পৃষ্ঠাসমূহ

উপন্যাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
উপন্যাস লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২০

মরীচিকা

মরীচিকা
উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী


সকাল থেকে কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল তবুও ভ্যাপসা গরমটা গেল না। বেলা এগারোটা বেজে গেছে, এখনো সূর্যের আলোর দেখা নেই। ভ্যাপসা গরমের জন্য রাস্তা ঘাট প্রায় জনশূন্য। ব্যতিক্রম শুধু সিধুদার চায়ের দোকান। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা বেকার যুবকদের কাছে সিধুদাই ভরসা। সিধুদা সবার দাদা। বাবারও দাদা ছেলেরও দাদা। বয়স আনুমানিক বছর ষাটেক হবে। কিন্তু সবাই সিধুদাকে দাদা বলেই ডাকে। জনশূন্য রাস্তার মোড়ের এই চায়ের দোকানে এই মুহূর্তে পাঁচজন চা-সিগারেট সহযোগে আড্ডা দিচ্ছে। পল্লব, অনিন্দ্য, আশফাক, সৌম্য আর নিশীথ। এরা পাঁচ জন ছোটবেলার বন্ধু। সেই প্রাইমারি স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েশন পর্যন্ত এক সাথে পড়েছে। স্বভাবতই তাদের মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। গত সপ্তাহেই ওদের গ্র্যাজুয়েশনের ফাইনাল সেমিস্টার শেষ হয়েছে। এখন অপেক্ষা রেজাল্টের। এই রেজাল্টই ঠিক করে দেবে পরবর্তী কালে ওরা আর একসাথে থাকবে কি না বা কে কার সাথে থাকবে। পাড়ার মোড়ে সিধুদার চায়ের দোকানের চা বেকার যুবককূলের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এতো চায়ের দোকান নয়, যেন প্রাইভেট টিউশন। এক একটা ক্লাসের এক একটা ব্যাচ যায় আবার একটা নতুন ব্যাচ ঢোকে। তবে সিধুদা কিন্তু সবার বন্ধু। সৌম্যদের সেমিস্টার শেষ হওয়ার পরের দিন ওরা পাঁচ জন যখন সিধুদার দোকানে চা খেতে এলো সিধুদা বলেছিল, "এই আরও একদল বেকার তৈরী হলো। এই যে নতুন বেকারের দল আমার চায়ের দোকানে তোদের স্বগত"
"মানে? আমরা কি তোমার দোকানে এই প্রথম এলাম নাকি!" আশফাক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
বড় আধপোড়া সসপ্যানের গায়ে লেগে থাকা দুধের সর চামচ দিয়ে চাঁচতে চাঁচতে সিধুদা মুচকি হেসে বলল "ওরে কাল পর্যন্ত তোরা ছিলি ছাত্র। গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট, মানে আজ থেকে তোরা অফিসিয়ালি বেকার যুবক হলি। মাথায় ঢুকল?"
সিধুদার কথায় ওদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে গেল। কিন্তু কথাটা কেউ ফেলে দিতে পারল না। চায়ে কাপে চুমুক দিয়ে শুরু হল তাদের আড্ডা। পাড়া-ঘর, দেশ-বিদেশ, খেলা, রাজনীতি, সিনেমা - আড্ডার বিষয়বস্তুর যেন কোনো সীমা নেই। অনিন্দ্য বলল, "আমরা এতো কিছু নিয়ে আলোচনা করছি যখন তখন একটা নিজেদের ভবিষ্যত নিয়েও আলোচনা হোক। নাকি ওটা বাদের খাতায়?"
"কিরে সৌম্য, তুই কিছু ভাবলি?" পল্লব জিজ্ঞাসা করল
সৌম্য এক চুমুকে চায়ের কাপের তলানিটা শেষ করে একটা সিগারেট ধরাল, তারপর সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, "নাহ্! সেভাবে কিছু এখনো ঠিক করি নি। তবে আমার ইচ্ছা আছে মাসকমিউনিকেশনে মাস্টার্স করার সে তো তোরা জানিসই। তবে সব কিছু নির্ভর করছে রেজাল্টের উপর"
নিশীথ মুচকি হেসে বলল, "মানে তোর মাথা থেকে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নলিস্ট হওয়ার ভুতটা এখনো নামে নি?"
"না রে শুধু ইনভেস্টিগেটিভ জার্নলিসম নয় ইদানীং আমার আরও একটা বিষয়ে আমার ইন্টারেস্ট জেগেছে। ফরেন রিলেশনশিপ অর্থাৎ বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক সাংবাদিকতা। যাই হোক, এবার তোদের ব্যাপারে বল।"
নিশীথ বলল, "আমার বাবার আর আমাকে পড়ানোর ক্ষমতা নেই। সুতরাং আমার এখানেই দ্যা এন্ড। দেখি কোথাও একটা কাজ-টাজ জোগাড় করতে পারি কিনা।"
পল্লব বলল যে তার এসব নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। রেজাল্টের পর এসব নিয়ে ভাববে। টেনশন করে এই মূল্যবান অবকাশটা সে নষ্ট করতে চায় না।
"আর পরিচালক মশাই আপনি কি সিনেমা পরিচালনা করবেন?" অনিন্দ্য আশফাককে জিজ্ঞাসা করল 
"পরিচালক আশফাকের কাছে আমার একটাই রিকোয়েস্ট আমাকে পাওলি দামের সাথে একবার দেখা করিয়ে দিস। হোয়াট অ্যা সিডাক্টিভ লুক! যেন আমার বুকের ভেতরটা খান খান হয়ে যায়। ভাই দেখা করিয়ে দিবি তো একবার?" সৌম্য চটুল ভঙ্গিমায় আশফাকের কাছে তার অনুরোধ রাখল।
বিরক্তির সুরে আশফাক বলল, "ধুর শালা! ছাড় তো ওসব কথা। আব্বা আমাকে আব্বার ব্যবসায় ঢুকতে বলছে। ওসব পরিচালক হওয়ার ভুত নাকি ঘাড় থেকে নামাতে হবে।"
"কি বললি? আমাদের স্কুল-কলেজে নাটক থিয়েটার পরিচালনা করে প্রশংসা কুড়নো ছেলেটা যার চোখে টলিউডের পরিচালক হওয়ার স্বপ্ন সে কিনা সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে বাপের জুতোর দোকানের কাউন্টারে বসবে! কি যাতা বলছিস এসব?" সৌম্য তেড়েফুঁড়ে উঠল
"আব্বাকে মৌলবী সাহেব বুঝিয়েছে এসব নাকি হারাম। তাই এসব ভুত মাথা থেকে নামিয়ে আমাকে ব্যবসায় ঢোকাতে বলেছে। তোরা চিন্তা কর যে লোকটা নিজে ধর্মের সুড়সুড়ি দিয়ে লোক ঠকিয়ে নিজের পেট চালায় সেই লোকটা নাকি আমার কেরিয়ারের দিক নির্দেশনা করছে! রিডিকুলাস!"
"সৌম্য, ঐ দেখ তোর বাগচি দাদু আসছে। এদিকেই আসছে মনে হচ্ছে" অনিন্দ্য এক বৃদ্ধের দিকে ইঙ্গিত করে বলল
সকলে তাকিয়ে দেখল এক বৃদ্ধ তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। বয়স হবে প্রায় পঁচাত্তর বছর, শরীর এখনো বেশ শক্ত। তবে চোখের নিচে ঝুলে পরা চামড়ায় বয়সের ছাপ স্পষ্ট। গটগট করে হেঁটে তাদের দিকেই আসছে।
সবাই তাড়াতাড়ি করে তাদের হাতের জ্বলন্ত সিগারেটগুলো লুকিয়ে নিল। সৌম্য একটু উচ্চ স্বরে বলল, "ও বাগচি দাদু, রাস্তা ভুল হলো নাকি? আজ এ দিকে কি ব্যাপার?" বাগচিদাদু দূর থেকে ফিরে গেলে আর বাবার পকেট কেটে কেনা সিগারেটটা আধখাওয়া অবস্থা ফেলে দিতে হয় না।
উদ্দেশ্য সফল হলো। দূর থেকেই বৃদ্ধ জানাল যে সৌম্যকে খুঁজতেই আসছিল, সৌম্য যেন সন্ধ্যা বেলায় একবার দেখা করে।
পাঁচজনই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সকলেই তাদের সিগারেট বাঁচিয়ে দেওয়ার জন্য সৌম্যকে ধন্যবাদ জানাল।
"এই বুড়ো কারোর সাথে মেশে না, কাউকে সেভাবে কোনো কথা বলে না কিন্তু তোকে কেন এতো ভালোবাসে বলতো?" পল্লব সৌম্যকে জিজ্ঞাসা করল
"জানি না রে। তবে সেই যে ছোটো বেলায় আমি দাদুর সাইকেলে ধাক্কা খেয়ে পরে গেলাম, আমার মাথা ফেটে গেল তারপর থেকেই দাদু আমাকে খুব ভালোবাসেন। তোদেরকে তো কতবার বলেছি আমার সাথে দাদুর কাছে চ, দেখবি উনি একদম অন্য মানুষ যেমন বাইরে দেখান তেমন মানুষ উনি নন। জানিস ওনার ভিতরে না একটা কোন বড় দুঃখ আছে, কিছু একটা না পাওয়ার দুঃখ আর তার জন্যই উনি নিজেকে গুটিয়ে রাখেন।" সৌম্য প্রায় এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল।
শেষ হয়ে যাওয়া সিগারেটের ফিল্টারটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে আগুন নেভাতে নেভাতে নিশীথ বলল, "মাথা খারাপ! এমনিতেই আমার মা বলে বাঙালরা খুব ফেরোসাস হয় তার উপর এই বুড়োকে দেখলেই কেমন যেন খুনি-খুনি মনে হয়।"
সৌম্যকে দৃশ্যতই বিরক্ত লাগছিল, "নিশীথ দাদুর বয়সী মানুষটাকে একটু সম্মান দিয়ে কথা বল প্লিজ। তখন থেকে বুড়ো-বুড়ো বলে যাচ্ছিস। এটা কি ঠিক?"
"সরি, সৌম্য আমি ঠিক সেভাবে বলতে চাইনি"
"আর একটা কথা বলি নিশীথ, রাতারাতি যে মানুষগুলোর মাথার উপর থেকে ছাদ চলে যায়, কোনওক্রমে জীবন বাঁচিয়ে নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পালিয়ে যেতে হয় আর তারপর সেই দেশে গিয়েও প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করতে হয় তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই একটু ডেসপ্যারেট তো হবেই আর তাদের সেই ডেসপ্যারেটনেশটাকে তোর-আমার মতো তুলনায় সুখী মানুষরা ফেরোসাসনেশ বলে জাজ করি", খুব গম্ভীর হয়ে সৌম্য কথাগুলো বলল। একটা লম্বা টান দিয়ে সিগারেটটা ফেলে দিল সৌম্য, তারপর আবার বলতে শুরু করল, "দেখ কিছু মানুষ আছে যারা মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ভাবে বিভেদ সৃষ্টি করে নিজেদের লাভের জন্য। ধর্মীয় বিভেদ, জাতিগত বিভেদ, ভাষাগত তথা আঞ্চলিকতা বিভেদ, শরীরের রং নিয়ে বিভেদ- যে কোনো বিভেদেই কারোর না কারোর লাভ হয় কিন্তু মানব জাতি তথা এই সৃষ্টির ক্ষতি হয়।
"কি বলছিস! ধর্ম তো ভগবানের সৃষ্টি" অনিন্দ্য সৌম্যর কথায় প্রতিবাদ জানাল।
"আচ্ছা! ঠিক আছে। তাহলে আমাকে বল তো মানুষ, গরু, ছাগল, বাঘ, সাপ, ব্যাঙ, হাতি, পোকা-মাকড় এতো কিছু সব তোর ঐ ভগবানই বানিছে তো?"
"অবশ্যই" দৃঢ় কন্ঠে অনিন্দ্য উত্তর দিল
"আচ্ছা এরা প্রত্যেকেই দেখতে কমপ্লিটলি আলাদা?"
"হ্যাঁ, একদমই তাই"
"তাহলে তোর কথা অনুযায়ী ধর্ম যদি ভগবানের সৃষ্টি হয় তাহলে আলাদা আলাদা ধর্মের মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য আলাদা হওয়া উচিৎ ছিল? তা কেন নয়?"
"এটা তো ভেবে দেখিনি! ভ্যালিড কোয়েশ্চেন।"
"ভাব, ভাব, ভাবতে শেখ। দেখ ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছে আর মানুষ ধর্ম নামের বিষাক্ত প্রাচীর দিয়ে নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। আমার মতে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করাই হল ঈশ্বরের সবচেয়ে বড় অবমাননা।"

"একদম ঠিক বলেছিস সৌম্য, এভাবে আমরা সত্যিই কখনো ভেবে দেখিনি" পল্লব কৃতজ্ঞতার সুরে বলল।
"বন্ধুগন, বেলা একটা বাজে। মা এবার ঝাঁটা নিয়ে আসবে। চল আজকের মতো উঠি" সৌম্য উঠে দাঁড়িয়ে প্যান্টের পিছন ঝাড়তে ঝাড়তে বলল।
সকলে সম্মতি জানিয়ে উঠে পরল।


দরজায় বার দুয়েক টোকা দিয়ে প্রায় মিনিট পাঁচেক ধরে অপেক্ষা করছে সৌম্য। এখনো ভিতর থেকে কোনো সারা আসছে না। অধৈর্য হয়ে চেঁচিয়ে ডাকল "দাদু, ও দাদু! এখনো ঘুমোচ্ছ নাকি?" এবার ভিতর থেকে সারা এলো। আরও মিনিট খানেক অপেক্ষার পর দরজা খুলল। ভিতর থেকে সেই বৃদ্ধ লোকটি বেরিয়ে এলো। মাথার চুলগুলো সব পেকে গেলেও দাঁত একটাও পরে নি। বৃদ্ধের নাম দীপঙ্কর বাগচি। 

"আয় আয়। বোস ওখানে" সোফার দিকে ইশারা করে সৌম্য কে বসতে বলল দীপঙ্কর।
ঘরটা বেশ পরিপাটি করে গোছানো। ঘরে ঢুকে বাঁ দিকের এক কোণে টেবিলের উপর একটা পিকচারটিউব দেওয়া টিভি, তার পাশে একটা বছর চোদ্দ-পনেরোর মেয়ের সাদা-কালো ছবি ফ্রেম করে টাঙানো। টিভির ঠিক উল্টো প্রান্তে সোফা আর তার সামনে একটা কাঁচের টি-টেবিল রাখা। অবিবাহিত দীপঙ্কর বাগচি একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি চাকরি করত। মা-ববাকে নিয়ে তার সংসার ছিল। প্রায় বছর কুড়ি আগে বাবা আর মা দুজনেই মারা গেছে। তাই এখন সে একাই। একটা ওয়ান-বি-এইচ-কে ফ্লাটই তার দুনিয়া। আত্মীয় স্বজন বলতে তার কেউ নেই। কাছের কেউ বলতে একমাত্র পাড়ার ছেলে সৌম্য। এছাড়া সে আর কারোর সাথে সে ভাবে মেশে না। কথাও প্রায় বলে না বললেই চলে। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে যতটা সম্ভব ইশারায় জবাব দেয়। যেন কথা বলতে না হলেই ভালো।
সৌম্য সোফায় বসেতেই দীপঙ্কর রান্নাঘরের ভিতর চলে গেল। মিনিট খানেক পর একটা কাঁচের প্লেটে কয়েক রকমের মিষ্টি আর সিঙাড়া নিয়ে বেরিয়ে এলো।
সৌম্য অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, "দাদু এসব কি? এতো কার জন্য?"
"এখানে তুই ছাড়া আর কে আছে?"
"তুমি পাগল এতো খাওয়া যায় নাকি?"
"খুব খাওয়া যায়। এই বয়সে খাবি না তো কোন বয়সে খাবি! আর তাছাড়া এই সিঙাড়া কিন্তু আমার নিজের বানানো। দোকানের পচা তেলে ভাজা নয়।"
"ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমি চেষ্টা করছি। কিন্তু দাদু এসব কোন খুশিতে?"
"কেন? তোকে কি এমনি কখনো খাওয়াই নি আমি?"
রসগোল্লা চিবোতে চিবোতে সৌম্য বলল, "তা বলছি না তবে আজ তোমাকে একটু অন্যরকম লাগছে। নিশ্চয়ই কোনো ব্যাপার আছে।"
"তা আছে। আজ আমি ভীষণ খুশি। অনেক দিন পর আজ আমার এতো ভালো লাগছে" আবেগে দীপঙ্করের গলা যেন বুজে আসছে
"কি হয়েছে বলো না দাদু।"
"আগে তুই সব খা তারপর বলব।"
"না, না। তুমি বলো আমি খেতে খেতেই শুনছি।"
"তবে শোন। তুই বারবার আমাকে জিজ্ঞাসা করিস না দেওয়ালে টাঙানো ঐ ছবিটা কার?
"হ্যাঁ। কার ছবি ওটা?"
"ওর নাম মীরা। মীরা দেবনাথ। পুরো ঘটনা জানতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে আজ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর আগে।"

