পৃষ্ঠাসমূহ

প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২২

বঙ্গাব্দের সূচনা করেন কে- রাজা শশাঙ্ক নাকি সম্রাট আকবর? - বিতর্কের নিষ্পত্তি!

বঙ্গাব্দের সূচনা করেন কে- রাজা শশাঙ্ক নাকি সম্রাট আকবর? - বিতর্কের নিষ্পত্তি!
                           উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী


বঙ্গাব্দের সূচনা বিষয়টি একটি বিতর্কিত বিষয় কারণ কেউ কেউ বলেন বঙ্গাব্দ গণনা শুরু করেছিলেন বাংলার রাজা শশাঙ্ক আবার কেউ কেউ বলেন আকবর এর শুরু করেছিলেন। বিভিন্ন ইতিহাসবিদ এ নিয়ে তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। প্রত্যেকের যুক্তিই প্রায় অকাট্য।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক কিংশুক চ্যাটার্জি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "শশাঙ্কর আমলে তো বাংলা ভাষাটাই চালু হয়নি। কাজেই তিনি বাংলার জন্য আলাদা অব্দ বা সাল চালু করেছিলেন এটা ভাবাটা বেশ বাড়াবাড়ি। বরং ইতিহাসে আমাদের বলে, মুঘল বাদশাহ আকবর বাংলা জয় করার পর এখানে একটি প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছিলেন। তারা যখন দেখলেন বাংলা থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য একটা ক্যালেন্ডার দরকার, আর সেটাকে হিন্দু শকাব্দর সঙ্গে সংযুক্ত না করে বরং মুসলিম হিজরীর সঙ্গে কানেক্ট করেই ক্যালিব্রেট করা যাক। খুব সম্ভবত সেভাবেই আকবরের দূতরা বঙ্গাব্দ চালু করে গিয়েছিলেন।"

কিন্তু আকবর তো বাংলা দখল করেন ১৫৭৬-য়ে রাজমহলের যুদ্ধ জিতে তার আগে বাংলায় কোনো বর্ষ গণনা পদ্ধতি চালু ছিল না তা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।

যাঁরা বলেন যে শশাঙ্কই বঙ্গাব্দের প্রবর্তক তাঁদের একটি যুক্তি, শশাঙ্কের মোটামুটি ভাবে ৫৯০ থেকে ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রাজত্ব করেন বলে ধারণা করা হয়। আবার খ্রীষ্টাব্দের সাথে বঙ্গাব্দের পার্থক্য ৫৯৩ বছর, অর্থাৎ বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয় ৫৯৩ খ্রীষ্টাব্দে। ইতিহাসবিদদের মতে জুলীয় বর্ষপঞ্জির বৃহস্পতিবার ১৮ মার্চ ৫৯৪ এবং গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির শনিবার ২০ মার্চ ৫৯৪ বঙ্গাব্দের সূচনা হয়েছিল। সুতরাং বঙ্গাব্দের সূচনা যে শশাঙ্কের রাজত্বকালেই শুরু হয়েছিল সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।

তবে এটাও ঐতিহাসিক ভাবে প্রমানিত যে বাংলা দখলের পর আকবর অনুভব করলেন যে হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে এখানে কাজ করতে অসুবিধা হচ্ছে কারন হিজরী পঞ্জিকা চান্দ্র মাসের উপর নির্ভরশীল। চান্দ্র মাস অর্থাৎ চাঁদ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষীণ করতে যে সময় নেয় (২৯.৫৩ দিন)। এই হিসেবে এক বছর হয় ৩৫৪ দিনে। কিন্তু সূর্য মাস ধরে বছর হয় ৩৬৫ দিনে। ঋতু পরিবর্তনও হয় সূর্যের সাপেক্ষে পৃথিবীর অবস্থানের উপর ভিত্তি করে এখানে চাঁদের কোন ভূমিকা নেই। আর চাষ আবাদ তো ঋতুর ভিত্তিতেই হয়। তাই সম্রাট আকবর বাংলার জন্য একটি সৌর পঞ্জিকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তাই আকবর ইরান থেকে আগত বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে হিজরী চান্দ্র বর্ষপঞ্জিকে সৌর বর্ষপঞ্জিতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব প্রদান করেন। ফতুল্লাহ শিরাজীর সুপারিশে পারস্যে  প্রচলিত ফার্সি বর্ষপঞ্জির অনুকরণে ৯৯২ হিজরী মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবর নতুন বর্ষপঞ্জি ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ বা ‘ইলাহী সন’ চালু করেন। তবে তিনি ঊনত্রিশ বছর পূর্বে তার সিংহাসন আরোহণের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এজন্য ৯৬৩ হিজরী সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। ৯৬৩ হিজরী সালের মুহররম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস, এজন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং ১লা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান এবং ভারতীয় শিক্ষাবিদ নিতীশ সেনগুপ্তের মতে বাংলা বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি পরিষ্কার নয়। এই উৎপত্তিতে ইসলামী প্রভাব ও বৌদ্ধ বা হিন্দু প্রভাব দুইই থাকতে পারে।

