এটাও তো হতে পারে যে আপনি আপনার স্ত্রীকে খুন করে গুম করে দিয়েছেন?"
"বাঃ! দেশের সংবিধান বলছে একশটা অপরাধী ছাড়া পায় পাক যেন একজন একজন নিরপরাধী শাস্তি না পায় আর এই দেশের আইনই সব স্বামীদের আগে থেকেই অপরাধী ধরে নিচ্ছে। এটা কি স্ববিরোধিতা নয় ইনসপেক্টর?"
"হয়তো আপনি ঠিক বলছেন। কিন্তু আমার হাত-পা আইনের বেড়ায় আবদ্ধ। আইনের বাইরে তো আমি যেতে পারি না।"
"কিন্তু ইনসপেক্টর........."
"তুই চুপ কর। ইনসপেক্টর আপনি বলুন এখন আমরা কি করব" অভয়কে থামিয়ে দিয়ে বিমল বলল।
এসআই সাহা একটু চিন্তা করল তারপর বলল, "আপনারা এক কাজ করুন, আপাতত অপরাজিতা দেবির মোবাইল নম্বরটা দিয়ে যান, আমি নিজের উদ্যোগে আনঅফিসিয়ালি তদন্ত কিছুটা এগিয়ে নিয়ে যাই। আপনি বরং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওনার বাপের বাড়ি থেকে কাউকে আনিয়ে রিপোর্টটা লেখান।"
"আপনাকে অনেক ধন্যবাদ স্যার। আমার শ্বশুরমশাই আর শাশুড়ির মা কাল সকালে চলে আসবেন, আমি কাল ওনাদের সরাসরি থানায় নিয়ে আসব। চলি স্যার।" দুজনে উঠে পরল। থানা থেকে বেরোবে এমন সময় ইনসপেক্টর ডাকল, "অভয়বাবু"
অভয় ঘুরে এলো, "বলুন স্যার"
"আমার মোবাইল নম্বরটা রাখুন, বলার মতো কোনো তথ্য যদি মনে পরে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবেন। কিছু লুকোবেন না কিন্তু।"
"অবশ্যই জানাবো স্যার।"

থানা থেকে বেরিয়ে রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকানে গিয়ে দুজনে দুটো সিগারেট ধরাল। দুজনেই নিশ্চুপ। অভয়ের চোখ দুটো ছলছল করছে। সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে শূণ্যে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে অভয় বলল, "বিমল, পুলিশ ওদের মতো তদন্ত করুক, আমরা একটু আমাদের মতো করে চার দিক খুঁজে দেখি চল।"
"আমরা এখন কোথায় খুঁজব? আর তাছাড়া মাসি আর মেসো তো কাল সকালেই আসছে"
"না রে বিমল। আমাকে খুঁজতেই হবে। আমি যে ওকে ছাড়া বাঁচব না রে। ছেলে-মেয়ে দুটোর মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। এখন আমি যদি পুলিশের ভরসায় বসে থাকি, নিজে খোঁজার এতোটুকু চেষ্টা না করি তাহলে আমি কি নিজের কাছেই মুখ দেখাতে পারব? ছেলে-মেয়ে দুটোকে কি জবাব দেবো? না রে বিমল, আমি পুলিশের ভরসায় নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারব না।"
"কিন্তু আমার একটা কাজ ছি..ল....."
"না-না। তুই যা। এটা আমার লড়াই, আমাকে একাই লড়তে হবে। তুই যা, তুই যা" অভয় ব্যথিত স্বরে বিমলকে জবাব দিল, তারপর মোটরসাইকেলে স্টার্ট দিয়ে নিমেষের মধ্যে বিমলের চোখে অদৃশ্য হয়ে গেল।

রাত প্রায় দশটা বাজে, অভয় এখনো বাড়ি ফেরে নি। অভয়ের মা-বাবা দুজনেই খুব চিন্তিত। মা অনেক কষ্টে অজয় আর অর্পিতাকে খাইয়ে ঘুম পারিয়েছে।
"কি গো! অভির সাথে তোমার কোনো কথা হলো?" মা বাবাকে জিজ্ঞাসা করল
"নাহ্" বলে বাবা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে আবার বলল, "ওর ফোনটাও তো বন্ধ, যোগাযোগ করতে পারছি না"
"একবার বিমলকে কল করে দেখো না, ও তো অভয়ের সঙ্গে আছে"
"ঠিক বলেছ, এটা তো আমার মাথায় ছিল না", বলেই বাবা সঙ্গে সঙ্গে বিমলের নম্বরে ডায়াল করল
অনেকক্ষণ কানে ফোনটা ধরে থাকতে দেখে অভয়ের মা অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল, "কি গো! ফোন লাগল?"
"রিং হচ্ছে, ধরছে না। দাড়াও আর একবার কল করি"
"হ্যাঁ গো, অভির আবার কোনো বিপদ হলো না তো?" মা ত্রস্ত কন্ঠে বাবাকে জিজ্ঞাসা করল
"আরে বিপদ আবার কি হবে! তুমি অযথা ফালতু চিন্তা কোরো না"
একটা বাইকের আওয়াজ ক্ষীণ থেকে ধীরে ধীরে বাড়ছে, যেন বাইকটা এদিকেই আসছে, কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাইকটা বাড়ি সদর দরজায় এসে দাঁড়াল তারপর একটা হর্ন বাজল।
"ঐ বোধহয় অভি এলো। আমি যাই দরজাটা খুলি" মা হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মিনিট খানেকের মধ্যেই অভয় ঘরে ঢুকল, ঝোড়ো কাকের মতো অবস্থা, মাথার চুল উস্কখুস্ক, দুই কোয়াস দিয়ে যেন ফেনা কাটছে। ঘরে ঢুকতেই বাবা জিজ্ঞাসা করল, "কি রে, তোর ফোন বন্ধ কেন?"
"চার্জ নেই", সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে অভয় চেয়ারে শরীর এলিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে পরল।
"বিমল কেন ফোন ধরছিল না? ওকে কি বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে এলি?"
"ওর কিছু এমার্জেন্সি কাজ এসে গিয়েছিল, তাই ও অনেকক্ষণ আগেই চলে এসেছে"
"তুই এতক্ষণ একা একা কোথায় ছিলি?" বাবা উদ্গ্রীব হয়ে জিজ্ঞাসা করল
"খুঁজছিলাম, পেলাম না" চোখ বন্ধ করেই কাঁপা কাঁপা গলায় অভয় বলল
"বৌমাকে? কোথায় খুঁজছিলি? তুই কি পাগল হয়ে গেলি?" বাবা ধমকে বলল
"এই জন্যই আমি তোমাকে যেতে বলেছিলাম, আমার কথা তো শুনবে না!" মা বাবার প্রতি অভিযোগ করল
"হ্যাঁ বাবা, অনেক খুঁজলাম ওকে। পেলাম না।"
"কিন্তু এতক্ষণ ধরে কোথায় খুঁজছিলি" মা খুবই উদ্বিগ্ন
"মা, ওকে আমি সব জায়গায় খুঁজলাম, পেলাম না। প্রথমে বাজারে গিয়ে সবাইকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেউ বলতে পারল না। তারপর রেল লাইনের ধার ধরে অনেকটা দেখে এলাম পেলাম না। একজন বলল আশেপাশের হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিতে, আমি সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে গিয়েছিলাম কিন্তু কোথাও পেলাম না মা, কোথাও পেলাম না", আর অভয় নিজেকে আটকে রাখতে পারল না, মাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল। মা, বাবা কারোর মুখে রা নেই। কিই বা বলবে! এই দুঃখের জন্য সান্ত্বনা দেওয়ার কি কোনো ভাষা হয়, হলেও তা তারা পড়ে নি। অভয়ের চোখের জলে মায়ের পিঠের আঁচল ভিজে গেল।
"অভি শান্ত হ। সত্যি কথা বলতে কি আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। যদি কিডন্যাপ হতো তাহলে তো এতক্ষণ কিডন্যাপারদের ফোন আসত। তোর কাছে, তোকে না পেলে আমার কাছে, কারোর কাছে তো ফোন আসতই। বাজারে গিয়ে যদি অসুস্থ হতো বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটত তাহলে তো নিশ্চয়ই খবর পেতাম, তুইও তো হাসপাতালে গিয়েছিলি কোথাও না কোথাও থেকে খবর তো পেতাম। মন শক্ত কর। এখুনি ভেঙে পরলে হবে? সামনে অনেক লড়াই পরে আছে।" অভয়ের পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বাবা সান্ত্বনা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল
মা অভয়কে হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসতে বললে অভয় খিদে নেই বলে জানাল। মা-বাবা মিলে খুব জোরাজুরি করাতে অভয় খেতে রাজি হলো।
"তুই হাত মুখ ধুয়ে আয়, আমি ভাত বাড়ছি।"
মাথা নেড়ে অভয় ঘরে ঢুকে গেল।

রাতে বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে কিন্তু অভয়ের কিছুতেই ঘুম আসছে না। বারে বারে অপরাজিতার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। গতকাল অপু ফল অফিস থেকে ফেরার সময় ফল নিয়ে আসতে বলেছিল কিন্তু অভয় ভুলে গিয়েছিল। যদি সে এটা না ভুলতে তাহলে আজ অপু ফল আনতে যেত না আর তাকে অভয় হারান না। "উঃ ভগবান কেন যে আমি ভুলে গেলাম!" মনে মনে অভয় নিজেকে দোষ দিতে লাগল। সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না যে অপুর হলোটা কি। কেউ তুলে নিয়ে গেল, নাকি কোনো দুর্ঘটনা ঘটল, নাকি অপু নিজেই..... ধুর এসব কি চিন্তা করছি! অভয় আবার চোখ বন্ধ করল। আবার দশ বছর আগেকার সেই সব ঘটনা তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে----
সম্পর্কের ঘনত্ব এখন অনেকটা বেড়েছে। এমনই একদিন রাতে ফোনে কথা বলতে বলতে মহুয়া অভয়কে জানাল যে সে তাকে একটা মিথ্যা কথা বলেছে। অভয় একটু আশ্চর্য হলো, "কি মিথ্যা বলেছ তুমি?"
"আগে বল তুমি রাগ করবে না" মহুয়া অভয়ের কাছে দাবি করার মতো করে বলল
"রাগ করব কেন? তুমি যখন মিথ্যা কথা বলেছ তখন নিশ্চয়ই এটার প্রয়োজন ছিল। এবার বলে ফেলো তো কথাটা কি।"
"আমার নাম মহুয়া নয়। অপরাজিতা। অপরাজিতা সেন। আর আমি তোমার প্রিয় বন্ধু বিমল মানে ছটকুদার বোন, মাসির মেয়ে।"
"কি! তুমি বিমলের বোন? ওর সাথে তো আমার প্রতিদিন ফোনে কথা হয়, ও আমাকে কিছু বলল না কেন?" অভয় একটু বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করল
"দাদাকে আমিই বলতে মানা করেছিলাম তো। তুমি কিন্তু রাগ করবে না বলে আমাকে কথা দিয়েছিলে"
"রাগ তো করিনি, অবাক অবশ্যই হয়েছি। যাইহোক, ব্যাপারটা আমাকে একটু বুঝিয়ে বলো তো"
"শোনো, গতবছর আষাঢ়নবমী পুজোয় আমি মাসির বাড়িতে গিছিলাম। সেখানেই আমি তোমাকে দেখি, মনে হয়েছিল আমি তোমাকে দেখতেই থাকি। আমি তোমাকে ভালোবাসি অভি।"
শেষের কথাটা অভয়ের ভিতর ঝড় তুলে দিল, উত্তেজনায় তার হাত-পা কাঁপতে লাগল। কথিত বলার চেষ্টা করেও মুখ দিয়ে টু শব্দ করতে পারছে না। তার যে ঠিক কিরকম অনুভূতি হচ্ছে তা সে নিজেও জানে না। এরকম অনুভূতি তার আগে কখনো হয়নি। একজন যুবতী নিজে থেকে তাকে প্রেম নিবেদন করেছে এ কথা অভয় নিজেই বিশ্বাস করতে পারছে না। সে নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। সম্বিত ফিরতেই তার কানে গেল--
কি হলো? কথা বলছ না যে? বুঝেছি, তুমি ভাবছ চেনা নেই, জানা নেই একটা মেয়ে এমন কথা কি করে বলতে পারে, আর একটা অচেনা মেয়েকে কি এইভাবে ভালো বাসা যায়? তাই তো?
"না, মানে" অভয় কিছু বলার চেষ্টা করতেই অপরাজিতা তাকে থামিয়ে দিল, "তুমি তো ঠিকই ভাবছ, এটা ভুল তো নয়। তুমি আমাকে চেনো না, জানো না, এমনকি আমার কোনো ছবিও দেখো নি। এরকম ভাবে কাউকে ভালোবাসা যায় নাকি? আচ্ছা তুমি বাড়ি কবে আসছ?"
"এই তো সামনের মাসেই" জড়ানো গলায় অভয় উত্তর দিল
"এবার যখন বাড়ি আসবে তখন আমরা দেখা করব, ঠিক আছে?"
"অবশ্যই দেখা করব। কিন্তু কোথায় দেখা করব?"
"আমার বাড়ি তো পানাগড়। আমরা তাহলে মাঝামাঝি জায়গায় কোথাও দেখা করব। বর্ধমানে?
"ঠিক আছে, তাই হবে।"
এরপর থেকে প্রতিদিন নিয়ম করে অভয় আর অপরাজিতার ফোনোপ্রেম চলতে থাকে। অর্ধেক রাত পর্যন্ত ফোনাফোনি চলত। ধীরে ধীরে অভয় অপরাজিতার প্রতি দুর্বল হয়ে পরল। তবে এটাকে ঠিক ভালোবাসা বলা যায় না তবে মোহাচ্ছন্নতার থেকে বেশি তো বটেই। আর এইভাবেই সেই দিনটা চলে এলো।
অভয় একটু তাড়াতাড়িই পৌঁছে গিয়েছিল। সে ভিষন উত্তেজিত, যত সময় এগিয়ে আসছে তার উত্তেজনাও ততই বাড়ছে। অপরাজিতার পৌঁছানোর আগে আধ ঘণ্টায় তিনটে সিগারেট খাওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু তাও উত্তেজনা এতোটুকু প্রশমিত হয় নি।
"অভয়?" পিছন থেকে ডাকটা এলো, সেই মিষ্টি আওয়াজ।
দুজনের এই ভালোবাসাকে পরিনতি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়াটা এক নাটকীয় ঘটনা। অপরাজিতার বাবা কালনার এক নামকরা ব্যবসায়ী, অগাধ পয়সা আর প্রতিপত্তি। অভয় মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। সুতরাং এই বিয়ে কি অপরাজিতার পরিবার মেনে নেবে? এছাড়াও অতীতের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার কারনে প্রেম করে বিয়ে করা অপরাজিতার বাবা একদম পছন্দ করে না। এই দুটো কথাই ওদের দুজনের রাতের ঘুম কে রে নেয়। এমতাবস্থায় ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে এল বিমল। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিমল অপরাজিতার বাবার কাছে অপরাজিতার সাথে অভয়ের বিয়ের প্রস্তাব রাখে এবং বিমল তার মেসোমশাইকে বোঝায় যে অভয় ছেলে হিসেবে খুবই ভালো আর অপরাজিতার জন্য উপযুক্ত। এইভাবে একটা বিমল একটা 'লাভ ম্যারেজ'কে 'এরেঞ্জ ম্যারেজ'-এ বদলে দিল। অভয়কে তার অনেক বন্ধু ঠাট্টা করে বলত, "তোর কপাল মাইরি! রাজকন্যা আর রাজত্ব দুইই পেলি"
এরপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। বিবাহিত জীবনের দশটা বছর কেটে গেছে। তারা এখন দুই ছেলেমেয়ের মা-বাবা। এদিকে কচ্ছ থেকে দিল্লি, হরিয়ানা হয়ে গত পাঁচ বছর ধরে অভয় কলকাতায় আছে। বাড়ি থেকে যাতায়াত করে। কিন্তু অপরাজিতার অভয়ের গ্রামের বাড়িতে থাকাটা বা কলকাতায় বদলি হয়ে আসাটা খুব একটা পছন্দ নয়। সে চায় অভয়ের সাথে বাইরে বাইরে ঘুরতে। কিন্তু অভয় তার মা- বাবার একমাত্র ছেলে, বয়স্ক বাবা-মাকে ছেড়ে কি ও বাইরে বাইরে ঘুরতে পারে? এছাড়া তার একটা মাটির টান আছে। সেই টাইন ওকে টেনে নিয়ে এসেছে। এই মাটিতেই তার নাড়ি পোঁতা আছে, এটা তো তার নাড়ির টান। এই টান কি সে উপেক্ষা করতে পারে!