সালটা ১৯৭০। সারা বাংলা দেশ তখন যেন বারুদের স্তূপ। এতোটুকু স্ফুলিঙ্গ পেলেই যেকোনো সময় ঘটে যাবে বিরাট বিস্ফোড়ন। বাংলাদেশের আবার-বৃদ্ধ-বনিতা তখন পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীর অত্যাচারের হাত থেকে দেশকে বাঁচানোর স্বপ্ন বিভোর।স্বাধীনতার আশায় সবাই টগবগ করে ফুটছে। তবে আলাদা বাংলাদেশের দাবি ততটা জোড়ালো হয় নি।
আমার বাড়ি ছিল রংপুরের উত্তরে এক গ্রামে। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, এমএ-র ফাইল ইয়ার। আমি থাকতাম ঢাকার বিখ্যাত জগন্নাথ আবাসনে। ঐ আবাসনের কাছেই ছিল মীরার বাড়ি। আমার বয়স কতো আর হবে, এই ধর বছর পঁচিশ আর মীরার বয়স তখন কুড়ি কি একুশ। যদিও মীরার সাথে পরিচয় আমার অনেক আগে থেকেই ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে একটা চায়ের দোকান ছিল, শফিক মিয়ার চায়ের দোকান। সেখানে আমরা চা খেতাম আর সেই চায়ের দোকানের ঠিক লাগোয়া একটা ঘরে মীরার দাদা বিনা পয়সায় গরীব ছেলে মেয়েদের পড়াতো যেখানে সে নিজেও পড়তে আসত। দিনের একটা সময় আমরা ওখানে আড্ডা দিতাম, ঠিক যেমন তোরা ঐ সিধুর দোকানে আড্ডা দিস। তবে আমাদের আলোচনার বিষয় বস্তু ছিল মূলত রাজনৈতিক। আমরা প্রায় প্রত্যেকেই বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা, জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ষড়যন্ত্র, পাকিস্তান আর্মির অত্যাচার, পাকিস্তান পিপলস পার্টি ও তার প্রতিষ্ঠাতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর রণনীতি- এই সব বিষয়েই আলোচনা হতো। আমাদের এই আলোচনা মীরার লুকিয়ে শুনত। একদিন হটাৎই সে আমাকে ডাকে। আমি একটু অবাকই হয়ে গিয়েছিলাম। কাছে যেতে সে আমাকে জানাল যে সে প্রায় প্রতিদিন আমাদের আলোচনা শোনে এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শে সে উদ্বুদ্ধ। আমার কাছে সে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে।
জানিস সৌম্য মীরা যে দেখতে খুব সুন্দরী রূপবতী ছিল তা নয় কিন্তু তার চাঁউনি ছিল অসম্ভব বুদ্ধিদীপ্ত। সাহিত্যের তার অসম্ভব দখল ছিল। আওয়ামী লীগে যোগ দিতে খুব তাড়াতাড়িই সে সবার কাছের হয়ে উঠল। পার্টির নির্দেশ মতো আমরা একসঙ্গে কাজ করতে লাগলাম। এই সময় কখন যে আমরা একে অপরকে ভালোবেসে ফেললাম তা আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি নি।
২৬সে মার্চ, ১৯৬৯ তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আয়ুব খানকে সরিয়ে সেই পদে বসেন পাক আর্মির কমান্ডার ইন চিফ ইয়াহিয়া খান। আর তারপর তিনি ১৯৬২ সালে গৃহীত সংবিধান বাতিল করেন। তখন থেকেই আপামর পূর্ব পাকিস্তানবাসী দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। সেই বছরের শেষের দিকে পার্টির উপর মহল থেকে আমাদের কাছে খবর আসে যে আগামী এক বছরের মধ্যে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে আমরা যেন এখন থেকেই তার জন্য নির্দিষ্ট কর্মসূচি শুরু করে দিই। ফলে আমরা পার্টির কাজে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
সেই বহুকাঙ্খিত ঘোষনা খুব তাড়াতাড়িই হল। ১৯৭০ সালের ৩১ শে মার্চ রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান একটি লিগাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার ঘোষণা করেন যাতে দুই পাকিস্তানের (পূর্ব আল পশ্চিম) একটি অবিচ্ছিন্ন আইনসভার জন্য সরাসরি নির্বাচন করার কথা ঘোষণা করা হয়। ঠিক হয় ভোট হবে ৭ই ডিসেম্বর, ১৯৭০। সারা দেশ খুশিতে মেতে উঠল। আমরা যারা পার্টির কর্মীরা ছিলাম তাদের কর্মব্যস্ততা আরও বেড়ে গেল। লড়াই মূলত দুই দলের- পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ যার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর পশ্চিম পাকিস্তানের পাকিস্তান পিপলস পার্টি যার নেতা ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো।
সাধারন নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে ঘটে গেল এক ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সে বছর ৩রা নভেম্বর বাংলাদেশের বুকে আছড়ে পড়ল ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণনাশক ঘূর্ণিঝড় 'ভোলা'। কয়েক মিনিটের মধ্যে 'ভোলা' পূর্ব পাকিস্তানকে তছনছ করে দিল। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ প্রাণ হারাল। সে এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য। কোথাও বাচ্ছা শিশু খিদের জ্বালায় কাঁদছে, তার মা-বাবার কোনো খবর নেই। কোথাও সন্তানহারা মা বিলাপ করছে। গাছপালার ভিতর থেকে শুধু লাশ বেরুচ্ছে। আমরা নেমে পড়লাম উদ্ধার কাছে। মীরার নেতৃত্বে তৈরী হলো ত্রাণ সংগ্রাহক কমিটি। তাদের সংগ্রহ করা ত্রাণ আমরা উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা দুর্যোগ কবলিত এলাকায় বিলি করতাম। এদিকে এতো বড় দুর্যোগের পরের ইয়াহিয়া সরকার যেন নির্বিকার। সরকারের তরফ থেকে এতোটুকু সাহায্য পাওয়া গেল না। বাঙালিরা এতো দিনে পরিষ্কার বুঝে গেল যে পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে পূর্ব পাকিস্তানের কোনো মূল্য নেই। আলাদা বাংলাদেশের স্বপ্নটা আরও তীব্র হলো। জেনারেল ইয়াহিয়ার এই অমানবিক আচরণর প্রতিবাদে ও দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসনের দাবিতে ১৯ শে নভেম্বর ঢাকা শহরে ছাত্র মিছিলের ডাক দেওয়া হলো। পুরোধায় যথারীত আমি আর মীরা। প্রতিটা দিন, প্রতিটা আন্দোলন আমার আর মীরার সম্পর্কটা মজবুত করছিল। ভালোবাসারও উপরে আমরা একে অপরকে ভীষণ শ্রদ্ধা করতাম।
এর কিছুদিনের মধ্যেই এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। পূর্ব নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ৭ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হল সাধারণ নির্বাচন। তখনও আপামর বাঙালির হৃদয়ে বঞ্চনার দগদগে ঘা স্পষ্ট। বাঙালির যাবতীয় রাগ, বেদনা, ঘৃণা আছড়ে পরল ব্যালট বাক্সে। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬০ আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল আওয়ামী লীগ আর ভুট্টোর পিপিপি পেল মাত্র ৮১ টা আসন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা পূর্ব পাকিস্তানে নেতার হাতে শাসনভার ছেড়ে দিতে রাজি ছিল না। তারা নানা অজুহাতে সরকার গঠনে বাগড়া দিতে থাকল। ভুট্টো বুঝতে পেরেছিল যে অবিভক্ত পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী হওয়া তার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। ফলে সে বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্যে এক সুত্র দিল 'উধার তুম, ইধার হাম', অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু হন আর পশ্চিম পাকিস্তানের ভুট্টো। যা ছিল কার্যত অবাস্তব প্রস্তাব। স্বভাবতই আওয়ামী লীগ তা মেনে নিল না। আর এই প্রস্তাবই বাঙালি মনে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা স্বাধীনতার আগুনকে দাউদাউ করে জ্বালিয়ে দিল।
এর পরেই শুরু হল আরও বৃহত্তর ষড়যন্ত্র। সারা পূর্ব পাকিস্তানে এক কথায় অঘোষিত কার্ফু জারি হয়ে গেল। শুরু হলো সাধারন মানুষের উপর পাক বাহিনীর নির্মম নির্যাতন। তাতে অবশ্য কি বাঙালিও মদত দিয়েছিল। সকলেই তখন বুঝে গিয়েছিল যে এবার আমাদের স্বাধীনতার লড়াইয়ে নামা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। শুধু আনুষ্ঠানিক ভাবে সেই লড়াই শুরু হওয়া বাকি ছিল মাত্র। খুব শিগগিরই তা হয়ে গেল। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জাতির উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সেই ভাষণে বিভিন্ন দাবির উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন, "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম"। তার এই ভাষণ গোটা জাতিকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উন্মাতাল করে তোলে। শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতার লড়াই যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নামে খ্যাত।
এরই মধ্যে আমার কাছে দলের উপর মহল থেকে কয়েকটা দিন গা ঢাকা দেওয়ার নির্দেশ আসে। কিন্তু সেই মূহুর্তে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই মীরা অত্যন্ত গোপনে আমাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তোলে। দিন চারেক আমি তাদের বাড়িতে ছিলাম। সারাদিন আমি আর মীরা গল্প করতাম। কোন দিকে যে সময় কেটে যেত বুঝতেই পারতাম না। চারিদিকের থমথমে পরিস্থিতি আর রাস্তায় আর্মির আধিক্য বলে দিচ্ছিল যে বড় একটা কিছু ঘটতে চলেছে। ২৩শে আমার কাছে অতি সত্বর ঢাকা ছাড়ার নির্দেশ আসে। সেই রাতেই আমি ঢাকা থেকে চলে যাই। মীরাই আমাকে বাসে তুলে দিয়ে আসে। মীরার জিজ্ঞাসা করেছিল যে আবার কবে দেখা হবে, বলেছিলাম স্বাধীন বাংলাদেশ আমাদের হাতছানি দিচ্ছে মীরা, খুব তাড়াতাড়িই আবার আমাদের দেখা হবে। মীরার শেষ কথা ছিল "আমি কিন্তু তোমার অপেক্ষায় রইলাম", আমার চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আসে, বুকে পাথর চাপা দিয়ে স্বাধীনতার লড়াইয়ে নেমে পরি।
অনেক লুকিয়ে চুরিয়ে ২৫ তারিখ সন্ধ্যা বেলায় গ্রামে পৌঁছাই। সেদিন রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর মিটিং ছিল তা বিফল হয়। মধ্যরাতে তিনি নরহত্যার নির্দেশ দিয়ে গোপনে লাহোর ফিরে যান। যে বড় কিছু ঘটার ইঙ্গিত গত কয়েক দিন ধরে নানা জায়গা থেকে আসছিল এবার পালা ছিল সেই ঘটনা ঘটার। মধ্যরাত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী শুরু করে 'অপারেশন সার্চলাইট' নামের গণহত্যাযজ্ঞ। সেই নরসংহারের খবর যাতে পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে না পৌঁছায় সেই উদ্দেশ্যে আগেই সমস্ত বিদেশি সাংবাদিকদের ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। সারা ঢাকা জুড়ে পাক বাহিনী নির্বিচারে হত্যালীলা চালায়। এর দিন দুয়েক পর দলের গোপন দূত মারফত বিস্তারিত খবর পেলাম। জানলাম যে ঢাকার প্রায় সমস্ত ছাত্রাবাসনগুলো ছিল ওদের প্রধান লক্ষ্য। আমাদের জগন্নাথ আবাসন ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলা হয়। প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ ছাত্রকে নির্মমভাবে খুন করা হয়। কিন্তু যে খবরটা আমাকে সবচেয়ে আঘাত করে তা হলো, আমার খোঁজে ওরা মীরাদের বাড়ি গিয়েছিল আর আমাকে না পেয়ে ওদের প্রত্যেককে গুলি করে মেরেছে। এই খবর শোনা মাত্র আমার মাথায় যেন বজ্রাঘাত হলো। বুকের ভিতরটা ভেঙে খানখান হয়ে গেল। আমি স্থবির হয়ে গেলাম। খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিলাম। নিজেকে একটা ঘরে বন্দি করে ফেললাম। আমার মা-বাবা শত চেষ্টা করেও আমাকে স্বাভাবিক করতে পারল না। আমি শুধুই ভাবছিলাম যে মীরাদের এই পরিনতির জন্য আমিই দায়ী। যদি আমি ওকে এসবের মধ্যে না জড়াতাম, যদি আমি ওদের বাড়িতে সেই কটা দিন আশ্রয় না নিতাম তাহলে ওদের এই ভাবে খুন হতে হত না।
এরই মধ্যে ঘটে গেল আর একটা ঘটনা। আমার এক তুতো দাদাকে আমি মনে করে পাক বাহিনীর খুন করল। এই খবরে আমি আবার এক ধাক্কা খেলাম আর এই ধাক্কায় আমার যেন সম্বিত ফিরল। 
সেদিন মধ্যরাতে রংপুরের পার্টির শীর্ষ নেতা শহীদুল ইসলাম ভূইয়া এলেন আমার সাথে দেখা করতে। উনি আমাকে পরামর্শ দিলেন যেন আমি যেন কিছুদিনের জন্য ভারতে চলে যাই। আমিও ভেবে দেখলাম উনি ঠিকই বলেছেন। কিন্তু বাদ সাধল আমার মা। মা আমাকে একা ছাড়তে নারাজ। অগত্যা ঠিক হল আমি, মা আর বাবা কিছু দিনের জন্য ভারতে চলে যাব। পরিস্থিতি বুঝে পরে ফিরে আসব। শহীদুল ভাই আমার ভারতে যাওয়ার যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিলেন। আমাদের গ্রাম থেকে কাছাকাছি ভারতের বর্ডার ছিল কুচবিহার। সেই রাতেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের সঙ্গে ছিল ইশতিয়াক আহমেদ, শহীদুল ভাই-এর বিশেষ পরিচিত। ইশতিয়াক ভাই বর্ডার পারাপার করাতে রীতিমত দক্ষ ছিল। ওনার সাহায্য তিস্তা ও সতী নদী পার করে সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম কুচবিহারের সিতাইয়ে। সেখান থেকে জলপাইগুড়িতে একটা বস্তিতে উঠলাম।
বছর দুয়েক আমরা জলপাইগুড়িতেই ছিলাম। এরই মধ্যে ভারতের সাহায্যে আমাদের মুক্তি বাহিনী পাকিস্তানকে আত্মসমর্পণ করাল, বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ হলো, বঙ্গবন্ধু দেশের সর্বময় কর্তা হলেন। কিন্তু মীরার ঘটনা আমি ভুলতে পারি নি। সেই আঘাত আমাকে যেন একদম বদলে দিল। হাসিখুশি মিশুকে আমি হয়ে গেলাম ঘরকুণো, কারোর সাথে কথা বলতাম না। দেখেছিসই তো আমাকে আমি কেমন।"
এতক্ষণ সৌম্য মন দিয়ে সব শুনছিল, এবার মুখ খুলল, "আরিব্বাস দাদু! এতো সিনেমার গল্প মনে হচ্ছে। আমি জানতাম তোমার কোনো গোপন ইতিহাস আছে কিন্তু তুমি এতো বছর ধরে মনের মধ্যে যে এতো দুঃখ-কষ্ট পুষে রেখেছ তার বিন্দুমাত্র আন্দাজ ছিল না।"
এক গ্লাস জন খেয়ে দীপঙ্কর গ্লাসটা টেবিলে রেখে বলল, "তা তুই ঠিকই বলেছিস। সিনেমাই বটে।"
"কিন্তু দাদু আজ হটাৎ আমাকে খাওয়ালে, এতো খুশি তার কারণ কি?
"এর কারন আমি আমার জীবনের সবথেকে খুশির খবর আজ পেয়েছি।"
"কি খবর?" চোখ দুটো বিস্ফারিত করে সৌম্য জিজ্ঞাসা করল।
"মীরা বেঁচে আছে আর এই কলকাতাতেই আছে" আনন্দে দীপঙ্করের চোখদুটো ভিজে গেল, চোখের কোণে জল চিক চিক করছে।
সৌম্য যেন চমকে উঠল, কয়েক সেকেন্ডে নীরবতার পর বলল, "কিন্তু দাদু তুমি তো বলেছিলে....."
সৌম্যকে থামিয়ে দিয়ে দীপঙ্কর বলল, "না না, মীরা বেঁচে ছিল। সেদিন রাতে ওদের বাড়িতে আক্রমণ হয়েছিল ঠিকই কিন্তু সেই আক্রমণে মীরা আর মীরার মা বেঁচে গিয়েছিল যদিও ওর দাদা আর বাবা মারা গিয়েছিল।"
"কিন্তু দাদু তুমি এই খবরটা কোথায় পেলে?"
"আজ মেডিকেল কলেজে গিয়েছিলাম আমার এক পুরোনো সহকর্মীকে দেখতে। সেখানে গিয়ে হটাৎ দেখা হয়ে গেল আমার এক বন্ধু সাব্বিরের সাথে। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাথে পড়তাম। সে এখন ঢাকাতেই থাকে। এখানে এসেছে তার এক আত্মীয়ের চিকিৎসার জন্য। সেই আমাকে এটা জানাল।"
"কিন্তু দাদু উনি কলকাতায় কেন?"
"সাব্বির বলল, ওরা নাকি শুনেছিল যে আমাকে পাক হানাদাররা খুন করেছে। আসলে আমার নিরাপত্তার কথা ভেবে সেই সময় তেমনই কথা রটানো হয়েছিল। ওরা যে আমার সেই ভাইকে খুন করেছিল সেটা আমি বলেই মুক্তি বাহিনী প্রচার করে। ততদিন আমি অবশ্য এদেশে চলে এসেছি।"
"তারপর?" সৌম্যর গায়ে কাঁটা দিচ্ছে
"তারপর আর কি! স্বাধীন বাংলাদেশে মীরা ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের নেতা হয়ে যায়। বছর দেড়েক পর বাড়ির চাপে শেষমেশ মীরা বিয়ে করে। বিয়ে ঢাকার আওয়ামী লীগেরই এক ব্যবসায়ী নেতা সমীরণ ভাদুড়ির সাথে। সমীরণদার সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল, উনি দলকে আর্থিকভাবে প্রচুর সাহায্য করেছেন। কিন্তু ঈশ্বর বোধহয় কাউকে সুখি দেখতে চান না। কারণ মানুষ সুখি হলে ঈশ্বরকে ভুলে যাবে। তাই মীরার জীবনে নেমে এলো আবার এক অন্ধকার।"
"কেন? আবার কি হলো?" সৌম্যকে জিজ্ঞাসা করল
"এরপর এলো সেই অভিশপ্ত রাত। পঁচাত্তর সালের ১৫ই আগস্ট ভোর রাতে বিদ্রোহী সেনারা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার খুন করল। তার পরেই তারা টার্গেট করল দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের। সমীরণদা আর মীরা দুজনেই ওদের টার্গেট ছিল। ১৭ই আগস্ট সন্ধ্যা বেলায় ওরা সমীরণদার বাড়ি আক্রমণ করল ওদের দুজনকে খুন করার জন্য কিন্তু ভাগ্যবশত সেদিন মীরা তার বছর দুয়েকের ছেলেকে নিয়ে ওর মায়ের বাড়ি গিয়েছিল। তাই সে বেঁচে যায়।"
"উনি কলকাতায় কিভাবে এলেন?"
"পার্টির কিছু নেতা কর্মীদের সাহায্যে মীরা তার ছেলে, মীরার মা আর শাশুড়িকে নিয়ে কলকাতায় চলে আসে। সমীরণদার তো এখানেও বিজনেস ছিল, বাড়িও ছিল।"
"আচ্ছা দাদু তোমার ওনার সাথে দেখা করতে ইচ্ছা করছে না?" উৎসুক গলায় সৌম্য জিজ্ঞাসা করল 
"ওর জীবনে আমি আর ঢুকতে চাইছি না। তাছাড়া এতো বড় কলকাতা ওকে কোথায় খুঁজব!" দীপঙ্করের গলায় হতাশা স্পষ্ট হলো।
"খোঁজার চাপটা তুমি আমার উপর ছেড়ে দাও। তুমি বলো ওনার ছেলের নাম কি তুমি জানো?"
"না, তা কি করে জানবো!"
"আচ্ছা তোমার সমীরণদার বাড়ি কোথায় সেটা কি জানো?"
"শুনেছি তো ভবানীপুরের দিকে কোথাও।"
"ঠিক আছে দাদু, আমি দেখছি। এখন চলি, কমপিউটার ক্লাসে যেতে হবে।"

কমপিউটার ক্লাস থেকে ফিরে সৌম্য তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে পড়ল। আজ খাবার টেবিলেও সৌম্য চুপচাপ ছিল। খেতে খেতে বাবা একবার জিজ্ঞাসা করেছিল যে সে আজ এতো চুপচাপ কেন। সৌম্য 'কিছু নয়' বলে এড়িয়ে যায়। ওর মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে যে এতো বছর ধরে বাগচি দাদু বুকের মধ্যে কতো কষ্ট বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে, কেউ তা জানে না, আর সে সব না জেনে লোকে কতো কি বলে। মানুষ কারোর ব্যাপারে কিছুই না জেনেই তাকে জাজ করে। শুধু মাত্র আত্মতুষ্টির জন্যই সে এটা করে। এটি মানুষের একটা অন্যতম জান্তব প্রবৃত্তি। এই চিন্তা সৌম্যর রাতের ঘুম কেড়ে নিল। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে কিন্তু ঘুম আসছে না। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, যে করেই হোক দাদুকে তাঁর প্রেম পাইয়ে দিতেই হবে। হটাৎ তার মাথায় এলো সোশাল মিডিয়ার কথা। সঙ্গে সঙ্গে সে ধড়মড়িয়ে বিছানা ছেড়ে নেমে পরল। তারপর পাশের টেবিলে রাখা ল্যাপটপটা চালু করে ফেসবুক খুলল। সার্চে গিয়ে 'ভাদুড়ী ভবানীপুর' বলে সার্চ করতেই অন্তত পঞ্চাশটা প্রফাইল সামনে এলো। সৌম্য মনে মনে ভাবল যে পঁচাত্তর সালে মীরা দেবির ছেলের বয়স যদি দুবছর হয় তবে এখন ওনার বয়স হবে বিয়াল্লিশ। তাহলে সেই মতো প্রফাইলগুলো নির্বাচন করতে হবে। এগারোটা প্রফাইল সে নির্বাচন করল। কিন্তু এই এগারোটা প্রফাইলের মধ্যে কোনটা সেই ব্যক্তির যাকে সে খুঁজছে? বসার ঘরের দেওয়ালে একাকী ঝুলতে থাকা ঘড়িটা ঢং করে একটা শব্দ করে জানান দিল যে রাত একটা বেজে গেছে। নাহ্, এবার শুয়ে পরতে হবে, মা যদি জানতে পারে এখনো জেগে আছে তাহলে ভীষণ বকবে। ল্যাপটপটা বন্ধ করে চিন্তার বোঝা নিয়ে সৌম্য শুয়ে পরল।

আজ সিধুদার দোকানে পল্লব, অনিন্দ্য, আশফাক, নিশীথরা এলেও সৌম্য আসেনি। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর সিধুদা জিজ্ঞাসা, "কিরে আশফাক তোদের পঞ্চপাণ্ডবের আর একটা কই?"
"কি জানি। আমরাও বুঝতে পারছি না গো। এক ঘন্টা হয়ে গেল আমরা এসেছি বাবুর এখনো দেখা নেই", বিরক্তির সুরে আশফাক জবাব দিল
"সিধুদা, আমাদের চারজনকেই আপাতত চা দাও, সৌম্য এলে দেখা যাবে" এই বলে নিশীথ বাকিদের দিকে তাকাতেই সকলে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল
একটা থালায় চারটে মাটির ভাঁড়ে চার কাপ চা এগিয়ে দিয়ে সিধুদা সৌম্যকে ফোন করার জন্য বলল। অনিন্দ্য জানাল যে পল্লব ইতিমধ্যেই অন্ততঃ চারবার ফোন করেছে কিন্তু সৌম্যর ফোন বন্ধ অছে।
"তাহলে তো চিন্তার বিষয়। তোরা যাবার সময় একবার ওর বাড়িতে খবর নিয়ে যাস" সিধুদাকে এখন চিন্তিত লাগছে।
পল্লবদের চা যখন প্রায় শেষের দিকে ঠিক তখনই সৌম্য এসে হাজির। তাকে দেখে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। সে দোকানে ঢুকতেই তার দিকে একের পর এক প্রশ্নের বাণ ধেয়ে এলো-
অনিন্দ্য বলল "কিরে কোথায় ছিলি?"
পল্লব বলল, "এতো দেরি কেন?"
নিশীথ বলল, "আমরা কখন এসেছি জানিস?"
আশফাক বলল, "তোর ফোনটা বন্ধ কেন?"
"সবাই মিলে একসাথে এতো প্রশ্ন করে আমি জবাব দেব কি করে! দাঁড়া আমি এই তো এলাম, দেখতেই পাচ্ছিস আমি ক্লান্ত। একটু বসি দিয়ে সব বলছি" এই বলেই সৌম্য সিধুদাকে এক গ্লাস জল আর একটা সিগারেট দিতে বলল।
সিধুদা জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, "চা খাবি না?"
"একটু পরে খাব" সিগারেটটা ধরিয়ে সৌম্য পল্লবদের উদ্দেশ্যে বলল "এবার তোদের প্রশ্নের জবাব দিই।"
"কি জবাব দেবে শালা তুমি! কাল সেই যে গেলি তারপর আর ফোন ধরিস নি, আজ আবার আউট অফ রিচ" আশফাক রীতিমতো রেগে আগুন।
"বাই দ্য ওয়ে, আশফাক আমার কোনো বোন নেই" মুচকি হেসে সৌম্য জবাব দিতেই সকলে হেসে উঠল।
"বন্ধুগন এবার একটু সিরিয়াস হতে হবে। ভীষণ জরুরি কথা আছে", সৌম্য ঠোঁটের কোণের মুচকি হাসিটা মিলিয়ে গেল, চোখ দুটো ছোট হয়ে গেল।
"কি এতো জরুরি কথা যে তুই এতো সিরিয়াস হয়ে গেলি?" পল্লব গম্ভীর হয়ে বলল।
"শোন তবে- কাল বাগচি দাদু আমাকে দেখা করতে বলে গেল না? তা আমি কাল গিয়েছিলাম-" এরপর সৌম্য ওদের সমস্ত ঘটনাটা খুলে বলল। সকলে এই ঘটনা শুনে স্তম্ভিত, তাদের মুখে কোনো রা নেই।
"এ তো রীতিমতো রোমহর্ষক সিনেমার গল্প!" নিজেকে একটু সামলে নিয়ে নিশীথ বলল।
"হ্যাঁ, ঠিক তাই। আমি ডিসাইড করেছি মীরা আন্টিকে খুঁজে বের করে এঁদের দুজনকে আবার মিলিয়ে দেব। তোরা কি আমার সঙ্গে থাকবি?"
"মানস স্যারের গাছের আম চুরি করা থেকে কাউকে না জানিয়ে বর্ধমানে ম্যাচ খেলতে যাওয়া- কোনো দিন কি আমরা তোর সঙ্গ ছেড়েছি যে আজ থাকব না?" পল্লবের কথা শেষ হতেই সকলে তাকে সম্মতি জানাল।
সৌম্য তাদের জানাল যে সে এগারোটা ফেসবুক প্রফাইল সিলেক্ট করেছে। তার একটা তালিকা সৌম্য তাদের দিল। ওরা প্রত্যেকে সেই তালিকাটা মন দিয়ে দেখল। কোথা থেকে শুরু করবে তারা? প্রত্যেকেই বেশ চিন্তিত। এমন সময় আশফাক বলল, "সৌম্য আমার সিক্সথ সেন্স বলছে সমীর ভাদুড়ীই হবে। এনাকে দিয়েই আমাদের মিশন শুরু করি আমরা"
"তোর এরকম মনে হওয়ার কারণ?" পল্লব গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞাসা করল
"দেখ, মীরা আন্টির হাজবেন্ডের নাম হল সমীরণ। 'সমীরণ' আর 'মীরা' এই দুটো নামের সাথে 'সমীর' নামটার একটা সামঞ্জস্য আছে। তাই আমার মনে হয় এনাকে দিয়েই আমাদের শুরু করা উচিৎ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই সমীরই সেই ব্যক্তি যাকে আমরা খুঁজছি", আশফাকের চোখে আত্মবিশ্বাসের ঝলক স্পষ্ট।
প্রত্যেকেই আশফাকের যুক্তির সাথে সম্মত হলো। ঠিক হলো আজই বৈকালে সৌম্য আর পল্লব ঐ ঠিকানায় যাবে। বাকিরাও এক একজন এক একটা ঠিকানায় যাবে।

বিকেল তখন সারে পাঁচটা বাজে। সূর্য প্রায় ডুবোডুবো। সৌম্যদের ট্যাক্সিটা মনে রাস্তা থেকে ডান দিকে বাঁক নিয়ে ঢুকে জগবন্ধু আশ্রমের পাশ দিয়ে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে একটা বড় লোহার গেটের সামনে দাঁড়াল। সৌম্য আর পল্লব ট্যাক্সি থেকে নেমে ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে গেটের সামনে এগিয়ে যেতেই দেখল কালো ফলকের উপর সোনালি অক্ষরে লেখা 'ডাঃ সমীর ভাদুড়ী' তার নিচে ডিগ্রির উল্লেখ। সৌম্যরা গেটের দিকে এগিয়ে যেতেই দারোয়ান তাদের জানাল যে ডাক্তারবাবু এখন নেই। সৌম্য সরাসরি জিজ্ঞাসা করল যে ডাক্তারবাবুর মা বাড়িতে আছেন কিনা। অন্ধকারে ছোঁড়া তীরটা ঠিক জায়গাতেই লাগল। ওরা অনুমতি নিয়ে ভিতরে গেল।
এক পরিচারিকা তাদের ভিতরে নিয়ে গেল। বসার ঘরে তাদের বসিয়ে সে চা-জল দিয়ে গেল। চা খেতে খেতে সৌম্য ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘরের চারিদিকটা দেখতে লাগল। ঘরের প্রতিটা আসবাবে আভিজাত্যের ছোঁয়া। এমন সময় এক ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা ঘরে ঢুকলেন। পরনে মেরুন পাড়ের সাদা শাড়ি, চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা, গায়ের চামড়া কিঞ্চিত শিথিল হয়ে এসেছে তবে মুখের মধ্যে একটা কাঠিন্য আছে। সৌম্য নিশ্চিত ইনিই মীরা। বৃদ্ধা ঘরে ঢুকতেই সৌম্যরা উঠে দাঁড়িয়ে হাত জড়ো করে প্রণাম করল- "আমি সৌম্য, সৌম্য বসু আর ও আমার বন্ধু পল্লব। আপনি নিশ্চয়ই মীরাদেবি?"
"হ্যাঁ, আমার নাম মীরা ভাদুড়ী কিন্তু আমি তো আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না!"
এটা শুনেই সৌম্যর মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠল, চোখ থেকে খুশির ঝলক ঝড়ে পরছে, আনন্দে ওর লাফিয়ে উঠতে ইচ্ছা করছে।
নিজেকে একটু সামলে নিয়ে সৌম্য বলল, "১৯৭০-৭১ সাল, ঢাকা ইউনিভার্সিটি- আপনার কি কিছু মনে পরছে?"
একথা শোনা মাত্রই মীরার মুখের গঠন পারলে গেল, চোখ দুটো কুঁচকে ছোটো করে কয়েক মূহুর্ত কিছু ভাবল তারপর সৌম্যকে জিজ্ঞাসা করল, "তোমরা কারা? কে তোমাদের পাঠিয়েছে? কি উদ্দেশ্য তোমাদের?" তারপর আশঙ্কার সুরে জিজ্ঞাসা করল, "সত্যি করে বলো তোমাদের কি ঐ রাজাকাররা পাঠিয়েছে?"
"না না। আমাদের কেউ পাঠায় নি। তাহলে আমি সরাসরি প্রসঙ্গে আসি। দীপঙ্কর বাগচিকে মনে পরে?"
মীরা চমকে উঠল। বহু বছর ধরে এই নামটা তার মনের মধ্যে পাথর চাপা ছিল। সমীরণের সাথে বিয়ের পর আর কখনোই সে এই নামটা মুখে আনে নি। অনেক চেষ্টা করেছে ভুলে থাকতে কিন্তু মনের এতো গভীরে এর শিকড় চলে গেছে যেই সে কিছুতেই দীপঙ্করকে মুছে ফেলতে পারে নি। মীরার কপালে বলিরেখা গভীর হলো, "কে তোমরা? সত্যি করে বলো তোমাদের কে পাঠিয়েছে।"
"আন্টি আপনার চিন্তার কোনো কারণ নেই" এতক্ষণ চুপ থাকার পর পল্লব মুখ খুলল।
সৌম্য ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলল, "আন্টি আমরা দীপঙ্কর বাগচি অর্থাৎ বাগচি দাদুর কাছ থেকেই আসছি।"
একথা শোনা মাত্র প্রথমে মীরা চমকে উঠল ক্ষণিকের মধ্যেই তার মুখাভিব্যক্তি পরিবর্তন হয়ে গেল, ক্রোধে তার মুখ লাল হয়ে গেল, চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, "বেরিয়ে যাও তোমরা আমার বাড়ি থেকে। আমার দুর্বলতা নিয়ে মজা করার অধিকার তোমাদের কে দিয়েছে! এই মুহূর্তে বেরিয়ে যাও না হলে দারোয়ান দিয়ে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবো।"
পল্লব আর সৌম্য এক চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হলো। ওরা এইরকম কিছু ঘটতে পারে বলে কল্পনাও করে নি। কোনো রকমে সামলে নিয়ে সৌম্য বলল, "আন্টি আপনি শান্ত হন। আমরা মিথ্যা বলছি না।"
"না তোমরা মিথ্যা বলছ। সে অনেক আগেই-" কথা শেষ করতে পারল না মীরা, মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো।
"না না না। আপনি ভুল জানেন, বাগচিদাদু বেঁচে আছেন আর এই কলকাতাতেই আছেন। তবে আমাদের উনি পাঠাননি, উনি জানেনও না আপনি কোথায় থাকেন। সবে কাল উনি জানতে পেরেছেন যে আপনি বেঁচে আছেন আর কলকাতাতেই আছেন", সৌম্য এক নিঃশ্বাসে বলে গেল।
"তোমরা সত্যি বলছ?" কান্না থামিয়ে বলল মীরা
"একশ শতাংশ সত্যি বলছি আমরা। আপনি চাইলে আমরা আপনাকে ওনার ছবি দেখাতে পারি, সৌম্যর মোবাইলে আছে" পল্লবের কথা শেষ হতেই সৌম্য তাড়াতাড়ি পকেট থেকে তার মোবাইলটা বের করে মীরার দিকে এগিয়ে দিল। চোখের জল মুছতে মুছতে ছবিগুলো মীরা যেন প্রাণ ভরে দেখল। হ্যাঁ, সেই মুখ, সেই চোখ, সেই করুন চাঁউনি- এ ছবি তার দীপঙ্করের ছাড়া আর কারোর হতে পারে না। ছবি দেখতে দেখতে মীরা হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো, যেন তার মনের ভিতরে জমে থাকা বহু বছরের দুঃখ-কষ্ট তার কান্নার মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এলো। সৌম্য কিছু বলতে যাবে এমন সময় পল্লব তাকে ইঙ্গিতে চুপ থাকতে বলল। এই মুহূর্তে মীরাকে তার ইচ্ছা মতো কাঁদতে দেওয়াই উচিৎ তাতে তার মনের ভিতরে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা বেদনা বেরিয়ে যাবে, মন হাল্কা হবে।
মিনিট দশেক হয়ে গেল কেউ কোনো কথা বলে নি, সবাই চুপ। মীরা অনেক কষ্টে কান্না থামিয়ে নিজেকে একটু সামলে নিয়েছে। এই মুহূর্তে ঘরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। সেই নিস্তব্ধতা ভাঙল মীরার কথায়, "সৌম্য, আমি তোমাদের সাথে যাবো, এখুনি।"
অবশ্যই, চলুন। বাকি কথা আমি ট্যাক্সিতে যেতে যেতে বলব।"