শামসুজ্জামান খান বলেন, “একে বাংলা সন বা সাল বলা হয়। এই সন ও সাল হল যথাক্রমে আরবী ও ফারসী শব্দ। এটা নির্দেশ করছে এগুলো মুসলিম রাজা বা সুলতান কর্তৃক বাংলায় পরিচিত করানো হয়”। অন্যদিকে নিতীশ সেনগুপ্ত বলেন, এর ঐতিহ্যগত নামটি হল বঙ্গাব্দ। আকবরের সময় এই বর্ষপঞ্জিকে বলা হত তারিখ-ই-ইলাহি। বর্ষপঞ্জির তারিখ-ই-ইলাহি ভারশনে, প্রতিটি দিন এবং মাসের আলাদা আলাদা নাম ছিল, আর এখন যে মাসের নামগুলো দেখা যাচ্ছে তারিখ-ই-ইলাহিতে এরকম মাসের নামের বদলে অন্য মাসের নাম ছিল।

আকবরের সময়ের অনেক শতক আগে নির্মিত দুটি শিব মন্দিরে বঙ্গাব্দ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। আর এটাই নির্দেশ করে, আকবরের সময়ের আরও অনেক আগেও বাংলা বর্ষপঞ্জির অস্তিত্ব ছিল।

ইতিহাসবিদরা একে অপরের যুক্তি খণ্ডন করার পরিবর্তে যদি একে অপরের যুক্তিগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করেন তবেই এই বিতর্কের অবসান হয়ে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে।

বিভিন্ন ইতিহাসবিদ তথা শিক্ষাবিদের লেখা পড়ে ও তাঁদের যুক্তি ও তথ্য বিশ্লেষণ করে বঙ্গাব্দের সূচনা সম্পর্কে আমার যে ধারনা তৈরী হয়েছে তা হলো, রাজা শশাঙ্কের আমল থেকেই বঙ্গাব্দের গণনা শুরু হয়েছিল তবে পরবর্তীকালে বাংলায় আকবর প্রেরিত কমিটি খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য তাতে কিছু অদল-বদল করে বঙ্গাব্দের পুনর্বিন্যাস করেন, যা আজও চলছে।

সুতরাং বঙ্গাব্দের কৃতিত্ব শশাঙ্ক ও আকবর উভয়কেই দেওয়া উচিৎ বলে আমি মনে করি।

তথ্যসূত্র: গুগল, উইকিপিডিয়া, বিবিসি বাংলা

শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২০

বামপন্থা ও আন্দোলন, বিদ্রোহ তথা বিপ্লবের ব্যাখ্যা এবং এর পিছনে বামপন্থী মতাদর্শের ভূমিকা

বামপন্থা ও আন্দোলন, বিদ্রোহ তথা বিপ্লবের ব্যাখ্যা এবং এর পিছনে বামপন্থী মতাদর্শের ভূমিকা
                   উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী 