এলার্মটা বাজতেই অভয় ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। জানলা দিয়ে সূর্যের ছটা এসে বিছানায় পরছে। তবে কি বেলা অনেকটা হয়ে গেল? দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখল আটটা বাজে। কাল অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমাতে পারেনি তাই, ক্লান্তও ছিল খুব তাই কখন যে আটটা বেজে গেছে জানতেও পারে নি। চায়ের কাপে চুমুক দিতেই একটা গাড়ির হর্ন কানে এলো। গাড়িটা যেন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। চায়ের কাপটা রেখে অভয় দরজা খুলল, দরজার সামনে অপরাজিতার বাবা অর্থাৎ তার শ্বশুর দাঁড়িয়ে। শ্বশুরমশাইকে অভ্যর্থনা জানিয়ে অভয় আশ্চর্যের সঙ্গে তার শাশুড়ি কেন আসে নি জিজ্ঞাসা করল। শ্বশুরমশাই জানাল যে তার শাশুড়িমাকে তার বোনের বাড়িতে অর্থাৎ বিমলের বাড়িতে রেখে এসেছে। অভয় খুব অবাক হল। বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত তার শ্বশুর-শাশুড়ি তাদের বাড়িতে এক কাপ চা পর্যন্ত খায় নি। যখনি আসে ওরা বিমলদের বাড়িতেই ওঠে আর আজ এমন বিপদের দিনেও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি?
"অভি তাড়াতাড়ি থানায় চলো। রিপোর্টটা লিখিয়ে আমাকে আবার ফিরতে হবে। বিকেলে ব্যবসায়ী সমিতির মিটিং আছে"
কথাটা কানে যেতেই অভয়ের মাথাটা গরম হয়ে গেল, সে চিৎকার করে উঠল, "কি ভেবেছেন কি আপনারা? মনুষ্যত্ব বলে আপনার কি কিছু আছে? অপরাজিতা আপনার মেয়ে, সেটা মাথায় আছে তো নাকি? আপনার কি এতোটুকু মায়া মমতা নেই? এই পরিস্থিতিতে আমি কোনো খাবার মুখে তুলতে পারছি না আর আপনি এইসব মিটিং-মিছিলের কথা বলছেন! ঐ বাচ্ছাদুটোকে দেখুন। ওরা আপনার নাতি-নাতনি, আপনারই রক্ত। কাল থেকে ওরা মা-মা করে কাঁদছে আর আপনি রিপোর্ট লিখিয়েই চলে যাওয়ার কথা বলছেন? যতদিন না অপুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে ততদিন আপনি এখানেই থাকবেন। আমাদের বাড়িতে থাকতে না চাইলে আপনার শালির বাড়িতেই থাকবেন, কিন্তু আপনাকে এখানেই থাকতে হবে" এক নিশ্বাসে অভয় নিজের সব রাগ, দুঃখ, হতাশা তার শ্বশুরের উপর ঢেলে দিল।

থানায় ঢুকে অভয় দেখল এসআই সাহা নেই। এক হাবিলদারকে জিজ্ঞাসা করে অভয় জানতে পারল যে উনি রাউন্ডে গেছেন আসতে দেরি হবে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে অভয় সাহাবাবুর মোবাইলে কল করল, "হ্যালো, স্যার আমি অভয় মানে অভয় মন্ডল বলছি, চিনতে পারছেন"
"হ্যাঁ-হ্যাঁ খুব চিনতে পারছি, বলুন"
"স্যার আমি আমার শ্বশুরমশাইকে নিয়ে এসেছি, এফআইআর করতে। আপনার আসতে কি দেরি হবে?"
"আপনি এক কাজ করুন, আমার টেবিলের ঠিক সামনের দত্তবাবু আছেন ওনার কাছে গিয়ে রিপোর্টটা লিখিয়ে দিন, আমার নাম করে বলুন ওনাকে আমার বলা আছে। তারপর আপনার শ্বশুরমশাইকে ছেড়ে দিয়ে আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আমি আসছি।"
"ঠিক আছে স্যার"
রিপোর্ট লিখিয়ে অভয় শ্বশুরমশাইকে বাড়ি ফিরে যেতে বলল। শ্বশুরমশাই চলে গেলে অভয় থানার সামনের চায়ের দোকানে গেল। সকালে টাটা ভালো করে খাওয়া হয় নি, একটা চা আর একটা সিগারেট নিল। অভয়ের মাথায় এক ঝাঁক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, ইনসপেক্টর সাহা কি কোনো সুত্র পেয়েছেন? অপরাজিতাকে কি এবার খুঁজে পাবে সে? আচ্ছা অপু কি কাল রাতে কিছু খেয়েছে? ছেলে-মেয়ে দুটোর চিন্তায় অপু খুব কষ্ট পাচ্ছে। অপুর হলো কি, এই ভাবে উবে গেল কি করে?
এতক্ষণ নিশ্চয়ই ইনসপেক্টর এসে গেছেন। সিগারেটটা ফেলে দিয়ে পা দিয়ে নেভার তারপর দোকানে পয়সা দিয়ে চলে গেল।
"স্যার আসতে পারি?"
"আরে আসুন আসুন। বসুন। চা খাবেন?"
"না স্যার। ধন্যবাদ। আমি এইমাত্র দোকান থেকে খেয়ে এলাম। কোনো খবর পেলেন স্যার?"
"আপনার স্ত্রীর যে নম্বরটা আপনি দিয়েছিলেন তার টাওয়ার লোকেশনের রিপোর্ট আর গত দু'মাসের কল হিস্ট্রি আমি পেয়েছি। লাস্ট টাওয়ার পাওয়া গেছে স্টেশন বাজারের, গতকাল সকাল এগারোটা আঠারো মিনিটে। তারপর থেকেই এই নম্বরটা বন্ধ। আচ্ছা অভয়বাবু যদি কিছু মনে না করেন একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?"
"মনে করব কেন! আপনি যে কোনো প্রশ্ন করতে পারেন। নিঃসংকোচে জিজ্ঞাসা করুন।"
"আচ্ছা আপনার সাথে আপনার স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন? মানে আমি বলতে চাইছি আপনার স্ত্রীর কি অন্য কোনো এফেয়ার আছে রে কখনো আপনার মনে হয়েছে?"
"কি বলছেন স্যার! এরকম হতেই পারে না।"
"আমি এখুনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না তবে এটা আমার ধারনা। দেখুন ওনার কল হিস্ট্রি যাচাই করে দেখেছি যে একটা নম্বর থেকে আপনার স্ত্রীর কাছে বারবার ফোন আসত আর প্রতিদিন নিয়ম করে তাদের ঘন্টার পর ঘন্টা কথা হতো। আশ্চর্যের বিষয় নম্বরটা পশ্চিমবঙ্গের নয়। হরিয়ানার।"
"কি বলছেন? এমনও তো হতে পারে যে আমার হরিয়ানায় যখন পোস্টং ছিল তখন সেখানে ওর যাদের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছিল তাদেরই কেউ?"
"মি. মণ্ডল আপনি কি কখনো আপনার কোনো বন্ধুর সাথে এইভাবে প্রতিদিন নিয়ম করে কয়েক ঘন্টা করে কথা বলতে চাইবেন? তাছাড়া ঐ নম্বরটার টাওয়ার লোকেশন বলছে গত কয়েকদিন ধরে ঐ নম্বর এই রাজ্যেই আছে আর গতকাল নম্বরটার শেষ টাওয়ার লোকেশন পাওয়া গেছে বর্ধমান স্টেশনে, সকাল দশটায়। যাই হোক আপনাকে আর একটা ইনফরমেশন দিই। আপনার স্ত্রীর টিকটক নামের একটা ভিডিও শেয়ারিং সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে একটা একাউন্ট আছে তা কি জানেন?"
"কি বলছেন স্যার! ও ওসব কবে শিখল? অপু তো স্মার্ট ফোন ঠিকঠাক ব্যবহার করতেই জানত না। আমি তো এ ব্যাপারে কিছু জানি না।"
"আপনি অনেক কিছুই হয়তো জানেন না মি. মণ্ডল, ভালো করে খোঁজ নিন, আপনার স্ত্রীর অতীত সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন। যাই হোক আপনি এখন আসতে পারেন। আমি সময় মতো আপনার সাথে যোগাযোগ করে নেব। আর হ্যাঁ আপনার কাছে কোনো তথ্য এলে যেন আমাকে জানাতে ভুলবেন না।"
অভয়ের মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোল না, সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে সে থানা থেকে বেরিয়ে গেল।

বাড়ি পৌঁছে অভয় চুপ চাপ একটা চেয়ারে বসে পরল। মাথায় কিছু ঢুকছে না। অপুর কোনো এফেয়ার থাকতে পারে এটা কিছুতেই সে বিশ্বাস করতে পারবে না। এটা কখনোই হতে পারে না। এইসব ভাবতে ভাবতেই মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করতে লাগল। এমন সময় অভয়ের ছেলে অজয় এসে জিজ্ঞাসা করল, "বাবা, মাকে এনেছ? ঠাম্মা যে বলল তুমি মাকে আনতে গেছ! মা কোথায় বলো না বাবা? মা আসছে না কেন?"
অভয় ভেল ভেল করে তার শিশু পুত্রের দিকে তাকিয়ে রইল। তার কাছে এইসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। সে যে নিজেও এই প্রশ্নগুলোরই উত্তর খুঁজছে। সেই মুহূর্তে অভয়ের মা এলো, অজয়কে কোলে নিয়ে বলল, বাবা মা খুঁজতে খুঁজতে হাঁপিয়ে গেছে দেখতে পাচ্ছ না সোনা? এখন খেলা কর যাও, মা কে পেয়ে গেলে বাবা ঠিক নিয়ে আসবে। আমার সোনা ছেলে, যাও ও ঘরে।"
অজয় চিৎকার করে উঠল, "নাআআআ। আমার মাকে চাই। এক্ষুনি চাই। আমি আর কোনো কথা শুনতে চাই না।"
ঠাম্মা অজয়কে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে অনেক চেষ্টা করে চুপ করাল। কিছুক্ষণ পরে আবার অভয়ের ঘরে এসে দেখে সে চেয়ারে মাথা নিচু করে বসে আছে আর তার চোখ দিয়ে ঝড় ঝড় করে জল পরছে।
কিরে! এইভাবে বাচ্ছা ছেলের মতো চোখের জল ফেললে হবে? একটু শক্ত হ।"
"মা, অজয়ের প্রশ্নগুলো যে আমার কানে গরম তেলের মতো এখনো ঢুকছে। কানের পর্দা যেন ফেটে যাবে মনে হচ্ছে মা। একটা প্রশ্নেরও জবাব আমার কাছে নেই।"
জানি বাবা, আমি তো তোর মা, তোর কষ্টটা আমি বুঝব না। সবই বুঝতে পারছি তবুও বলছি পারলে নিজেকে একটু শক্ত কর। এইভাবে ভেঙে পরিস না।"
"আচ্ছা মা, বাড়িতে অপু সারাদিন কি করত? ওর মধ্যে ইদানীং কি কোনো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেছিলে?"
মা অভয়ের দিক থেকে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে উত্তর দিল, "ও কি স্বাভাবিক কোনো দিনও ছিল?"
এরপর ঘরে কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল আর তারপর অভয় উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "মা আমি একটু বিমলদের বাড়ি থেকে আসছি" তারপর হনহন করে বেরিয়ে গেল।

দরজায় কলিং বেলের বোতাম টিপে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে উঠল কিন্তু কোনো উত্তর পেল না তাই অধৈর্য হয়ে কয়েকবার দরজা পেটাল। এবার ভিতর থেকে আওয়াজ এলো আর সঙ্গে সঙ্গেই বিমল দরজা খুলল, "কি রে! কি ব্যাপার? এই ভরদুপুরে এখানে?"
"কেন? খুব অসুবিধায় ফেলে দিলাম বুঝি?" বলেই অভয় বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল। ঘরে ঢুকেই অভয় দেখল বিমলের মা, বাবা আর অভয়ের শ্বশুর, শাশুড়ি খেতে বসেছে, সবাই মাংস ভাত খেতে খেতে খোশ মেজাজে গল্প করছে। এই দৃশ্য দেখেই অভয়ের রক্ত গরম হয়ে গেল, যাদের মেয়ে নিরুদ্দেশ তারা এরকম খোশ মেজাজে কি করে থাকতে পারে! অভয়কে দেখেই সকলে অপ্রস্তুতে পরে গেল, কেউই তো এই মুহূর্তে অভয়কে সেখান আশা করে নি। নিজেকে সামলে নিয়ে অভয়ের শাশুড়ি বলল, "এসো বাবা, এসো। কোনো খবর পেলে?"
"কোনো খবর পেলাম কি পেলাম না তা নিয়ে আপনাদের কি কাজ! আপনারা যেমন মাংস ভাত খাচ্ছেন, খান আর ফুর্তি করুন। আমাকে শুধু একটা সত্যি কথা বলুন, আমার আগে অপরাজিতার কি অন্য কোনো সম্পর্ক ছিল? দয়া করে কিছু গোপন করবেন না, সত্যি করে বলবেন।"
"এ কি বলছেন বাবা! এ যে শোনাও পাপ। দোহাই তোমায় আমার মেয়ের চরিত্রে এমন কালো দাগ তুমি দিও না", অভয়ের শাশুড়ি কাঁদতে লাগল।
উঃ, এই নাকে কান্না অভয়ের আর সহ্য হচ্ছে না। কোনো প্রত্যুত্তর না দিয়ে অভয় সেখান থেকে চলে গেল।
আশা, আশঙ্কার দোলাচলে এইভাবে দুটো দিন কেটে গেল। দুপুরে অভয় নিজের ঘরে শুয়ে অতীতের সুখের দিন গুনছিল। অভয়ের বাবা অভয়কে ডেকে জানাল যে বৈশাখী এসেছে, তার জন্য অপেক্ষা করছে। সে গ্রামেরই বছর কুড়ি বাইশের একটি মেয়ে, অজয়কে পড়ায়। অপরাজিতাই ঠিক করেছিল। বৈশাখীর সাথে অভয়ের সরাসরি কোনো দিন কথা হয় নি তাই অভয় ভেবে পাচ্ছে না যে সে আবার কি বলবে। ঘরে ঢুকতেই বৈশাখীর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, "অভয়দা, একটা কথা বলছিলাম। মানে আমার মনে হলো এটা আমার আপনাকে জানানো উচিৎ তাই........"
"অপুর ব্যাপারে?"
"হ্যাঁ, দাদা"
"বলো, বলো। নিঃসঙ্কোচে বলো। প্রতিটা ইনফরমেশন এখন গুরুত্বপূর্ণ।"
"দাদা, কয়েকদিন আগে বৌদির খোঁজ করে আমার কাছে একটা ফোন এসেছিল। হিন্দিতে কথা বলছিল। ভয় পেয়ে আমি ফোন টা কেটে দিয়েছিলাম।"
"কিন্তু তোমার নম্বর তার কাছে গেল কিভাবে?"
"মাস খানেক আগে আমি যখন অজয়কে পড়াচ্ছিলাম তখন বৌদি একবার আমার ফোনটা নিয়ে কাউকে ফোন করেছিল। হয়তো তাকেই। তারপর আবার কল লিস্ট থেকে নম্বরটা ডিলিটও করে দেয়।"
"ঠিক আছে, তুমি আমাকে নম্বরটা দাও"

বৈশাখী চলে যেতেই অভয় ইনসপেক্টর সাহাকে ফোন করল। বৈশাখীর থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে তার থেকে পাওয়া মোবাইল নম্বরটা ইনসপেক্টরকে দিল। ইনসপেক্টর সাহা অভয়কে বলল--
"অভয়বাবু আমার কাছেও কিছু তথ্য আছে। আপার স্ত্রীর কল হিস্ট্রি থেকে পাওয়া নম্বরটা শ্রীভান সিং গুর্জর নামের এক ব্যক্তির, তার বাড়ি হরিয়ানার হিসার জেলায়। মজার কথা হলো এই শ্রীভান নামের এক ব্যক্তি আপনার স্ত্রীর টিকটক গ্রুপেও আছেন। আরও আশ্চর্যের বিষয় ঐ গ্রুপে আপলোড করা ভিডিওগুলোতে আপনার স্ত্রী কিন্তু নিজেকে অবিবাহিতা বলে পরিচয় দিয়েছেন। একটা ভিডিওতে তো আবার আপনার মেয়েকে তাঁর ভাইঝি বলে পরিচয় দিয়েছেন আর কোন ভিডিওতেই ওনার বিবাহের চিহ্ন নেই এমনকি প্রতিটা ভিডিও চ্যাট বা আপলোডেড ভিডিও শুট করার আগে বেশ যত্ন সহকারে সিঁদুর মুছতেন।"
"কি বলছেন স্যার! আমি তো ভাবতেই পারছি না।"
"আপনাকে তো বলেছিলাম, আপনি অনেক কিছুই জানেন না। ঠিক আছে রাখছি।"
ফোনটা রেখে অভয় ধপ করে বসে পরল। তার মাথার ভেতরটা কেমন যেন খালি খালি মনে হচ্ছে। চারিদিক শূণ্য মনে হচ্ছে। সে যেন এক অতল গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে।

বিকালে এসআই সাহার ফোন এলো। থানার নম্বর দেখে অভয়ের মনে একটু আশার আলো খেলল, হয়তো কোন খবর আছে। তবে কি অপরাজিতার খবর পাওয়া গেছে! এসব সাত-পাঁচ চিন্তা করতে করতে তাড়াতাড়ি ফোনটা রিসিভ করল-
"হ্যালো!"
"অভয়বাবু, আমি ইনসপেক্টর সাহা বলছি।"
"বলুন স্যার। নতুন কোনো খবর আছে? অপরাজিতার কি খোঁজ পাওয়া গিয়েছে?"
"তা ধরুন পাওয়া গিয়েছে। তবে ফোনে সব বলা যাবে না। আর তাছাড়া তদন্তের কাজ এখনো একটু বাকি আছে। আপনি এক কাজ করুন, আজ সন্ধ্যা সাতটায় আপনার শ্বশুরমশাই আর শাশুড়িমা কে নিয়ে থানায় চলে আসুন। আর হ্যাঁ, আপনার বন্ধু বিমলকেও সঙ্গে আনবেন। এখন আমি রাখছি।"
অভয় আশা-আশঙ্কায় বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। ইনসপেক্টর কি এমন খবর পেলেন যে এদের সবাই কে নিয়ে যেতে বললেন। তাহলে কি সত্যিই অপুর কারোর সাথে সম্পর্ক আছে? না-না, কি যা তা চিন্তা মাথায় আসছে! এটা হতেই পারে না। অপু আমাকে ছাড়া আর কাউকে ভালো ভাসতে পারে না। চিন্তায় চিন্তায় জর্জরিত অভয় চোখ বন্ধ করে উপরের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, "হে ঈশ্বর, আমাকে এ কোন পরীক্ষার সামনে ফেললে তুমি!"