দীপঙ্করের আবাসনের সামনে এসে ট্যাক্সিটা থামল। ট্যাক্সি থেকে নেমে পল্লব সৌম্যকে জানাল যে তার ভিতরে যাওয়া উচিৎ হবে না কারন দীপঙ্করের সাথে তার সেভাবে কোনো পরিচয়ই নেই। সৌম্য তাকে বলল সে যেন বাকিদের নিয়ে সিধুদার দোকানে অপেক্ষা করে, সে কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের সাথে যোগ দেবে। মাথা নেড়ে পল্লব সেখান থেকে বিদায় নিল। মীরাকে নিয়ে সৌম্য ভিতরে গেল। ফ্লাটের সামনে গিয়ে সৌম্য কলিং বেল টিপতেই সঙ্গে সঙ্গে দীপঙ্কর দরজা খুলল যেন দরজা খোলার জন্য তৈরীই ছিল।
"কিরে তুই? এমনিতে তো পান-সুপারি দিয়ে নেমন্তন্ন না করলে তুই আসিস না। এখন নিজে থেকেই হাটাৎ কি ব্যাপার?"
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থেকেই সৌম্য জবাব দিল, "দাদু, তুমিও তো দশবার বেল না বাজালে দরজা খোলো না এখন বেল বাজাতে না বাজাতেই খুললে কি ব্যাপার?"
"আরে আমি একটু বেরোচ্ছি। ভাবছি একবার লোকাল থানায় যাব।"
"থানায়! থানা কেন?"
"দেখি মীরাকে খুঁজে বের করতে পুলিশ কোনো সাহায্য করে কি না।"
"তার জন্য থানায় যাওয়ার দরকার নেই। সৌম্য হ্যা না" মুচকি হেসে সৌম্যর বলল
"তুই কি করবি?"
"কি করব নয়, জিজ্ঞাসা করো কি করেছি"
"ঠিক আছে, কি করেছিস?"
"কি করেছি তুমি নিজের চোখেই দেখো" বলে সৌম্য ইশারা করতেই মীরা পাশ থেকে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
"দেখো তো দাদু চিনতে পারো কি না"
দীপঙ্কর বিস্ময় চোখে মীরার দিকে তাকিয়ে রইল। মীরাও বিহ্বল। দুজনের চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়ছে। এ যেন চোদ্দ বছরের বনবাসের পর উর্মিলা আর লক্ষণের মিলন। কিন্তু উর্মিলা ও লক্ষণ দুজনেই জানতেন যে চোদ্দ বছর পর আবার তাদের দেখা হবে কিন্তু দীপঙ্কর আর মীরা এতোদিন দুজন দুজনকে মৃত ভেবে এসেছে তাই তাদের মনের মধ্যে কোথাও দেখা হওয়ার কোনো সম্ভবনাই ছিল না। এহেন অসম্ভব ঘটনা যখন হটাৎই সম্ভব হয়ে যায় তখন তার অনুভূতিটাই আলাদা হয়। এই অনুভূতি ওরা দুজনের কেউই মুখে প্রকাশ করতে পারছিল না।
হটাৎ সৌম্যর ডাকে দুজনের সম্বিত ফিরল, "ও দাদু, তুমি কি আমাদের বাইরেই দাঁড় করিয়ে রাখবে নাকি?"
"তাই তো, দেখেছিস! আয় আয় ভিতরে আয়। মীরা, ভিরতে এসো।"
ভিতরে গিয়ে ওরা সোফায় বসল। দীপঙ্করকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় লাগছে। সে কিভাবে মীরাকে অভ্যর্থনা করবে, কিভাবে এই সন্ধ্যাটা উজ্জাপন করে কিছুই তার মাথায় ঢুকছিল না। মীরা ব্যাপারটা বুঝতে পারল, "এতো ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। তুমি দুদণ্ড বোসো এখানে।" ইতস্ততঃ করতে করতে দীপঙ্কর একটা চেয়ারে টেনে নিয়ে টি টেবিলে উল্টো দিকে বসল।
"আচ্ছা সৌম্য এই অসাধ্য সাধন তু কি করে করলে বল তো" দীপঙ্করের কথা শেষ হতেই সৌম্য কাঁধ ঝাঁকিয়ে জমার কলারটা তুলে মজার ছলে বলল, "দাদু, আমরা হচ্ছি একবিংশ শতাব্দীর যুবক, আমাদের কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়" বলেই হেসে উঠল। সৌম্যর সাথে মীরা ও দীপঙ্কর দুজনেই হেসে উঠল। এতক্ষণে ঘরের ভিতরের গুমোট ভাবটা কেটে যেন একটা শীতল হাওয়া বয়ে এলো। এরপর সৌম্য মীরাকে কি ভাবে খুঁজে পেল সেটা সংক্ষেপে জানাল।
"তোদের যে আমি কি ভাবে ধন্যবাদ জানাব তা আমার জানা নেই। ওদের সবাইকে বলবি যে তোদের আমি একটা এমন পার্টি দেব যে তোরা সারা জীবন ভুলবে না।"
"ঠিক আছে সে দেখা যাবে আমি এখন উঠি।"
"সে কি! কেন? মীরা একটু অবাক হলো
"আন্টি, আমি সেই কখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছি। মা খুব চিন্তা করবে। একবার বাড়িতে দেখা করে আসি। চিন্তা করবেন না আন্টি, আপনা যখন আমি নিয়ে এসেছি তখন আপনাকে পৌঁছে দেবার দায়িত্বও আমার"

দীপঙ্করের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সৌম্য সোজা সিধুদার দোকানে চলে গেল। সেখানে ইতিমধ্যেই বাকিরা হাজির। সৌম্য সেখানে পৌঁছতেই সকলে উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকাল।
"কিরে, এতো তাড়াতাড়ি চলে এলি?" আশফাক সৌম্যকে জিজ্ঞাসা করল।
"ওনাদের এতোদিন পর দেখা হলো। ওনাদের মাঝে কি আমার থাকা ঠিক? তাই চলে এলাম।"
নিশীথ আশফাককে বলল, "সত্যি আশু, তো ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়র জোর আছে! এটা আমি তো ভাবতেই পারি নি। কি বল তোরা?"
সকলে সম্মতি জানাল। সৌম্য সিধুদাকে এক কাপ চা দিতে বলে অনিন্দ্যর কাছে একটা সিগারেট চাইল। সিগারেটটা ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিয়ে এক চুমুক চা খেল তারপর ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, "বুঝলি দাদু বলেছে আমাদের একটা পার্টি দেবে, এমন পার্টি যা আমরা সারা জীবন ভুলব না।"
"তাই নাকি! সৌম্য দেখবি যেন বিরিয়ানি থাকে মেনুতে" আবদারের সুরে আশফাক বলতেই সবাই হো হো করে হেসে উঠল।

সৌম্য বেরিয়ে যেতেই দীপঙ্কর মীরাকে বলল, "তুমি বোসো, আমি চা বানিয়ে আনছি।"
"এখানে একা বসে থাকব কেন? আমিও তোমার সাথে তোমার রান্নাঘরে যাই চলো"
চা বানাতে বানাতে দুজনে তাদের স্মৃতির গভীরে ডুব দিল। মীরা দীপঙ্করকে বলল, "তোমার মনে আছ যখন তুমি আমাদের বাড়িতে আন্ডারগ্রাউন্ড ছিলে তখন রান্নাঘরে আমি রান্না করতাম আর সেখানে বসে বসে আমার সাথে গল্প করতে?"
"তা আবার মনে থাকবে না! গল্প করতে করতে ঘন্টার পর ঘন্টা কি ভাবে কেটে যেত জানতেই পারতাম না।"
"আচ্ছা দীপঙ্কর, তুমি বিয়ে করলে না কেন?"
"হুম, আমার আবার বিয়ে। জীবনের একটা বড় সময় তো অবসাদগ্রস্ত হয়েই কাটিয়ে দিলাম। জানো তোমার মৃত্যু খবরটা আমি মন থেকে একদম মেনে নিতে পারে নি। ভীষণ ভেঙে পড়েছিলাম। তোমার স্মৃতি নিয়েই জীবনের এতোটা বছর কাটিয়ে দিলাম।"
দুজনে দু'কাপ চা নিয়ে বসার ঘরে ফিরে এলো।
"আমি কিন্তু একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি"
"কি সিদ্ধান্ত?" জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দীপঙ্কর মীরার দিকে তাকাল।
"শেষ জীবনটা আমি তোমার সাথেই কাটাতে চাই। আমাকে বিয়ে করবে তো?"
কি বলছ মীরা! তুমি আমাকে বিয়ে করবে? এ তো আমার কাছে স্বর্গ পাওয়া" আবেগে দীপঙ্করের গলা বুজে এলো। সে এটা কল্পনাও করে নি। সারা জীবন যে দুঃখ ভোগ করে শেষ জীবনে তাকে ঈশ্বর হয়তো এভাবেই সুখ ঢেলে দেন। 
এমন সময় সৌম্য ফিরে এলো। সে জানালো রাত সারে আটটা বাজে, এবার তাদের বেরোনো উচিৎ।
মাস খানেক কেটে গেছে, দীপঙ্কর আর মীরা এখন নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ করে। কখনো প্রিন্সেপ ঘাটে, কখনো ময়দানে বা কখনো পার্কস্ট্রীটের কোনো আভিজাত রেস্তরাঁয়। ওরা যেন তাদের যৌবন ফিরে পেয়েছে। দীপঙ্কর আর মীরা ঠিক করল সামনের মাসের পঁচিশ তারিখ কালিঘাটের মন্দিরে তারা বিয়ে করবে। দীপঙ্করের মনে কিন্তু এখনো কিছুটা সংশয় থেকে গেছে। সংশয় অবশ্যই মীরাকে নিয়ে নয় সংশয় মীরার ছেলে সমীরকে নিয়ে। সমীর কি এটা মেনে নেবে? মীরা তো এখনো সমীরকে কিছুই জানায় নি। সে যখন জানবে তখন তার প্রতিক্রিয়া কি হবে, এইসব সাত পাঁচ চিন্তা তার মাথায় ঘুরছে। মীরাকে তার এই সংশয়ের কথা জানাতে মীরা বলেছে বলেছে যে সমীরের কি প্রতিক্রিয়া হবে সে জানে না কিন্তু সে তার সিদ্ধান্তে অটল। মীরার কথা শুনে বোঝা যায় যে তার সাথে সমীর সম্পর্কে তেমন উষ্ণতা নেই বরং শীতলতাই বেশি। তবে দীপঙ্কর এ ব্যাপারে মীরাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। সে যখন এই প্রসঙ্গে কিছু বলা উচিৎ মনে করবে তখন সে নিজেই বলবে। যে কোনো সম্পর্কে ভালোবাসার সাথে একে অপরের প্রতি সম্মান থাকাও অত্যন্ত জরুরী। সেই সম্মান, সেই শ্রদ্ধা যে দীপঙ্কর আর মীরার একে অপরের প্রতি যথেষ্ট আছে তা বলাই বাহুল্য।

হাতে আর মাত্র এগারোটা দিন। মীরার মনে মনে ভাবল এবার সমীরকে দীপঙ্করের ব্যাপারে জানানো দরকার। সে জানে সমীরের তার প্রতি ভালোবাসা বা সম্মান কিছুই নেই। সে আর তার স্ত্রী চন্দ্রাণীর ভালোবাসা শুধু মাত্র তার সম্পত্তির উপর। এতো বড় বাড়িতে ছেলে, বৌমা, ছোট্ট নাতনি, পরিচারক-পরিচারিকা সকলের মাঝেও সে বড় নিঃসঙ্গ। একাকিত্ব, মানসিক যন্ত্রণা যখন তাকে একটু একটু করে শেষ করে দিচ্ছিল ঠিক তখনই সৌম্যকে যেন ঈশ্বর তাঁর দূত হিসেবে পাঠালেন। সৌম্য এক লহমায় মীরার মনে তার নিজের জীবনের মূল্যায়নটাই বদলে দিল। মীরা যখন তার জীবনকে সুখহীন এক ব্যর্থ জীবন হিসেবে মূল্যায়ন করে ফেলেছে তখনই 'দেবদূত' সৌম্যর মাধ্যমে দীপঙ্করের খবর পাঠিয়ে ঈশ্বর তাকে বুঝিয়ে দিলেন যে সে বড্ড তাড়াহুড়ো করে ফেলেছে, জীবনের এখনো একটা মোড় বাকি আছে যা তাকে সুখে, শান্তিতে ভরিয়ে দেবে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অস্থির মনটাকে শান্ত করার জন্য মীরা কয়েক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল, একটা  দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনটাকে শক্ত করল, আজ সমীরকে সে সব বলবেই। সন্ধ্যাবেলায় সমীর ঘরে ফিরতেই মীরা তাকে বলল যে সে কিছু কথা বলতে চায়। কিন্তু সমীর জানাল যে সে এখন ক্লান্ত, এই মুহূর্তে কোনো ফালতু কথা শোনার মতো সময় বি ইচ্ছা তার কাছে নেই।
কি! আমার কথা ফালতু, তোর কাছে আমার কথার কোনো মূল্য নেই?" চিৎকার করে ক্ষোভে ফেটে পড়ল মীরা তারপর বলল, "তোকে এখুনি শুনতে হবে, এটা আমার ভবিষ্যতের কথা"
"হুম! তোমার কি ভবিষ্যতের কিছু বাকি আছে? বেশ বলো" সমীরের চোখে মুখে অবজ্ঞার ছাপ স্পষ্ট।
মীরা দীপঙ্কর আর দীপঙ্করের সাথে তার সম্পর্কের কথা সব সমীরকে জানাল আর তারপর বলল যে তারা আগামী পঁচিশ তারিখে বিয়ে করছে। একথা শুনে পিছন ঘুরে থাকে সমীর তার মায়ের দিকে একবার ঝট করে ঘুরে দেখল তারপর বলল, "তোমার যা ইচ্ছা করো তবে দয়াকরে এসবের মধ্যে আমাকে টেনো না।"
এতক্ষণে মীরার নিজেকে একটু হাল্কা লাগছে, মনের মধ্যে যে খচখচানিটা ছিল সেটা চলে গেছে।
সমীর গটগট করে উপরে উঠে গেল। শোয়ার ঘরে যেতেই তার স্ত্রী চন্দ্রাণী তাকে বলল, "বুড়ি কি বলছিল?" সমীর চন্দ্রাণীকে সব খুলে বলল তারপর বলল সে জানিয়ে দিয়েছে যে এসবের মধ্যে সে নেই। একথা শোনা মাত্রই চন্দ্রাণী কপাল চাপড়াতে লাগল, "এ কি সর্বনাশ করলে তুমি!" চাপা গলায় বলল চন্দ্রাণী।
"কেন? সর্বনাশের আবার কি করলাম?"
চন্দ্রাণী একবার চট করে ঘরের পর্দাটা সরিয়ে বাইরেটা দেখে নিল, তারপর দরজাটা বন্ধ করে দিয় বলল, "তোমার মাথায় কি গোবর আছে? ভেবে দেখেছ তোমার মা তার ঐ পুরনো নাগরের সাথে বিয়ের পর সব সম্পত্তি যদি তার নামে লিখে দেয় তখন কি হবে?"
"এটা তো আমি ভেবে দেখিনি। আমি এখুনি গিয়ে মাকে বলে আসছি যে এতে আমার মত নেই"
'আ হা রে! উনি বলবেন আর উনার মাও শুনে নেবেন! এ যেন তেল পারা খেজুর গাছ!"
"তাহলে কি করব?"
"খুন" চন্দ্রাণীর চোখদুটো জ্বলজ্বল করে উঠল
"কি বলছ! মাকে খুন করব?" সমীর চমকে উঠল
"তোমার মাথায় সত্যিই গোবর আছে। কি করে যে আমার বাবা তোমার মতো একটা হাঁদারামের সাথে আমার বিয়ে দিল কে জানে! তোমার মা খুন হলে সবার সন্দেহ প্রথমেই তোমার উপর পরবে। তখন এই সম্পত্তি জেলে বসে ভোগ করতে হবে।"
"আহা রাগ করছ কেন? পরিস্কার করে বলোই না।"
"দেখ ঐ বুড়োটার তো কেউ নেই বলছ। সুতরাং বুড়োটা যদি কোন ভাবে অপঘাতে মরে তাহলে কেউ তেমন মাথা ঘামাবে না। পুলিশও ক'দিন নামে মাত্র তদন্ত করবে দিয়ে ফাইল বন্ধ করে দেবে।"
"কিন্তু চন্দ্রাণী, প্রথমে একবার কাউকে দিয়ে বুড়োটাকে শাসানি দিলে হয় না?"
"আচ্ছা গাড়ল তো তুমি? তাহলে সবাই জেনে যাবে না যে তুমি এই বিয়ের বিরুদ্ধে? পড়ে ঐ লোকটা যদি বাথরুমে পড়ে গিয়ে মরে তাহলেও লোকে তোমাকেই সন্দেহ করবে।"
"এটা তো ভেবে দেখিনি। ঠিক আছে আমি ব্যাবস্থা করছি।

বিয়ের আর সপ্তাহ খানেক বাকি। দুজনের ব্যস্ততা তুঙ্গে। তবে বিয়ের যাবতীয় ব্যাবস্থাপনায় আছে 'টিম সৌম্য'। ওরা পাঁচ জনে মিলেই রিসর্ট ভাড়া করা থেকে গাড়ি, ডেকরেশন, ক্যাটারিং সমস্থ কিছু দেখভাল করছে। বিয়েটা কালীঘাটে হবে ঠিকই কিন্তু রিসেপশনের অনুষ্ঠানটা বেশ জাঁকজমকপূর্ণ করার পরিকল্পনা হয়েছে। শহরের উপকণ্ঠে একটা রিসর্ট ভাড়া করা হয়েছে, পাড়া থেকে সকলকে সেই রিসর্টে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুটো লাক্সারি বাসও করা হয়েছে সঙ্গে আরও দুটো এসইউভি। একটা বর-কনের জন্য আর একটা সৌম্যদের পাঁচ জনের জন্য। দীপঙ্করের এমনই নির্দেশ ছিল।
বিকেলে দীপঙ্করের ফ্লাটে সে মীরার সাথে বসে নিমন্ত্রণের তালিকায় একবার অন্তিম বারের মতো চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল যাতে কেউ বাদ না চলে যায়। ঠিক সেই সময় কলিং বেলটা বেজে উঠল। দীপঙ্কর দরজা খুলতেই অকস্মাৎ তার উপর একজন ঝাঁপিয়ে পড়ল। লোকটা অন্ততঃ ছ'ফুট লম্বা, মুখটা কালো কাপড়ে ঢাকা। দীপঙ্কর এই বয়সেও বেশ শক্তিশালী, যুবক বয়সে অনেক ট্রেনিং, অনেক লড়াই করেছে। দুজনের ধস্তাধস্তি দেখে মীরা ছুটে এসে দীপঙ্করকে বাঁচানোর চেষ্টা করতেই লোকটা বেগতিক বুঝে ভোজালি দিয়ে মীরাকে আক্রমণ করল। এতে মীরার ডান হাতের বাহুটা মারাত্মক আহত হলো। এই দেখে দীপঙ্কর যেন দিক্বিদিক জ্ঞান শূণ্য হয়ে গেল, তার ভিতরকার ঘুমন্ত জানোয়ারটা জেগে উঠল। সে সেই লোকটার হাত থেকে ভোজালিটা কেড়ে নিয়ে হিংস্র প্রাণীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল আর তারপর এলোপাথারি ভোজালির কোপে নৃশংস ভাবে লোকটাকে মেরে ফেলল। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে তাদের সব সপ্ন ভেঙে চুরমার। তাদের আনন্দের মুহূর্তগুলো এক লহমায় সীমাহীন হতাশায় বদলে গেল। সম্বিত ফিরতেই দুজনে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল।

আট মাস হয়ে গেল কোর্টে কেস চলছে। ঘটনার নৃশংসতা যে বর্ণনা কোর্ট শুনেছে আর যা তথ্য-প্রমান পুলিশ কোর্টের সামনে পেশ করেছে তার বিচার করে দীপঙ্করের যে মৃত্যুদণ্ড হবে তা এক প্রকার সবাই নিশ্চিত। এই ঘটনাটা চারিদিকে ভীষণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তাই আজ ২১সে মে রায় বেরোনোর দিন কোর্টে বেশ ভিড় হয়েছে। সাধারণ জনগণ, মিডিয়া থেকে শুরু করে মানবাধিকার কর্মী, এজলাস আজ গমগম করছে। জনগণের সহানুভূতি কিন্তু সম্পূর্ণভাবে দীপঙ্করের পক্ষে কিন্তু কোর্ট তো সহানুভূতিতে চলে না, কোর্টের কাছে সাক্ষ-প্রমাণই শেষ কথা। রায় রায় ঘোষণা হলো, প্রত্যাশা মতোই ফাঁসির আদেশ। আগামী ৩১সে মে ফাঁসির দিন ধার্য হলো তার আগে অবশ্য চাইলে উচ্চ আদালতে আবেদন করার ছাড় দেওয়া হলো।
পরের দিন সকালে মীরা আর সৌম্য গেল জেলে দীপঙ্করের সাথে দেখা করতে। সৌম্য মীরাকে বলল, "আন্টি আপনি আগে দেখা করে আসুন আমি তারপর যাবো।"
মীরা দেখল এক মুখ দাড়ি নিয়ে দীপঙ্কর গারদের রড ধরে দাঁড়িয়ে আছে, মাথাটা একেবারে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। মীরা যেতেই দীপঙ্কর মাথাটা তুলল। নিঃশব্দে চোখ দিয়ে দড়দড় করে জল পরছে। "মীরা কোথা থেকে কি হয়ে গেল বলো তো? কেন লোকটা আমার উপর আক্রমণ করল সেটাও জানতে পারলাম না। মুহূর্তের মধ্যে সব কেমন বদলে গেল!"
মীরার কান্না যেন থামছে না, কোনোরকম বলল, "তোমার ফাঁসি হয়ে গেলে আমিও আত্মহত্যা করব। একা একা বাঁচার আর কোনো ইচ্ছা আমার নেই।"
একথা শোনা মাত্র দীপঙ্করের মুখটা একদম পাল্টে গেল, মীরাকে বলল, "মীরা তুমি আমাকে দারুণ কথা বললে। বেঁচে থেকে না পারলেও মরে গিয়ে তো আমরা মিলিত হতেই পারি। সেখানে কে আটকাবে আমাদের। আঃ শান্তি পেলাম। এখন আর আমার কোনো আফসোস নেই। আমি মরে শান্তি পাবো।"
ঠিক হলো ঠিক যে মুহূর্তে দীপঙ্করের ফাঁসি হবে সেই মুহূর্তেই মীরাও আত্মহত্যা করবে।
মীরা চলে যেতে সৌম্য এলো দেখা করতে বিভিন্ন কথার মাঝে সৌম্য জানাল যে বিভিন্ন সংবাদপত্রে, খবরের চ্যানেলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই রায়ের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছে। দীপঙ্কর মনে মনে ভাবল যে তারা যতই প্রচার চালাক তার ফাঁসি কেউ আটকাতে পারবে না কারন সে উচ্চ আদালতের কোনো আবেদন করবে না। কিন্তু নিয়তির ইচ্ছা বোধহয় অন্যরকম। সে উচ্চ আদালতের আবেদন না করলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলো করল। তারা তাদের আবেদনে আদালতকে বলল যে দীপঙ্কর বাগচি আত্মরক্ষার জন্য এই খুন করেছে আর এই অপরাধে একজন সত্তরোর্ধ মানুষকে ফাঁসি দেওয়া মধ্যযুগীয় বর্বরতা ছাড়া আর কিছুই নয় তাই তাদের অনুরোধ আদালত যেন দীপঙ্কর বাগচির ফাঁসির আদেশ পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এই খবর শুনে দীপঙ্করের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হলো। বারবার তার সাথে কেন এমন হয়? কেন সে যেটা চায় তা কখনো পায় না? রাগে, দুঃখে ছটফট করতে লাগল কিন্তু কিছুতেই যেন সে শান্ত হতে পারছে না। কি করবে সে? ভেবে ভেবে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।