আন্দোলন আনে বিদ্রোহ বা বিপ্লব যা সুনেতৃত্বের দ্বারা সংগঠিত হয়ে অভ্যুত্থানের রূপ নেয়। সুতরাং এটা বোঝা যাচ্ছে যে কোনো অভ্যুত্থানই একদিন সংগঠিত হয় না। ক্রমাগত রাষ্ট্র তথা শাসকের বঞ্চনা, অবহেলা ও অত্যাচার জনগণের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করে কিন্তু রাষ্ট্রের ভয় জনগণকে প্রতিবাদ করতে দেয় না। কিন্তু ভয় আর কতদিন? তারও একটা সীমা আছে। যেদিন ভয় তার চরম সীমায় পৌঁছয় সেদিন সে ক্ষোভ বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর অনুঘটকের কাজ করে এবং ক্রমে তা সাহসে রূপান্তরিত হয়। এর ফলে শুরু হয় ছোটো ছোটো প্রতিবাদী আন্দোলন। তখন রাষ্ট্র সাধারণত দুটো অবস্থান নেয়; এক, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দেখিয়ে সেই প্রতিবাদী আন্দোলনগুলোকে উপেক্ষা করা অথবা দুই, ভয় পেয়ে প্রতিবাদীদের উপর সীমাহীন অত্যাচার বর্ষণ করা যা আমরা ৪ জুন, ১৯৮৯এ চীনের রাজধানী বেইজিং শহরের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে দেখেছি। এই ঘটনা ইতিহাসে তিয়েনআনমেন স্কয়ার গণহত্যা বা ৪ জুন গণহত্যা নামে কুখ্যাত।

    তিয়েনআনমেন স্কয়ারে, ৪ জুন, ১৯৮৯

বামপন্থা ছাড়া কখনোই বা কোনো কালেই কোনো আন্দোলন সংগঠিত হয় নি, হতে পারে না। এই কথা শুনেই দক্ষিণপন্থীরা রে-রে করে তেড়ে আসতেই পারেন। কিন্তু এটাই বাস্তব। কেন এটা বাস্তব তা বোঝার জন্য আগে বামপন্থা কি সেটা জানতে হবে। বেশির ভাগ (ডানপন্থী) মানুষ বামপন্থা বলতেই বোঝেন মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন ইত্যাদি। কিন্তু তাদের এই ধারনা সর্বৈব ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন। তাঁদের মতবাদগুলো বামপন্থার অংশ ঠিকই কিন্তু বামপন্থা মানেই তাঁদের মতবাদ নয়। রাজনীতিতে বামপন্থা ও দক্ষিণপন্থা ধারণার উদ্ভাবন হয় ফরাসি বিপ্লবের সময় (১৭৮৯-৯৯)। সেই সময় ফরাসী এস্টেট জেনারেলে বাম দিকের চেয়ারগুলোতে যাঁরা বসতেন তাঁরা সাধারণত রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করতেন এবং প্রজাতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা তৈরি সহ বিপ্লবকে সমর্থন করতেন। আর যারা ডান দিকে বসতেন তাঁরা পুরনো ও প্রচলিত শাসনব্যবস্থা ও তার ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের সমর্থক ছিলেন। ১৮১৫ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী রাজনীতিতে 'বাম' শব্দের ব্যবহার ব্যাপক হয়। অর্থাৎ ধর্মীয় বা রাজনৈতিক মতাদর্শে যাঁদের গোঁড়ামি নেই এবং যারা প্রচলিত বস্তাপচা ধ্যানধারণার পরিবর্তনপন্থী তাদের "বামপন্থী" বলা হয়। সমাজবাদ, সাম্যবাদ তথা কমিউনিজম (পূর্ণ সাম্য) ইত্যাদি আদর্শ ও মতবাদ গুলো বামপন্থী রাজনীতির ধারক ও বাহক। তবে প্রতিটি মতবাদেরই সময়ের সাথে জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আবশ্যক।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ইংরেজি সাপ্তাহিক 'ফরওয়ার্ড ব্লক'-এর ৫ই আগস্ট, ১৯৩৯এর সংখ্যার সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন-
"'তত্ত্ব' ও 'বিপরীত তত্ত্ব'-র সমন্বয়ে 'সমন্বয় তত্ত্ব'-র জন্ম হয়। এই 'সমন্বয় তত্ত্ব' আবার ক্রমবিকাশের পরবর্তী পর্যায়ে 'তত্ত্ব' হয়ে ওঠে। এই 'তত্ত্ব' আবার 'বিপরীত তত্ত্ব' কে জাগিয়ে তোলে। এবং সেই সংঘর্ষের সমাপ্তি ঘটে আবার এক সমন্বয় তত্ত্ব'-এ। এইভাবে প্রগতির চাকা ক্রমাগত এগিয়ে চলে।"