সন্ধ্যা ঠিক পৌনে সাতটায় ওরা থানায় পৌঁছে গেল। অভয়ের আর তর সইছে না, তাই একটু আগেই পৌঁছে গেছে কিন্তু ইনসপেক্টর সাহা কোথায়? ওনাকে তো দেখা যাচ্ছে না! অভয় কাউকে জিজ্ঞাসা করে সময় নষ্ট করতে চাইল না তাই সরাসরি সাহাবাবুকেই ফোন করল। ইনসপেক্টর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলল। বাইরে আছে, ফিরছে। মিনিট কুড়ি-পঁচিশ সময় লাগবে। আরও আধ ঘন্টা! অভয়ের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর থানার বাইরে এসে পায়চারি করতে লাগল।
"কি ব্যাপার অভয়বাবু এখানে ঘুরছেন কেন? ভিতরে চলুন", গাড়ি থেকে নেমে এসআই সাহা জিজ্ঞাসা করল
"স্যার আপনি এসেছেন! আমার একেবারেই তর সইছে না। আপনি প্লিজ একটু তাড়াতাড়ি সব বলুন। আগে বলুন আমার অপু কোথায় আছে, ও ভালো আছে তো?" কাতর হয়ে অভয় বলল
ইনসপেক্টর গোঁফের কোলে একবার মুচকি হেসে বলল, "ভিতরে চলুন, সব বলছি।"
ভিতরে গিয়ে অভয় আর ইনসপেক্টর নির্দিষ্ট চেয়ারের বসল। এক গ্লাস জল খেয়ে ইনসপেক্টর সাহা বলতে শুরু করল--
"অভয়বাবু আপনি আজ দুপুরে আমাকে যে নম্বরটা দিয়েছিলেন তার ইতিহাস-ভূগোল আমি খুঁজে বের করেছি। সেটাও হরিয়ানার নম্বর আর ঐ শ্রীভান সিং গুর্জরেরই।"
এই কথা শোনা মাত্র অভয়ের শ্বশুর-শাশুড়ি পরস্পরের দিকে তাকাল।
ইনসপেক্টর আবার বলতে শুরু করল, "ঘটনার দিনে ঐ নম্বরটার টাওয়ার লোকেশন বলছে সকাল এগারোটার সময় স্টেশন বাজারে ছিল, একটার সময় হাওড়া স্টেশনে ছিল। দুপুর তিনটের দিকে কলকাতা এয়ারপোর্ট তারপর আড়াই ঘণ্টা বন্ধ, অন হয় দিল্লি এয়ারপোর্টে। আমি এখানকার স্টেশন ও হাওড়া স্টেশনের সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করে দেখে বুঝেছি যে আপনার স্ত্রী স্বেচ্ছায় গেছেন।"
"কি বলছেন স্যার! আমি তো এসব কথা ভাবতেও পারছি না!" অভয়ের বাকরুদ্ধ হওয়ার মতো অবস্থা।
"অভয় বাবু, অবাক করার মতো আরও অনেক ঘটনা আছে। ওনার টিকটক গ্রুপে ব্যারাকপুরের এক বিহারি ছেলে আছে। তাকে জেরা করে জানতে পেরেছি যে ওই গ্রুপের সদস্যরা জানে আপনার স্ত্রী অবিবাহিতা ও শ্রীভানের প্রেমিকা। এবং আজ সকালে ওদের দুজনের রেজিস্ট্রি করে বিয়েও হয়ে গেছে।"
"কি? বিয়ে! অপু আবার বিয়ে করেছে? ও ছেলে মেয়ে দুটোর কথা একবারও ভাবল না!" অভয়ের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল
এদিকে তার শ্বশুর-শাশুড়ি আর বিমল মাথা নিচু করে বসে আছে।
ইনসপেক্টর একবার ওদের দিকে তাকিয়ে দেখল তারপর আবার বলতে শুরু করল, "আপনার শ্বশুরমশাই, শাশুড়িমা আর আপনার এই বাল্য বন্ধুটি কিন্তু আগে থেকে সব জানতেন।"
এটা শুনেই অভয় চমকে উঠল, "কি বলছেন ইন্সপেক্টর!"
"একদম ঠিক শুনেছেন আপনি আর আমিও ঠিকই বলেছি। আপনি নিজেই জিজ্ঞাসা করুন না।"
"বাবা! মা! বিমল! ইনসপেক্টর যা বলছেন তা কি সত্যি?
ওরা মাথা নিচু করে বসে রইল। কেউ কোনো কথা বলল না। অভয় আবার চেঁচিয়ে উঠল, "চুপ করে আছেন কেন বাবা? বলুন।"
এসআই সাহা বলল, "আরে ওরা কি বলবে, আমি বলছি শুনুন। সেদিন আপনি থানা থেকে যাওয়ার পর আপনার বন্ধু তার মেসোমশাই কে জানান যে আপনি থানায় এসেছিলেন আর কেসটা আমি দেখছি।"
"বিমল এই বুঝি তোর ইম্পর্টেন্ট কাজ?" অবজ্ঞার সুরে অভয় বলল।
"এই খবর পেয়ে আপনার শ্বশুরমশাই তাঁর পলিটিক্যাল সোর্স ও পাওয়ার কাজে লাগিয়ে আমার উপর প্রেসার দেওয়ান যাতে আমি এই কেসটা কোনো তদন্ত না করে ধামা চাপা দিই। আগেও যেমন করেছেন আর কি" ইনসপেক্টর আবার বলল।
অভয় চমকে উঠে বলল, "আগেও করেছেন মানে?"
"সেটাও বলছি। অভয়বাবু, আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম না যে আপার স্ত্রীর আগে কারোর সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না? তাহলে শুনুন, আপনার স্ত্রী এর আগে দুবার দুজন আলাদা আলাদা ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়েছিলেন। একজনের নাম অমিত রায় আর একজনের নাম আনোয়ার হোসেন।"
কি! এতো বড় কথা আপনারা চেপে গিয়েছিলেন? আমি সেদিনও জিজ্ঞাসা করলাম, এতো করে বললাম সত্যি কথাটা বলতে আর আপনারা নির্দ্বিধায় এরকম নাটক করে গেলেন! আপনারা কি মানুষ? ছিঃ ছিঃ!"
ওরা তিন জনেই মাথা নিচু করে রইল। তদের তো কিছু বলার থাকতেও পারে না।
"আরও চমকে দেবার মতো কথা শুনুন। অভয়বাবু আপনার বন্ধু মধ্যস্থতা করে আপনাদের প্রেমের সম্পর্ককে এরেঞ্জ ম্যারেজের রূপ দিয়েছিলেন, তাই তো?"
"হ্যাঁ, একেবারেই তাই।"
"না, একেবারেই ভুল। এটাও একটা নাটক। আরও পরিস্কার করে বললে একটা বিরাট ষড়যন্ত্র। আপনার স্ত্রীর যা রেকর্ড ছিল তার জন্য ওর বিয়ে দেওয়া মুশকিল হয়ে গিয়েছিল। তখন আপনার শ্বশুর-শাশুড়ি বিমলবাবুকে বলেন যে উনি যদি বিয়ের ব্যবস্থা করিয়ে দেন তাহলে মোটা উপঢৌকন দেবেন। বলতে দ্বিধা নেই যে বিমলবাবু মোটা উপঢৌকন পেয়েওছিলেন। কি বিমলবাবু তাই তো?"
বিমল নিরুত্তর। এখনো মাথা নিচু করেই বসে আছে।
"ওঃ! তাই যাদের দু'বেলা দু'মুঠো খাবার জুটতো না আমার বিয়ের পরেই দেখলাম তাদের দু'তলা পাকা বাড়ি হয়ে গেল, নতুন বাইক চলে এলো! আমার জীবনের তুই এইভাবে সওদা করলি! বিমল, তুই এতো নীচ! আমি তোর ছোটো বেলার বন্ধু আর তুই আমার এতো বড় সর্বনাশ করলি?"
"অভয়বাবু, আপনি চাইলে আপনাকে ঠকানো, আপনাকে ডিভোর্স না দিয়ে আবার বিয়ে করা ইত্যাদি অপরাধের জন্য আপনার স্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন। যদি বলেন তো আমি কেস রুজু করতে পারি" এসআই অভয়কে বলল।
জবাবে অভয় বলল, "দেখুন ইনসপেক্টর, আমি ওই কলঙ্কিনিকে তো আর ঘরে তুলব না। ও যেমন আছে থাক। আমার সামনে এখন বিরাট দায়িত্ব। ওসব আইনি জটিলতায় যাওয়ার আমার কোনো ইচ্ছা নেই।"
"অ্যাজ ইউ উইস" ইন্সপেক্টরের ঠোঁটে হালকা হাসির ঝলক। মনে মনে ভাবল একেই বোধহয় ভালোবাসা বলে। অভয়ের শ্বশুরের দিকে একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলল, "নিন এটাতে একটা সই করে দিন"
"এটা কি অফিসার?" অভয়ের শ্বশুর জিজ্ঞাসা করল
"এটা একটা এফিডেভিট, এতে লেখা আছে যে আপনার মেয়ে স্বেচ্ছায় অভয় বাবুকে ছেড়ে গেছেন, এই ঘটনার জন্য অভয়বাবু কোনো ভাবেই দায়ী নন, ভবিষ্যতে আপনারা কোনো অভয়বাবুর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনতে পারবেন না।" এসআই জবাব দিল।
"অফিসার, আমার জামাই হীরের টুকরো, ওর কোনো তুলনা হয় না। আমার মেয়ে ওর সাথে সংসার করার যোগ্য নয়। আমি ওর সাথে অনেক অন্যায় করেছি, ওর জীবনটাই নষ্ট করে দিয়েছি। আবার ওর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ কি কখনো করতে পারি? আর কত পাপ করব। দিন কাগজটা আমি সই করে দিচ্ছি।"

ঝোড়ো কাকের মতো অবস্থায় অভয় বাড়ি ঢুকল। ওর বাবা-মা দুজনেই উৎসুক হয়ে বসেছিল। বাড়ি ঢুকতেই বাবা জিজ্ঞাসা করল, "কি রে, কোনো খবর পেলি?"
"বলছি বাবা। মা, এক গ্লাস জল দাও তো।" কোনো রকমে কথা গুলো বলে ঘরের মেঝেতে বসে পরল। মা জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিতেই এক নিশ্বাসে অভয় জলটা খেয়ে নিল। তার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
"কি রে অভি, বল কি খবর পেলি" মা অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল। অভয় সব কথা তার মা বাবাকে বলল, আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল। বিলাপ করতে করতে সে তার মা-বাবার উদ্দেশ্যে বলল, "আমি তো ভাবতেই পারছি না যে অপু অন্য কারোর সাথে পালিয়েছে। আমাকে ছেড়ে গিয়ে সে অন্য কাউকে বিয়ে করেছে মা! আমার কথা না হয় ছেড়েই দাও ওর কি অজয়-অর্পিতার জন্যও এতোটুকু মায়া হো না? ও পারবে এদের ছেড়ে থাকতে?"
অভয়ের মা বাবার কাছে এর কোনো উত্তর নেই। ওরা ভেবে পাচ্ছে না যে কোন ভাষায় সান্তনা দেবে?
সবাই চুপ, ঘরে এখন নিস্তব্ধতা, যেন শ্মশানের শান্তি। নিজেকে সামলে নিয়ে অভয় তার মা কে জিজ্ঞাসা করল, "মা অজয় আর অর্পিতা কোথায়?" মা বলল পাশের ঘরে আছে।
পাশের ঘরে গিয়ে অভয় যে দৃশ্য দেখল তা ওকে যেন চাবুকের মতো আঘাত করল। এই দৃশ্য যতটাই করুন ততটাই মর্মান্তিক আর ততটাই হৃদয়স্পর্শী। দেখল ছোট্ট অর্পিতার কোলে অজয় শুয়ে শুয়ে কাঁদছে মাকে চাই বলে আর অর্পিতা তার দাদার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে আদো আদো গলায় বলছে, "কাঁদিস না দাদা, মা নেই তো কি হয়েছে? আমি তো আছি। আমি তোকে ঘুম পাড়িয়ে দেব।"
এই দৃশ্য অভয়কে নাড়িয়ে দিল। সে মনে মনে অপরাজিতার উদ্দেশ্যে বলল, "দেখো, দেখো। এই পাঁচ বছরের শিশুটারও মনে মমতার উদ্রেক হয়েছে তা তোমার ভিতরে নেই। নাহ্, তুমি নারী নও, নারীরূপী কোনো মায়াবীনি।

শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২০

অজানা জ্বর

 অজানা জ্বর

                                                                                              উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী


                                                                অঙ্কন ; তন্দ্রা ব্রহ্মচারী

আজ 'আরএন হাওস'-এ আনান্দের জোয়ার এসেছে , আরএন রায় গ্রুপ অফ কোম্পানিজের চেয়ারম্যান রাথীন্দ্র নাথ রায়ের একমাত্র পুত্র রমেন্দ্র নাথ রায়ের পনেরো তম জন্মদিন। খুব ধুমধাম করে পালন হবে, কয়েকশো অতিথি আমন্ত্রিত, সাদা বাড়িটা আলোয় ঢেকে গেছে। বাড়ির বড় গেটটা ফুল আর বেলুন দিয়ে সাজানো হয়েছে। গেটের ভিতর ঢুকলেই বিরাট সবুজ ঘাসের মখমলি উঠন আর সেই উঠনে একটা মস্ত বড় ফোয়ারা আছে। ফোয়ারাটাও আজ রংবেরঙের আলো দিয়ে সাজানো হয়েছে। চারিদিকে ব্যস্ততা, শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে যে যুদ্ধকালীন তৎপরতা। কিন্তু এতো আনন্দের মাঝেও একটা বিস্বাদের সুর আছে আর তা হল রথীনবাবুর হটাৎ অসুস্থতা। গত কয়েক দিন ধরেই রথীন জ্বর-সর্দি-কাশিতে ভুগছে, পারিবারিক ডাক্তার ও বাল্যবন্ধু ডাঃ মিহির রঞ্জন চৌধুরী রথীনবাবুকে একদম ঘর বন্দি করে দিয়েছেন, এতে যদিও রথীনের যথেষ্ট আপাত্তি ছিল কিন্তু ওনার উপর বন্ধু মিহিরের প্রভাব এততাই যে তাঁর নির্দেশ আমান্য করতে পানেন নি। একবার শুধু মৃদু আপাত্তির সুরে বলেছিল, “ডাক্তার, হয়েছে তো আমার সামান্য সর্দি-কাশি, তুই এটা নিয়ে কিন্তু বড্ড বাড়াবাড়ি করছিস”, জবাবে মুখে মাস্ক লাগাতে লাগাতে মিহির বলেছিলেন, “ডাক্তার আমি না তুই? দেখ এই জ্বর-সর্দি-কাশি মারাত্মক কোন আসুস্থতা নয় ঠিকই কিন্তু আজকালকার এইসব রোগকে অবহেলা কারাও উচিৎ নয়, তোর বাড়িতে একটা বাচ্ছা ছেলে আছে, অন্তত তার সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে আমার কথামত নিয়ম মেনে থাক, কয়েকটা দিনের তো ব্যাপার।” রথীন এর পর আর কোন আপত্তি করে নি।