আজ ২৭শে মে। আজকের সকালটাও অন্যদিনের মতোই হলো। কিন্তু একটু বেলার পর দিনটা সম্পূর্ণ বদলে গেল। সারা দেশ উত্তাল হয়ে উঠল একটা খবরে। দীপঙ্কর বাগচি তার ফাঁসির আদেশ বহাল রাখার জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে, আজই তার শুনানি হবে, তার হবে সওয়াল করবে প্রখ্যাত ব্যারিস্টার লক্ষণ জালানি। এই খবর সত্যি অবাক করার মতো। কেউ কখনো শুনেছেন যে নিজেকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ানোর জন্য কেউ খরচ করে বড় উকিল নিয়োগ করে! বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমেও এই ঘটনা কভার করা হলো। লক্ষণ জালানি তার জীবনে কোনো কেস হারে নি। এবারও তাই হলো। সুপ্রিম কোর্ট দীপঙ্করের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখাল। খুশিতে দীপঙ্কর দুহাত তুলে নেচে উঠল। সে এখন অপ্রতিরোধ্য। তার মীরার সাথে মীলন কেউ আটকাতে পারবে না। নির্দিষ্ট দিনেই ফাঁসি হবে।

৩০শে মে ঘোষণা হলো পরের দিন সকাল সাতটায় দীপঙ্করের ফাঁসি হবে। সে দিন মীরা এলো জীবিত অবস্থায় শেষ বারের মতো দেখা করতে। দুজনে ঠিক করল পরের দিন সকালে যখন দীপঙ্করকে ফাঁসির মঞ্চে তোলা হবে তখনই মীরা বিষ খাবে। তার সব ব্যবস্থা মীরা করে রেখেছে।

আজ ভোর ভোর দীপঙ্কর উঠে পরেছে যদিও সারা রাত সে দু চোখের পাতা এক করতে পারে নি। এটাই তার এই পৃথিবীতে শেষ রাত। মনের ভিতরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। আর মাত্র দু ঘন্টা, তার পরেই সে এই পৃথিবীকে বিদায় জানাবে আর কেউ তাকে মীরার সাথে মিলিত হতে আটকাতে পারবে না। সকাল ছ'টা বেজে গেছে, আর এক ঘন্টা। এখুনি হয়তো জেলের কর্মীরা চলে আসবে, তাকে স্নান করিয়ে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাবে। সাড়ে ছ'টা বেজে গেল এখনো কেউ এলো না। এবার দীপঙ্কর একটু অস্থির হয়ে উঠল। সাতটায় তার ফাঁসি অথচ পৌনে সাতটাতেও কারোর কোনো উদ্যোগ নেই কেন? সাতটা দশ বাজে, দীপঙ্কর জেলার সাহেবকে তার সেলের দিকে আসতে দেখল। সে এবার নিশ্চিন্ত হলো, এবার নিশ্চয়ই তাকে তৈরী করা হবে, সেজন্যই জেলার আসছেন। মনে মনে ভাবল মীরা হয়তো এতক্ষণ বিষ খেয়ে নিয়েছে। জেলার তার সেলের সামনে আসতেই দীপঙ্কর বলল, "আসুন জেলার সাহেব, আমি তো কখন থেকে অপেক্ষা করছি। এতো দেরি হলো যে, আমার ফাঁসির সময় কি পরিবর্তন হয়েছে?"
জেলার বলল, "দীপঙ্করবাবু আপনার জন্য একটা খবর আছে। আপনার ফাঁসি রোধ হয়ে গেছে। মানবাধিকার কর্মীরা একত্রিত ভাবে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছিল, রাষ্ট্রপতি সেই আবেদন মঞ্জুর করেছেন।"
দীপঙ্কর একথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল। পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখ দিয়ে একটাও কথা বেরোচ্ছে না। শরীর যেন ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। এখন তার চিন্তা তার ফাঁসি নিয়ে নয়, চিন্তা মীরার আত্মহত্যা নিয়ে। কাটা পাঁঠার মতো এখন তরফাচ্ছে সে। এ কি সর্বনাশ হয়ে গেল! সে মনেপ্রাণে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছে যেন মীরার কিছু না হয়।
কিছুক্ষণ পর সৌম্য এলো তার সাথে দেখা করতে। কাঁদতে কাঁদতে বলল, "দাদু, সর্বনাশ হয়ে গেছে। মীরা আন্টি আজ সকালে আত্মহত্যা করেছেন। আর সুইসাইড নোটে লিখে গেছেন যে তোমার সাথে পরলোকে মিলিত হবার জন্যই একাজ করলেন। এটাও লিখেছেন যে ওনার সমস্ত সম্পত্তি উনি উইল করে আমার নামে লিখে দিয়েছেন", সৌম্য হাউহাউ করে কেঁদে উঠলো।
নির্বাক দীপঙ্কর ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল।

দীপঙ্কর এবং মীরা দুজনেরই মরুভূমির ন্যায় জীবনে সুখ যেন মরীচিকা, তারা যতই সুখের কাছে এগিয়ে যায় সুখ ততই তাদের থেকে দূরে সরে যায়। এখন, যখন দীপঙ্করের একমাত্র সুখ মৃত্যু তখন মৃত্যও তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে আর মীরা সুখের মৃত্যু যখন আলিঙ্গন করল সুখ তার মৃত্যু হাত ছেড়ে দিয়ে চলে গেল বহুদুরে ঠিক মরীচিকার মতোই।
*অঙ্কণ : তন্দ্রা ব্রহ্মচারী
**বিধিসম্মত সতর্কীকরণ - এই গল্পের ঘটনা, স্থান, কাল, পাত্র সবই কাল্পনিক। এর সাথে যদি বাস্তবের কারোর কোনো মিল পাওয়া যায় তা নিতান্তই কাকতালীয় বলে গণ্য হবে। ধূমপান ও মদ্যপান স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর, ইহা ক্যান্সারের কারণ।

মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২০

প্রতিশোধ

প্রতিশোধ
উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

          অঙ্কণ : তন্দ্রা ব্রহ্মচারী


শীতটা সবে পরতে শুরু করেছে। বিকেল বেলায় পাঁচটার পর মাথা শিশিরে ভিজে যাচ্ছে। ভোরের দিকেও বেশ ঠান্ডা। এই সময় সকাল বেলায় কাঁথা চাপা দিয়ে ঘুমাতে খুব ভালো লাগে। খাটের পাশে টেবিলে রাখা মোবাইল ফোনটা বাজতে বাজতে ক্লান্ত হয়ে গেল কিন্তু অভিরূপের ঘুম ভাঙল না। ঘন্টা দুয়েক আগে মোবাইলে যখন ঘুম ভাঙানোর বাজনা বেজেছিল তখন অভি চোখ বন্ধ করেই আঙুলের এক খোঁচায় তাকে চুপ করিয়ে দিয়েছিল। এই শান্তির ঘুম ভাঙতে সে মোটেই রাজি নয়। কিন্তু সব সময় যেটা চাওয়া হয় সেটা পাওয়া যায় না। অভির ক্ষেত্রেও তাই হলো। কেউ খুব জোরে জোরে কলিং বেলটা বাজাচ্ছে। অভি ভিশন বিরক্ত হয়ে কানে বালিশ চাপা দিল। মিনিট খানেকের শান্তির পর এবার দরজা পেটানোর আওয়াজ। এবার অভির বিরক্তির বাঁধ ভাঙল। মুখ থেকে বালিশটা সরিয়ে কোনো রকমে চোখটা খুলে ঘড়িটা দেখল, "সাতটা চল্লিশ বেজে গেছে!" অভি তড়াক করে লাফিয়ে খাট থেকে নেমে প্রায় দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলল-
"স্যার আপনি?" দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে গোয়েন্দা অফিসার ইনসপেক্টর সনাতন মিত্র।
"তোমার নাম অভিরূপ না হয়ে কুম্ভকর্ণ হওয়া উচিত ছিল। চার বার ফোন করেছি, বার কয়েক ডোর-বেল বাজিয়েছি তাতেও তোমার ঘুম ভাঙল না!" সনাতনের মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট
"না, মানে, স্যার........." অভি আমতা আমতা করতে লাগল।
"বেশ-বেশ, বাইরেই দাঁড় করিয়ে রাখবে না ভিতরে আসতে বলবে?"
"আরে স্যার, কি যে বলেন! আসুন-আসুন"
সনাতন ঘরের ভিতরে ঢুকে চারিদিক তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল, "মাত্র দু'দিন হলো মালিনী বাপের বাড়ি গেছে এর মধ্যেই তুমি ঘরের যা অবস্থা করেছো! এতো অগোছালো কেউ কি করে হতে পারে অভি?"
"মালিনীও আমাকে একই প্রশ্ন করে। আমিও স্যার এটা ভেবে পাই না", নিষ্পাপ শিশুর মতো মুখ করে অভি জবাব দিল
"হুম, বুঝেছি, তুমি শোধরাবে না। তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নাও, আমাদের বেরোতে হবে।"
"স্যার, নতুন কোনো কেস?"
"সেটা আমি এখনই বলতে পারব না। ডিআইজি সাহেব ডেকে পাঠিয়েছেন, গেলেই বোঝা যাবে।"
"মনে হচ্ছে আমার ভোরের সপ্ন সত্যি হবে। আজ আমি একটা দারুণ সপ্ন দেখেছি স্যার।"
ঠিক আছে, আগে তুমি তৈরী হয়ে নাও, তোমার স্বপ্ন আমি গাড়িতে শুনব।"

আবাসন থেকে গাড়িটা বেরিয়ে বড় রাস্তায় পরতেই সনাতন একটা সিগারেট ধরাল, কয়েকটা টান দিয়ে সিটে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে বলল, "তা ভোর বেলায় কি স্বপ্ন দেখলে অভি যেটা নাকি সত্যি হলে তুমি খুব খুশি হবে?"
"স্যার, দারুন সপ্ন। তবে প্লটটা বছর পঁচিশ পরের।"
"বাবা! টাইম মেশিন নাকি? তা বেশ, এবার ভনিতা না করে বলো তো।"
"স্যার, দেখলাম এক বিরাট ব্যবসায়ী ও তার ছেলেকে একটা ভাইরাস প্রয়োগ করে খুন করা হয়েছে যা একেবারে নর্মাল মৃত্যু মনে হচ্ছে আর সেই কেসটা আপনি সলভ করলেন।" পুরো স্বপ্নটা অভি বিস্তারিত জানাল
"এ তো দেখছি জৈবাস্ত্র হে। হা হা হা....."
"হ্যাঁ স্যার, একেবারেই তাই। আর আশ্চর্যের বিষয় ঠিক এ ভাবেই ডিআইজি স্যার আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন আর আপনি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন।"
"তা তোমার সপ্নেও কি তুমি এরকম কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমোচ্ছিলে নাকি?"
"কি যে বলেন স্যার.....!" লাজুক মুখটা অভি নামিয়ে নিল
"অভি ভারতে প্রথম জৈবাস্ত্র প্রয়োগের ঘটনা কবে ঘটেছিল জানা আছে?"
"না, স্যার, তা তো বলতে পারব না" জিজ্ঞাস্য চোখে অভি বলল।
"আরে নিজেদের ইতিহাস নিয়ে একটু পড়াশোনা করো। কলেজ স্ট্রিটে লালবাজারের ইতিহাস নিয়ে অনেক বই পাবে, একটু পড়ো, নিজেদের জানো।"
"অবশ্যই পড়ব। স্যার, ওটা কবে হয়েছিল?"
"১৯৩৫ সালে, এই বাংলাতেই। প্লেগের জীবাণু প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়। বীরভূমের এক অভিজাত পরিবারের ঘটনা।"
"কি সাঙ্ঘাতিক!" অভির চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল

"মে আই কামিন স্যার?" সনাতন ডিআইজি সত্যসাধন মুখোপাধ্যায়ের কেবিনে ঢোকার অনুমতি চাইল
"এসো সন্তু, এসো। বসো" সামনে রাখা চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করে ডিআইজি বলল
চেয়ারে বসে মুখে একটা প্রশান্তির হাসি নিয়ে সনাতন বলল, "বাবা-মায়ের দেওয়া এই নামটা আপনিই বাঁচিয়ে রেখেছেন স্যার"
মুচকি হেসে অভি বলল, "স্যার দেখবেন এই নামেই একদিন আপনি বিখ্যাত হবেন। ডিটেকটিভ সন্তু।"
"বেশ-বেশ, তুমি বোসো। স্যার এবার বলুন জরুরী তলবের কি কারন।"
ডিআইজি এতক্ষণ কাঁচের ডিম্বাকৃতি পেপার ওয়েটটা টেবিলের উপর হাত দিয়ে লাট্টুর মতো ঘোরাচ্ছিল। মনোবিদরা বলে কেউ যখন গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকে তখন এই ধরনের অভিব্যক্তি তাদের মধ্যে দেখা যায়। সনাতন তাকে জরুরী তলব করার কারণ জিজ্ঞাসা করতেই ডিআইজি হটাৎ করে ঘুরন্ত পেপার ওয়েটটা হাত দিয়ে চেপে ধরল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকার পর টেবিলের উপর ঝুঁকে পড়া মাথাটা উপরে তুলল। কপালে বলিরেখা স্পষ্ট। চশমাটা কপালের উপর তুলে বলল, "সন্তু, একটা ব্যাপারে আমি খুব চিন্তিত, ইন ফ্যাক্ট আমার উপর ভিষন প্রেসারও আছে।"
"কি ব্যাপার স্যার বলুন না" সনাতনকে এখন খুব উৎসাহি দেখাচ্ছে কারন ডিআইজি এইভাবে তলব করে যে কেসেরই দায়ীত্ব দিয়েছে প্রতিটা ভিষন চ্যালেঞ্জিং আর সনাতন নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে খুব পছন্দ করে।
"তুমি কি শুনেছ গত পরশু ডানকুনির কাছে দুর্গাপুর এক্সপ্রেস ওয়ের পাশের ঝোপ থেকে এক বিদেশী মহিলার লাশ উদ্ধার হয়েছে?"
"হ্যাঁ স্যার, জানি। শুনেছি খুব নৃশংস ভাবে খুন করা হয়েছে?"
"হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছ। দুটো স্তন কেটে নিয়েছে, তারপর মুখ থেঁতলে খুন করা হয়েছে। ঘটনাচক্রে এই মহিলা নিউজিল্যান্ড এমব্যাসিতে কর্মরতা তাই আমার উপর কতটা প্রেসার আছে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ?"
"স্যার মহিলাটিকে কি রেপ করা হয়েছিল?"
"আপাত ভাবে তো রেপড্ বলে মনে হয়নি, বাকিটা বোঝা যাবে ফরেন্সিক রিপোর্ট এলে। তুমি এখুনি এই কেসের চার্জ নাও, আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খুনিকে গ্রেফতার করো" এই বলে ডিআইজি সনাতনের দিকে দুটো ফাইল এগিয়ে দিল।
ফাইল দুটো নিয়ে সনাতন তাতে একটু চোখ বুলিয়ে নিয়ে উঠে পরল, "ঠিক আছে স্যার, এখন উঠি? আপনাকে সময় মতো রিপোর্ট দিতে থাকব।"
"ঠিক আছে, এসো। সনাতন এন্ড অভি, বেস্ট অফ লাক বোথ অফ ইউ।"
দুজনেই ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিল।

গাড়িতে বসে অভি সনাতনকে জিজ্ঞাসা করল, "স্যার কোথা থেকে শুরু করবেন?"
"তোমার কি মনে হয়, প্রথমেই আমাদের কি করা উচিৎ?" সনাতন রসিকতার মোড়কে অভির দিকে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল
"আমার মনে হয় খুনের স্পটটা একবার ঘুরে লোকাল থানার যে অফিসার এই ঘটনার তদন্তে আছেন তাঁর সাথে একবার কথা বলে নেওয়া দরকার।"
"এই তো, তোমার বুদ্ধি খুলছে" সনাতনের চোখে প্রসন্নতার ছাপ দেখা গেল। "অভি, লোকাল থানায় ফোন করে আইও-কে স্পটে পৌঁছাতে বলো।"
কলকাতা থেকে বর্ধমানের দিকে যেতে দুর্গাপুর এক্সপ্রেস ওয়েতে ডানকুনি টোল প্লাজা থেকে সাড়ে চার কিলোমিটার আগে বাম দিকে একটা ঝোপের পাশে পুলিশের ব্যারিকেড, ইতস্ততঃ উৎসাহি মানুষ জিজ্ঞাস্য দৃষ্টি নিতে ঘুরঘুর করছে। সনাতনদের গাড়িটা এসে দাঁড়াতেই এক পুলিশ অফিসার ছুটে এলো। সনাতন গাড়ি থেকে নেমে একটা সিগারেট ধরাল।
"গুড মর্নিং স্যার। আমি এসআই আব্দুল করিম, এই কেসের আইও" সনাতনকে স্যালুট করল ঐ পুলিশ অফিসার।
"মর্নিং। চলুন করিম সাহেব একবার স্পটটা দেখে নিই।"
"সিওর স্যার। চলুন" এসআই করিম সনাতনকে পথ দেখিয়ে ঝোপের ভিতরে যেখানে মৃত দেহটা পরে ছিল সেখানে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়ে সনাতন আর অভি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব দেখল।
"তা করিম সাহেব কি বুঝছেন? আপনার কি মনে হয়? আর ভিক্টিমের নাম কি?" সনাতন জিজ্ঞাসা করল।
"স্যার, ভিক্টিমের নাম মিস এমালিয়া মার্টিন। এখনো স্যার এমন কোনো ক্লু পাইনি যেটা ধরে এগিয়ে যেতে পারি।"
"রেপ তো হয় নি বলছেন। ফরেন্সিক আর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কি হাতে পেয়েছেন?"
"পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেয়েছি, এই নিন স্যার। গত পাঁচ তারিখ রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ খুনটা হয়েছে" এসআই একটা ফাইল সনাতনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল "ফরেন্সিক রিপোর্টটা আজ কালের মধ্যেই চলে আসবে স্যার।"
"রিপোর্টটা আমার কাছে পাঠিয়ে দেবেন", জ্বলন্ত সিগারেট শেষাংশটা পা দিয়ে মারিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, "ভিক্টিমের পরিচিতদের সাথে আপনি তো কথা বলেছেন, ওনারা কি কাউকে সন্দেহ করছেন?"
"না স্যার। ওনারা প্রত্যেকেই বলেছেন ইনি খুবই শান্ত ও মিশুকে সভাবের মহিলা ছিলেন। ওনার যে কেউ শত্রু হতে পারে তা বিশ্বাস করাই মুসকিল।"
"ঘটনার দিন ভিক্টিমের কিরকম এটিচ্যুড ছিল, সারাদিন কি করেছিলেন সে সব খবর নিয়েছেন?"
"আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার। সারাদিন অফিসেই ছিলেন তবে উনি অন্যদিনের তুলনায় সেদিন বেশি উৎফুল্ল ছিলেন। অফিস থেকেও একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গিয়েছিলেন।"
"হুম গুড, গুড জব" সন্তুষ্টির স্বরে সনাতন বলল তারপর অভিকে বলল, "কি বুঝলে হে অভি?"
"স্যার, সকাল বেলার ঘুম থেকে জোর করে তুলে নিয়ে চলে এলেন, এখন এগারোটা বাজে। সকাল থেকে পেটে একটাও দানা-পানি পরে নি। খালি পেটে আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না স্যার", মাথা চুলকাতে চুলকাতে অভি জবাব দিল।
"এখানে তো কিছু দেখছি না, খাবে কি?" সনাতন চারিদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখে নিয়ে বলল "ঐ যে একটা মিষ্টির দোকান দেখতে পাচ্ছি, চলো দেখি সিঙাড়া পাওয়া যায় কিনা।"
দোকানটা ছিল ঘটনা স্থলের ঠিক উল্টো দিকে। ওরা দুজন গাড়ি নিয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে ক্রসিং থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে এসে দোকানের সামনে পৌঁছাল।
দোকানে পৌঁছে ওরা দু প্লেট সিঙাড়া অর্ডার করে চেয়ারে বসল। এদিক ওদিক দেখতে দেখতে অভি মুচকি হেসে বলল, "গরুর গাড়ির আবার হেড লাইট!"
"মানে?" অবাক হয়ে সনাতন জিজ্ঞাসা করল।
"স্যার ঐ দেখুন সিসি টিভি ক্যামেরা। ভারি তো দোকান তার আবার সিসি টিভি ক্যামেরা। ভাবটা এমন যেন কলকাতার কেসি দাসের মিষ্টির দোকান।"
"হা হা হা......, ওঃ অভি তুমি পারও বটে" হাসতে হাসতে সনাতন জবাব দিল।

অফিসে ঢুকে সনাতন দু'কাপ চা দিতে বলে ফাইলগুলো খুলে বসল। খুব মনোযোগ দিয়ে রিপোর্টগুলো পরছে আর সেই সাথে মৃতদেহের ছবিগুলো দেখছে। কোনো দিকে মন নেই। অভি বার কয়েক ডাকার পর সারা পেল-
"কিছু কি বললে অভি?"
"স্যার, আমি আপনাকে অনন্ত পাঁচবার ডাকলাম তবে আপনি সারা দিলেন। আছা আপনি কি আজ সকালের ঘটনার প্রতিশোধ নিলেন নাকি? আমি কিন্তু স্যার সত্যিই শুনতে পাই নি" আবদারের সুরে গড়গড় করে অভি কথাগুলো বলে গেল।
মুচকি হেসে সনাতন অভিকে তাকে ডাকার কারন জিজ্ঞাসা করল। অভি জানাল বেয়ারা অনেকক্ষণ আগে চা দিয়ে গেছে, চা টা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।
সনাতন চায়ের কাপটা এগিয়ে নিল, তারপর একটা চুমুক দিয়ে বলল, "অভি আমার কাছে খবর আছে বিহার, ওড়িষ্যা, ঝাড়খণ্ড আর মধ্যপ্রদেশে গত কয়েক মাসে এই ধরনের কয়েকটা খুন হয়েছে। তুমি আজই লেগে পড়ো। এই সব ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য আমার চাই। ঘটনাগুলোর তদন্ত প্রক্রিয়ার অগ্রগতি, গ্রেফতার হওয়া বা না হওয়া সাসপেক্টদের সম্পর্কিত তথ্য ইত্যাদি যাবতীয় রিপোর্ট আমার চাই।"
"স্যার এটা কি কোনো সিরিয়াল কিলিং-এর ঘটনা বলে মনে হচ্ছে?" অভির চোখ ফেটে উৎসাহের ঝলক বেরিয়ে আসছে
চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে সনাতন বলল, "এটা যে সিরিয়াল কিলিং তা এখনি বলা যাচ্ছে না। প্রথমত সবকটা খুনই যে একজনই করেছে তা বলা যাচ্ছে না আর তাছাড়া একজনই একাধিক খুন করলেও তাকে সিরিয়াল কিলার বলা যায় না, এর নির্দিষ্ট সং আছে।"
"সিরিয়ার কিলারের আমার সংজ্ঞা আছে?" অভি খুব অবাক হলো
"নিশ্চয়ই আছে। আচ্ছা অভি বলতো সিরিয়াল কিলার কথাটা প্রথম কে ব্যবহার করেন?"
অভি ঘাড় নেড়ে জানিয়ে দিল যে সে জানে না।
"১৯৭৪ সালে পুলিশ স্টাফদের এক সেমিনারে নিজের বক্তৃতায় একটি ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে এই টার্মটা প্রথম ব্যবহার করেন বিখ্যাত এফবিআই স্পেশাল এজেন্ট রবার্ট রেসলার। ২০০৪ সালে লেখক অ্যান রুল তাঁর বিখ্যাত ক্রাইম থ্রিলার উপন্যাস 'কিস মি, কিল মি' তে এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করার পর এটা রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যায়।"
"আর স্যার একজন ব্যক্তিকে কখন সিরিয়াল কিলার বলা যায়?" অভিরূপ এখন রীতিমত উত্তেজিত। তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেছে।
সনাতনের চায়ের কাপে অন্তিম চুমুক দিয়ে একটা সিগারেট ধরাল তারপর একটা লম্বা টান দিয়ে উপর দিকে মুখ করে ধোঁয়া ছেড়ে বলতে আরম্ভ করল, "সিরিয়াল কিলার হল এমন একজন ব্যক্তি যে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সাধারণত তিন বা ততোধিক লোককে খুন করেছে একটি অস্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক পরিস্থিতির মধ্যে। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সময়কালও অন্তর্ভুক্ত থাকে। বেশিরভাগ কর্তৃপক্ষ তিনটি হত্যার দ্বারা নির্ধারণ করে, অনেকে আবার এটিকে চারটি বা দুজনেও কমিয়ে দেয়।
অর্থাৎ প্রতিটি খুনের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট সময়ের সুত্র থাকবে, লোকটার মানসিক বিকারগ্রস্ত হবে যা সুপ্ত থাকে, তার সেই বিকার অবশ্যই তার কোনো অন্ধকার অতীত থেকে আসে। অনেক সময় যে পদ্ধতিতে খুনগুলো করা হয় তার পিছনেও একটা নির্দিষ্ট কারন থেকে।"
অভি মনোযোগী ছাত্রের মতো এতক্ষণ সব শুনেছিল, সনাতনের কথা শেষ হতেই সে বলল, "স্যার, আপনার কথা মতো ঐ সমস্ত তথ্য আমি দিন কয়েকের মধ্যেই জোগাড় করছি কিন্তু এই মুহূর্তে তদন্ত কোথা থেকে শুরু করবেন?"
"এক কাজ কর, মিস এমালিয়ার সেদিন অফিস থেকে বেরোনোর পর উনি যেদিকে যেদিকে গিয়েছিলেন সেই সব রাস্তার সিসি টিভি ফুটেজ জোগাড় করো, সেগুলো খুঁটিয়ে দেখো কিছু পাওয়া যায় কিনা।"