'তত্ত্ব' ও 'বিপরীত তত্ত্ব'-র উদ্ভাবন ও তার থেকে 'সমন্বয় তত্ত্ব'-র জন্মের এই প্রক্রিয়াকেই 'বামপন্থী কার্যক্রম' বলে তিনি বর্ণনা করেছেন। আন্দোলন, বিদ্রোহ বা বিপ্লব অথবা অভ্যুত্থান তখনই হয় যখন মানুষ প্রচলিত 'তত্ত্ব' থেকে বিমুখ হয়ে 'বিপরীত তত্ত্ব'-র খোঁজে নামে। এটা একটু পরিস্কার করে বোঝাতে আমরা চীনের উদাহরণ দিতে পারি। তৎকালীন প্রচলিত রাজতন্ত্র নামক 'তত্ত্ব'-র বিরুদ্ধে একটি 'বিপরীত তত্ত্ব'-র খোঁজে শুরু হয় আন্দোলন। সেখান থেকে 'বিপরীত তত্ত্ব' হিসেবে উঠে আসে 'একদলীয় শাসনব্যবস্থা' সময়ের সাথে সাথে যা 'সমন্বয় তত্ত্ব' হয়ে বর্তমানে 'তত্ত্ব'-র রূপ নিয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন সময়ে এই তত্ত্বর বিপরীত তত্ত্ব হিসাবে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ছোটো ছোটো প্রতিবাদী আন্দোলন হচ্ছে। এই সমস্ত প্রতিবাদী আন্দোলনকে যারা সমর্থন করবে তারাই বামপন্থী বলে গণ্য হবে আর যারা বর্তমানে প্রচলিত একদলীয় শাসনব্যবস্থাকেই চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে তাদের চিন্তাধারা অবশ্যই দক্ষিণপন্থী।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সমাজে প্রচলিত জাত-পাতের ভেদাভেদ ভুলে সকলকে সমান চোখে দেখার কথা প্রচার করেছিলেন। তিনিই ভারতের প্রথম 'সাম্যবাদ'-এর প্রবর্তক। তাঁর নেতৃত্বে ঘটা সামাজিক আন্দোলনও 'বামপন্থী আন্দোলন' বলেই গণ্য হয়।

রাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় চলতে থাক প্রতিবাদী আন্দোলনগুলো সাধারণত ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্যে পরে। এইসব আন্দোলন গুলোর পিছনের কারনও ভিন্ন হয় কিন্তু এগুলোর প্রতিক্রিয়া হয় একই আর তা হলো জনমনে বারুদের সঞ্চার। প্রতিবাদের এই বারুদে যখন রাষ্ট্রের উপেক্ষা বা অত্যাচারের স্ফুলিঙ্গ পরে তখন সেই আন্দোলন সংগঠিত হয় ফলে জনগণ সেই শাসক তথা সরকার বা 'রাষ্ট্রনেতা' বা ক্ষমতাসীন দলকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে যে সমস্ত কর্মসূচি গ্রহণ করে তাকে বিদ্রোহ বা বিপ্লব বলে আর এই বিপ্লবের একটা বৃহত্তর রূপ হলো 'অভ্যুত্থান'। যদিও বিদ্রোহ ও বিপ্লবের মধ্যে কিছুটা গুণগত পার্থক্য আছে। বিপ্লব বিদ্রোহের আর এক নাম হলেও বিদ্রোহ বিপ্লবের সমার্থক নয়। ব্যাপার একটু বুঝিয়ে বলা যাক, যে সংগঠিত আন্দোলন রাষ্ট্রের শাসক তো পরিবর্তন করে দেয় কিন্তু শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন করে না বা করতে পারে না তাকে বলা হয় বিদ্রোহ। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় জিম্বাবুয়ে ও রবার্ট মুগাবের কথা। 
  জিম্বাবুয়ের সালিসবারি শহরে রবার্ট মুগাবে, এপ্রিল,    ১৯৮০