রথীনের দেখভাল করার দায়িত্ব নিয়েছে ওনার স্ত্রী শর্মিলা, তার ঘরে আপাতত আর কারোর প্রাবেসাধিকার নেই। ডাক্তারের এতো 'বাড়াবাড়ি' রথীনের একমাত্র বোন রজনী হাসি মুখে মেনে নিয়েছে বটে কিন্তু রমেন এতে মোটেই খুশি নয়। এতো ধুমধাম করে তার জন্মদিন পালন করা হচ্ছে আর তাতে কিনা তার বাবাই থাকবে না! এটা যেন সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। এক সময় তো সে জন্মদিনের অনুষ্ঠান বাতিল করবে বলে জেদ ধরে বসেছিল, সবাই মিলে তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আবার রাজী করিয়েছে।

রথীন আর মিহির ছোট থেকে প্রায় একই সাথে মানুষ হয়েছে, মা মরা মিহিরকে রথীনের মা নিজের ছেলের মতোই দেখতেন এমনকি গরীব ঘরের মেধাবী ছাত্র মিহিরের পড়াশোনার যাবতীয় খরচ রথীনের বাবাই করেছিলেন। এই পরিবারে আরও একজন সদস্য আছে, যার কথা না বললেই নয়, অবনী সরকার। যেমন লক্ষণ ছাড়া রামায়ণ সম্পূর্ণ হয় না তেমন অবনী ছাড়া রথীনের জীবনও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। দুজনের সম্পর্ক ঠিক রাম লক্ষণের মতোই। অবনী রথীনের পিসতুতো ভাই, মা-বাবার মৃত্যুর পর রথীনই অবনীকে মানুষ করেছে, লন্ডনের স্কুল অব কমার্স থেকে বিজনেস এডমিনেস্ট্রেশনে স্নাতকোত্তর করে গত কয়েক বছর হলো রথীনের ব্যবসার যাবতীয় দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। তার সুপটু ব্যবসায়ীক কৌশল ও গুনে রথীনের ব্যবসার বেশ উন্নতি হয়েছে। রথীনও অবনীর কর্মদক্ষতায় বেশ খুশি ও নিশ্চিন্ত।

রমেনকে আজ তার প্রাণের চেয়ে প্রিয় পিসি রজনী খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে। খাওয়া দাওয়ার এলাহী আয়োজন আছে। ইতিমধ্যেই অতিথিরা হাজির, কেকও কাটার জন্য তৈরি। বন্ধুরা 'হ্যাপি বার্থডে টু ইউ' গাইতে শুরু করেছে, রমেন ফুঁ দিয়ে পনেরো টা বাতি নিভিয়ে কেক কাটতে যাবে এমন সময় সবার কানে এলো একটা চিৎকার, যা ক্রমশ আর্তনাদের চেহারা নিল। মুহূর্তের আকস্মিকতায় সবাই স্তম্ভিত। সম্বিত ফিরতেই সবাই ছুটলো দোতলায় রথীনের ঘরের দিকে, শর্মিলার কান্নার আওয়াজটা যে ও দিক থেকেই আসছে।

মিহির আগে ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিল যাতে আর কেউ ঢুকতে না পারে। প্রত্যেকে ঘরের বাইরে কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে দাঁড়ায়। রমেন আর রজনী একে অপরকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করছে। অবনী অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। কান্নার আওয়াজটা এখনো ভিতর থেকে আসছে। এমন অবস্থায় হটাৎ ঘরের দরজা খুলে গেল। ঝড়ো কাকের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে এলো মিহির, মুখে কোন রা নেই। অবনী চেঁচিয়ে উঠল, 'কেমন আছে দাদা?' মিহির এখনো নির্বাক, অবনী আওয়াজটা এবার আর একটু বেড়ে গেল, কি হলো ডাক্তারদা (অবনী মিহিরকে এই নামেই সম্বোধন করত), কথা বলছ না কেন?' এবার মিহির ধীরে ধীরে মুখ তুলল, তার চোখের জল যেন বাঁধন মানছে না। আর এর সাথে সাথে ই অবনী কান্নায় ভেঙে পরল।

দু'বছর, সাত মাস পর

কয়েকমাস পরেই প্রজাতন্ত্র দিবসের শতবার্ষিকী পালন করবে সারা দেশ। সুতরাং নিরাপত্তার কঠোর জাল বুনতে হবে আর সেই সঙ্গেই জঙ্গি সংগঠন, জঙ্গি নেতা ও তাদের সাহায্যকারী প্রত্যেকের উপর নজর রাখতে হবে। এই সময়টাকে অত্যধিক স্পর্শকাতর বলে ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দপ্তরের। তাই রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তরে নিজের কেবিনে গোয়েন্দা আধিকারিকদের নিয়ে এক জরুরী মিটিং করছেন গোয়েন্দা অফিসার সনাতন মিত্র। ছিপছিপে ও শক্তপোক্ত চেহারা, উচ্চতা তা প্রায় পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি, গায়ের রং চাপা, চোখে একটা অদ্ভুত চপলতা। অপরাধীদের ত্রাস এই গোয়েন্দা অপরাধী ও পুলিশ উভয় মহলেই পরিচিত 'চিপকু গোয়েন্দা' বলে, কারণ অপরাধের শিকড় আর অপরাধী পর্যন্ত না পৌঁছানো পর্যন্ত কেসের সাথে জোঁকের মতো লেগে থাকে। এই নামটা অবশ্য সনাতনের অপছন্দের নয়। সনাতন গর্ব করে বলে "মানিকবাবু আমাদের রক্তে গোয়েন্দাগিরি ঢুকিয়ে দিয়েছেন, অন্ততঃ তাঁর প্রতি সম্মান জানাতে 'চীনা জোঁক' কেসের সাথে তো লেগে থাকতেই হবে।"
মিটিং-এর মাঝেই মোবাইল বেজে উঠল, বিরক্ত হয়ে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখে দ্রুত ফোনটা রিসিভ করলেন - "জয় হিন্দ স্যার" "স্যার, অফিসেই আছি" "এখুনি?" "কিন্তু স্যার আমি এই মুহূর্তে যে অফিসারদের নিয়ে জরুরি একটা মিটিং করছি......" "ঠিক আছে স্যার, এখুনি আসছি"
ফোনটা কেটে কয়েক মুহূর্ত কিছু ভাবল, তারপর বলল "মাই ডিয়ার অফিসার্স, আওয়ার মিটিং ইজ ওভার, আপনারা এখন আসতে পারেন, আমি পরে সময় মতো আবার কল করে নেব।" সবাই বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলো এমন সময় সনাতন বলল, "অভি, তুমি দাঁড়াও।"
আভি অর্থাৎ অভিরূপ চট্টপাধ্যায়, আইপিএস অফিসার, বয়স ৩৩ বছর। বুদ্ধিদীপ্ত এই অফিসার দারুণ কর্মঠ আর তাই চিপকু গোয়েন্দার পছন্দের তালিকায় একদম শীর্ষে পৌঁছাতে সময় লাগেনি।
অভিকে বসতে নির্দেশ দিলেন সনাতন। অভি, ডিআইজি স্যারের ওখান থেকে ফোন এসেছিল, আমাকে সমস্ত এপয়েন্টমেন্ট, এসাইনমেন্ট ক্যানসেল করে ইমিডিয়েট ওনার অফিসে পৌঁছাতে বললেন। এতো উদ্বেগে স্যারকে কখনো দেখিনি। কি সমস্যা হতে পারে বলো তো?"
স্যার আমি... মানে.....আমি...." অভিকে আমতা আমতা করতে দেখে থামিয়ে দিয়ে সনাতন বলল "তুমিই বা কি করে জানবে?" দীর্ঘশ্বাস নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সনাতন, "অভি, চলো আমার সাথে।"
"স্যার আমি? কিন্তু উনি তো আপনাকে ডেকেছেন!"
"কথা না বাড়িয়ে চলো তো আমার সাথে"

"স্যার আসতে পারি?" কেবিনের দরজাটা ঠেলে মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল সনাতন।
"আরে, এসো-এসো, বসো" বলে চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করে বসতে বলল ডিআইজি সত্যসাধন মুখোপাধ্যায়।
"স্যার আমি কিন্তু আভি মানে অভিরূপকেও নিয়ে এসেছি।"
"তা বেস তো, ওকে ভিতরে ডাকো"
"অভি ভাতরে এসো"
অভি ভিতরে ঢুকে স্যালুট জানাল, তারপর পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল।
"দাঁড়িয়ে কেন! বোসো।" অভিকে ডিআইজি বললেন।
"থ্যাংক ইউ স্যার" বলে অভি সনাতনের পাশের চেয়ারে বসল।
এরপর কয়েক মিনিটের পিনড্রপ সাইলেন্স। ডিআইজিকে বেশ চিন্তিত লাগছে। মাথার পিছনে হাত দিয়ে শরীরটা চেয়ারে এলিয়ে দিয়ে কি যেন ভাবছে।
"স্যার! আপনাকে এতো চিন্তিত আগে কখনো দেখিনি।" "বিশেষ কোন টেরোরিজম মুভমেন্টের খবর আছে?"
"হুম! এটা টেরোরিস্টই বটে, অতি ভয়ঙ্কর টেরোরিস্ট"
"কোন গ্রুপ স্যার?" "বোম ব্লাস্টের পরিকল্পনা আছে না অন্য কিছু?"
"নাহ্ সে সব কিছু নয়। আচ্ছা সনাতন তোমার বয়স কতো হলো?"
"স্যার, একচল্লিশ প্লাস"
"বাঃ, তাহলে তো তোমার মনে থাকার কথা।"
"কি বলুন তো স্যার!"
"বছর সাতাশ-আঠাশ আগে একটা ভাইরাস মহামারীর রূপ নিয়েছিল ফলে সারা বিশ্ব সন্ত্রস্ত হয়ে গিয়েছিল, মনে পড়ে?"
"খুব মনে পরে স্যার, আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি, বহুদিন স্কুল বন্ধ ছিল, আমাদের তো খুব মজা হয়েছিল।"
"কিন্তু কতো মানুষের কতো ক্ষতি হয়েছিল চিন্তা করোতো, দেশের অর্থনীতির একেবারে তলানিতে চলে গিয়েছিল। যাইহোক, অভি তোমার মনে পড়ে কিছু?"
"স্যার আমার তখন বয়স ছ'বছর, সেভাবে কিছু মনে নেই, তবে পরে এ ব্যপারে অনেক গল্প শুনেছি। কিন্তু স্যার আজ সে সব কথা কেন উঠছে ঠিক বুঝলাম না।"
ডিআইজির চোখ দুটো কুঁচকে গেল, টেবিলের উপর ঝুঁকে পরে বলল, "যদি সে আবার ফিরে আসে?"
"মানে! কি বলছেন স্যার?" সনাতন চমকে উঠল।
"হ্যাঁ, তুমি ঠিক শুনেছ, গত পরশু আরএন রায় গ্রুপ অফ কোম্পানিজের মালকিন শর্মিলা রায়ে একমাত্র ছেলে রমেন্দ্রনাথ রায় মারা গেছে। ক'দিন ধরেই সে জ্বরে আক্রান্ত ছিল। ওর চিকিৎসা করছিল বিখ্যাত ভাইরোলজিস্ট ডাঃ প্রশান্ত সামন্ত। উনি নিশ্চিত যে রমেনের শরীরে ঐ ভাইরাস বাসা বেঁধেছিল। এই রোগ যদি ছড়িয়ে পড়ে তাহলে তার ফল অতি ভয়ঙ্কর হবে। এটা আমাদের আটকাতেই হবে সনাতন। তোমার দুজনে একবার ওদের সাথে যোগাযোগ করো, ওদের বাড়ি গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে দেখ তবে সাবধান কেউ যেন কিছু জানতে না পারে। যতদিন না কোনো কনক্লুশনে পৌঁছাতে পারছি ততদিন এটা মানুষের স্বার্থেই গোপন রাখতে হবে। এই কেসটা আমি তোমার হাতেই তুলে দিলাম।"
"চিন্তা করবেন না স্যার, এই রোগ আমি ছড়াতে দেবো না। ঠিক আছে স্যার, আমি চলি"
"বেস্ট অফ লাক মাই বয়"
সনাতন আর অভিরূপ দুজনেরই ডিআইজির কাছ থেকে বিদায় নিল।

গাড়ি এসে থামল বিশাল সাদা বাড়িটার গেটে। দারোয়ান পরিচয় জানতে চাইলে সনাতন বলল "থানা থেকে আসছি। ম্যাডামের সাথে দেখা করতে চাই।" রাস্তায় আসতে আসতে অভিকে সনাতন বলে দিয়েছিল যে তারা যে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট থেকে আসছে তা যেন কেউ জানতে না পারে। বাড়িতে ঢুকতেই এক পরিচারক পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে অভি জানাল যে তারা থানা থেকে আসছে, ম্যাডাম শর্মিলার সাথে দেখা করতে চায়। পরিচারক তাদের উপরের নিয়ে গেল। ঘরে একদিকে পুত্রহারা শোকার্ত মাকে সান্তনা দিচ্ছে অবনী আর একদিন বন্ধুসম ভাইপোহারা বিলাপরতা পিসিকে বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে মিহির।
সনাতন দরজায় টোকা দিল, "আসতে পারি?"
"কে?" অবনী জিজ্ঞাসা করতেই ঘরের সবাই দরজার দিকে তাকাল।
"আমি সনাতন মিত্র, থানা থকে আসছি। ও আমার সহযোগি অভিরূপ চট্টপাধ্যায়। আমি রমেনের মৃত্যুর ব্যাপারে একটু খোঁজ খবর নিতে চাই।"
সবাই যেন চমকে উঠল, "কেন বলুন তো?" অবনী জানতে চাইল।
"না আসলে ওর মৃত্যু অজানা জ্বরের ফলে হয়েছে তো তাই আমাদের একটু রমেনের ব্যপারে খোঁজ খবর করতে বলা হয়েছে। আসলে রাজ্যে অজানা জ্বরে মৃতদের একটা ডাটাবেশ তৈরী করছে সরকার। সেই ব্যাপারেই কিছু প্রশ্ন করব আপনাদের, যদি আপনাদের কোনো আপত্তি না থাকে।"
মিহির বলল "না না আপত্তি থকবে কেন! আসুন, বসুন।"
তাদের বিভিন্ন প্রশ্ন করে সনাতন আর অভিরূপ যা জানতে পারল তা এইরকম---

রথীনের মৃত্যুর পড় তার ব্যবসা এখন বিধবা স্ত্রী শর্মিলা ও ভাই অবনী সামলাচ্ছে। শর্মিলা ঠিক করেছে যে রমেনের উচ্চমাধ্যমিক শেষ হলে তাকে অক্সফোর্ডে ভর্তি করবে, তাই অবনীকে এ ব্যাপারে খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য বলেছে সে। এদিকে রজনীও বিবাহযোগ্যা হয়েছে। শর্মিলা তার এক ব্যবসায়ী বন্ধুর ভাইয়ের সাথে রজনীর বিবাহ প্রস্তাব দিয়েছে, যদিও রজনীকে এতে খুব একটা খুশি মনে হয় নি কিন্তু মুখে কোনো আপত্তি করেনি। তাই শর্মিলাও আর বেশি দূর এগোয় নি।

সামনে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা তাই রমেন দিনরাত এক করে পড়াশোনা করছে। এরপর বিদেশে যাবে, অক্সফোর্ডের মতো এক বিশ্ব বরেণ্য ও ঐতিহাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাবে, এসব ভাবলে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হবে, ভালো রেজাল্ট না হলে অক্সফোর্ডে ভর্তি হওয়া হবে না। তাই সে নাওয়া খাওয়া ভুলে পড়াশোনা করতে ব্যস্ত। মা একদিন বলেছিলেন, "হ্যাঁ রে, এই ভাবে বই মুখে পরে থাকলে তো অসুস্থ হয়ে পরবি!" জবাবে রথীন বলেছিল, "ও কিছু হবে না, অক্সফোর্ডের টিকিট পেতে একটু কষ্ট তো করতেই হবে মা, বাবার ইচ্ছা যে পুরন করতেই হবে। তুমি চিন্তা কোরো না।" জবাব শুনে মা খুশি হয়ে চলে গিয়েছিল।