দুদিন হয়ে গেল তদন্তে সেভাবে কোনো অগ্রগতিই হয় অথচ আছ ডিআইজি সাহেবকে তদন্ত সম্পর্কিত রিপোর্ট দিতে হবে। সনাতন বেশ চিন্তিত। কি বলবে গিয়ে! সনাতন ভেবে কোনো কূল কিনারা পাচ্ছে না। যাই হোক যেতে তো হবে, কিছু একটা তো বলতেই হবে তাই সনাতন বেরিয়ে পড়ল।
অফিসে ঢুকতেই সনাতন দেখল ডিআইজির সাথে কেউ একজন বসে আছে, বয়স প্রায় বছর ষাট হবে তবে শরীরে বয়সের ছাপ নেই, শক্তপোক্ত ফিট ফিগার। পোশাক দেখে বেশ সম্ভ্রান্ত বলে মনে হচ্ছে। ডিআইজির সাথে সনাতনের চোখাচোখি হতেই ডিআইজি সনাতনকে ডাকল, "এসো সন্তু, পরিচয় করিয়ে দিই। ইনি হলেন বিখ্যাত ব্যবসায়ী মৃণাল দত্ত আর মিঃ দত্ত ইনি আমাদের ডিপার্টমেন্টের রত্ন গোয়েন্দা অফিসার সনাতন মিত্র।"
দুজনে পরস্পরকে প্রনাম করে অভিবাদন জানাল তারপর মৃণাল বলল, "মিঃ মুখার্জি সনাতনবাবুর আমি অনেক নাম শুনেছি। উনি অনেক কমপ্লিকেটেড কেস সলভ করেছেন তা আমি জানি।"
সনাতন বিনয়ী কন্ঠে ধন্যবাদ জানিয়ে চেয়ারে বসল।
ডিআইজি বেল বাজিয়ে বেয়ারাকে ডেকে সনাতনকে চা দিতে বলল তারপর বলল, "সন্তু তুমি এলে বটে তবে আমাকে একটু বেরোতে হবে। সিএমের সাথে একটা মিটিং আছে আর তারপর আমি মিঃ দত্তর ওখানে যাবো, একটা পার্টি আছে।"
সনাতন মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাল, এখনই তাহলে কিছু বলতে হবে না। হাতে একটু সময় পাওয়া গেল।
ডিআইজির কথা শেষ না হতেই মৃণাল সনাতনকে বলল, "মিঃ মিটার আপনিও চলুন না, আমার বিজনেসের আন্দামানের ইউনিটের সাকসেস পার্টি দিচ্ছি। বেশি দূরে নয়, বাইপাশের ধারেই একটা হোটেলে। সব স্টাফরা থাকবে। আপনি আসবেন কিন্তু অবশ্যই"
"মাফ করবেন মিঃ দত্ত, আমি একটা কেস নিয়ে ভিশন পাজেল্ট হয়ে আছি, সেই কেসের ব্যাপারেই আমাকে একটু বাইরে যেতে হবে", মুচকি হেসে সনাতন আবার বলল, "আর একটা কথা ওটা মিটার নয় মিত্র হবে।"
"ওহ্ সিওর। পরের বার কিন্তু আসতেই হবে। এখন থেকে বলে রাখলাম"
"অবশ্যই যাবো। স্যার আমি তাহলে এখন উঠি?"
ডিআইজির কাছ থেকে সনাতন বিদায় নিল।

অফিসে বসে সনাতন সিগারেটের পর সিগারেট খেয়ে যাচ্ছে কিন্তু মাথায় কিছুই ঢুকছে না, একটা জায়গায় থেকে শুরু করেছিল কিন্তু তাও নিষ্ফলা হয়েছে। এমালিয়ার যাত্রা পথের সিসি টিভি ফুটেজ থেকে তেমন কিছুই পাওয়া যায় নি, এমন কি মোবাইল নম্বরের কল হিস্ট্রি বা টাওয়ার লোকেশন থেকেও কোনো সাহায্য পাওয়া যায় নি। এখন কোথা থেকে কি সুত্র পাওয়া যায়! এদিকে ব্যক্তিগত ও ডিপার্টমেন্টাল বিভিন্ন সোর্স থেকেও কোনো লিড পাওয়া যাচ্ছে না। ঠিক সেই সময় মাথায় এলো সোসাল মিডিয়ার কথা। হ্যাঁ এখান থেকেই আবার শুরু করতে হবে। ল্যান্ড ফোনের রিসিভারটা টেনে নিয়ে সনাতন কয়েকটা নম্বর টিপে ডায়াল করল, ফোনের ওপার থেকে সাড়া পেতেই "সতীশকে পাঠিয়ে দিন" বলে ফোনটা রেখে দিল। সতীশ, অর্থাৎ ইন্সপেক্টর সতীশ দাস, কালো করে পেশিবহুল শরীর। সাইবার অপরাধ শাখার অত্যন্ত দক্ষ অফিসার। সাইবার দুনিয়ায় সমস্ত খুঁটিনাটি তার নখদর্পণে।
"মে আই কামিন স্যার?" দরজায় টোকা দিয়ে সতীশ ভিতরে আসার অনুমতি চাইল।
"এসো সতীশ। একটা ভিষন ইম্পর্টেন্ট কাজ আছে।" এমালিয়া মার্টিনের যাবতীয় তথ্য সতীশকে দিয়ে সনাতন বলল, "এনার সমস্ত সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটের যাবতীয় এক্টিভিটির তথ্য, চ্যাট হিস্ট্রি সব আমার চাই। ইমিডিয়েট।"
"ওকে স্যার। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি সমস্ত ডিটেলস আপনাকে দিচ্ছি" বলে সতীশ বেরিয়ে গেল।

দুপুরের খাবারটাও সনাতন মনে দিয়ে খেতে পারল না। এতো দুর্জ্ঞেয় তাকে আগে কোনো কেসে হতে হয় নি। চেয়ারের বসে যখন সনাতন নিজের মনেই সুত্র হাতরাচ্ছে তখনই অভির আবির্ভাব হলো।
"স্যার, আপনার কথামতো সব তথ্য নিয়ে চলে এসেছি। কিন্তু সমস্যা হলো প্রতিটা ক্ষেত্রেই পুলিশ ক্লুলেস।"
"খুনগুলো কি ভাবে হয়েছে?" সনাতনকে এখন আরও চিন্তিত লাগছে।
"স্যার সেম টু সেম। একইভাবে প্রথমে ব্রেইস্ট দুটো কাটা হয়েছে তারপর মুখটা থেঁতলে থেঁতলে ব্রুটেলি খুন করা হয়েছে।"
"ইজ এনি অফ দেম রেপড?" সনাতন জিজ্ঞাসা করলে অভি মাথা নেড়ে জানাল না তাদংর কেউ ধর্ষিতা নয়।
"প্রত্যেকেই কি বিদেশি?"
"হ্যাঁ স্যার, প্রত্যেকেই বিদেশি এবং কেউ কিন্তু একই দেশের নয়, আলাদা আলাদা দেশের। তারা রাশিয়া, ইংল্যান্ড, ইজিপ্ট ও ভেনেজুয়েলার মহিলা।
"হুম। আমার ধারনা খুনি এক জনই, না হলে এতোটা মিল হয় না।" কিছুক্ষণ চুপ থেকে সনাতন বলল, "জানো অভি লালবাজারের ইতিহাস নিয়ে পড়তে গিয়ে আমি একটা ঘটনা পড়েছিলাম, একেবারে একই রকম ভাবে একটি দশ বছরের শিশু তার মাকে হত্যা করেছিল। ঘটনাটা ১৯৭১ সালের। যদিও শিশুটির বাবা শুরুতে সব দোষ নিজের কাঁধে নিয়ে নেয় কিন্তু তদন্তে আসল ঘটনা বেরিয়ে আসে।"
এই ঘটনা শুনে অভি যেন আকাশ থেকে পড়ল, "স্ট্রেঞ্জ! একটা শিশু কিভাবে তার মাকে এইরকম নৃশংসভাবে হত্যা করতে পারে তা আমার মাথাতেই ঢুকছে না স্যার!"
"সে সব বড়লোকের কেচ্ছা। শিশুটির বাবা বড় ব্যবসায়ী, নাম অপরেশ সরকার। শিশুটির নাম ছিল সমরেশ। অপরেশবাবুর স্ত্রী ছিলেন মডেল। শরীরের গঠন নষ্ট হয়ে যাবে এই আশংকায় তিনি তাঁর ছেলেকে স্তন দিতেন না। ইন ফ্যাক্ট তিনি তো বাচ্ছাটিকে জন্ম দিতেই চান নি। শিশুটির উপর নানাভাবে অত্যাচারও করতেন। ধীরে ধীরে শিশুটি মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পরে আর তারই ফল এই হত্যাকাণ্ড।"
"তারপর বাচ্ছাটার কি হলো?"
"শুনেছি বিচারে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে জুভেনাইল হোমে পাঠানো হয়েছিল, তারপর আর জানি না।"
"স্যার, আর একটা ইনফরমেশন আছে, ঈশাবেল্লা রডরিগেজের মোবাইলটা পাওয়া যায় নি
রাত আটটা বেজে গেছে। সনাতন অফিসে করিডোরে পায়চারি করছে। কপালে চিন্তার ভাঁজ। এমন সময় সতীশ এলো। ওকে খুব নিরাশ দেখাচ্ছে। সে এসে সনাতনকে জানাল যে এমালিয়ার একমাত্র ফেসবুক ছাড়া আর অন্য কোনো সোশাল সাইটে কোন একাউন্ট নেই এবং ফেসবুকের একাউন্টটাও প্রায় ইনএক্টিভ।
নিরাশ সনাতন অভিকে খুন হওয়া বাকি চার মহিলার তথ্য সতীশকে দিতে বলে তাদের তথ্য বের করার নির্দেশ দিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে গেল।

রাত তখন দশটা বাজে। কয়েক পুরুষ আগেকার দম দেওয়া দেওয়াল ঘড়িটা দশটা ঘণ্টা পিটিয়ে তার জানান দিল। আজ সনাতন আর নিজের বাড়ি যায় নি, অভির বাড়িতেই থেকে গেছে যদি দুজনের আলোচনায় কোনো সুত্র বেরিয়ে আসে এই আশায়। অভি আজ তার স্পেশাল মটন রেজালা রান্না করছে। সনাতন গলায় দু'পাত্র রাম ঢেলে ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে দিয়েছে তার মুখমণ্ডলের চোখদুটো খোলা থাকলেও মনের চোখ বন্ধ। চিন্তা তার মনের চোখের উপর পর্দা ফেলে দিয়েছে। তার কাছে সবই মরীচিকা মনে হচ্ছে। মরুভূমিতে তৃষ্ণার্ত পথিক যেমন মরীচিকার দিকে ছুটে যায় সনাতনও একই ভাবে ছুটে গিয়েছিল কিন্তু প্রতিটা ক্ষেত্রেই তাকে নিরাশ হতে হয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে মোবাইলটা বেজে উঠল। উঠে গিয়ে মোবাইলের পর্দায় দেখল সতীশের নাম ভেসে উঠেছে। তবে কি ও কোনো ক্লু পেল? মনে আবার একটা আশা জাগল। ফোন ধরতেই ওপার থেকে সতীশের উৎসাহি আওয়াজ ভেসে এলো। সে সনাতনকে জানাল যে এমালিয়া মার্টিনের 'ওয়ান্না ডেট ইউ ডট কম' নামের একটা ডেটিং ওয়েবসাইটে একাউন্ট আছে এবং তার মাধ্যমে ইদানীং পিটার ডিকোস্টা নামের একজনের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল আর তাদের চ্যাট হিস্ট্রি থেকে জানা যাচ্ছে যে তারা গত পাঁচ তারিখ দেখা করার পরিকল্পনা করেছিল। এই কথা শুনে সে যে ধরে প্রাণ পেল। এটা একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুত্র আর এই সুত্র ধরেই এই কেসের জট খুলবে বলে তার আশা। সন্তু সতীশকে নির্দেশ দিল যাতে সে বাকী ভিক্টিমদেরও ওই ওয়েবসাইটে একাউন্ট আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে আর থাকলে পিটারের সাথে তাদের যোগাযোগ আছে কিনা দেখতে বলল।
খাবার টেবিলে অভি লক্ষ্য করল সনাতনের মধ্যে সেই অন্যমনস্কতাটা আর নেই। খাওয়ার শেষে হাত মুখ ধুয়ে সনাতন একটা সিগারেট ধরাল। সিগারেট খেতে খেতে সে অভির রান্নার খুব প্রসাংশাও করল। অভি কাছে সনাতনের এই পরিবর্তন একটু আশ্চর্যের ঠেকছিল। মুচকি হেসে অভি বলল, "স্যার, পেটে দু'পাত্র পরতে না পরতেই দেখছি সব টেনশন হাওয়া!"
"হা-হা-হা" সনাতনের অট্টহাসিতে যেন ৬ রিক্টারস্কেলের ভূমিকম্প এলো। তারপর বলল, "অভি, এটা পেটে দু'পাত্র যাওয়ার এফেক্ট নয়, এটা কানে দু'শব্দ যাওয়ার এফেক্ট।" অভি এর অর্থ কিছু বুঝতে পারল না শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তখন সনাতন সতীশের সাথে তার কথোপকথন সংক্ষেপে অভিকে বলল। সতিনের দেওয়া এই তথ্য অভিকেও খুব উৎসাহিত করল।
বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর সনাতন অভিকে খুন হওয়া মহিলাদের নাম পরপর বলতে বললে অভি একটা কাগজ নামগুলো বলতে লাগল
১লা জুলাই বিহারের সমস্তিপুরে খুন হয় একাটেরিনা লিয়াডোভা, এরপর ১৯শে আগস্ট ওড়িষ্যার চাঁদপুরে নেল্লি সালাভি, তারপর ২৪শে সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রদেশের রাভাতে ঈশাবেল্লা রডরিগেজ, ১৯শে অক্টোবর ঝাড়খণ্ডের রামগড়ে এলেক্স কেলি আর সব শেষ ৪ঠা নভেম্বর এমালিয়া মার্টিন।"
প্রায় অর্ধেক রাত পর্যন্ত চিন্তা করেও সনাতন এই নামগুলো থেকে কোনো সুত্র খুঁজে বের করতে পারল না। এরই মাঝে কখন যেন নিজের অজান্তেই সে ঘুমের দেশে পারি দিল।

সকাল থেকে অফিসে বসে সনাতন আর অভিরূপ খুন হওয়া মহিলাদের নাম গুলো থেকে সুত্র বের করার চেষ্টা করে যাচ্ছে যদিও তারা এখনো নিশ্চিত নয় যে এই সব কটা ঘটনার ক্ষেত্রেই চক্রান্তকারী এক জনই। দুপুর গড়িয়ে গেল কিন্তু কোনো সুত্র পাওয়া গেল না। এমন সময় সতীশ এসে হাজির হলো। সতীশকে দেখে সনাতন এমনই অভিব্যক্তি প্রকাশ করল যেন সে তার অপেক্ষাতেই ছিল।
"এসো এসো সতীশ, বোসো" সনাতন তার টেবিলের সামনে রাখা চেয়ারে সতীশকে বসতে বলল।
সতীশ কিছু বলার জন্য যেন খুব উদ্গ্রীব, চেয়ারের বসেই সঙ্গে সঙ্গে বলতে শুরু করল, "স্যার ইন্টারেস্টিং ইনফরমেশন আছে।"
"তাড়াতাড়ি বলো। তোমার ইনফরমেশনের উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।"
"স্যার খুন হওয়া প্রত্যেক মহিলারই 'ওয়ান্না ডেট ইউ ডট কম'-এ একাউন্ট ছিল এবং এমালিয়ার সাথে পিটার ডিকোস্টাকে যেমন পাওয়া গেছে তেমনি বাকি মহিলাদের ক্ষেত্রেও কাউকে না কাউকে পাওয়া গেছে। তবে প্রত্যেকের আলাদা পরিচয়।"
"তবে কি একজন নয়? এর পিছনে কি কোনো গ্যাং কাজ করছে?" সতীশের কথার মাঝেই অভি জিজ্ঞাসা করল। সনাতন বিরক্ত হয়ে বলল, "আঃ অভি! সতীশকে শেষ করতে দাও। বলো সতীশ।"
"স্যার ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটা হলো ওদের পরিচয় আলাদা হলেও একই আইপি এড্রেস থেকে একাউন্টগুলো অপারেট হয়েছে, আর তা হয়েছে আন্দামান থেকে।"
"ওকে সতীশ, অনেক ধন্যবাদ, এখন তুমি আসতে পারো, প্রয়োজনে তোমাকে আমি ডেকে নেব।" সতীশকে বিদায় দিয়ে অভিরূপকে সনাতন বলল যে তার বিশ্বাস এটা একই জনের কাজ। নাম পাল্টে একজনই এই একাউন্টগুলো অপারেট করছে এবং সেক্ষেত্রে এই পিটার নামের একাউন্টটাও ভুয়ো।

সনাতনের হাতে এই কেস আসার পর এক সপ্তাহ কেটে গেছে। ছয় তারিখে ডিআইজি এই কেসের ফাইল সনাতনের হাতে তুলে দিয়েছিল আর আজ তেরো তারিখ। হটাৎই সনাতনের চোখ চলে গেল টেবিলের উপর রাখা একটা কাগজের উপর যাতে অভি মৃতদের নামের সাথে তাদের দেশের নাম লেখা আছে।
"অভি দেশের নামগুলো পরপর বলো তো" অভিরূপকে নির্দেশ দিয়ে সনাতন চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিল।
অভি দেশের নামগুলো পরপর বলল-
রাশিয়া
ইজিপ্ট
ভেনেজুয়েলা
ইংল্যান্ড এবং
নিউজিল্যান্ড
চোখ বন্ধ করেই সনাতন নামগুলো মনে মনে কয়েকবার আওড়াল তারপর হটাৎ করে ঝেরেমেরে উঠে বসে অভিরূপকে দেশগুলোর ইংরেজি নামের প্রথম অক্ষরগুলো লিখতে বলল। অভি একটা কাগজে লিখল আর-ই-ভি-ই-এন।
"একজ্যাক্টলি, এর সাথে যদি তুমি 'জি' এবং 'ই' যোগ করো তা হলে হয়ে যায় 'রিভেঞ্জ' অর্থাৎ 'প্রতিশোধ', অভি গিঁট খুলতে শুরু করেছে।"
অভিরূপকে এখন আরও উৎসাহি দেখাচ্ছে, ওর গায়ে কাঁটা দিয়েছে, সে বলল, "স্যার তাহলে নিশ্চয়ই খুনের তারিখগুলোও একটার সাথে আরেকটা জড়িত। সেই সুত্রটা খুঁজে বের করতে পারলে পরের ঘটনাটা হয়তো আটকাতে পারব।"
"একদম ঠিক বলেছ অভি। একটা কাগজে পরপর তারিখগুলো লিখে ফেল তো।"
টেবিলের একপাশে রাখা প্রিন্টার থেকে অভিরূপ একটা কাগজ বের করে তারিখ গুলো লিখে সনাতনের দিকে এগিয়ে দিল। সনাতন তারিখগুলো মন দিয়ে দেখতে লাগল-
১লা জুলাই
১৯শে আগস্ট
২৪শে সেপ্টেম্বর
১৯শে অক্টোবর
৪ঠা নভেম্বর
"কিন্তু স্যার, একটা তারিখগুলোর মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। এমনও নয় যে এগুলো কোনো বিশেষ দিন" অভি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে বলল।
"তোমার কাছে এই তারিখগুলোর কোনো ইম্পর্টেন্স না থাকলেও খুনির কাছে থাকতেই পারে।" সনাতন উপরের দিকে মুখ করে একটু অন্যমনস্ক ভাবে কথাগুলো বলল।
কিন্তু স্যার তার আছে এই তারিখের কি গুরুত্ব সেটা আমরা জানব কি করে?"
"সেটা না জানলেও কিছু তো একটা সুত্র পাবই। আচ্ছা অভি তুমি কোনো কম্পিটিটিভ এক্সাম দিয়েছে?"
"কি যে বলেন স্যার, না দিলে আমি আইপিএস হলাম কি করে?" লাজুক মুখে অভি জবাব দিল
"ঠিক ঠিক, এই সব কেসের চাপে আমার মাথাটা গেছে একেবারে। এই ধরনের পরীক্ষায় কিছু জেনারেল ইনটেলিজেন্সের প্রশ্ন থাকে না, কিছু সংখ্যা পরপর দেওয়ার পর বলা হয় এই সিরিজের পরবর্তী সংখ্যা কি?"
"হ্যাঁ স্যার, কিন্তু এই ঘটনার সাথে তার সম্পর্ক কি?"
একটু চিন্তা করেই ইউরেকা বলে সনাতন চেঁচিয়ে উঠল, "অভি দেখো ১লা জুলাই আর ১৯শে আগস্টের মধ্যে গ্যাপ ৪৯ দিনের, ১৯শে আগস্ট আর ২৪শে সেপ্টেম্বরের মধ্যে গ্যাপ ৩৬ দিনের,২৪শে সেপ্টেম্বর আর ১৯শে অক্টোবরের মধ্যে গ্যাপ ২৫ দিনের এবং ১৯শে অক্টোবর আর ৪ঠা নভেম্বরের মধ্যে গ্যাপ ১৬ দিনের। কিছু বুঝলে অভি?
"স্যার মানে ৭, ৬, ৫ আর চারের স্কয়ার?"
"একদম তাই" এই বলেই "ও শিঠ" বলে চেঁচিয়ে উঠল। অভিরূপ কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করলে সনাতন বলল যে এই সুত্র অনুযায়ী পরের গ্যাপ হয় ৯ দিনের আর আজই আর একটা খুন হবে।
"অভি এটা জানা সত্ত্বেও আমাদের হাতে এমন কোন তথ্য নেই যে আমরা এই খুনটা আটকাতে পারি।"
কথা শেষ হতে না হতেই সনাতন টেবিলের উপর হাত দিয়ে মেরে আফসোসের সুরে আবার "শিট" বলে দুবার চেঁচিয়ে উঠল আর তারপরই চেয়ার ছেড়ে উঠে অভিকে বলল, "ওঠো, এখুনি বেরোতে হবে।"
অভিও বলা মাত্রই উঠে পড়ল। দু'জনে প্রায় ঝড়ের বেগে অফিস থেকে বেরিয়ে গেল। গাড়িতে ওঠার আগে অভি সনাতনের কাছে জানতে চাইল যে তারা কোথায় যাচ্ছে। জবাবে সনাতন বলল, "তোমার কে সি দাসের মিষ্টির দোকানে"
"মানে?" অভিরূপ অবাক হলো
"আরে বাবা সেদিন ঐ মিষ্টির দোকানে সিসি টিভি ক্যামেরা লাগানো আছে দেখলে না? আমি নিশ্চিত ওখানে থেকে কিছু না কিছু পাওয়া যাবেই।"