আফ্রিকার একটি ছোটো দেশ রোডেশিয়ার স্বৈরাচারী ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে সে দেশের জনমানসে পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে পাথেও করে রবার্ট মুগাবে এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলন সংগঠিত করে জয়ী হন। তাঁর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় 'রিপাবলিক অব জিম্বাবুয়ে'। সমগ্র আফ্রিকায় তিনি নায়কের সম্মান পেতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই মুগাবেই পরিণত হয়েছিলেন স্বৈরাচারী শাসকে। সীমাহীন দুর্নীতি ও ক্রমাগত মানবাধিকার লঙ্ঘন করে একসময়কার সমৃদ্ধশালী জিম্বাবুয়েকে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করেছিলেন তিনি। অর্থাৎ তাঁর আন্দোলনে শাসকের মুখ পরিবর্তন হলো ঠিকই কিন্তু শাসনব্যবস্থা ও নীতি তথা শাসকের চরিত্রে বদল হলো না। তাই তাঁর দ্বারা সংগঠিত এই আন্দোলনকে বিপ্লব নয় বরং বিদ্রোহ বলা যায়। অপরদিকে যদি আমরা ফরাসি বিপ্লব ও ভিয়েতনাম বিপ্লবের দিকে দেখি সেখানে দেখব মানুষের সংগঠিত আন্দোলন সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে সম্পূর্ণ নতুন শাসনব্যবস্থার পত্তন ঘটায়। অর্থাৎ এই আন্দোলনগুলোর ফলে রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে যায় তাই এগুলো হলো 'বিপ্লব'। সুতরাং সংক্ষেপে বলা যায়, যে আন্দোলনের উদ্দেশ্য শুধুই ক্ষমতার হস্তান্তর তাকে আমরা 'বিদ্রোহ' বলি এবং যে আন্দোলনের উদ্দেশ্য রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি করা সেই আন্দোলনকে আমরা 'বিপ্লব' বলি।

    ভিয়েতনাম

কয়েকটি আন্দোলন সংগঠিত হয়ে বিদ্রোহ, বিপ্লব থেকে অভ্যুত্থানে পৌঁছানোর এই সমগ্র প্রক্রিয়া সাফল্যের জন্য যেটা সবথেকে আবশ্যিক তা হলো সু-নেতৃত্ব। দক্ষ নেতা ও তার নির্ভুল রণনীতিই কোনো আন্দোলনকে সংগঠিত করতে ও তার সাফল্য এনে দিতে পারে। আর এর জন্য আবশ্যক সংগ্রামী সৈনিকদের নেতৃত্বে প্রতি অটল বিশ্বাস। তা নাহলে যেকোনো আন্দোলন হয় অঙ্কুরেই বিনাশ হয় অথবা মাঝ পথেই দিশাহীন হয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। যেমনি হয়েছিল নকশালবাড়ি আন্দোলনের ক্ষেত্রে। 

    নকশালবাড়ির আন্দোলনের একটি ছবি, ১৯৬৯(?)

উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রামের কৃষকদের উপর ভূস্বামীদের অত্যাচারের ফলে সৃষ্টি জনরোষকে চারু মজুমদারের সু-নেতৃত্ব ও সুশীতল রায়চৌধুরী, কানু সান্যাল ও জঙ্গল সাঁওতালদের নির্ভীক আপোসহীন ব্যক্তিত্ব সংগঠিত রূপ দেয় যা 'নকশালবাড়ি আন্দোলন' (১৯৬৯-৭১) নামে সারা বিশ্বে পরিচিতি পায়। কিন্তু এর পরেই পরবর্তী সময়ে নেতৃত্ব অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং তা থেকে সৃষ্ট অবিশ্বাস ও বিভাজন এবং সবশেষে চারু মজুমদারের গ্রেফতারী ও রহস্য মৃত্যুর ফলে সেই আন্দোলন সু-নেতার অভাবে দিশাহীন হয়ে পরে। দিশাহীন নকশালবাড়ি আন্দোলন লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে আজকের দেশ ও দেশবাসীর শত্রু 'মাওবাদী জঙ্গি'তে রূপান্তরিত হয়েছে। চীনের বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দাবিতে মাঝে মধ্যেই যে সব ছোটোখাটো আন্দোলন হয় সেগুলো সু-নেতার অভাবে রাষ্ট্রের দমননীতির মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয় ও অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়।