এবার অক্টোবরে শেষ সপ্তাহেই শীতটা বেশ জাঁকিয়ে পরেছে। বিগত কয়েক বছর ধরে এমনটা দেখা যায় নি। এর মধ্যেও রমেন এসি চালিয়ে পড়তে বসে। বাড়ির সবাই মানা করলেও সে কি মানার ছেলে! "বৌদি,রাত প্রায় এগারোটা বাজতে চলল, এখনো রমেন খেতে এলো না?" শর্মিলা রজনী জিজ্ঞাসা করতেই রজনী বলল দাঁড়া আমি দেখছি, এই বলে তিনতলার উপরে রমেনের পড়ার ঘরে গেল। ঘরে ঢুকে শর্মিলা দেখে রমেন ঘুমোচ্ছে। "দেখ ছেলের কান্ড, আমরা নিচে অপেক্ষায় আছি ও কখন পড়াশোনা শেষ করে খেতে আসবে আর ছেলে আমার লেপ ঢাকা দিয়ে ঘুমোচ্ছে" এই বলে রমেনের গায়ে হাত দিতেই শর্মিলা চমকে উঠল। এ কি! গা যে জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে! সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার মিহিরের ডাক পরল। ডাক্তার এলেন, জ্বর মাপার জন্য থার্মোমিটারটা রমেনের বগলে লাগিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "ওর কি কাশি বা হাঁচি হচ্ছে?" উত্তরে রজনী বলল, "ক'দিন ধরে খুক খুক করে কাশছে, বৌদি রেগে গিয়ে ওর ঘরের এসির কানেকশনটা কেটে দিয়েছে।" কি! এখনো ও এসি চালাচ্ছে!" আশ্চর্যজনক অভিব্যক্তি সহ জিজ্ঞাসা করল মিহির আর তারপর ওষুধ পত্র দিয়ে চলে গেল। বেশ কয়েকদিন হয়ে গেল এখনো জ্বর ছাড়ছে না। অবনী, শর্মিলা আর রজনী আলোচনা করছিল। বাড়ির সকলে যথেষ্ট উদ্বেগের মধ্যে আছে। ঘর পোড়া গরু তো, সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় তো পাবেই। এমন সময় রজনীর মোবাইলে একটা ফোন এলো। "ছোটো মামা ফোন করেছেন, তাড়াতাড়ি ফোনটা ধর" বলে শর্মিলা রজনীর দিকে ফোনটা এগিয়ে দিল।
"হ্যালো, হ্যাঁ মামা বলো"
"কিরে, ওদিককার কি খবর?" "রমেনের শরীর কেমন আছে?"
"একদম ভালো নেই মামা" রজনী মাথাটা নামাল
"জ্বর কি একটুও কমেছে?"
"না, আমার ভয় করছে! দাদাও তো.........." এই বলেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল রজনী।
"ভয়ের ব্যাপার তো বটেই, তবে কাঁদিস না, আমি কালই আমার বন্ধু বিখ্যাত ভাইরোলজিস্ট ডাঃ প্রশান্ত সামন্তকে নিয়ে যাব। চিন্তা করিস না।"
"ঠিক আছে মামা, তুমি কিন্তু কালই নিয়ে এসো"
"অবশ্যই; ঠিক আছে এখন রাখছি।"
"কিরে রজনী, মামা কি বললেন?" অবনী উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করল। রজনী অবনী আর শর্মিলাকে মামার সাথে হওয়ার কথাবার্তা সংক্ষেপে জানাল। অবনী আপত্তির সুরে বলল, "এই সামান্য জ্বরের জন্য এতো নাম করা ডাক্তার আনার কি দরকার, মিহিরদা তো আছেই।" রজনী বলল, "না অবনীদা আমার ভিষন ভয় করছে, মামা বড় ডাক্তার নিয়েই আসুক।"

পরদিন সকালেই ছোটো মামা ডাঃ সামন্তকে নিয়ে হাজির। বাড়িতে এসেই সোজা রমেনের ঘরে চলে গেল। ডাঃ সামন্ত রমেনকে প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে পরীক্ষা করার পর নিচে নেমে এলো। মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। কপালে বলি রেখা দেখা যাচ্ছে। "আমি একটু ডাঃ চৌধুরীর সাথে একান্তে কিছু কথা বলতে চাই" ডাঃ সামন্তকে বললেন। 'ওহ্ সিওর, চলুন" বলে মিহির ডাঃ সামন্তকে পাশের ঘরে নিয়ে গেল।
"ডক্টর, আপনি তো শুরু থেকেই চিকিৎসা করছেন, তা আপনার কি মনে হয়?"
"আমি তো শুরুতে নর্মাল ভাইরাল ফিভার ভেবেছিলাম, কিন্তু কাল ওর সিম্পটমগুলো দেখে এটাকে আরও সিরিয়াস ভাবেই ট্রিট করছি। ইন ফ্যাক্ট আমি আজকে ওর কিছু টেস্ট করানোর কথাও ভেবেছিলাম। সকালে এখানে এসে শুনলাম আপনি এসেছেন। ভালোই হলো। আপনার কি মত স্যার?"
"আমি কিন্তু খুব একটা ভালো বুঝছি না। নর্মাল ভাইরাল ইনফেকশন বলে মনে হচ্ছে না। তাই আমি ওকে আমার হাসপাতালে শিফ্ট করতে চাই, অবশ্য যদি আপনার আপত্তি না থাকে।"
"একি বলছেন স্যার! আপনার মতো স্বনামধন্য ডাক্তার ওর চিকিৎসা করবে এতে আমার আপত্তি কেন থাকবে? রমেন তো আমার ছেলের মতোই। আপনি ওকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন।"
কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্স এসে হাজির হলো। দ্রুত রমেনকে নিয়ে যাওয়া হলো রাজ্যের এক নামকরা হাসপাতালে যার ভাইরোলজি ডিপার্টমেন্টের যথেষ্ট সুখ্যাতি আছে। চিকিৎসাও দ্রুত শুরু হয়ে গেল। রক্ত, মল, মূত্র, লালারস ইত্যাদি নানান নমুনা টেস্টের জন্য ল্যাবে পাঠানো হলো কিন্তু রমেন সতেরো বছরের এই কোমল শরীর ঐ আর পেরে উঠল না। সেদিন রাতে রমেন মারা গেল।

জিজ্ঞাসাবাদ করে অফিসে ফেরার জন্য গাড়িতে উঠল সনাতন আর অভিরূপ। কিছুদূর যেতেই সনাতনের মোবাইলটা বেজে উঠল। ডিআইজি সত্যসাধন মুখোপাধ্যায়ের কল, সনাতন ফোনটা ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে কিছু নির্দেশ এলো আর সনাতন "ওকে স্যার" বলে ফোনটা রেখে দিল।
"কি ব্যাপার স্যার?" অভি জিজ্ঞাসা করল।
"ডাঃ সামন্ত আমার সাথে দেখা করতে চান, উনি আজ বিকেলে সাড়ে তিনটে নাগাদ স্যারের অফিসে আসবেন। এখন ক'টা বাজে অভি?"
"স্যার, দেড়টা বাজে"
"হাতে বেশিক্ষণ সময় নেই, লাঞ্চ করেই বেরিয়ে পরতে হবে।"


                                                                                     অঙ্কন ; তন্দ্রা ব্রহ্মচারী 

বিকাল ঠিক তিনটে পঁচিশে সনাতন আর অভি পৌঁছে গেল ডিআইজির অফিসে।
"স্যার আসতে পারি?" সনাতন কেবিনে ঢোকার অনুমতি চাইল।
"আরে অতো ফর্মালিটির দরকার নেই, এসো এসো"
ভিতরে ঢুকে দুজনেই স্যালুট করে চেয়ারে বসল।
"মিসেস রায়ের সাথে কথা হলো?"
"হুম, স্যার হলো তবে শুধু মিসেস রায় নয় ওনার দেওর, ননদ ও ওনাদের পারিবারিক ডাক্তার মিহিরবাবুর সাথেও কথা হয়েছে।"
"ফাইন! কি জানতে পারলে?"
সনাতন সংক্ষেপে পুরো ঘটনাটা ডিআইজিকে জানাল। এই কথা শেষ হতেই ডাঃ সামন্ত সেখানে এসে পৌঁছলেন।
"গুড আফটারনুন ফ্রেন্ডস্"
"গুড আফটারনুন ডক্টর, আসুন আসুন। প্লিজ হ্যাভ ইওর সিট।"
"থ্যাংক ইউ। তবে আমি সিওর নই এই আফটারনুনটা গুড না ব্যাড" চেয়ারে বসতে বসতে বললেন ডাঃ সামন্ত।
"ডক্টর, এই হলো সনাতন মিত্র, আমাদের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টর রত্ন বলতে পারেন। আর এই ইয়ংস্টারের নাম অভিরূপ চট্টপাধ্যায়, সনাতনের অন্যতম প্রিয় সহযোগি। আর সনাতন ইনি ডাঃ সামন্ত।"
করমর্দন করে পরিচয় পর্ব শেষ হতেই ডাঃ সামন্ত সনাতনকে উদ্দেশ্যে করে জিজ্ঞাসা করল, "অফিসার, আপনি তো রমেনের বাড়ি গিয়েছিলেন, পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বার্তাও বলেছেন তা রমেন কি ইদানীং বিদেশে কোথাও গিয়েছিল?"
"না, ইনফ্যাক্ট ও পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিল যে নিজের ঘর থেকেই হয়তো মাস ছয়েক বের হয় নি।" সনাতন জবাব দিল।
"দেখুন ওর শরীর থেকে ভাইরাসটা যে পাওয়া গেছে এটা তো সত্যি কিন্তু প্রশ্ন হলো এই ভাইরাস ওর শরীরে এলো কোথা থেকে। এটা যে পর্যায়ে আছে তাতে ভয়ের কিছু নেই কারোর প্রাণ নিতে পারবে না কিন্তু যদি ভয় তখনই যদি এ মিউটেশনের মাধ্যমে নিজের ডিএনএ তে কোনো পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলে আর এটা হলে আবার মহামারী দেখা দেবে আমি নিশ্চিত।"
অভি জিজ্ঞাসা করল, "ডক্টর আপনি বললেন এর প্রাণ নেওয়ার ক্ষমতা নেই তাহলে রমেন কি করে মারা গেল?"
"ইয়ংম্যান এই একই চিন্তা আমিও করছি। একজন সুস্থ সবল যুবক কখনোই এর প্রভাবে মারা যেতে পারে না। বয়স্ক মানুষ হলে তবুও কথা থাকত কারন বৃদ্ধ/বৃদ্ধাদের ইমিউনিটি অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে।"
"অথবা যদি না ইচ্ছা করে, নির্দিষ্ট ওষুধ প্রয়োগ করে কারোর ইমিউনিটি কম করে দেওয়া হয়?" সনাতন জিজ্ঞাসা করল।
"মানে?" ডাক্তার চমকে উঠল।
"মানে ধরুন এই ভাইরাসটা কারোর শরীরে ইচ্ছাকৃত ভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো আর তারপর কোনো ওষুধ দিয়ে তার শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে দেওয়া হলো? ইজ ইট পশিবল?
"প্লান্ড মার্ডার! ডু ইউ নো........"
"স্যার আমি ভেবেচিন্তেই বলছি" ডিআইজির কথা শেষ হওয়ার আগেই উত্তর দিল সনাতন।
"ডক্টর সনাতন যা বলছে তা কি সম্ভব?" ডিআইজি ডাক্তার সামন্তকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করল।
"ইট ইজ থিওরিটিক্যালি পশিবল বাট নট প্রাক্টিক্যালি।" ডাক্তার জবাব দিল।
"হোয়াই নট প্রাক্টিক্যালি পশিবল?" ডিআইজি জিজ্ঞাসা করল।
"কারন এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়, গত পঁচিশ বছরে আমাদের দেশে বা বিশ্বের কোথাও এই ভাইরাসের আক্রমণের কোনো রেকর্ড নেই। কারোর পক্ষে এই ভাইরাস জোগাড় করাই সম্ভব নয়।" ডাক্তার বলল
"সনাতন বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দাও" বলে ডিআইজি সনাতনের দিকে একটা সিগারেট এগিয়ে দিল।
"থ্যাংক ইউ স্যার" বলে সিগারেট নিয়ে সনাতন পকেট লাইটার বের করল। চিন্তিত মুখে সনাতন সিগারেটটা ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিয়ে উপর দিকে মুখ করে ধোঁয়া ছাড়ল। এরপর আর আর একটা টান দিতে যাবে এমন সময় সনাতনের চোখ দুটো চিকচিক করে উঠলো ও হালকা বিস্ফারিত হলো যেন অন্ধকার জঙ্গলে পথ হারানো ব্যক্তি দূরে কোনো আলোর ছটা দেখতে পেয়েছে আর তারপর জিজ্ঞাসা করল "ডাক্তারবাবু ভারতের কোথাও কি এই ভাইরাস নেই?"
ডাক্তার কিছুক্ষণ চিন্তা করল তারপর বলল, "একটা জায়গায় আছে, কোচিনের 'দ্যা ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি'-এর ল্যাবে, তবে সেখান থেকে নিয়ে আসা তো অসম্ভব।"
"হুম...... স্যার আমি আর একবার ও বাড়ি যেতে চাই, মে আই? সনাতন ডিআইজিকে জিজ্ঞাসা করল।
"অফ কোর্স। সনাতন তুমি এই কেসের ইনভেস্টিগেশন অফিসার, এই কেসের জন্য তুমি যতবার খুশি যেখানে খুশি যেতে পারো। তবে একটা কথা মাথায় রেখো যতক্ষণ না কোনো কনক্লুশনে পৌঁছাতে পারছি এই ভাইরাসের ব্যাপারে কেউ যেন কিছু জানতে না পারে।"
সিওর স্যার। আচ্ছা ডক্টর আমি যদি এই ইনভেস্টিগেশনের কাজে আইভি যেতে চাই তাহলে আপনি কি আমাকে কোনোভাবে সাহায্য করতে পারবেন?"
"কেন নয়! ওখানকার ল্যাব ইন-চার্জ প্রফেসর ফার্নানডেজ আমার বিশেষ পরিচিত।"
"তাহলে আপনি এখুনি কথা বলে ব্যবস্থা করুন আমি কালই কোচিন যেতে চাই। অভি তুমি কাল একবার রায় বাড়ি যাও, চারিদিক ভালো করে খুঁটিয়ে দেখবে, বিশেষ করে রমেনের ঘরটা। বুঝেছ?" সনাতন এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল।
ডাক্তার সম্মতি সূচক ঘাড় নেড়ে উঠে পড়ল, "আমি তাহলে চলি?"
"ওকে ডক্টর। প্রয়োজন মতো কথা বলে নেব", ডিআইজি বলল।
"স্যার আমরাও উঠি?" ডিআইজির থেকে আজ্ঞা নিয়ে সনাতন আর অভি দুজনেই বেরিয়ে গেল।

ভোরের ফ্লাটেই সনাতন কলকাতা থেকে কোচিন এসেছে। এখানকার আবহাওয়া কোলকাতার থেকে বেশ আলাদা। কলকাতা ঠান্ডার আমেজ ইতিমধ্যেই চলে এসেছে কিন্তু এখানে এখনো বেশ গরম, ফ্লাইট থেকে বের হতেই যেন মনে হলো জ্বলন্ত ফার্নেস। এয়ারপোর্টটা শহর থেকে বাইরে। এয়ারপোর্ট থেকে শহরে আসার রাস্তাটার দু'দিক শুধুই সবুজ। এক সঙ্গে এতো সবুজ অনেক দিন পর দেখল সনাতন। এয়ারপোর্ট থেকে সনাতন সোজা ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি এসে পৌঁছল। ঘড়িতে এখন সকাল সাড়ে ন'টা বাজে। সকাল দশটায় প্রফেসর ফার্নানডেজ এপয়েন্টমেন্ট নেওয়া আছে। সনাতন প্রফেসর ফার্নানডেজকে ফোন করে ওর উপস্থিতর জানান দিলে প্রফেসর তাকে নির্দিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা করতে বলল।

অভিকে ঠিক সময় মতো রমেনদের বাড়িতে উপস্থিত হলো। দারোয়ান আজ আর পরিচয় জিজ্ঞাসা করে নি। অভি গাড়ি থেকে নামতেই স্যালুট করে বলল, "সেলাম সাব। ঘর পর ম্যাডামজি কে আলাবা অউর কোহি ভি নেহি হ্যা। ম্যাডাম ভি দিন ভর রোঁ রহি হ্যা।" দারোয়ানের সাথে অভি কয়েকটা কথা বলে ভিতরে গেল। অভি বাড়িতে ঢুকতেই দেখল শর্মিলা বসার ঘরের দেওয়ালে টাঙানো রমেনের একটা বড় ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। অভি পিছন থেকে ডাকল, "ম্যাডাম..."