মিষ্টির দোকানে পৌঁছে অভি নিজেদের পরিচয় দিতে ক্যাশে বসে থাকা মালিক আর দুজন কর্মচারী শশব্যস্ত হয়ে পড়ল। এক কর্মচারীকে দুটো চা দিতে বলে মালিক কাউন্টার থেকে বেরিয়ে এসে বিনয়ী হয়ে অভিরূপকে জিজ্ঞাসা করল-
"স্যার, আপনাদের কি হেল্প করতে পারি?"
"আপনার দোকানের বাইরে যে সিসি টিভি ক্যামেরাটা আছে আমরা তার ফুটেজ দেখতে চাই" অভি জবাব দিতেই "নিশ্চয়ই স্যার" বলে দোকানের মালিক ক্যাশ কাউন্টারের কম্পিউটারটা তাদের দিকে ঘুরিয়ে দিল। তারা দুজনে নির্দিষ্ট সময়ের ফুটেজ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখল। গাড়িটার একটা অংশ দেখা যাচ্ছে। সাদা রঙের বড় কোনো বিদেশি গাড়ি যেটা কলকাতার দিক থেকে এসে দাঁড়ালো, কিছুক্ষণ পর চলে গেল। চলে যাবার সময় পিছনের নম্বর প্লেটের ডান দিকের অংশটা আবছা দেখা যায় যাতে উপরে ইংরেজি 'এক্স' অক্ষর আর নিচে ৭৬ দেখা গেল।
সনাতন বলল, "কলকাতা থেকে এখানে আসতে হলে হয় বালি ব্রিজ পেরিয়ে আসতে হবে অথবা সেকেন্ড হুগলি ব্রিজ পেরিয়ে সাঁতরাগাছি হয়ে আসতে হবে। কিন্তু গাড়িতে লাশ নিয়ে কেউ নিশ্চয়ই টোল প্লাজা পেরিয়ে আসতে চাইবে না। সেক্ষেত্রে এও নিশ্চয়ই বিদ্যাসাগর সেতু বা নিবেদিতা সেতু পেরিয়ে আসে নি। এসেছে বিবেকানন্দ সেতু অর্থাৎ পুরনো বালি ব্রিজ পেরিয়ে।" এর পরেই অভির দিকে তাকিয়ে বলল, "অভি তুমি ওয়ারলেসে এখুনি ইনফরম করে দাও বিবেকানন্দ সেতুর আশেপাশের সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করতে আর এই গাড়ির তথ্যগুলো দিয়ে দাও। গাড়িটা বিবেকানন্দ সেতু দিয়েই এসেছিল, আই এম কোয়াইট সিওর এবাউট দ্যাট।"
অফিসে ফেরার পথেই যাবতীয় তথ্য হাতে চলে এলো। সাদা রঙের ফর্চুনার গাড়ি, নম্বর ডব্লিউবি ০২ এক্স ৯৮৭৬, গাড়ির মালিকের নাম মৃণাল দত্ত। নামটা শুনেই সনাতন চমকে উঠে জানতে চাইল ওটা ব্যবসায়ী মৃণাল দত্ত কিনা। অভি জানিয়ে বলল "তবে স্যার উনি ঘটনার দুদিন আগে এই গাড়িটার চুরি যাওয়ার রিপোর্ট লিখিয়েছিলেন"
"অভি তবে চলো অফিসে না গিয়ে সোজা মৃণালবাবুর সাথেই দেখা করা যাক।"

মৃণাল দত্তর অফিসে গিয়ে রিসেপশনে সনাতন আর অভিরূপ নিজেদের পরিচয় দিয়ে জানাল যে তারা মৃণাল দত্তর সাথে দেখা করতে এসেছে। রিসেপশনে বসা বছর চব্বিশের মেয়েটা ইন্টারকামে কারোর সাথে কথা বলল তারপর দুজনকে দুটো গলায় ঝোলানো ভিজিটরস্ কার্ড দিয়ে পাঁচ তলায় যেতে বলল।
অফিসের টপ ফ্লোরে মৃণাল দত্তর কেবিনের পরিবেশটা খুব মনোরম। বড় কেবিনের একদিকে সোফা আর টি টেবিল পাতা। অন্য দিকে বিরাট টেবিল যার এক প্রান্তে মৃণালের চেয়ার আর অপর প্রান্তে পরপর চারটে চেয়ার পাতা। কেবিনের উত্তর দিকে দেওয়াল সমান কাঁচের জানালা দিয়ে সবুজ ময়দান দেখা যাচ্ছে আর একদিকে প্রবহমান শান্ত গঙ্গার মনোরম দৃশ্য।
সনাতন আর অভিরূপ কেবিনে ঢুকতেই মৃণাল চেয়ারের ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল, "আরে আমার কি সৌভাগ্য! এতো মেঘ না চাইতেই জল! আসুন আসুন।"
সনাতন দেখল ভিতরে মৃণালের সমবয়সী আর একজন বসে আছে।
"আসুন পরিচয় করিয়ে দিই" সামনে বসা ব্যক্তির দিকে ইশারা করে বললেন ইনি আমার বিজনেস পার্টনার ধ্রুবজ্যোতি ধারা। বেশিক্যালি আমেরিকার নাগরিক তবে বেশিরভাগ সময় ভারতেই থাকেন। আমার মামার সময় থেকেই আমাদের সাথে আছেন। একেবারেই আমার ভাইয়ের মতো। আর ধ্রুব, ইনি হলেন বিখ্যাত গোয়েন্দা সনাতন মিত্র আর উনি অভিরূপ চট্টপাধ্যায়।
ধ্রুব উঠে দাঁড়িয়ে সনাতনের সঙ্গে হাত মেলাল তারপর বলল, "আপনার সাথে আলাপ হয়ে ভালো লাগল তবে আমাকে একটা বিশেষ কাজে এখুনি বেরোতে হবে। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড।"
ধ্রুবজ্যোতি বেরিয়ে যেতেই সনাতন আর অভিরূপ চেয়ারে বসল। মৃণাল ইন্টারকামে কফি অর্ডার করে বলল, "বলুন ইনসপেক্টর"
"মিঃ দত্ত, আপনার কি কোনো গাড়ি চুরি হয়েছে?"
"হ্যাঁ। সাদা রঙের ফর্চুনার। গাড়ির নম্বর ডব্লিউবি ০২ এক্স ৯৮৭৬।" মৃণাল জবাব দিয়েই একটু আশ্চর্যের সাথে আবার বললেন, "কি ব্যাপার, বলুন তো? আপনার মতো বড়মাপের গোয়েন্দা অফিসার নিশ্চয়ই একটা গাড়ি চুরির তদন্ত করবে না।"
"ঠিকই ধরেছেন। আমি একটা খুনের তদন্ত করছি আর আপনার ঐ গাড়িতে গত পাঁচ তারিখ রাতে একটা লাশ পাচার হয়েছে।"
এরই মধ্যে বেয়ারা কফি নিয়ে ঢুকল। দু কাপ কফি দুজনকে পরিবেশন করে বেয়ারা অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে গেল।
বেয়ারা বেরিয়ে যেতেই সনাতন ঘটনাটা মোটামুটি বলল। মৃণাল গম্ভীর হয়ে শুনছিল, সনাতনের কথা শেষ হতেই মৃণাল বলল, "অফিসার, আপনি কি আমাকে কোনো ভাবে সন্দেহ করছেন?"
সনাতন মুচকি হেসে বলল, "দেখুন মিঃ দত্ত একজন গোয়েন্দাগিরি মূলধনই হলো সন্দেহ। তাই সন্দেহ করতে ভুলে গেলে তো গোয়েন্দাগিরিও ভুলে যাব। যাই হোক আপনার কাছে এ ব্যাপারে কোনো তথ্য থাকলে আমাকে জানাবেন। আজ চলি, আবার দেখা হবে" এই বলে সনাতন আর অভিরূপ চলে গেল।

অফিসে যখন সনাতনরা পৌঁছাল তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে এসেছে। সনাতন কে খুব ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত লাগছিল। না পরিশ্রমের ক্লান্তি নয়, এটা পরাজয়ের ক্লান্তি। সারাদিন হন্যে হয়ে ঘুরেও এমন কোন সুত্র সে জোগাড় করতে পারে নি যা দিয়ে আজকের খুনটা আটকাতে পারবে। কেবিনে ঢুকে চেয়ারের উপর ধপ করে বসে পরল। টেবিলের উপর হাতের কনুই দিয়ে ভর দিয়ে হাতের উপর মাথাটা নিচু করে রাখল তারপর মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, "অভি আমি পারলাম না, আজকের খুনটা কিছুতেই আটকাতে পারলাম না।"
এরই মধ্যে সেখানে সতীশ এসে জানাল ঈশাবেল্লা রডরিগেজের মোবাইল ফোনটা ট্রাক করা গেছে, তারপর একটা কাগজে লেখা ঠিকানাটা দিয়ে চলে গেল। সনাতন কাগজে লেখা ঠিকানাটা দেখে অভিকে বলল, "অভি এখানে যে এলাকার কথা বলা হয়েছে সেখানেই তো মিঃ দত্তর বাড়ি। কেন জানি আমার বারবার মনে হচ্ছে এই কেসে মিঃ দত্ত জারিত। আবার দেখো এই ভুয়ো একাউন্টগুলো অপারেটর হচ্ছে আন্দামান থেকে আর মিঃ দত্তর বিজনেসের একটা বড় ইউনিট আন্দামানে আছে। প্রতিটা সুত্রই ওনার দিকে ইঙ্গিত করছে" এই বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে পরল।
"চলো আজ ওঠা যাক, কাল আবার একটা মৃত্যু খবর শোনার জন্য তৈরী থাকো।"

পরের দিন সকালে অফিসে পৌঁছাতেই অভি সনাতনকে জানাল যে মৃণাল দত্তর ব্যাপারে ঠিকুজি কুষ্ঠী জোগার হয়ে গেছে। সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় হলো মৃণাল দত্ত হচ্ছে ব্যবসায়ী অপরেশ সরকারের ভাগ্নে যার স্ত্রী ১৯৭১ সালে তারই দশ বছরের ছেলের হাতে এই একই পদ্ধতিতে নৃশংসভাবে খুন হয়। এই খবর শুনে সনাতন চমকে উঠল। তারপর একটু চিন্তা করে বলল, "অভি এমনও তো হতে পারে যে মৃণাল দত্তই সমরেশ সরকার, অর্থাৎ যাকে আমরা ভাগ্নে ভাবছি সে আদতে ছেলে?"
"কি বলছেন স্যার!" অভি রীতিমতো স্তম্ভিত
"অভি তুমি এক কাজ করো মৃণালবাবু পিছনে সাদা পোশাকের পুলিশ লাগাতার, ওনার প্রতিটা মুভমেন্টের খবর আমার চাই। আমাকে একটু বেরোচ্ছি হেডকোয়ার্টারের মহাফেজখানা ঐ কেসের ফাইল বের করে একটু স্টাডি করব।"
দুপুরে অভি সনাতনকে ফোন করে জানাল যে রিভেঞ্জের 'জি' পাওয়া গেছে। শিলিগুড়ির কাছে মাটিগাড়া অঞ্চলে এক পরিত্যক্ত চা বাগান থেকে ঘানার নাগরিক এক মহিলার মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে, নাম জ্যানেট আইয়েম। তাকেও একইভাবে স্তন কেটে মুখ থেঁতলে খুন করা হয়েছে।

আজকে সতেরো তারিখ। হিসেব মতো শেষ খুনটা আজকে হওয়ার কথা। কারন ৪৯, ৩৬, ২৫, ১৬, ৯ এই পংক্তিতে এর পরের সংখ্যা ৪ হয়, অর্থাৎ ২এর স্কয়ার। তা সত্ত্বেও সনাতনের মেজাজ আজ ফুরফুরে। অভি লক্ষ্য করল আজ সনাতন হাবভাব এমন যেন কেস সলভ হয়ে গেছে, খুনিও ধরা পরেছে। সনাতনকে এতোটা নিশ্চিন্তে বসে থাকতে গত কয়েকদিন অভি দেখে নি।
"স্যার, আজ সতেরো তারিখ"
"হুম, তো?" সনাতনের গোঁফের কোলে মুচকি হাসির ঝলক
"স্যার, হিসেব মতো আজ আর একটা খুন হওয়ার কথা!"
"হবে না। তার আগেই খুনি ধরা পরে যাবে। তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারো।"
ঠিক সেই সময় সনাতনের ফোনে একটা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ এলো। মেসেজটা দেখেই সনাতন মুচকি হেসে টেবিলে রাখা ল্যান্ড ফোনের রিসিভারটা তুলে নিয়ে তাতে কয়েকটা নম্বর টিপে ডায়াল করল।
"হ্যালো, স্যার, আমি সনাতন বলছি"
"কেস প্রায় সলভ হওয়ার পথে, আজই খুনি ধরা পরবেই।"
"আমার একটা ফেবার লাগবে"
"মিঃ মৃণাল দত্তর বাড়ির সার্চ ওয়ারেন্ট চাই"
"স্যার আমার উপর বিশ্বাস রাখুন, আপনার চাকরি নিয়ে কোনোরকম টানাটানি হবে না। প্লিজ স্যার।"
"থ্যাংক ইউ। থ্যাংক ইউ সোমাচ স্যার।"
ফোনের ওপারে কথা শোনা না গেলেও সনাতনের কথা শুনে অভি বুঝতে পারল যে সে ডিআইজিকে ফোন করেছে।
ফোন রেখেই সনাতন বলল, "অভি ইমিডিয়েট দশ-বারো জনের একটা টিম রেডি করো। রেইড করতে হবে। আর হ্যাঁ, সতীশকেও সঙ্গে নিয়ে নিও।"

সনাতন তার দল নিয়ে যখন মৃণাল দত্তর বাড়ি পৌঁছল তখন মৃণাল অফিসের জন্য তৈরী হচ্ছে। সনাতনকে ফোর্স সহ ঢুকতে দেখে মৃণাল অবাক হয়ে গেল, রাগে ভিতরে ভিতরে ফুঁসলেও বাইরে তা প্রকাশ না করে সনাতন কে তির্যক ভাবে জিজ্ঞাসা করল, "কি ব্যাপার অফিসার? ফোর্স নিয়ে কি আমাকে গ্রেফতার করতে এসেছেন নাকি?"
"না। আপাতত আপনার বাড়ি সার্চ করতে এসেছি। সন্দেহজনক কিছু পেলে তখন না হয় গ্রেফতার করব", অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে সনাতন জবাব দিল।
"সার্চ ওয়ারেন্ট আছে?"
"আপনার মতো একজন এতো বড় ব্যবসায়ী যার বড় বড় নেতা মন্ত্রীদের সাথে ওঠা বসা তার বাড়ি কি বিনা ওয়ারেন্টে সার্চ করতে যেতে পারি?" এই বলে সনাতন ওয়ারেন্টের কপিটা মৃণালের দিকে এগিয়ে দিল।
কাগজটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে মৃণাল তল্লাশি শুরু করার জন্য ইঙ্গিত করে সোফায় বলে পরল।
প্রায় ঘন্টাখানেক তল্লাশি চালানোর পর অভি হন্তদন্ত হয়ে এসে বলল ছাদের চিলেকোঠার ঘর থেকে একটা মোবাইল উদ্ধার হয়েছে যা ঈশাবেল্লার খোয়া যাওয়া মোবাইলটার বর্ণনার সাথে হুবহু মিলে যাচ্ছে।
মোবাইলটা নিয়ে সনাতন একবার এদিক ওদিক ঘুরিয়ে দেখে সতীশের দিকে এগিয়ে দিয়ে তাকে নির্দেশ দিল যে এটা ঈশাবেল্লার মোবাইল কিনা তা নিশ্চিত করতে। সতীশ তার সাথে থাকা একটা পোর্টেবল মেশিন দিয়ে পরীক্ষা করে জানাল যে আইএমইআই নম্বর মিলে যাচ্ছে, অর্থাৎ এটা ঈশাবেল্লারই মোবাইল।
এটা শুনেই সনাতন মৃণালের দিকে তাকিয়ে বলল "আপনাকে গ্রেফতার করার মতো যথেষ্ট এভিডেন্স পেয়েগেছি মিঃ দত্ত। ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।"

মৃণালের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সনাতন মৃণালকে হেডকোয়ার্টারে নিয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় আইনি আনুষ্ঠানিকতাগুলো সেরে ফেলার জন্য সতীশকে নির্দেশ দিয়ে অভি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। গাড়ি সনাতন নিজে চালাচ্ছিল। গাড়িতে যেতে যেতে অভি নিশ্চিন্ত সনাতনকে বলল-
"অবশেষে খুনি ধরা পড়ল। স্যার এখন বেশ হালকা লাগছে।"
সনাতন চুপ করে থাকল, কোনো উত্তর দিল না।
"মৃণালবাবুর মতো একজন সাদাসিধে নিরীহ দেখতে মানুষের মধ্যে যে এইরকম একজন কুখ্যাত খুনি লুকিয়ে ছি তা আমি চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না", কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর অভি আবার বলল। সনাতন এখনো চুপ। তাকে এইরকম চুপচাপ থাকতে দেখে অভি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল, স্যার এতো বড় একটা কেস সলভ করলেন, এর পরেও এরকম নিরুত্তাপ কেন আপনি?"
"তোমরা কি মনে হয়, কেস সলভড?"
"খুনিই ধরা পরে গেছে যখন তখন নিশ্চয়ই কেস সলভ।"
"মৃণালবাবুকে খুনি প্রমান করার মতো যথেষ্ট প্রমান তোমার হাতে আছে?"
সনাতনের এই প্রশ্নের কোনো উত্তর অভিরূপের কাছে নেই তাই সে ফ্যালফ্যাল করে সনাতনের দিকে তাকিয়ে রইল।
"গল্প এখনো বাকি আছে। গল্পে আসল মোচড় খুব তাড়াতাড়ি দেখতে পাবে।"

বিকেল প্রায় সারে পাঁচটা বাজে। নভেম্বর মাস তাই এরই মধ্যে সূর্য অস্ত গেছে, অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। শহরতলির এই জায়গাটা একটু নির্জন। দেখে কেউ এটাকে কলকাতা বলে বিশ্বাস করবে না। একসময় এখানে ঘন জঙ্গল ছিল, এই এলাকাটা সমাজবিরোধীদের স্বর্গরাজ্য ছিল। এখন চারিদিকে ছোটবড় আবাসন, বাংলো ইত্যাদি গড়ে উঠেছে। সেইসঙ্গে তৈরী হয়েছে শপিং কমপ্লেক্স, মল, স্কুল, হাসপাতাল, মাল্টিপ্লেক্স ইত্যাদি। তবুও একটু ভিতরের দিকে গেলে সেই নির্জনতাটা থেকেই গেছে।
একটা ফাঁকা বাস স্ট্যান্ডের সামনে এসে সনাতন গাড়িটাকে দাঁড় করালো। অভি বুঝতে পারল এখানে তারা দুজন ছাড়াও সাদা পোশাকের পুলিশ অনেকে আছে। গাড়ি থেকে নেমে সনাতন বলল যে এরপর তারা হেঁটে যাবে। কয়েক পা হাঁটতেই সনাতন অভিকে দেখাল যে একটা বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে এক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা নামছে, সনাতন বলল, "অভি এই হচ্ছে 'রিভেঞ্জ'-এর শেষ 'ই'। ঐ মহিলা ইথিওপিয়ান, নাম তেরুয়াঞ্চি গেব্রু। এখুনি, এখানেই এর খুন হওয়ার কথা"
অভি চমকে উঠে চাপা গলায় বলল, "কি বলছেন স্যার? তার মানে মৃণালবাবু খুনি নন? খুনি এখনো ধরা পরে নি?"
"যার বিরুদ্ধে তোমার কাছে কোনো প্রমানই তাকে কি করে তুমি খুনি বলতে পারো?" এই বলে সনাতন অভিকে ইশারায় চুপ করতে বলল।
সামনের বাড়িটাকে সাদা পোশাকের কয়েছেন পুলিশ ঘিরে রেখেছে। গেব্রু লোহার গেটটা খুলে ভিতরে ঢুকল সনাতন আর অভিরূপ পিছনের গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকল। চারিদিক অন্ধকার যেন কালো চাদর দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। তারা দুজন আড়ালে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে। সনাতন কোর্টের ভিতরের পকেট থেকে রিভলবার টা বের করে হাতে ধরল।
গেব্রু অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ডাকতে লাগল, "হ্যালো! ইজ দেয়ার এনিওয়ান? হ্যালো মিঃ এলেক্স, দিস ইজ গেব্রু। আর ইউ দেয়ার?" সে উত্তরের আসায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
এমন সময় সনাতন লক্ষ্য করল একটা ছায়া মূর্তি অন্ধকারের চাদর ভেদ করে হাতে একটা রড বা লাঠি জাতীয় কিছু নিয়ে ধীরে ধীরে গেব্রুর দিকে এগিয়ে আসছে। সনাতন অভিকে ইশারায় সেই ছায়া মূর্তিটা দেখাল। অভি ভিতরে ভিতরে প্রচন্ড উত্তেজিত। সনাতন রিভলবারটা শক্ত করে ধরল। হটাৎ সেই ছায়া মূর্তি হাতের রডটা দিয়ে পিছন থেকে গেব্রুর মাথায় আঘাত করতে যাবে এমন সময় সনাতন তার রিভলবার তাক করে সেই ছায়া মূর্তির হাতে গুলি করল, সঙ্গে সঙ্গে সে ছুটে পালাতে উদ্যত হলে কিছু সাদা পোশাকের পুলিশ তাকে ধরে ফেলল। এদিকে গুলির শব্দে গেব্রু ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল। সনাতন তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, "ডোন্ট ওরি মিস গেব্রু, ইউ আর সেফ নাও।"

তারা পুলিশ হেডকোয়ার্টারে যখন ফিরে এলো তখন প্রায় রাত ন'টা বাজে। ডিআইজির কেবিনে ঢুকতেই অভি মৃণালকে সেখানে বসে থাকতে দেখে অবাক হলো। সনাতনের দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টি নিয়ে তাকাতেই সনাতন তাকে সবুর করতে বলে চেয়ারে বসল।
মৃণাল সনাতনকে অভিনন্দন জানিয়ে জিজ্ঞাসা করল যে এতো কমপ্লিকেটেড কেস সনাতন কিভাবে সলভ করল। ডিআইজিও তার তদন্ত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে সনাতন এক গ্লাস জল খেয়ে বলতে শুরু করল-
"স্যার ঐ ডেটিং ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্যের সাহায্য আমারর আন্দামান থেকে আমরা একজনকে গ্রেফতার করি যে খুনির হয়ে ঐ ওয়েবসাইট অপারেট করত, বদলে একটা মাসোহারা পেত। তাকে জেরা করে আমারা জানতে পারি যে সে খুনিকে কখনো দেখেইনি। তাই আমরা ঠিক করি যে খুনিকে হাতে নাতে ধরতে হলে ওকে ওর কাজ করতে দিতে হবে। তার মাধ্যমেই ক্রমে জানতে পারি খুনির শেষ টার্গেট ইথিওপিয়ার নাগরিক এক মহিলা যাঁর নাম তেরুয়াঞ্চি গেব্রু। আমি নিজে ওনার সাথে দেখা করে ওনাকে কনফিডেন্সে নিই। তার পর তাঁর পিছনে সিকিউরিটির জন্য তিনজন সাদা পোশাকের পুলিশ লাগিয়ে দিই। এদিকে সাসপেক্টের উপরেও নজর রাখা চলতে থাকে।"
"কিন্তু যদি খুনিকে আগেই আইডেন্টিফাই করে থাকেন তবে আজ সকালে আমাকে কেন গ্রেফতার করলেন? খুনিকে আপনি আইডেন্টিফাই করলেনই বা কিভাবে আর আজ সকালে আমার বাড়ি থেকে যে মোবাইলটা উদ্ধার হলো সেটা?" মৃণাল উদ্গ্রীব হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
মুচকি হেসে সনাতন বলল, "মিঃ দত্ত আপনাকে অ্যারেস্ট করাটা ছিল একটা নাটক। আপনার বাড়ি থেকে মোবাইলটা উদ্ধার হওয়ার পরেও যদি আপনাকে গ্রেফতার না করতাম তাহলে খুনি বুঝে সতর্ক হয়ে যেত, সেক্ষেত্রে আমাদের প্ল্যানটা ফেল হয়ে যেতে পারত। আপনার গ্রেফতারের খবরে খুনি নিশ্চিন্ত হয়ে যায় ফলে আমার বাকি প্লানটা এক্সিকিউট করতে সুবিধা হয়।"
"অফিসার, খুনিটা কে সেটা আগে বলুন" মৃণাল আর ধৈর্য রাখতে পারছে না।
সনাতন অভিরূপকে ইশারা করতেই অভিরূপ খুনিকে নিয়ে হাজির হল। তাকে দেখে মৃণাল স্তম্ভিত, "হোয়াট! ধ্রুব! ধ্রুব সিরিয়াল কিলার? হোয়াট রাভিস অফিসার?"
"মিঃ দত্ত, আসল টুইস্টটা হলো আপনি যাকে ধ্রুবজ্যোতি ধারা বলে জানেন তিনি আসলে আপনার মামাতো ভাই সমরেশ সরকার"
"কি বলছেন মিঃ মিত্র? আর ইউ সিরিয়াস?"
"সেদিন আপনার অফিস থেকে ফিরে আমি খবর পেলাম যে ঈশাবেল্লা রডরিগেজের খোয়া যাওয়া মোবাইলটা কয়েক মিনিটের জন্য অন হয়েছিল আর তার যে টাওয়ার লোকেশন পাই তা আপনার বাড়ির আসেপাসে। আমার সন্দেহ হয় যে আপনিই হয়তো সমরেশবাবু, আর এই খুনগুলো আপনিই করছেন। কারন সমস্ত এভিডেন্স আপনার বিরুদ্ধে যাচ্ছিল। তাই আমি পুরনো ফাইল বের করে আপনার মামিমার মার্ডার কেসটা স্টাডি করা শুরু করি। সেখানে দেখি সমরেশবাবুর আইডেন্টিফিকেশন মার্ক হিসেবে উল্লেখ আছে ডান হাতে একটা অতিরিক্ত কড়ি আঙুল আর ঘারের পিছনে একটা পোড়া দাগ। আমার মনে পড়ে যায় যে আপনার অফিসে যখন ধ্রুববাবুর সাথে হাত মিলিয়েছিলাম তখন ওনার অতিরিক্ত আঙুল লক্ষ্য করেছিলাম, আর উনি যখন আপনার কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন তখন ওনার পোড়া দাগটা দেখি। তখনই আমি প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাই যে উনিই সেই সিরিয়াল কিলার আর সেই মোবাইলটা আপনার বাড়িতেই আছে। কিন্তু আরও নিশ্চিত হওয়ার দরকার ছিল তাই আমি আপনার অফিস থেকে এক বেয়ারাকে দিয়ে ধ্রুববাবুর জলের গ্লাস সংগ্রহ করে সমরেশবাবুর ফিঙ্গার প্রিন্টের সাথে ম্যাচ করছে কিনা তা পরীক্ষা করতে দিই। আজ সকালে সেই রিপোর্ট হোয়াসঅ্যাপে পেয়েই আমি স্যারকে রিকোয়েস্ট করে আপনার বাড়ির সার্চ ওয়ারেন্ট বের করি। বাকিটাতো আপনি জানেনই।"
"সত্যিই মিঃ মিত্র আপনি জিনিয়াস। আপনার ব্যাপারে যা শুনেছিলাম আপনি তার থেকেও অনেক বেশি গ্রেট। কিন্তু আরও একটা কথা জানার বাকি আছে। সমরেশ আমেরিকা কিভাবে গেল আর সেখানকার নাগরিকত্বই বা কি করে পেল?"
কি সমরেশবাবু? বলে ফেলুন," সনাতন কটাক্ষের সুরে সমরেশকে বলল
এতক্ষণ সে চুপ করে ছিল, এবার মুখ খুলল, "আমি জুভেনাইল হোম থেকে পালানোর পর বাবা এক এজেন্টকে দিয়ে আমাকে আমেরিকা পাঠান। সেই এজেন্ট প্রথমে বিহার হয়ে নেপাল নিয়ে যান। সেখানে সপ্তাহ খানেক লুকিয়ে রাখার পর আমাকে সেখানকার যাবতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। সেই পরিচয় পত্রের নিয়ে আমি আমাকে মেক্সিকো হয়ে আমেরিকা নিয়ে যায় সেই দালাল। আমেরিকায় যাওয়ার পর আমি আবার এক নতুন পরিচয় পাই, সমরেশ সরকার।"
"তার মানে মামা সব জানতেন?" মৃণাল অবাক হলো
সনাতন সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, "নিশ্চয়ই। সেই জন্যই তো ওনাকে বিজনেস পার্টনার বানিয়ে দিয়েছিলেন?"
সেই সময় সনাতনের ইশারায় দুজন এসে সমরেশকে নিয়ে গেল।
"কিন্তু স্যার এই ৪৯, ৩৬ ইত্যাদির কি রহস্য তা তো জানা হলো না", এতক্ষণ চুপ থাকার পর অভি জিজ্ঞাসা করল।
"ওটা আমিই বলে দিচ্ছি। মাতৃ স্নেহ, মাতৃ দুগ্ধ থেকে বঞ্চিত সমরেশ এমনিতেই মানসিক স্থিরতা হারিয়েছিল, এমনই সময় একদিন ওনার ওনাকে মা পড়াতে বসেছিলেন, ৪৯এর স্কয়াররুট বলতে না পারায় ঘারে গরম হারিকেন চেপে ধরে। আর সেই দিনই সমরেশবাবু তার মা কে খুন করেন। এর থেকেই এই সিরিজটা এসেছে।"
"অদ্ভুত, ইউ আর অশম" বলে ডিআইজি সনাতনকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিল।
অভি বলল, "স্যার আমার এক বন্ধু, পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। যদি আপনি অনুমতি দেন তবে সে আপনার এই তদন্তের ঘটনাগুলো নিয়ে সিরিজ লিখতে চায়। 'ডিটেকটিভ সন্তুর ডায়রি'।"
সনাতন হেসে বলল, "যাক, ফেলু মিত্তির আর তোপসে তো ছিলই এবার জটায়ুও পেয়ে গেলেম।"