   নকশালবাড়িতে এক সভায় চারু মজুমদার, ১৯৬৭

বর্তমান সময়ে সারা বিশ্ব তোলপাড় করছে আমেরিকার 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' আন্দোলনে। কিন্তু এই এই আন্দোলন এক দিনেই হয় নি। আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের উপর শ্বেতাঙ্গদের বর্বর অত্যাচার আজ নতুন নয়। কলম্বাসের আমেরিকার ভূখণ্ডে পা দেওয়ার পর থেকেই এই বর্বরতা চলে আসছে, তাই অনেকেই কলম্বাসকে ঔপনিবেশিকতা ও ক্রীতদাস প্রথার পথপ্রদর্শক হিসেবে ঘৃণার চোখে দেখেন। ওয়াশিংটন পোস্টের একটা সমীক্ষা অনুযায়ী, আমেরিকায় প্রতি বছর এক হাজারের বেশি ও প্রতিদিন অন্তত এক জন কৃষ্ণাঙ্গের মৃত্যু হয় পুলিশের গুলিতে। সুতরাং মানুষের মনে ক্ষোভ ছিলই।
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকার সানফোর্ডে ট্রেভর মার্টিন নামের এর ১৭ বছরের কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরকে জর্জ জিমারম্যান নামক এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশকর্মী অন্যায় ভাবে গুলি করে হত্যা করে। কিন্তু সানফোর্ড পুলিশ প্রথমে তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয় নি। পরে জনরোষের চাপে পুলিশ জিমারম্যানকে হেফাজতে নেই কিন্তু তার বিরুদ্ধে গঠিত চার্জ এতোই দুর্বল ছিল যে সে খুনের দায় থেকে মুক্তি পেয়ে যায়। এর পর সে তার 'বীরত্বের নিদর্শন' ঐ বন্দুকটা নিলামে তোলে যা আড়াই লক্ষ ডলারে বিক্রি হয়। এই অমানবিক ঘটনার পরেই 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' আন্দোলন শুরু হয়। তবে তা বিচ্ছিন্ন ভাবে চলত। এর পরেও মাইকেল ব্রাউন, এরিক গার্নার ইত্যাদি কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গ পুলিশের দ্বারা খুন হয় আর প্রতিটা ঘটনার পরেই মানুষ কৃষ্ণাঙ্গদের বাঁচার অধিকার নিয়ে গর্জে ওঠে।

    'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' আন্দোলনের একটি ছবি

সম্প্রতি আমেরিকার অতিমারি পরিস্থিতির পর্যালোচনামূলক একটা রিপোর্ট প্রকাশ হয়। যে রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে কৃষ্ণাঙ্গরাই এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। আমেরিকার জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ যার মধ্যে ৪৪ শতাংশ মানুষ কাজ হারিয়েছেন, ২২ শতাংশ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং ২৩ শতাংশ মানুষের করোনা আক্রান্তের মৃত্যু হয়েছে। এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসতেই দেশ মানুষের মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা তৈরী হয় যে পুলিশ-প্রশাসন থেকে করোনা প্রতিক্ষেত্রেই কৃষ্ণাঙ্গদেরই ভুগতে হয়। আর ঠিক এই সময়েই জর্জ ফ্লয়েডের নৃশংস খুনের ঘটনা সামনে আসে যা মানুষের মনে জমে থাকা ক্ষোভের বারুদে স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করে। শুরু হয় বৃহত্তর আন্দোলন। এই আন্দোলন এতোটাই সংগঠিত যা ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সে দেশে ঘটে যাওয়া শ্রমিক আন্দোলনের কথা মনে করায়। এই আন্দোলন ভালো নেতা ও সুপরিকল্পিত রণনীতির দ্বারা পরিচালিত হওয়া ছাড়া সম্ভব নয়। যদিও এখনো নির্দিষ্ট কোনো নেতা বা সংগঠনের নাম এখনো সামনে আসে নি কিন্তু সরকারি রিপোর্ট বলছে এর পিছনে আমেরিকার বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো এর পিছনে আছে, রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ANTIFA নামক একটি বামপন্থী সংগঠনের দিকে আঙুল তুলেছেন। মানুষের জমায়েতে লালপতাকার উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি প্রমান করে যে এই আন্দোলন বামপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

সবশেষে, বামপন্থীরাই মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে তাদের রাষ্ট্রীয় শোষনের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে শেখাতে পারে। 

উপসংহার: প্রতিটা আন্দোলন, বিদ্রোহ তথা বিপ্লবের পিছনে থাকে বামপন্থী মতাদর্শের অনুপ্রেরণা। বামপন্থাই মানুষকে মুক্তির পথ দেখায়।

ফেরাতে হাল ফিরুক লাল

ফেরাতে হাল ফিরুক লাল                             উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী কাস্তে হাতুরি তারা হোক সিংহ, ধানের শীষ, কোদাল বেলচা কিংবা তারা - ভ...