প্রফেসর ফার্নানডেজ কেবিনে ঢুকে সনাতন নিজের পরিচয় দিতেই প্রফেসর সনাতনকে বসতে বললেন। সনাতন ধন্যবাদ জানিয়ে বসল।
"প্রফেসর, আপনার সাথে তো ডক্টর সামন্তর কথা হয়েছে, উনি নিশ্চিয় আপনাকে সব বলেছেন?"
"হ্যাঁ-হ্যাঁ, উনি আমাকে সবটা বলেছেন। উনি এও বলেছেন যে আপনি সন্দেহ করছেন যে এটা একটা প্লানড্ মার্ডার হতে পারে।"
"হ্যাঁ, একেবারেই তাই। আচ্ছা আপনারা কি ইদানীং কাউকে কোনো কারনে এই ভাইরাস দিয়েছেন?"
"ইনসপেক্টর, আমাদের ল্যাবে যে ভাইরাসগুলো আছে তাদের মধ্যে এটাই সব থেকে বিপজ্জনক। কেউ চাইলেই তো আর তাকে এই মারণ বিষ দিয়ে দিতে পারি না। এর একটা নির্দিষ্ট প্রটোকল আছে। আমাদের ডাটাবেসে সব রেকর্ড থাকে।"
"তাহলে আমাকে কি গত এক বছরের ডাটা দিতে পারেন প্রফেসর?"
"দেখুন ইনসপেক্টর আমি আগেই বলেছি আমরা একটা নির্দিষ্ট প্রটোকলে বাঁধা আছি, তাই উইদাউট এনি অফিশিয়াল করেসপন্ডেন্স আমি এ ব্যাপারে আপনাকে কোনো সাহায্য করতে পারব না।"
"কিন্তু প্রফেসর কোনো রকম অফিশিয়াল করেসপন্ডেন্স করতে গেলে তো সব কিছু ফ্লাস হয়ে যাবে! ব্যাপারটা আর গোপন রাখা যাবে না।"
"ইনসপেক্টর, দেন আই এম হেল্পলেস, এক্সট্রিমলি সরি ফর দ্যাট।"
"প্রফেসর, প্লিজ ব্যাপারটার গুরুত্ব বুঝুন। আমি কিন্তু অনেক আশা নিয়ে এতো দূর এসেছি।"
প্রফেসর কিছুক্ষণ চিন্তা করল তারপর বলল, "আপনাকে একটা হেল্প করতে পারি। তবে আনঅফিশিয়ালি, তাতে আশাকরি আপনার পারপাশ সল্ভ হবে, তদন্তের কাজে আসবে।"
"কি ভাবে?" সনাতন প্রফেসরকে জিজ্ঞাসা করল।
"আমি আপনাকে বলে দিচ্ছি, আপনি নোট করে নিন।" প্রফেসর জবাব দিল।
কম্পিউটারের ডাটা চেক করে প্রফেসর একটু অবাক হলো তারপর সনাতনকে জানাল যে গত প্রায় চার বছর কেউ এই ভাইরাসের নমুনা এখান থেকে নেয় নি।
এটা শুনে সনাতন চিন্তিত হয়ে পরল। তারপর প্রফেসরকে ধন্যবাদ জানিয়ে উঠে পরল।

গাড়ি এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। এখানকার প্রাকৃতিক দৃশ্য অপরূপ। কিন্তু সনাতনের এসব কিছুই ভালো লাগছিল না, যেতে যেতে সে শুধু ভাবছিল যে এতদূর কষ্ট করে এলো আর তার কোনো ফল পেলো না! ঠিক সেই সময় সনাতনের মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল।
"হ্যালো! ইয়েস প্রফেসর টেল মি।"
ফোনের ওপার থেকে প্রফেসর কিছু বলল আর তারপর সনাতনের মুখটা খুশিতে ভরে উঠল। প্রফেসরকে ধন্যবাদ জানিয়ে সনাতন ফোন রেখে দিল।

সনাতন এয়ারপোর্ট থেকে সোজা অফিসে চলে এলো। অভি ওর জন্য অপেক্ষা করছিল, সনাতন নিজের কেবিনে ঢুকতেই অভি উঠে দাঁড়াল।
"বোসো, বোসো। আর এদিকের কি খবর অভি?"
"স্যার আমি রায় বাড়ি গিয়েছিলাম। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি।"
"বাঃ! তবে তথ্য তুমি পেয়েছ ঠিকই কিন্তু তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তার বিচার আমিই করব" বলে সনাতন হাসল। "বলো কি কি তথ্য তুমি পেয়েছ।"
"স্যার প্রথমত, দারোয়ানের সাথে কথা বলে জানতে পেরেছি যে ওদের পারিবারিক ডাক্তার মিহিরবাবুর সাথে রমেনের পিসি রজনীর একটা প্রেমের সম্পর্ক আছে আর এর প্রমান আমি মিহিরবাবুর মোবাইলের কল হিস্ট্রি থেকেও পেয়েছি। দ্বিতীয়ত, রথীনবাবুর উইল অনুযায়ী আঠারো বছর বয়স হলেই এই সমস্ত সম্পত্তির মালিক হতো রমেন। তৃতীয়ত, আমি রমেন ঘরে একটা ওষুধের ছেঁড়া র্যাপার পেয়েছি যে ওষুধটা সাধারণত ফাঙ্গাল ইনফেকশনের জন্য ব্যবহার করা হয় কিন্তু মোস্ট ইম্পর্টেন্টলি এই ওষুধটার সাইড এফেক্টে ইমিউনিটি সিস্টেমের বারোটা বেজে যায়, তবে মিসেস রায়ের সাথে কথা বলে জেনেছি যে ঐ পরিবারের কারোর কোনো রকম ফাঙ্গাল ইনফেকশনের কোনো হিস্ট্রি নেই। তাহলে এই ওষুধটার কি কাজ?"
"তুমি তো কামাল করে দিয়েছ হে! আমিও হয়তো এতটা সাফল্য পেতাম না। আচ্ছা অভি তোমার কি কাউকে সন্দেহ হয়?"
অভি একটু চিন্তা করল তারপর বলল "না স্যার, আমি তো কাউকে সন্দেহ করতে পারছি না।"
"অভি, একজন সাকসেসফুল গোয়েন্দা হতে গেলে তোমাকে সন্দেহবাতিক হতেই হবে। সন্দেহ করতে শেখো হে।"
"অবশ্যই স্যার। মনে থাকবে। স্যার ওখান থেকে কি ইনফরমেশন পেলেন?"
"প্রথমত কিছুই পাই নি তবে পরে প্রফেসর ফার্নানডেজ ফোনে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। আমি সেটা নিয়েই চিন্তিত ছিলাম কিন্তু তুমি দুই আর দুই চার মিলিয়ে দিলে।"
"আপনি কি ডাক্তার মিহিরকে সন্দেহ করছেন নাকি?"
"আচ্ছা অভি, রথীনবাবু কবে মারা যান?"
"তা স্যার বছর তিনেক হবে।"
"হুম..... অভি আমার বিশ্বাস ওটাও মার্ডার।"
"কি বলছেন স্যার!" অভি অবাক হয়ে সনাতনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
"ইয়েস মাই ডিয়ার, আই এম কোয়াইট সিওর এবাউট দ্যাট।"
"চলো ওঠো এখুনি বেরোতে হবে"
গাড়িতে উঠে অভি সনাতনকে জিজ্ঞাসা করল, "কিন্তু স্যার আমরা যাচ্ছি কোথায়?"
"প্রাইম সাসপেক্টকে তুলে আনতে। আমি কাকে মিন করছি তুমি কি বুঝলে?"
"স্যার, লেট মি গেস; ডক্টর মিহির চৌধুরি?"
"এই তো তোমার মগজাস্ত্র কাজ করছে! ব্রাভো মাই বয়।"
"কিন্তু স্যার আইভি থেকে আপনি কি তথ্য পেলেন তা কিন্তু আমাকে এখনো আপনি জানালেন না" অনুযোগের সুরে অভি বলল।
"এতোই যখন তোমার কিওরিসিটি তবে শোনো-
আমি যখন প্রফেসর ফার্নানডেজের কাছ থেকে নিরাশ হয়ে ফিরছি তখন রাস্তায় হটাৎ ওনার ফোন এলো উনি জানালেন বছর তিনেক আগে এখানকার এক মেডিকেল কলেজের অধিকর্তার সুপারিশে ডঃ এম আর চৌধুরি নামের এক ডাক্তার নিজেকে ভাইরোলজিস্ট পরিচয় দিয়ে চারটে স্যাম্পল ওখান থেকে কালেক্ট করেছিলেন, উনি নাকি এই ভাইরাসটার উপর কোনো রিসার্চ করছেন। এই এম আর চৌধুরিই হয়তো মিহির রঞ্জন চৌধুরি আর মোটিভ তো তুমি দিয়েই দিলে।"

সনাতনদের গাড়িটা একটা বড় সোসাইটির গেটে এসে থামল। সিকিউরিটি গার্ডকে সনাতন নিজের পরিচয় দিয়ে মিহিরের ফ্লাট নম্বর জিজ্ঞাসা করল। চোদ্দ তলায় বিরাট ডুপ্লেক্স ফ্লাট। দরজায় বার কতক বেল বাজানোর পর মিহির দরজা খুলল। মিহির একটু অবাক হলো, "আপনি!"
"নমস্কার মিহিরবাবু। আমার সাথে তো আপনাকে কালই পরিচয় হয়েছিল।"
"নমস্কার, হ্যাঁ-হ্যাঁ মনে পরেছে। আসুন না, ঘরে আসুন।" মিহির অভ্যর্থনা জানাল
"না মিহির বাবু, আমি যাব না, বরং আপনাকে একটু আমাদের সাথে যেতে হবে।"
"কোথায়?"
"পুলিশ হেড কোয়ার্টার মানে আমার অফিসে"
"আমার অপরাধ?"
"আপাতত আপনি কিছু অপরাধ করেছেন তো আমি বলছি না।"
"ঠিক আছে, চলুন"

অফিসে নিজের ঘরে না গিয়ে সনাতন মিহিরকে নিয়ে একটা কনফারেন্স হলে গেল। কনফারেন্স টেবিলের এক দিকে সনাতন ও অভি আর অপর দিকে মিহির বসে বসল। বেয়ারাকে ডেকে সনাতন চা দিতে বলল। বেয়ারা চা দিয়ে গেলে সনাতন মিহিরের দিকে একটা কাপ এগিয়ে দিয়ে নিজের কাপে একটা চুমুক দিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। এতক্ষণ মিহির চুপ ছিল, এবার মুখ খুলল, "ইনসপেক্টর, আমি কিন্তু আমার অপরাধ এখনো জানতে পারলাম না!"
"দেখুন মিহির বাবু আমার কাছে আপনার বিরুদ্ধে যা প্রমান আছে তা আপনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা বের করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু আমি তা করি নি। কারণ আমি চাই না তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই ব্যাপারে কেউ কিছু জানুক। তাই আমি আশা করছি আপনি আমাদের সম্পূর্ণ সাহায্য করবেন। কি তাই তো?"
"কি মুশকিল! আপনি এতো কথা বলছেন আর আসল কথাটা কেন বলছেন না?"
"আপনার বন্ধুর ছেলে রমেনের স্বাভাবিক মৃত্যু হয় নি। ও খুন হয়েছে।"
"কি বলছেন ইন্সপেক্টর! রমেনকে খুন করা হয়েছে!"
"আজ্ঞে হ্যাঁ। আর শুধু রমেন নয় আপনার বন্ধু রথীনবাবুও খুন হয়েছিলেন।"
"হোয়াট? ইমপসিবল। আপনি হয়তো জানেন না যে রথীনের ডেথ সার্টিফিকেট আমি দিয়েছিলাম ইনসপেক্টর।"
"আমি সবই জানি। আমি এও জানি আপনি কি ভাবে কোন অস্ত্রে ওদের হত্যা করেছেন। আমি এও জানি এর পিছনে আপনার উদ্দেশ্যে কি।"
"হোয়াট দ্যা হেল ইউ আর টকিং! আপনি জানেন রথীন আমার কাছে নিজের মায়ের পেটের ভাইয়ের থকেও আপন ছিল আর রমেন তো আমার নিজের ছেলের মতো। ওদের এতোটুকু ক্ষতি করার কথা কখনো আমি সপ্নেও ভাবতে পারি না আর আপনি বলছেন আমি খুন করেছি! আর তাছাড়া এতে আমার কি লাভ?"
"ডক্টর, মোটিভ তো নিশ্চয়ই আছে। আপনার সাথে রজনীদেবির সম্পর্কের কথা আমাদের অজানা নয়। আর এই সম্পর্কে রথীনবাবুও সহমত হলে আপনি নিশ্চয়ই এতো দিন অবিবাহিত থাকতেন না? আর রমেনের মৃত্যুর পর তো এই বিরাট সম্পত্তি আপনার পদতলে চলে এলো। কি ডক্টর?"
"ছিঃ ইনসপেক্টর ছিঃ! আমি তো এতোটা নিচ চিন্তা কখনো করতেই পারি না। আর তাছাড়া আমার আর রজনীর সম্পর্কের কথা রথীন তো জানতই না।"
"দেখুন মিহিরবাবু, আপনি তদন্তে আমাদের সাহায্য করলে আপনারই উপকার হবে, অন্যথায় আপনাকে আমরা গ্রেফতার করতে বাধ্য হব।"
"গ্রেফতার আপনি আমাকে করতেই পারেন, তাই বলে তো মিথ্যাটা সত্যি হয়ে যাবে না।"
এবার সনাতনের গলার স্বর উপর উঠল, উত্তেজিত গলায় চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করল, "আপনি বছর তিনেক আগে কোচিনের ইন্সটিটিউট অব ভাইরোলজি থেকে নিজেকে ভাইরোলজিস্ট পরিচয় দিয়ে একটা ভাইরাসের চারটে স্যাম্পল নিয়ে আসেন নি?"
"না ইনসপেক্টর না। আমি জীবনে কখনো কোচিন যাই নি আর ঐ ইন্সটিটিউট অব ভাইরোলজির তো কখনো নামই শুনিনি", মিহিরও উচ্চস্বরে উত্তর দিল।
"এখনো মিথ্যা কথা বলছেন! আমার কাছে এর রেকর্ড আছে যেখানে পরিস্কার যে ভাইরোলজিস্ট ডক্টর এম আর চৌধুরি অর্থাৎ আপনি চারটে স্যাম্পল কালেক্ট করেছেন।"
"বাঃ, এই বুদ্ধি নিয়ে আপনি নাকি রাজ্যের সেরা গোয়েন্দা! এমন গোয়েন্দা দপ্তরের উপর আমার সমবেদনা রইল। ডক্টর এম আর চৌধুরি কি আর কেউ থাকতে পারে না এই দেশে?"
মিহিরের কথাগুলো সনাতনের বুকে তীরের মতো বিঁধল। তাই তো এটা তো তার চরম বোকামি হয়েছে। শামুককে ছুঁয়ে দিলে শামুক যেমন নিজেকে খোলসের ভিতর ঢুকিয়ে নেয় সনাতনও ঠিক তেমন চুপসে গেল। চেয়ারে ধপ করে বসে পরল। মিহির তখনো উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছে। চারিদিকে নিস্তব্ধতা। সনাতন একটা সিগারেট ধরাল, দুটো লম্বা টান দিল তারপর মিহিরকে বলল, ডক্টর, আপনি আসতে পারেন। তদন্তের প্রয়োজন মতো আপনাকে আবার ডেকে নেব।"
মিহির বিধ্বস্ত অবস্থায় উঠে দাঁড়াল তারপর ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। "ডক্টর", সনাতনের ডাকে মিহির থমকে দাঁড়াল, "আপনার কাছে অনুরোধ, দয়া করে এ ব্যাপারে কাউকে কিছু জানাবেন না। এটা অত্যন্ত সংবেদনশীল ঘটনা এই মুহূর্তে এই ঘটনাটা গোপন রাখাই বাঞ্ছনীয়।"
মিহির সম্মতি সূচক ঘাড় নেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

মিহির চলে যাওয়ার পর থেকেই সনাতন চুপ করে বসে ছিল, কোনো কথা বলেনি, গভীর চিন্তায় মগ্ন। অভি কয়েকবার ডেকেও সাড়া পায় নি তাই সে আর বৃথা চেষ্টা না করে অপেক্ষা করাই শ্রেয় মনে করেছে। রাত সাড়ে দশটা নাগাদ নিজের কেবিন থেকে সনাতন বেরিয়ে এলো। বাইরে তখন অভি পায়চারি করছিল। অভিকে দেখে সনাতন বলল, "কি ব্যাপার অভি, এখনো বাড়ি যাও নি?"
"স্যার, আমি আপনারই অপেক্ষায় ছিলাম।"
"নাহ্ অভি, তোমার বৈবাহিক জীবনের বলি আমার হাতেই হবে মনে হচ্ছে, হা হা হা......"