**বিধিসম্মত সতর্কীকরণ - এই গল্পের ঘটনা, স্থান, কাল, পাত্র সবই কাল্পনিক। এর সাথে যদি বাস্তবের কারোর কোনো মিল পাওয়া যায় তা নিতান্তই কাকতালীয় বলে গণ্য হবে। ধূমপান ও মদ্যপান স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর, ইহা ক্যান্সারের কারণ।

বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২০

মায়াবীনি

মায়াবীনি

                                                                                  উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী


                     অঙ্কন: তন্দ্রা ব্রহ্মচারী
অফিসের কর্মব্যস্ততার মাঝে বারবার ব্যাক্তিগত ফোন এলে অভয় খুব বিরক্ত হয়। যেকোনো কাজের প্রতি তার নিষ্ঠা প্রশ্নাতীত, তা সে ব্যাক্তিগত জীবনের কাজই হোক বা তার পেশাদারী দায়িত্বই হোক। আর সেই জন্য সে অফিস টাইমে কোনো ব্যক্তিগত ফোন আসুক তা চায় না। মোবাইল ফোনটা বেজে উঠতেই বিরক্ত হয়ে অভয় ফোনটা তুলল, "বলো বাবা। কি? কখন থেকে?" অভয় আঁতকে উঠল। "তুমি কোনো চিন্তা কোরো না, আমি এখুনি বেরোচ্ছি" বলেই ফোনটা রেখে দিয়ে এক মুহূর্ত কিছু একটা চিন্তা করল তারপর হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল বড় সাহেবের ঘরে।
"মে আই কামিন স্যার?" ঘরের দরজাটা একটু ফাঁক করে অভয় ভিতরে যাওয়ার অনুমতি চাইল।
"আরে অভয়! এসো-এসো। কি ব্যাপার, এতো টেনশন কিসের?"
"স্যার, আমার একটু ছুটি চাই"
"তা একটু ছুটি কেন? পুরোটাই নিয়ে নাও না, কিন্তু তোমার টেনশনটা কিসের সেটা তো বলো"
"স্যার, আমার খুব বিপদ হয়ে গেছে, আমার স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, সম্ভবত ওকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। ফোনে বাবাকে সান্তনা দিলাম বটে কিন্তু আমার মাথা একদম কাজ করছে না, কি করব কিচ্ছু ভেবে পাচ্ছি না।" কাতর গলায় অভয় জবাব দিল।
"আরে এতো বড় ঘটনা ঘটে গেছে আর তুমি এখনো এখানে দাঁড়িয়ে আছ! তুমি ইমিডিয়েট বেরিয়ে যাও। আর শোন, তোমাকে এখন আর ট্রেনে-বাসে যেতে হবে না আমার গাড়িটা নিয়ে যাও, ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি ও তোমাকে তোমার বাড়ি ছেড়ে দেবে।"
"আপনাকে যে স্যার কি বলে যে ধন্যবাদ দেব......."
"আর ফর্ম্যালিটি করতে হবে না, তাড়াতাড়ি রওনা হও।"

গাড়িটা জাতীয় সড়ক ধরে হু-হু করে ছুটে চলেছে। রাস্তার দু'ধারে সবুজ ধানের ক্ষেত দ্রুত গতিতে পিছনের দিকে সরে যাচ্ছে। মাঝের সিটে ড্রাইভারের উল্টো দিকের জানালার ধারে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল অভয়। বার বার অপরাজিতার মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে, আর সেই সাথেই অজয় আর অর্পিতার কান্নার আওয়াজ তার কানে বাজছে। হটাৎ অভয়ের কানে একটা আপাত নিরীহ, মোলায়েম নারী কন্ঠস্বর ভেসে এল, "আমি কি অভয় মন্ডলের সাথে কথা বলছি?" সে চমকে উঠে চারিদিকে তাকিয়ে দেখল, "আমি তো গাড়িতেই আছি! এটা তাহলে আমার মনের ভুল", মনে মনে ভাবতেই তার বুকের ভেতরটা চিন-চিন করে উঠল, একরাশ নিঃস্বতা ঘিরে ধরল তাকে, দম বন্ধ হয়ে আসছে, অভয়ের এখন হাউহাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কোনো রকমে নিজে কে সংযত করে চোখটা বন্ধ করে বসে রইল অভয়। সময় যেন কাটছে না, আজ রাস্তাটা কেউ যেন রাবার ব্যান্ডের মতো টেনে বাড়িয়ে দিয়েছে, কতক্ষণে বাড়ি ফিরবে ভেবে ভেবে আকুল হয়ে উঠছে সে। চোখ বন্ধ করে মাথাটা এলিয়ে দিল অভয়।

অভয়ের সাথে অপরাজিতার বিয়ে হয়েছিল নাটকিয় ভাবে। যেন সিনেমার গল্প। একটা বেসরকারি কম্পানিতে চাকরি সুত্রে অভয় তখন গুজরাতের কচ্ছে থাকে। একদিন রাতে অভয়ের মোবাইলে একটা ফোন আসে। অচেনা নম্বর দেখে অভয় একটু ইতস্ততঃ করছিল, শেষমেশ ফোনটা ধরল-
"হ্যালো! কে বলছেন?"
উত্তরে ফোনের ওপার থেকে একটা আপাত নিরীহ, মোলায়েম নারী কন্ঠস্বর ভেসে এল, "আমি কি অভয় মন্ডলের সাথে কথা বলছি?"
গলার আওয়াজটা যেন অভয়ের হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছিল, সে কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে জবাব দিল, "হ্যাঁ বলছি। আপনি কে বলছেন?"
"আমি মহুয়া। আমাকে আপনি চিনবেন না।"
সেদিন অপরাজিতা অভয়কে তার সঠিক নামটা বলে নি। হয়তো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল।
"আমার নম্বর কোথায় পেলেন?"
"আপনারই এক বন্ধুর থেকে, তবে তার নাম এখনই জিজ্ঞাসা করবেন না, সময়মতো আমি নিজেই আপনাকে বলব।"
এইভাবে তাদের ফোনালাপ শুরু। ধীরে ধীরে ওরা দুজনে একে অপরের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল, 'আপনি' পরিবর্তিত হয়ে গেল 'তুমি'-তে। সম্পর্কের ঘনত্ব এখন অনেকটা বেড়েছে। এমনই একদিন.......
"স্যার! স্যার!" ড্রাইভারের ডাকে অভয়ের তন্দ্রা ভেঙে গেল,
"হ্যাঁ, বলো!"
"কোন রাস্তায় যাবো, সোজা না ডান দিকে?"
জানলা দিয়ে বাইরেটা একটু দেখে নিয়ে অভয় জবাব দিল, "ডান দিকে ঘোরাও।"

গাড়ি থেকে নামতেই অভয়ের উত্তেজনাটা বেড়ে গেল। হন্তদন্ত হয়ে প্রায় রুদ্ধশ্বাসে বাড়ি ঢুকতেই কানে গেল তার পাঁচ বছরের মেয়ে কাঁদছে, কোন রকমে জুতো জোড়া খুলে ভারি পর্দাটা সরিয়ে ঘরে ঢুকে দেখল অভয়ের মা খাটে বসে অর্পিতাকে ভোলানোর চেষ্টা করছে আর তার সাত বছরের ছেলে অজয় পাসে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। অভয়ের বাবা চেয়ারে বসে আছে, চিন্তায়, ক্লান্তিতে মাথাটা ঝুঁকে প্রায় হাঁটুর কাছে নেমে এসেছে।
ঘরে ঢুকতেই অভয়ের মা অভয়ের দিকে প্রায় ছুটে এলো, "এসেছিস বাবা! দেখ তো আমাদের কত বড় সর্বনাশ হয়ে গেল" বলেই হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করল। বাবা হন্তদন্ত হয়ে উঠে বসে কাতর সুরে অভয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, "কি হল বলত? আমার মাথায় তো কিচ্ছু ঢুকছে না"
দুঃখে, কষ্টে, চিন্তায় অভয়ের ভিতরে যেন কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যাচ্ছে কিন্তু বাবা-মা এতোটাই ভেঙে পরেছে যে তাকে প্রাণপণ চেষ্টা করে সেই ঝড়কে দমিয়ে রাখতে হচ্ছে। এইটাই তো পুরুষ মানুষের জীবন, কেঁদে হালকা হওয়া পুরুষ-ধর্ম বিরুদ্ধ। কষ্টটা ভিতরে চেপে অভয় তার বাবাকে জিজ্ঞাসা করল, "বাবা, অপুকে (অপরাজিতাকে বাড়ির সবাই এই নামেই ডাকত) কখন থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? আমাকে সব ডিটেলে বলো"
"সকাল এগারোটা থেকে। তুই তো গোপালকে তার রিক্সা নিয়ে দশটার সময় আসতে বলে অফিস চলে গেলি। ও সময়মতো এসে অপুকে নিয়ে ইস্কুলে চলে যায়। গোপাল বলল এগারোটা নাগাদ অজয়ের ছুটি হয় তারপর তাদের দুজনকে নিয়ে ও বেরিয়ে পরে, কিছুক্ষণ পর স্টেশন বাজারের কাছে পৌঁছাতেই অপু গোপালকে দাঁড়া করিয়ে ফল কিনবে বলে বাজারের ভিতরে যায়। মিনিট পনেরো অপেক্ষা করার পর দেরি হচ্ছে দেখে গোপাল অপুকে ফোন করে, কিন্তু ওর ফোন বন্ধ ছিল। এখনো বন্ধই আছে। হ্যাঁ রে অভয়, কি হলো বলত?" চেয়ার ছেড়ে বাবা উঠে দাঁড়াল। বাবার কথা শেষ হতে না হতেই মা আবার ডুকরে কেঁদে উঠলো।
"আঃ মা, কেঁদো না চুপ করো। বাবা আমাকে এখুনি থানায় যেতে হবে। বাইকের চাবিটা দাও"
"চল, আমিও তোর সঙ্গে যাই" টেবিলের ড্রয়ার থেকে চাবিটা বের করে অভয়কে বলল ওর বাবা।
চাবিটা তাড়াতাড়ি তার বাবার হাত থেকে নিয়ে অভয় বলল, "না বাবা, তোমাকে যেতে হবে না।"
"না-না তোর বাবা যাক। ওর কথা শুনো না, তুমি যাও" মা নাছোড়।
"আমি বিমলকে বলে দিয়েছি, ও এখুনি এসে পরবে, ওকে নিয়েই যাবো।"
"তা ভালো করেছিস", বাবা একটু নিশ্চিন্ত হলো। "আচ্ছা বেয়াই মশাইকে খবর দিয়েছিস?"
"হ্যাঁ, বাবাকে বলেছি। বাবা বললেন আজ ওনার ড্রাইভার আসবে না, তাই ওরা আজ আসতে পারবে না। কাল সকালে আসবে।"
"ওদের মেয়ে নিরুদ্দেশ আর ওরা ড্রাইভারের অপেক্ষায় বসে আছে?" মা অবাক হয়ে বলল।
মাকে চুপ করিয়ে দিয়ে বাবা বলল, "ওসব নিয়ে চিন্তা করার সময় এখন নয়", তারপর অভয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, "তুই আর দেরি করিস না বাবা, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পর"
কথা শেষ হতেই বিমলের আওয়াজ এলো, অভয়ের নাম নিয়ে ডাকতেই অভয় বেরিয়ে পরল।

থানায় পৌঁছে অভয় বুঝতে পারল যে কোনো না কোনো কারনে আজ থানার মধ্যে কর্ম ব্যস্ততা অন্য দিনের তুলনায় একটু বেশি, সবাই শশব্যস্ত। সে একজন হাবিলদারকে জিজ্ঞাসা করল, "স্যার, এফআইআর করার আছে, কোথায় যাব দয়া করে একটু বলবেন?"
"আজ সবাই ব্যস্ত। সামনে ভোট, সেজন্য নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকরা আসছেন। আপনি পরে আসবেন" নির্দেশে করার মতো করে হাবিলদার জবাব দিল।
এই কথা শুনেই অভয়ের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেল। সে ক্ষোভের ফেটে পরল। চিৎকার করে বলল, "আমার স্ত্রী হারিয়ে গেছে আর আপনারা ভোট দেখাচ্ছেন? কোন সংবিধানে লেখা আছে ভোটের সময় অভিযোগ দায়ের করা যায় না? মনে রাখবেন আপনারা পাবলিক সার্ভেন্ট, জনতাকে সার্ভিস দেওয়ার বদলেই আমাদের ট্যাক্সের পয়সায় আপনাদের মাইনে হয়........." অভয় চিৎকার করতে থাকে। বিমল অভয়কে চুপ করানোর বৃথা চেষ্টা করতে করতেই একজন সাব ইন্সপেক্টর সেখানে পৌঁছলেন।
"কি ব্যাপার, এতো চেঁচামেচি কিসের?"
"স্যার, দেখুন না এনাকে বললাম আজ সবাই ব্যস্ত, কোনো এফআইআর নেওয়া যাবে না, কাল আসতে আর ইনি খামোখা........"
"স্যার, আমার স্ত্রী হারিয়ে গেছে আর ইনি আমাকে ভোটের ব্যস্ততা দেখাচ্ছেন", হাবিলদারের কথার মাঝেই অভয় এসআই সাহাকে বলল।
"আপনারা আমার সাথে আসুন" এসআই সাহা অভয় আর বিমলকে ডেকে নিল।
"বসুন", চেয়ারে বসে টেবিলের উল্টো দিকে রাখা চেয়ারের দিকে নির্দেশ করে এসআই সাহা বলল।
দুজনে দুটো চেয়ারে বসল। বিমল ইন্সপেক্টরকে ধন্যবাদ জানাতেই ইনসপেক্টর বলল, "আপনার সমস্যা কি বলুন এবার।" অভয় সমস্ত ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে জানাল তারপর শান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করল, "অপরাজিতাকে পেয়ে যাব তো স্যার? দয়া করে একটু তাড়াতাড়ি এফআইআরটা দায়ের করে তদন্তটা শুরু করুন"
"দেখুন, সব কিছুর তো একটা সিস্টেমে আছে। আইন অনুযায়ী আমরা আপনার কথায় এফআইআর নথিবদ্ধ করতে পারি না। আপনার শ্বশুরবাড়ির তরফে কাউকে এই এফআইআর করতে হবে।"
"কেন? আমার স্ত্রী নিখোঁজ আর আমি তার অভিযোগ জানাতে পারি না?"
"না। কারন আবার স্ত্রীর নিখোঁজের পিছনে আপনার হাত থাকতেই পরে, এটাও তো হতে পারে যে আপনি আপনার স্ত্রীকে খুন করে গুম করে দিয়েছেন?"
"বাঃ! দেশের সংবিধান বলছে একশটা অপরাধী ছাড়া পায় পাক যেন একজন একজন নিরপরাধী শাস্তি না পায় আর এই দেশের আইনই সব স্বামীদের আগে থেকেই অপরাধী ধরে নিচ্ছে। এটা কি স্ববিরোধিতা নয় ইনসপেক্টর?"
"হয়তো আপনি ঠিক বলছেন। কিন্তু আমার হাত-পা আইনের বেড়ায় আবদ্ধ। আইনের বাইরে তো আমি যেতে পারি না।"
"কিন্তু ইনসপেক্টর........."
"তুই চুপ কর। ইনসপেক্টর আপনি বলুন এখন আমরা কি করব" অভয়কে থামিয়ে দিয়ে বিমল বলল।
এসআই সাহা একটু চিন্তা করল তারপর বলল, "আপনারা এক কাজ করুন, আপাতত অপরাজিতা দেবির মোবাইল নম্বরটা দিয়ে যান, আমি নিজের উদ্যোগে আনঅফিসিয়ালি তদন্ত কিছুটা এগিয়ে নিয়ে যাই। আপনি বরং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওনার বাপের বাড়ি থেকে কাউকে আনিয়ে রিপোর্টটা লেখান।"
"আপনাকে অনেক ধন্যবাদ স্যার। আমার শ্বশুরমশাই আর শাশুড়ির মা কাল সকালে চলে আসবেন, আমি কাল ওনাদের সরাসরি থানায় নিয়ে আসব। চলি স্যার।" দুজনে উঠে পরল। থানা থেকে বেরোবে এমন সময় ইনসপেক্টর ডাকল, "অভয়বাবু"
অভয় ঘুরে এলো, "বলুন স্যার"
"আমার মোবাইল নম্বরটা রাখুন, বলার মতো কোনো তথ্য যদি মনে পরে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে জানাবেন। কিছু লুকোবেন না কিন্তু।"
"অবশ্যই জানাবো স্যার।"

থানা থেকে বেরিয়ে রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকানে গিয়ে দুজনে দুটো সিগারেট ধরাল। দুজনেই নিশ্চুপ। অভয়ের চোখ দুটো ছলছল করছে। সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে শূণ্যে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে অভয় বলল, "বিমল, পুলিশ ওদের মতো তদন্ত করুক, আমরা একটু আমাদের মতো করে চার দিক খুঁজে দেখি চল।"
"আমরা এখন কোথায় খুঁজব? আর তাছাড়া মাসি আর মেসো তো কাল সকালেই আসছে"
"না রে বিমল। আমাকে খুঁজতেই হবে। আমি যে ওকে ছাড়া বাঁচব না রে। ছেলে-মেয়ে দুটোর মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। এখন আমি যদি পুলিশের ভরসায় বসে থাকি, নিজে খোঁজার এতোটুকু চেষ্টা না করি তাহলে আমি কি নিজের কাছেই মুখ দেখাতে পারব? ছেলে-মেয়ে দুটোকে কি জবাব দেবো? না রে বিমল, আমি পুলিশের ভরসায় নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারব না।"
"কিন্তু আমার একটা কাজ ছি..ল....."
"না-না। তুই যা। এটা আমার লড়াই, আমাকে একাই লড়তে হবে। তুই যা, তুই যা" অভয় ব্যথিত স্বরে বিমলকে জবাব দিল, তারপর মোটরসাইকেলে স্টার্ট দিয়ে নিমেষের মধ্যে বিমলের চোখে অদৃশ্য হয়ে গেল।

রাত প্রায় দশটা বাজে, অভয় এখনো বাড়ি ফেরে নি। অভয়ের মা-বাবা দুজনেই খুব চিন্তিত। মা অনেক কষ্টে অজয় আর অর্পিতাকে খাইয়ে ঘুম পারিয়েছে।
"কি গো! অভির সাথে তোমার কোনো কথা হলো?" মা বাবাকে জিজ্ঞাসা করল
"নাহ্" বলে বাবা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে আবার বলল, "ওর ফোনটাও তো বন্ধ, যোগাযোগ করতে পারছি না"
"একবার বিমলকে কল করে দেখো না, ও তো অভয়ের সঙ্গে আছে"
"ঠিক বলেছ, এটা তো আমার মাথায় ছিল না", বলেই বাবা সঙ্গে সঙ্গে বিমলের নম্বরে ডায়াল করল
অনেকক্ষণ কানে ফোনটা ধরে থাকতে দেখে অভয়ের মা অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল, "কি গো! ফোন লাগল?"
"রিং হচ্ছে, ধরছে না। দাড়াও আর একবার কল করি"
"হ্যাঁ গো, অভির আবার কোনো বিপদ হলো না তো?" মা ত্রস্ত কন্ঠে বাবাকে জিজ্ঞাসা করল
"আরে বিপদ আবার কি হবে! তুমি অযথা ফালতু চিন্তা কোরো না"
একটা বাইকের আওয়াজ ক্ষীণ থেকে ধীরে ধীরে বাড়ছে, যেন বাইকটা এদিকেই আসছে, কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাইকটা বাড়ি সদর দরজায় এসে দাঁড়াল তারপর একটা হর্ন বাজল।
"ঐ বোধহয় অভি এলো। আমি যাই দরজাটা খুলি" মা হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মিনিট খানেকের মধ্যেই অভয় ঘরে ঢুকল, ঝোড়ো কাকের মতো অবস্থা, মাথার চুল উস্কখুস্ক, দুই কোয়াস দিয়ে যেন ফেনা কাটছে। ঘরে ঢুকতেই বাবা জিজ্ঞাসা করল, "কি রে, তোর ফোন বন্ধ কেন?"
"চার্জ নেই", সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে অভয় চেয়ারে শরীর এলিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে পরল।
"বিমল কেন ফোন ধরছিল না? ওকে কি বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে এলি?"
"ওর কিছু এমার্জেন্সি কাজ এসে গিয়েছিল, তাই ও অনেকক্ষণ আগেই চলে এসেছে"
"তুই এতক্ষণ একা একা কোথায় ছিলি?" বাবা উদ্গ্রীব হয়ে জিজ্ঞাসা করল
"খুঁজছিলাম, পেলাম না" চোখ বন্ধ করেই কাঁপা কাঁপা গলায় অভয় বলল
"বৌমাকে? কোথায় খুঁজছিলি? তুই কি পাগল হয়ে গেলি?" বাবা ধমকে বলল
"এই জন্যই আমি তোমাকে যেতে বলেছিলাম, আমার কথা তো শুনবে না!" মা বাবার প্রতি অভিযোগ করল
"হ্যাঁ বাবা, অনেক খুঁজলাম ওকে। পেলাম না।"
"কিন্তু এতক্ষণ ধরে কোথায় খুঁজছিলি" মা খুবই উদ্বিগ্ন
"মা, ওকে আমি সব জায়গায় খুঁজলাম, পেলাম না। প্রথমে বাজারে গিয়ে সবাইকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেউ বলতে পারল না। তারপর রেল লাইনের ধার ধরে অনেকটা দেখে এলাম পেলাম না। একজন বলল আশেপাশের হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিতে, আমি সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে গিয়েছিলাম কিন্তু কোথাও পেলাম না মা, কোথাও পেলাম না", আর অভয় নিজেকে আটকে রাখতে পারল না, মাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল। মা, বাবা কারোর মুখে রা নেই। কিই বা বলবে! এই দুঃখের জন্য সান্ত্বনা দেওয়ার কি কোনো ভাষা হয়, হলেও তা তারা পড়ে নি। অভয়ের চোখের জলে মায়ের পিঠের আঁচল ভিজে গেল।
"অভি শান্ত হ। সত্যি কথা বলতে কি আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। যদি কিডন্যাপ হতো তাহলে তো এতক্ষণ কিডন্যাপারদের ফোন আসত। তোর কাছে, তোকে না পেলে আমার কাছে, কারোর কাছে তো ফোন আসতই। বাজারে গিয়ে যদি অসুস্থ হতো বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটত তাহলে তো নিশ্চয়ই খবর পেতাম, তুইও তো হাসপাতালে গিয়েছিলি কোথাও না কোথাও থেকে খবর তো পেতাম। মন শক্ত কর। এখুনি ভেঙে পরলে হবে? সামনে অনেক লড়াই পরে আছে।" অভয়ের পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বাবা সান্ত্বনা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল
মা অভয়কে হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসতে বললে অভয় খিদে নেই বলে জানাল। মা-বাবা মিলে খুব জোরাজুরি করাতে অভয় খেতে রাজি হলো।
"তুই হাত মুখ ধুয়ে আয়, আমি ভাত বাড়ছি।"
মাথা নেড়ে অভয় ঘরে ঢুকে গেল।