সকাল সাতটা বাজে, অভি চায়ের কাপটা নিয়ে ট্যাবলেটে খবরের কাগজটা খুলে বসেছে। কাল রাতে বাড়ি ফিরতে রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গিয়েছিল। না, অভির বৌ মালিনী অবশ্য এ নিয়ে কোনো অভিযোগ করেনি। ফ্রেস হয়ে খাওয়া দাওয়া করে শুতে শুতে রাত প্রায় একটা, তাই আজ উঠতে একটু দেরি হয়ে গেছে। হটাৎ ফোনটা বেজে উঠল। "এই যে সনাতনদা ফোন করেছেন, ধরো", মালিনী অভিকে ফোনটা দিয়ে গেল।
"হ্যালো! বলুন স্যার"
"অভি, তুমি আধ ঘণ্টার মধ্যে তোমার বাড়ির কাছে যে শপিং মলটা আছে তার সামনে এসে দাঁড়াও।"
"ওকে স্যার" বলে অভি ঝটপট তৈরী হয়ে বেরিয়ে পড়ল।

অভি গাড়িতে উঠেছে অনেকক্ষণ হলো কিন্তু সনাতন গত রাতের মতোই নিশ্চুপ। ধৈর্য হারিয়ে অভি সনাতনকে জিজ্ঞাসা করল, "স্যার, আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?" সনাতন এখনো চুপ।
"বুঝলে অভি, গতকাল আমি একটা বড় ভুল করে ফেলেছিলাম। মিহিরবাবুর শেষ কয়েকটা কথা আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছে।"
"কেন স্যার? আপনি কি ভুল করেছেন? আর ক্রিমিনালরা তো এরকম কতো কথাই বলে থাকে।"
"তুমি সিওর যে মিহিরবাবুই আসল খুনি? ডক্টর এম আর চৌধুরি এবং ডক্টর মিহির রঞ্জন চৌধুরি দুজন কি একই ব্যাক্তি?"
অভির চোখ দুটো বিস্ফারিত হলো, অবাক হয়ে বলল, "মানে! দুজন কি আলাদা ব্যক্তি?"
"আমি জানি না। তবে সেটা জানতেই এখন বেরিয়েছি।"

গাড়ি এসে দাঁড়াল একটা বড় তিনতলা বাড়ির সামনে। সনাতন আর অভিরূপ গাড়ি থেকে নেমে লোহার গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকল। সনাতন দরজার বেল বাজাল। অভি লক্ষ্য করল দরজায় বড় বড় করে লেখা আছে 'ডাঃ প্রশান্ত সামন্ত'।
এক পরিচারক তাদের ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসাল।বসার ঘরে দুজনে কয়েক মিনিট অপেক্ষা করতেই ডাঃ সামন্ত এলেন, "আরে সনাতন বাবু যে! একেই হয়তো সিক্সথ সেন্স বলে, আমি আজই আপনাকে ফোন করতাম। একটা ইমপরট্যান্স ইনফরমেশন আছে।"
"তাহলে ডক্টর আপনারটাই আগে শুনি, তারপর না হয় আমি যেটা বলতে এসেছিলাম সেটা বলব।"
"রমেনের শরীরে যে ভাইরাসটা পাওয়া গেছে তার জিনোম সিকোয়েন্সের আইভি তে সংরক্ষিত ভাইরাসের সাথে হুবহু মিল আছে তবে এর বাইরের যে প্রটিন এনভেলপটা আছে তা তুলনায় খুবই দুর্বল। অর্থাৎ ঐ ভাইরাসের উপর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রয়োগ করা হয়েছে আর এর ফলে ভাইরাসটা দুর্বল হয়ে পরেছে আর এর এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ছড়িয়ে পরার ক্ষমতাও কমে গেছে। ফলে এর থেকে মহামারীর কোনো আশংকা নেই।"
"তার মানে অনেক পরিকল্পনা করে তবেই রথীনবাবুর ও রমেনের উপর এই বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে?" অভি ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলল।
"আচ্ছা ডক্টর, আপনি কি ডাঃ মইনুল হোসেনকে চেনেন?" সনাতন জিজ্ঞাসা করল।
"কি যে বলেন! আমি মইনুলকে চিনব না? ও আর আমি তো এমবিবিএস পর্যন্ত একসাথেই পড়াশোনা করেছি। ও এখন মেডিক্যাল কলেজে আছে তো।"
"হুমম্, আমার একটা ইনফরমেশন লাগবে। বছর চারেক আগে উনি কোনো এক ডাঃ এম আর চৌধুরিকে আইডি থেকে ঐ ভাইরাসটার চারটে স্যাম্পল কালেক্ট করার জন্য অথরাইজেন লেটার দিয়েছিলেন। কে সেই ডাক্তার? তার পরিচয় আমার লাগবে।"
"কোনো সমস্যা নেই, আমি এখুনি জেনে নিচ্ছি।"
ডাক্তার সামন্ত টেবিল থেকে মোবাইলটা নিয়ে তার বন্ধু ডাঃ মইনুল হোসেনকে ফোন করল। তাদের মধ্যে কিছুক্ষণ কথাবার্তা হলো তারপর ফোনটা রেখে বলল, "সনাতনবাবু ঐ এম আর চৌধুরি হলো মইনুলের ছাত্র মানস রায়চৌধুরি, এয়ারপোর্টের কাছে একটা আবাসনে থাকে। ওর ডিটেল এড্রেস আর ফোন নম্বর আমি আপনাকে মেসেজ করে দিচ্ছি।"
"অনেক ধন্যবাদ ডক্টর। আজ তাহলে উঠি" এই বলে সনাতন আর অভিরূপ সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ল।

ডাঃ সামন্তর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে সনাতন একটা সিগারেট ধরাল। সনাতনকে এখনো চিন্তা মুক্ত দেখাচ্ছে না। হটাৎ অভিকে সনাতন জিজ্ঞাসা করল, "অভি, তুমি যদি তোমার নাম শর্টে লেখো কি লিখবে?"
"কেন স্যার?" অভি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
"আহা! প্রশ্নের উপর প্রশ্ন কোরোনা। উত্তর দাও।" সনাতনকে একটু বিরক্ত হলো।
"স্যার আমি লিখব আইপিএস এ চ্যাটার্জি।"
"কেন? তোমার নাম তো অভিরূপ, তাহলে এ আর চ্যাটার্জি কেন নয়?"
"কি যে বলেন স্যার! চিন্তায় চিন্তায় আপনার মাথাটা গেছে।" এই বলে অভি হাসল
এবার সনাতন রেগে জিজ্ঞাসা করল, "কামঅন অভি, ডোন্ট বি ওভারস্মার্ট। যেটা জিজ্ঞাসা করেছি তার উত্তর দাও।"
"সরি স্যার। অভিরূপ তো একটাই কথা, এখানে অভি ফার্স্ট নেম আর রূপ মিডিল নেম তো নয় যে আমি এ আর লিখব।"
"একজ্যাক্টলি। তেমন রয়চৌধুরিও একটাই কথা তাহলে মানসবাবু ওনার নাম এম রয়চৌধুরি না লিখে এম আর চৌধুরি কেন লিখলেন?"
"এটা তো আমি ভেবে দেখিনি স্যার!" অভি অবাক হলো
"অভি, ভাবা প্র্যাক্টিস করো। আমি নিশ্চিত মানসবাবুকে দিয়েই গাঁট খোলা সুরু হবে।"
এমন সময় সনাতনের মোবাইলে ডিআইজির ফোন এলো। ডিআইজি তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সনাতন বলল কেস সলভ হওয়ার পথে, আগামী দু-এক দিনের ভিতরেই কালপ্রিট ধরা পরবে। ফোন রাখতেই সনাতনের মোবাইলটা আবার বেজে উঠল, ডাঃ সামন্ত মানসের ঠিকানা আর ফোন নম্বর পাঠিয়েছে। সনাতন মোবাইলটা অভির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, "মানসবাবুর নম্বরটা নোট করে নাও, আজ সন্ধ্যার মধ্যে আমার এই নম্বরের গত তিন বছরের কল হিস্ট্রি চাই।"

সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ অভি সনাতনের অফিসে এলো। কেবিনে ঢুকে অভি দেখল সনাতন চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিয়েছে, ডান হাতটা টেবিলের উপর যার আঙুলের ফাঁকে একটা সিগারেট জ্বলছে আর বাম হাতের কব্জিটা কপালের উপর রাখা। সনাতন কিছু একটা বিড়বিড় করছিল।
"মে আই কামিন স্যার?" দরজায় টোকা মেরে অভি জিজ্ঞাসা করল।
"আরে এসো এসো" সনাতন জবাব দিল।
"স্যার, এই নিন মানসবাবুর কল হিস্ট্রি"
"ওটা তুমি কি দেখেছ? কোনো স্পেশাল নম্বর কি নোট করেছ?"
"হ্যাঁ স্যার করেছি। একটা নম্বর আছে যে নম্বরটা আমার কাছে সিগনিফিকেন্ট লেগেছে। কোনো কোনো দিন ঐ নম্বরের সাথে দশ বারো বার পর্যন্ত ফোনালাপ হয়েছে।"
"নম্বরটা কার সেটা কি খোঁজ নিয়েছ?"
"হ্যাঁ স্যার। তবে আলাদা করে খোঁজ নিতে হয় নি, আমার মোবাইলে নম্বরটা ডায়াল করতে নামটা স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে।"
"অর্থাৎ নম্বরটা তোমার ফোনে সেভ আছে! কার নম্বর? তাড়াতাড়ি বলো আমায়।"
"স্যার, নামটা আমি হজম করতে পারছি না। নম্বরটা অবনীর।"
"হোয়াট! আই সি....... খেলাটা এতক্ষণে আমার কাছে অনেকটা পরিষ্কার হলো। অভি তুমি চলে যাবার পর আমি ডাঃ মিহিরের বাড়ি গিয়েছিলাম। ওনার সাথে কথা বলে আমি এমন কিছু তথ্য পেয়েছি যা জানলে তোমার হুঁশ উড়ে যাবে।"
অভি টান টান হয়ে বসল, "কি তথ্য পেয়েছেন স্যার?"
"সময় হলেই জানতে পারবে। আপাতত বাড়ি যাও। কাল অনেক রাত হয়েছিল। প্রতিদিন এতো রাত করা ঠিক নয়।"
"ওকে স্যার। আমি উঠছি"
"ঠিক আছে। আর হ্যাঁ কাল সকালে দশটা নাগাদ এয়ারপোর্ট থানায় চলে যাবে। তার আগেই সেখানে মানসবাবুর নামের গ্রেফতারী পরোয়ানা পৌঁছে যাবে, ওনাকে তুলে নিয়ে সোজা এখানে চলে আসবে। থানায় কথা বলে আমি সব ব্যবস্থা করে রাখব।"
"ঠিক আছে স্যার। আজ তাহলে আমি যাই?"
সনাতন ইশারায় অভিকে চলে যেতে বলল।
"গুড নাইট" বলে অভি বেরিয়ে গেল।

সনাতনকে এখন অনেকটা রিল্যাক্সড লাগছে। মানসকে প্রায় চার ঘণ্টা জেরা করেছে তার পরেও মুখমণ্ডলে ক্লান্তির লেস মাত্র নেই। অনকে কষ্ট করে যখন কেউ কোনো দুর্গম গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে তখন তার মুখ থেকে ক্লান্তির ছাপ মুছে যায়। অভিকে সনাতন আজ রাত আটটায় সকলকে রায় বাড়িতে জড়ো করার নির্দেশ দিল। অভি বেরিয়ে গেলে সনাতন ফোন করল ডিআইজিকে-
"হ্যালো! বলো সনাতন।"
"গুড আফটারনুন স্যার"
"গুড আফটারনুন। কিছু সুসংবাদ দেবে মনে হচ্ছে?"
"নিশ্চয়ই স্যার। দ্যাট কেস হ্যাজ বিন সলভড্"
"ওয়েল ডান। তা কালপ্রিট কে? তাকে এরেস্ট করেছো,"
"না স্যার, এখনো করিনি। আজ রাত আটটায় সবার উপস্থিতিতে আমি এই রহস্য উদঘাটন করব আর আমি চাই সেখানে আপনিও উপস্থিত থাকুন।"
"নিশ্চয়ই থাকব। তোমার ডাকে কি আমি সারা না দিয়ে থাকতে পারি!"
"ঠিক আছে স্যার তাহলে সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ আমি আপনাকে পিক আপ করে নেব। রাখছি স্যার" এই বলে সনাতন ফোনটা কেটে দিয়ে একটা সিগারেট ধরাল আর তার পর পরম তৃপ্তিতে সুখটান দিতে লাগল।

                                                                                          অঙ্কন ; তন্দ্রা ব্রহ্মচারী 

ঘড়ির কাঁটায় ঠিক আটটা বাজে। আরএন ভিলার বৈঠকখানায় একে একে বসে আছে শর্মিলা, অবনী, মিহির, রজনী আর রজনীর ছোটমামা। এর উল্টো দিকে বসে আছে ডিআইজি, সনাতন আর ডাঃ সামন্ত।
"সনাতন, অভি কোথায়? ডিআইজি জিজ্ঞাসা করল
"স্যার, অভি সময় মতো চলে আসবে।"
"তাহলে শুরু করো"
"ইয়েস স্যার" বলে সনাতন উঠে দাঁড়াল। "ইনি ডিআইজি সত্যসাধন মুখোপাধ্যায় আর আমি রাজ্য গোয়েন্দা দপ্তরের অফিসার সনাতন মিত্র", সনাতন পরিচয় দিল
"তবে সেদিন যে আপনি নিজেকে লোকাল থানার পুলিশ বলেছিলেন?" অবনী জিজ্ঞাসা করল
"সেদিন পরিচয় গোপন করার প্রয়োজন ছিল মিঃ সরকার" বলে সনাতন হাসল। "যে জন্য আপনাদের এখানে একত্রিত করেছি তা আপনাদের পরিবারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বছর তিনেক আগে এক অজানা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মিঃ রায়ের মৃত্যু হয় আর গত সপ্তাহে একইভাবে মৃত্যু হয় ওনার ছেলে রমেনের"
এই কথা বলতেই শর্মিলা গুঁমরে কেঁদে উঠল।
"শর্মিলাদেবি নিজেকে সামলান" ডিআইজি বলল
"হ্যাঁ, আমি যেটা বলছিলাম" সনাতন আবার শুরু করল, "আপনাদের যে কারণে আজ আমি এখানে একত্রিত করেছি, রথীনবাবু এবং রমেন দুজনেরই মৃত্যু স্বাভাবিক নয়, ওঁদের দুজনকেই খুন করা হয়েছে।"
ঘরের মধ্যে হটাৎই কয়েক মিনিটের স্তব্ধটা আর তারপরেই ছোটো মামা চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠল, "কি বলছেন ইন্সপেক্টর? কিন্তু ওদের তো জ্বরে মৃত্যু হয়েছিল!"
"হ্যাঁ একেবারেই তাই", সনাতন মামাকে জবাব দিতে লাগল, "বায়োলজিকাল ওয়েপন, জৈবিক অস্ত্র, শুনেছেন?"
"মানে, হেঁয়ালি না করে পরিস্কার করে বলুন" মামাকে রীতিমতো অস্থির দেখাচ্ছে
"আজ থেকে বছর সাতাশ আঠাশ আগে বিশ্বব্যাপী অতিমারি সৃষ্টি করেছিল একটা ভাইরাস, মনে আছে?"
"হ্যাঁ, খুব মনে আছে" মামা জবাব দিল
"ঐ ভাইরাসের প্রয়োগেই দুজনের মৃত্যু হয়"
এতক্ষণ রজনী চুপ ছিল, এবার মুখ খুলল, "কিন্তু কে, কেনই বা দাদা আর রমেন কে খুন করবে?"
"খুনের কারন বলতে পারেন সম্পত্তির লোভ, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও প্রতিহিংসা আর খুনি হলেন........." চারিদিকে স্তব্ধতা, কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর সনাতন অবনীর দিকে আঙুল তুলে দেখাল
"হাও ডিয়ার ইউ মিস্টার মিত্র! কি যাতা বলছেন?" অবনী চিৎকার করে উঠল
"শান্ত হন অবনীবাবু। দেখুন তো ওনাকে চিনতে পারেন কি না" এই বলে সনাতন অভিকে ডাকল, "অভি ওনাকে নিয়ে ভিতরে এসো"
সঙ্গে সঙ্গে অভি একজনকে নিয়ে ভিতরে ঢুকল যার হাত দুটো পিছন দিক থেকে হাতকড়া দিয়ে বাঁধা ছিল। তাকে দেখেই অবনী চমকে উঠল, "মানস তুই! সব বলে দিয়েছিস?"
"অবনীদা তুমি আমাদের এতো বড় ক্ষতি করলে? তোমার দাদা এতো কিছু করল, তোমাকে ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করালো আর সেই তুমি কিনা........." রজনী কাঁদতে কাঁদতে বলল
"চুপ কর, নাটক করিস না, তোর দাদা এগুলো আমার জন্য করে নি, নিজের জন্য করেছে যাতে আমি ওর ব্যাবসা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলতে পারি আর আমি করছিলামও কিন্তু তোর দাদা কি করল? সমস্থ সম্পত্তি রমেনের নামে লিখে দিল! মানে আমি চিরকাল চাকরই থেকে যাবো, প্রথমে রথীন্দ্রনাথ রায়ের আর তারপর রমেন্দ্র নাথ রায়ের। সেই জন্যই আমি এদের সরিয়ে দিয়েছি।"
"কি শর্মিলাদেবি কিছু বলবেন না?" সনাতন মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করল
"হ্যাঁ-হ্যাঁ নিশ্চয়ই বলব" শর্মিলা উত্তর দিল তারপর অবনীর দিকে তাকিয়ে বলল "এটা তুমি কি করলে অবনী!"
অবনী চট করে শর্মিলার দিকে তাকাল আর তার দিকে কটকট করে তাকিয়ে রইল
সনাতন আবার মুচকি হাসল তারপর বলল "গল্পে টুইস্ট এখনো আছে। এই চক্রান্তের মূলে আরও একজন আছেন"
"আবার কে আছে এর পিছনে?" মিহির জিজ্ঞাসা করল
"মিসেস রায়" সনাতন উচ্চস্বরে বলল
"মিথ্যা কথা, এসব চক্রান্ত" চেঁচিয়ে উঠল শর্মিলা
ঘরে উপস্থিত প্রত্যেকের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল, ডাঃ সামন্ত আশ্চর্যের সাথে চেঁচিয়ে উঠলেন "হোয়াট!" ডিআইজির অবাক হয়ে বলল, "কি বলছ সনাতন! উনি কেন ওনার ছেলেকে মারবেন?"
"শর্মিলাদেবি রমেনের নিজের মা নন, সৎ মা আর রমেনের একমাত্র মাসি। রমেনের জন্মের সাথে সাথেই ওর মা মারা যান। এরপর পারিবারিক চাপে অনিচ্ছা সত্ত্বেও শর্মিলাদেবি বাধ্য হন রথীনবাবুকে বিয়ে করতে। কি শর্মিলাদেবি এবার আপনি বলবেন না আমিই বলব?"
শর্মিলা মাথা নিচু করে বিষধর সাপের মতো ফুঁসছে, সনাতনের প্রশ্নে কোনো জবাব দিল না
"তাহলে আমিই বলি" সনাতন বলতে শুরু করল, "রথীনবাবুর উইল অনুযায়ী আঠারো পেরোলে সব সম্পত্তি রমেনের হওয়ার কথা। একথা অবনীবাবু জানতে পেরে ক্ষুব্ধ হন সে কথা উনি আগেই বলেছেন। এদিকে শর্মিলাদেবির দিদি প্রসবকালীন মৃত্যুর পর পরিবারের চাপে উনি বাধ্য হন রথীনবাবুকে বিয়ে করতে, এরপর রথীনবাবুর মাথায় একটা ভয় ঢোকে যদি শর্মিলাদেবির নিজের সন্তান হলে উনি রমেনের অবহেলা করেন তাই শর্মিলাদেবিকে একরকম বাধ্য করেন নিঃসন্তান থাকতে, উনি একবার অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পরলে রথীনবাবু ওষুধ দিয়ে সেই বাচ্ছা নষ্ট করে দেন। ফলে শর্মিলাদেবির ভিতরে জ্বলে ওঠে প্রতিহিংসার আগুন। ইতিমধ্যেই শর্মিলাদেবি অবনীবাবুর ক্ষোভের কথা জানতে পেরে দুজন হাত মেলান। এরপর থেকে চলতে থাকে খুনের পরিকল্পনা। আলোচনা চলতে থাকে কিভাবে দুজনকে খুন করা হবে যাতে কেউ জানতে না পারে আর এটাকে স্বাভাবিক মৃত্যুর রূপ দেওয়া যায় তা নিয়ে। এমনই একসময় শর্মিলাদেবির মনে পরে অবনীবাবু লন্ডন থেকে ফিরে একবার কথা প্রসঙ্গে ওনার বন্ধু ভাইরোলজিস্ট মানসবাবুর ও তার কাছ থেকে শোনা এই ভাইরাসের গল্প বলেছিলেন এবং এও বলেছিলেন যে তিনি অর্থাভাবে এই ভাইরাসের উপর রিসার্চ করতে পারছেন না। ব্যাস শর্মিলাদেবির মাথায় পুরো ছক খেলে যায়। মানসবাবু চলে যান কোচিন। শর্মিলাদেবির পরামর্শ মতোই উনি ওখানে নিজের নামের সংক্ষিপ্তাকার লেখেন ডক্টর এম আর চৌধুরি যেটা মিহিরবাবুর নামের সংক্ষিপ্তাকার।"
মিহির জিজ্ঞাসা করল, "কিন্তু এই ভাইরাসটা তো খুব ছোঁয়াচ, এর থেকে বাড়ির প্রত্যেকের ইনফেক্টেড হওয়ার কথা!"
ডক্টর সামন্ত মিহিরবাবুকে থামিয়ে দিয়ে বলল, "ডক্টর যে ভাইরাসটা ওদের শরীরে ইনজেক্ট করা হয়েছিল তার উপর জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রয়োগ করে এর প্রটিন এনভেলপটা দুর্বল করে দেওয়া হয় যার ফলে এর ক্ষমতা ব্যাপক হ্রাস পায়। এর অন্য শরীরে ছড়িয়ে পরার কোনো ক্ষমতাই ছিল না, আই এই অসাধ্য সাধন করেছে মানস। কিন্তু দুঃখের বিষয় ও তার এই জ্ঞানটা কোনো ভালো কাজে লাগল না।"
মিহির আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল,"তাহলে তো ডক্টর সামন্ত ভাইরাসটার প্রাণ নেওয়ারও ক্ষমতা ছিল না?"
"এখানেও মানসের শয়তানী বুদ্ধি কাজ করেছে। আপনি তো নিশ্চয়ই জানেন যে বেশ কিছু এন্টি ফাঙ্গাল ওষুধ আছে যেগুলো আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সেইসব ওষুধ শর্মিলাদেবি ওদের খাওয়াতেন। এর ফলে ওদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভিষন কমে যায় আর সেই সুযোগে এই ভাইরাস ওদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে" সনাতন জবাব দিল।
"এতো হিংস্র মানুষ হতে পারে" ডাক্তার সামন্ত বিড়বিড় করল
"অভি অবনীবাবু আর শর্মিলাদেবিরকে নিয়ে যাও" সনাতন বলল। সঙ্গে সঙ্গে একদল পুরুষ ও মহিলা পুলিশ এসে ওদের নিয়ে চলে গেল।
ডিআইজি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল তারপর সনাতনের কাছে এগিয়ে গিয়ে সনাতনের কাঁধ চাপড়াতে চাপড়াতে বলল, "ব্রাভ মাই সান, আমি জানতাম তুমিই একমাত্র পারবে। আই স্যালুট ইউ।
"স্যার আপনি যে আমার উপর বিশ্বাস রেখেছেন তার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাই" সনাতন বলল ডিআইজিকে  তারপর মিহিরের দিকে তাকিয়ে বলল, "মিহিরবাবুর আমি আপনাকে অনেক কটু কথা বলেছি, তার জন্য আবার ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।"
"ছিঃ ছিঃ ইনসপেক্টর, আপনি সেদিনও আমার বাড়িতে এসে একই কথা বললেন, আজও একই কথা বলছেন। এইভাবে আমাকে আর লজ্জিত করবেন না। আপনি তো শুধু মাত্র আপনার কর্তব্য পালন করেছেন।"
অভিকে বলল, "মিহির বাবু আপনার আর রজনীদেবির বিয়েতে কিন্তু আমাদের নেমন্তন্ন করতে ভুলবেন না, একেবারে কব্জি ডুবিয়ে খাব।"
"হা-হা-হা-হা-হা-হা-হা......" ঘরে উপস্থিত সকলে হাসিতে ফেটে পড়ল।

সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২০

স্বপ্ন

স্বপ্ন
       উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

                                                               আঙ্কন ; তন্দ্রা ব্রহ্মচারী

উৎসবের জঙ্গলে চলছে হরেক খেলা,
সব পশুরা একত্রিত, বসেছে বিরাট মেলা,
হচ্ছে ক্রিকেট, ফুটবল আর হকি।
কি আশ্চর্য! এসব হচ্ছেটা কি?
হাতি বনাম শেয়াল হচ্ছে ক্রিকেট ম্যাচ,
শেয়ালর বলে হাতি মশাই মেরেই হলেন ক্যাচ।
বাঘমামা ঐ ফুটবলটা মারলেন তাঁর হেডে-
বলটা সটান চলে গেল উটবেড়ালের নেটে।
হরিণমশায় হকি স্টিকটা চালালেন গায়ের জোরে,
সিংহ রেফারি বাঁশি বাজাতেই ভল্লুকরা গেল হেরে।
পটকা, বাজি, রংমশালে আকাশ গেল রেঙে,
হটাৎ মায়ের জলের ছিটায় ঘুমটা গেল ভেঙে।

পনেরোই আগস্ট

পনেরোই আগস্ট
               উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

আজ পনেরোই আগস্ট, আজ স্বাধীনতা দিবস।
সে বলল, সেটা আবার কি!
বললাম, জানিস না? ঊনিশ‌শ সাতচল্লিশ সালে
আজকের দিনেই তো-
অত্যাচারী বৃটিশদের থেকে আমরা
পেয়েছিলাম মুক্তি- স্বাধীনতা।
সে বলল, স্বা-ধী-ন-তা! হা হা হা-
বললাম, হাসছিস যে?
সে বলল, স্বাধীনতা না ছাই!
একে বলে প্রভু বদল,
ছিল বিদেশী প্রভু, হলো দেশী।
বললাম, কি বলছিস যাতা?
সে বলল, কাকে বলে স্বাধীনতা?
বললাম, দেখছিস না আজ-
দিকে দিকে তিরঙ্গা, দিকে দিকে
বন্দেমাতরম আওয়াজ?
কান পেতে শোন, ভেসে আসছে
কতো স্বদেশী গান, কবিতা।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে বলল, বুঝলাম-
এটাই হলো তোর স্বাধীনতা!
বললাম, স্বাধীনতা মানে তো তাই!
সে বলল, চল তবে তোকে শোনাই--
যদি করো সরকারের সমালোচনা-
পাবে তুমি দেশদ্রোহী তকমা!
যে হবেনা সরকারের সঙ্গী,
রাতারাতি সে হয়ে যাবে জঙ্গী।
মুক্ত চিন্তার মানুষ হলে, ঠিকানা হবে-
তিহার জেলে।
নেতাদের, মন্ত্রীদের বিদেশী ব্যাঙ্কের
খাতা কালো টাকায় উপচে পরে,
তারাই আবার পতাকা তোলে,
দেশভক্তির বুলি ঝাড়ে।
পেটের জ্বালায় ট্রাফিক সিগন্যালে
যে বৃদ্ধ একটুকরো কাপড় হাতে
বাধ্য হয় বাবুদের গাড়ির-
কাঁচ পরিষ্কার করতে,
তার কাছে স্বাধীনতার মানে কি?
যে শিক্ষিত যুবক রিক্সা চালায়, করে হকারি-
তার কাছে স্বাধীনতার মানে কি?
ঋণের দায়ে যে কৃষক
আত্মহত্যার পথ বাছে,
তার কাছে কি এই স্বাধীনতার-
কোনো অর্থ আছে?
অভাবে, দারিদ্রে যে শিশুপেল না
শিক্ষার আলো
এই স্বাধীনতা তাকে কি দিলো?
বললাম, তবে স্বাধীনতা মানে কি?
সে বলল, স্বাধীনতা হলো-
খাদ্যের অধিকার, শিক্ষার অধিকার,
বেকারত্ব, দুর্নীতি থেকে মুক্তি,
প্রতিটা নাগরিকের বলার অধিকার,
প্রত্যেকের চিকিৎসা পাবার অধিকার।
অবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে রইলাম-
বললাম, ঠিকই তো, এটাই তো-
আসল স্বাধীনতা!
তুই কে? কি তোর ঠিকানা?
সে বলল, নিজের মধ্যে খুঁজে নে,
আমি তোর থেকে পৃথক কেউ না।

করোনা কাহন

করোনা কাহন
               উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

বিশ্ব জোড়া আজ অন্ধকার, কালো মেঘে ঢাকা,
দোকান-বাজার জনশূণ্য, রাস্তা-ঘাট ফাঁকা।
বিশ্বযুদ্ধের আগমনে মনুষ্যকূল ভিত-সন্ত্রস্ত,
শত্রু যে অণুবীক্ষণিক, ছোঁয়াচে; ভয় তাই মস্ত।

চীন দেশের এক শহর, নাম টি তার উহান,
জিয়াং নামের এক ডাক্তার, ছিলেন বড়ই মহান।
সর্দি কাশির রোগীর দেহে পেলেন নতুন ভাইরাস,
পরীক্ষা করে দেখলেন তিনি এটি অতি সিরিয়াস।

করোনা নামের এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ল হু-হু,
সংক্রমিত লক্ষাধিক, বিশ্ব জোড়া প্রাণ নিয়েছে বহু।
ওষুধ নেই চিকিৎসা নেই কিন্তু নেইকো কোনো ভয়,
সাবধানতা, সচেতনতা এই অস্ত্রে পাবই মোরা জয়।

হাওয়ায় পারে না উড়তে সে, ছড়ায় শুধুই ছোঁয়ায়,
যত্রতত্র থুতু নয়, আটকাবে ঘনঘন সাবানে হাত ধোয়ায়।
দোকান-বাজার-রাস্তা-ঘাটে রাখুন দুরত্ব এক মিটার,
মহামারী থেকে বাঁচতে আপনার সহযোগিতা দরকার।

সর্দি-কাশি-জ্বর হলেই নেবেন চিকিৎসকের শলা,
উপসর্গ অতি সামান্য হলেও করবেন না অবহেলা।
সরকার-প্রশাসনের নির্দেশ মেনে ঘরে থাকুন বন্দী
অপ্রয়োজনে বাইরে বেরোনোর আঁটবেন না ফন্দি।

ছুড়ে ফেল কুসংস্কার, ছড়িও নাকো গুজব,
না তো এটা অবতার, না আল্লাহ্-র গজব।
মেঘ কাটবে, আলো আসবে করোনা হবে দূর,
জয় মোদের হবেই হবে মনে বিশ্বাস রেখো ভরপুর।

রাজাকার সাবধান


রাজাকার সাবধান
                     উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

বাঙালী ঝরিয়েছে অনেক রক্ত, দিয়েছে সহস্র প্রাণ,
আজও তার প্রমান দিচ্ছে শাহবাগের পবিত্র স্থান ।
বাঙালী ভেঙ্গেছে ব্রিটিশ দম্ভ, করেছে জয় পাকিস্থান,
তাইতো বলি রাজাকারের দল তোরা সব সাবধান ।

বাংলা গড়তে শহিদ হয়েছেন বঙ্গবন্ধু মুজিব,
বাংলা বাঁচাতে শহিদ হলেন হায়দার রাজীব ।
জানি তোমাদের পবিত্র প্রাণ যাবেনা নিস্ফল,
বাংলায় তোমরা পুজীত হবে শহর হতে মফঃসল ।

রাজাকারদের একটাই শাস্তি, চাই ফাঁসি সত্ত্বর,
এই দাবিতেই অবিচল আজ প্রজন্ম চত্ত্বর ।
বন্ধ কর ধর্ম-ব্যাবসা, বন্ধ কর ঘৃণা,
তোমাদের ঐ চোখ রাঙানি আমরা আর সইব না ।

এপার বাংলা–ওপার বাংলা, বাংলা মোদের প্রাণ,
নেইকো হেথায় কোন ভেদাভেদ হিন্দু-মুসলমান
গড়ব মোরা নতুন বাংলা লড়িয়ে দিয়ে জান,
তাইতো বলি রাজাকারের দল তোরা সব সাবধান ।

ফেরাতে হাল ফিরুক লাল

ফেরাতে হাল ফিরুক লাল                             উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী কাস্তে হাতুরি তারা হোক সিংহ, ধানের শীষ, কোদাল বেলচা কিংবা তারা - ভ...