রাতে বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে কিন্তু অভয়ের কিছুতেই ঘুম আসছে না। বারে বারে অপরাজিতার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে। গতকাল অপু ফল অফিস থেকে ফেরার সময় ফল নিয়ে আসতে বলেছিল কিন্তু অভয় ভুলে গিয়েছিল। যদি সে এটা না ভুলতে তাহলে আজ অপু ফল আনতে যেত না আর তাকে অভয় হারান না। "উঃ ভগবান কেন যে আমি ভুলে গেলাম!" মনে মনে অভয় নিজেকে দোষ দিতে লাগল। সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না যে অপুর হলোটা কি। কেউ তুলে নিয়ে গেল, নাকি কোনো দুর্ঘটনা ঘটল, নাকি অপু নিজেই..... ধুর এসব কি চিন্তা করছি! অভয় আবার চোখ বন্ধ করল। আবার দশ বছর আগেকার সেই সব ঘটনা তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে----
সম্পর্কের ঘনত্ব এখন অনেকটা বেড়েছে। এমনই একদিন রাতে ফোনে কথা বলতে বলতে মহুয়া অভয়কে জানাল যে সে তাকে একটা মিথ্যা কথা বলেছে। অভয় একটু আশ্চর্য হলো, "কি মিথ্যা বলেছ তুমি?"
"আগে বল তুমি রাগ করবে না" মহুয়া অভয়ের কাছে দাবি করার মতো করে বলল
"রাগ করব কেন? তুমি যখন মিথ্যা কথা বলেছ তখন নিশ্চয়ই এটার প্রয়োজন ছিল। এবার বলে ফেলো তো কথাটা কি।"
"আমার নাম মহুয়া নয়। অপরাজিতা। অপরাজিতা সেন। আর আমি তোমার প্রিয় বন্ধু বিমল মানে ছটকুদার বোন, মাসির মেয়ে।"
"কি! তুমি বিমলের বোন? ওর সাথে তো আমার প্রতিদিন ফোনে কথা হয়, ও আমাকে কিছু বলল না কেন?" অভয় একটু বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করল
"দাদাকে আমিই বলতে মানা করেছিলাম তো। তুমি কিন্তু রাগ করবে না বলে আমাকে কথা দিয়েছিলে"
"রাগ তো করিনি, অবাক অবশ্যই হয়েছি। যাইহোক, ব্যাপারটা আমাকে একটু বুঝিয়ে বলো তো"
"শোনো, গতবছর আষাঢ়নবমী পুজোয় আমি মাসির বাড়িতে গিছিলাম। সেখানেই আমি তোমাকে দেখি, মনে হয়েছিল আমি তোমাকে দেখতেই থাকি। আমি তোমাকে ভালোবাসি অভি।"
শেষের কথাটা অভয়ের ভিতর ঝড় তুলে দিল, উত্তেজনায় তার হাত-পা কাঁপতে লাগল। কথিত বলার চেষ্টা করেও মুখ দিয়ে টু শব্দ করতে পারছে না। তার যে ঠিক কিরকম অনুভূতি হচ্ছে তা সে নিজেও জানে না। এরকম অনুভূতি তার আগে কখনো হয়নি। একজন যুবতী নিজে থেকে তাকে প্রেম নিবেদন করেছে এ কথা অভয় নিজেই বিশ্বাস করতে পারছে না। সে নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। সম্বিত ফিরতেই তার কানে গেল--
কি হলো? কথা বলছ না যে? বুঝেছি, তুমি ভাবছ চেনা নেই, জানা নেই একটা মেয়ে এমন কথা কি করে বলতে পারে, আর একটা অচেনা মেয়েকে কি এইভাবে ভালো বাসা যায়? তাই তো?
"না, মানে" অভয় কিছু বলার চেষ্টা করতেই অপরাজিতা তাকে থামিয়ে দিল, "তুমি তো ঠিকই ভাবছ, এটা ভুল তো নয়। তুমি আমাকে চেনো না, জানো না, এমনকি আমার কোনো ছবিও দেখো নি। এরকম ভাবে কাউকে ভালোবাসা যায় নাকি? আচ্ছা তুমি বাড়ি কবে আসছ?"
"এই তো সামনের মাসেই" জড়ানো গলায় অভয় উত্তর দিল
"এবার যখন বাড়ি আসবে তখন আমরা দেখা করব, ঠিক আছে?"
"অবশ্যই দেখা করব। কিন্তু কোথায় দেখা করব?"
"আমার বাড়ি তো পানাগড়। আমরা তাহলে মাঝামাঝি জায়গায় কোথাও দেখা করব। বর্ধমানে?
"ঠিক আছে, তাই হবে।"
এরপর থেকে প্রতিদিন নিয়ম করে অভয় আর অপরাজিতার ফোনোপ্রেম চলতে থাকে। অর্ধেক রাত পর্যন্ত ফোনাফোনি চলত। ধীরে ধীরে অভয় অপরাজিতার প্রতি দুর্বল হয়ে পরল। তবে এটাকে ঠিক ভালোবাসা বলা যায় না তবে মোহাচ্ছন্নতার থেকে বেশি তো বটেই। আর এইভাবেই সেই দিনটা চলে এলো।
অভয় একটু তাড়াতাড়িই পৌঁছে গিয়েছিল। সে ভিষন উত্তেজিত, যত সময় এগিয়ে আসছে তার উত্তেজনাও ততই বাড়ছে। অপরাজিতার পৌঁছানোর আগে আধ ঘণ্টায় তিনটে সিগারেট খাওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু তাও উত্তেজনা এতোটুকু প্রশমিত হয় নি।
"অভয়?" পিছন থেকে ডাকটা এলো, সেই মিষ্টি আওয়াজ।
দুজনের এই ভালোবাসাকে পরিনতি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়াটা এক নাটকীয় ঘটনা। অপরাজিতার বাবা কালনার এক নামকরা ব্যবসায়ী, অগাধ পয়সা আর প্রতিপত্তি। অভয় মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। সুতরাং এই বিয়ে কি অপরাজিতার পরিবার মেনে নেবে? এছাড়াও অতীতের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার কারনে প্রেম করে বিয়ে করা অপরাজিতার বাবা একদম পছন্দ করে না। এই দুটো কথাই ওদের দুজনের রাতের ঘুম কে রে নেয়। এমতাবস্থায় ত্রাতা হিসেবে এগিয়ে এল বিমল। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিমল অপরাজিতার বাবার কাছে অপরাজিতার সাথে অভয়ের বিয়ের প্রস্তাব রাখে এবং বিমল তার মেসোমশাইকে বোঝায় যে অভয় ছেলে হিসেবে খুবই ভালো আর অপরাজিতার জন্য উপযুক্ত। এইভাবে একটা বিমল একটা 'লাভ ম্যারেজ'কে 'এরেঞ্জ ম্যারেজ'-এ বদলে দিল। অভয়কে তার অনেক বন্ধু ঠাট্টা করে বলত, "তোর কপাল মাইরি! রাজকন্যা আর রাজত্ব দুইই পেলি"
এরপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। বিবাহিত জীবনের দশটা বছর কেটে গেছে। তারা এখন দুই ছেলেমেয়ের মা-বাবা। এদিকে কচ্ছ থেকে দিল্লি, হরিয়ানা হয়ে গত পাঁচ বছর ধরে অভয় কলকাতায় আছে। বাড়ি থেকে যাতায়াত করে। কিন্তু অপরাজিতার অভয়ের গ্রামের বাড়িতে থাকাটা বা কলকাতায় বদলি হয়ে আসাটা খুব একটা পছন্দ নয়। সে চায় অভয়ের সাথে বাইরে বাইরে ঘুরতে। কিন্তু অভয় তার মা- বাবার একমাত্র ছেলে, বয়স্ক বাবা-মাকে ছেড়ে কি ও বাইরে বাইরে ঘুরতে পারে? এছাড়া তার একটা মাটির টান আছে। সেই টাইন ওকে টেনে নিয়ে এসেছে। এই মাটিতেই তার নাড়ি পোঁতা আছে, এটা তো তার নাড়ির টান। এই টান কি সে উপেক্ষা করতে পারে!

এলার্মটা বাজতেই অভয় ধড়মড়িয়ে উঠে বসল। জানলা দিয়ে সূর্যের ছটা এসে বিছানায় পরছে। তবে কি বেলা অনেকটা হয়ে গেল? দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখল আটটা বাজে। কাল অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমাতে পারেনি তাই, ক্লান্তও ছিল খুব তাই কখন যে আটটা বেজে গেছে জানতেও পারে নি। চায়ের কাপে চুমুক দিতেই একটা গাড়ির হর্ন কানে এলো। গাড়িটা যেন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। চায়ের কাপটা রেখে অভয় দরজা খুলল, দরজার সামনে অপরাজিতার বাবা অর্থাৎ তার শ্বশুর দাঁড়িয়ে। শ্বশুরমশাইকে অভ্যর্থনা জানিয়ে অভয় আশ্চর্যের সঙ্গে তার শাশুড়ি কেন আসে নি জিজ্ঞাসা করল। শ্বশুরমশাই জানাল যে তার শাশুড়িমাকে তার বোনের বাড়িতে অর্থাৎ বিমলের বাড়িতে রেখে এসেছে। অভয় খুব অবাক হল। বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত তার শ্বশুর-শাশুড়ি তাদের বাড়িতে এক কাপ চা পর্যন্ত খায় নি। যখনি আসে ওরা বিমলদের বাড়িতেই ওঠে আর আজ এমন বিপদের দিনেও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি?
"অভি তাড়াতাড়ি থানায় চলো। রিপোর্টটা লিখিয়ে আমাকে আবার ফিরতে হবে। বিকেলে ব্যবসায়ী সমিতির মিটিং আছে"
কথাটা কানে যেতেই অভয়ের মাথাটা গরম হয়ে গেল, সে চিৎকার করে উঠল, "কি ভেবেছেন কি আপনারা? মনুষ্যত্ব বলে আপনার কি কিছু আছে? অপরাজিতা আপনার মেয়ে, সেটা মাথায় আছে তো নাকি? আপনার কি এতোটুকু মায়া মমতা নেই? এই পরিস্থিতিতে আমি কোনো খাবার মুখে তুলতে পারছি না আর আপনি এইসব মিটিং-মিছিলের কথা বলছেন! ঐ বাচ্ছাদুটোকে দেখুন। ওরা আপনার নাতি-নাতনি, আপনারই রক্ত। কাল থেকে ওরা মা-মা করে কাঁদছে আর আপনি রিপোর্ট লিখিয়েই চলে যাওয়ার কথা বলছেন? যতদিন না অপুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে ততদিন আপনি এখানেই থাকবেন। আমাদের বাড়িতে থাকতে না চাইলে আপনার শালির বাড়িতেই থাকবেন, কিন্তু আপনাকে এখানেই থাকতে হবে" এক নিশ্বাসে অভয় নিজের সব রাগ, দুঃখ, হতাশা তার শ্বশুরের উপর ঢেলে দিল।

থানায় ঢুকে অভয় দেখল এসআই সাহা নেই। এক হাবিলদারকে জিজ্ঞাসা করে অভয় জানতে পারল যে উনি রাউন্ডে গেছেন আসতে দেরি হবে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে অভয় সাহাবাবুর মোবাইলে কল করল, "হ্যালো, স্যার আমি অভয় মানে অভয় মন্ডল বলছি, চিনতে পারছেন"
"হ্যাঁ-হ্যাঁ খুব চিনতে পারছি, বলুন"
"স্যার আমি আমার শ্বশুরমশাইকে নিয়ে এসেছি, এফআইআর করতে। আপনার আসতে কি দেরি হবে?"
"আপনি এক কাজ করুন, আমার টেবিলের ঠিক সামনের দত্তবাবু আছেন ওনার কাছে গিয়ে রিপোর্টটা লিখিয়ে দিন, আমার নাম করে বলুন ওনাকে আমার বলা আছে। তারপর আপনার শ্বশুরমশাইকে ছেড়ে দিয়ে আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আমি আসছি।"
"ঠিক আছে স্যার"
রিপোর্ট লিখিয়ে অভয় শ্বশুরমশাইকে বাড়ি ফিরে যেতে বলল। শ্বশুরমশাই চলে গেলে অভয় থানার সামনের চায়ের দোকানে গেল। সকালে টাটা ভালো করে খাওয়া হয় নি, একটা চা আর একটা সিগারেট নিল। অভয়ের মাথায় এক ঝাঁক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, ইনসপেক্টর সাহা কি কোনো সুত্র পেয়েছেন? অপরাজিতাকে কি এবার খুঁজে পাবে সে? আচ্ছা অপু কি কাল রাতে কিছু খেয়েছে? ছেলে-মেয়ে দুটোর চিন্তায় অপু খুব কষ্ট পাচ্ছে। অপুর হলো কি, এই ভাবে উবে গেল কি করে?
এতক্ষণ নিশ্চয়ই ইনসপেক্টর এসে গেছেন। সিগারেটটা ফেলে দিয়ে পা দিয়ে নেভার তারপর দোকানে পয়সা দিয়ে চলে গেল।
"স্যার আসতে পারি?"
"আরে আসুন আসুন। বসুন। চা খাবেন?"
"না স্যার। ধন্যবাদ। আমি এইমাত্র দোকান থেকে খেয়ে এলাম। কোনো খবর পেলেন স্যার?"
"আপনার স্ত্রীর যে নম্বরটা আপনি দিয়েছিলেন তার টাওয়ার লোকেশনের রিপোর্ট আর গত দু'মাসের কল হিস্ট্রি আমি পেয়েছি। লাস্ট টাওয়ার পাওয়া গেছে স্টেশন বাজারের, গতকাল সকাল এগারোটা আঠারো মিনিটে। তারপর থেকেই এই নম্বরটা বন্ধ। আচ্ছা অভয়বাবু যদি কিছু মনে না করেন একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?"
"মনে করব কেন! আপনি যে কোনো প্রশ্ন করতে পারেন। নিঃসংকোচে জিজ্ঞাসা করুন।"
"আচ্ছা আপনার সাথে আপনার স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন? মানে আমি বলতে চাইছি আপনার স্ত্রীর কি অন্য কোনো এফেয়ার আছে রে কখনো আপনার মনে হয়েছে?"
"কি বলছেন স্যার! এরকম হতেই পারে না।"
"আমি এখুনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না তবে এটা আমার ধারনা। দেখুন ওনার কল হিস্ট্রি যাচাই করে দেখেছি যে একটা নম্বর থেকে আপনার স্ত্রীর কাছে বারবার ফোন আসত আর প্রতিদিন নিয়ম করে তাদের ঘন্টার পর ঘন্টা কথা হতো। আশ্চর্যের বিষয় নম্বরটা পশ্চিমবঙ্গের নয়। হরিয়ানার।"
"কি বলছেন? এমনও তো হতে পারে যে আমার হরিয়ানায় যখন পোস্টং ছিল তখন সেখানে ওর যাদের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছিল তাদেরই কেউ?"
"মি. মণ্ডল আপনি কি কখনো আপনার কোনো বন্ধুর সাথে এইভাবে প্রতিদিন নিয়ম করে কয়েক ঘন্টা করে কথা বলতে চাইবেন? তাছাড়া ঐ নম্বরটার টাওয়ার লোকেশন বলছে গত কয়েকদিন ধরে ঐ নম্বর এই রাজ্যেই আছে আর গতকাল নম্বরটার শেষ টাওয়ার লোকেশন পাওয়া গেছে বর্ধমান স্টেশনে, সকাল দশটায়। যাই হোক আপনাকে আর একটা ইনফরমেশন দিই। আপনার স্ত্রীর টিকটক নামের একটা ভিডিও শেয়ারিং সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে একটা একাউন্ট আছে তা কি জানেন?"
"কি বলছেন স্যার! ও ওসব কবে শিখল? অপু তো স্মার্ট ফোন ঠিকঠাক ব্যবহার করতেই জানত না। আমি তো এ ব্যাপারে কিছু জানি না।"
"আপনি অনেক কিছুই হয়তো জানেন না মি. মণ্ডল, ভালো করে খোঁজ নিন, আপনার স্ত্রীর অতীত সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন। যাই হোক আপনি এখন আসতে পারেন। আমি সময় মতো আপনার সাথে যোগাযোগ করে নেব। আর হ্যাঁ আপনার কাছে কোনো তথ্য এলে যেন আমাকে জানাতে ভুলবেন না।"
অভয়ের মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোল না, সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে সে থানা থেকে বেরিয়ে গেল।

বাড়ি পৌঁছে অভয় চুপ চাপ একটা চেয়ারে বসে পরল। মাথায় কিছু ঢুকছে না। অপুর কোনো এফেয়ার থাকতে পারে এটা কিছুতেই সে বিশ্বাস করতে পারবে না। এটা কখনোই হতে পারে না। এইসব ভাবতে ভাবতেই মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করতে লাগল। এমন সময় অভয়ের ছেলে অজয় এসে জিজ্ঞাসা করল, "বাবা, মাকে এনেছ? ঠাম্মা যে বলল তুমি মাকে আনতে গেছ! মা কোথায় বলো না বাবা? মা আসছে না কেন?"
অভয় ভেল ভেল করে তার শিশু পুত্রের দিকে তাকিয়ে রইল। তার কাছে এইসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। সে যে নিজেও এই প্রশ্নগুলোরই উত্তর খুঁজছে। সেই মুহূর্তে অভয়ের মা এলো, অজয়কে কোলে নিয়ে বলল, বাবা মা খুঁজতে খুঁজতে হাঁপিয়ে গেছে দেখতে পাচ্ছ না সোনা? এখন খেলা কর যাও, মা কে পেয়ে গেলে বাবা ঠিক নিয়ে আসবে। আমার সোনা ছেলে, যাও ও ঘরে।"
অজয় চিৎকার করে উঠল, "নাআআআ। আমার মাকে চাই। এক্ষুনি চাই। আমি আর কোনো কথা শুনতে চাই না।"
ঠাম্মা অজয়কে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে অনেক চেষ্টা করে চুপ করাল। কিছুক্ষণ পরে আবার অভয়ের ঘরে এসে দেখে সে চেয়ারে মাথা নিচু করে বসে আছে আর তার চোখ দিয়ে ঝড় ঝড় করে জল পরছে।
কিরে! এইভাবে বাচ্ছা ছেলের মতো চোখের জল ফেললে হবে? একটু শক্ত হ।"
"মা, অজয়ের প্রশ্নগুলো যে আমার কানে গরম তেলের মতো এখনো ঢুকছে। কানের পর্দা যেন ফেটে যাবে মনে হচ্ছে মা। একটা প্রশ্নেরও জবাব আমার কাছে নেই।"
জানি বাবা, আমি তো তোর মা, তোর কষ্টটা আমি বুঝব না। সবই বুঝতে পারছি তবুও বলছি পারলে নিজেকে একটু শক্ত কর। এইভাবে ভেঙে পরিস না।"
"আচ্ছা মা, বাড়িতে অপু সারাদিন কি করত? ওর মধ্যে ইদানীং কি কোনো অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেছিলে?"
মা অভয়ের দিক থেকে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে উত্তর দিল, "ও কি স্বাভাবিক কোনো দিনও ছিল?"
এরপর ঘরে কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল আর তারপর অভয় উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "মা আমি একটু বিমলদের বাড়ি থেকে আসছি" তারপর হনহন করে বেরিয়ে গেল।

দরজায় কলিং বেলের বোতাম টিপে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে উঠল কিন্তু কোনো উত্তর পেল না তাই অধৈর্য হয়ে কয়েকবার দরজা পেটাল। এবার ভিতর থেকে আওয়াজ এলো আর সঙ্গে সঙ্গেই বিমল দরজা খুলল, "কি রে! কি ব্যাপার? এই ভরদুপুরে এখানে?"
"কেন? খুব অসুবিধায় ফেলে দিলাম বুঝি?" বলেই অভয় বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল। ঘরে ঢুকেই অভয় দেখল বিমলের মা, বাবা আর অভয়ের শ্বশুর, শাশুড়ি খেতে বসেছে, সবাই মাংস ভাত খেতে খেতে খোশ মেজাজে গল্প করছে। এই দৃশ্য দেখেই অভয়ের রক্ত গরম হয়ে গেল, যাদের মেয়ে নিরুদ্দেশ তারা এরকম খোশ মেজাজে কি করে থাকতে পারে! অভয়কে দেখেই সকলে অপ্রস্তুতে পরে গেল, কেউই তো এই মুহূর্তে অভয়কে সেখান আশা করে নি। নিজেকে সামলে নিয়ে অভয়ের শাশুড়ি বলল, "এসো বাবা, এসো। কোনো খবর পেলে?"
"কোনো খবর পেলাম কি পেলাম না তা নিয়ে আপনাদের কি কাজ! আপনারা যেমন মাংস ভাত খাচ্ছেন, খান আর ফুর্তি করুন। আমাকে শুধু একটা সত্যি কথা বলুন, আমার আগে অপরাজিতার কি অন্য কোনো সম্পর্ক ছিল? দয়া করে কিছু গোপন করবেন না, সত্যি করে বলবেন।"
"এ কি বলছেন বাবা! এ যে শোনাও পাপ। দোহাই তোমায় আমার মেয়ের চরিত্রে এমন কালো দাগ তুমি দিও না", অভয়ের শাশুড়ি কাঁদতে লাগল।
উঃ, এই নাকে কান্না অভয়ের আর সহ্য হচ্ছে না। কোনো প্রত্যুত্তর না দিয়ে অভয় সেখান থেকে চলে গেল।
আশা, আশঙ্কার দোলাচলে এইভাবে দুটো দিন কেটে গেল। দুপুরে অভয় নিজের ঘরে শুয়ে অতীতের সুখের দিন গুনছিল। অভয়ের বাবা অভয়কে ডেকে জানাল যে বৈশাখী এসেছে, তার জন্য অপেক্ষা করছে। সে গ্রামেরই বছর কুড়ি বাইশের একটি মেয়ে, অজয়কে পড়ায়। অপরাজিতাই ঠিক করেছিল। বৈশাখীর সাথে অভয়ের সরাসরি কোনো দিন কথা হয় নি তাই অভয় ভেবে পাচ্ছে না যে সে আবার কি বলবে। ঘরে ঢুকতেই বৈশাখীর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, "অভয়দা, একটা কথা বলছিলাম। মানে আমার মনে হলো এটা আমার আপনাকে জানানো উচিৎ তাই........"
"অপুর ব্যাপারে?"
"হ্যাঁ, দাদা"
"বলো, বলো। নিঃসঙ্কোচে বলো। প্রতিটা ইনফরমেশন এখন গুরুত্বপূর্ণ।"
"দাদা, কয়েকদিন আগে বৌদির খোঁজ করে আমার কাছে একটা ফোন এসেছিল। হিন্দিতে কথা বলছিল। ভয় পেয়ে আমি ফোন টা কেটে দিয়েছিলাম।"
"কিন্তু তোমার নম্বর তার কাছে গেল কিভাবে?"
"মাস খানেক আগে আমি যখন অজয়কে পড়াচ্ছিলাম তখন বৌদি একবার আমার ফোনটা নিয়ে কাউকে ফোন করেছিল। হয়তো তাকেই। তারপর আবার কল লিস্ট থেকে নম্বরটা ডিলিটও করে দেয়।"
"ঠিক আছে, তুমি আমাকে নম্বরটা দাও"

বৈশাখী চলে যেতেই অভয় ইনসপেক্টর সাহাকে ফোন করল। বৈশাখীর থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে তার থেকে পাওয়া মোবাইল নম্বরটা ইনসপেক্টরকে দিল। ইনসপেক্টর সাহা অভয়কে বলল--
"অভয়বাবু আমার কাছেও কিছু তথ্য আছে। আপার স্ত্রীর কল হিস্ট্রি থেকে পাওয়া নম্বরটা শ্রীভান সিং গুর্জর নামের এক ব্যক্তির, তার বাড়ি হরিয়ানার হিসার জেলায়। মজার কথা হলো এই শ্রীভান নামের এক ব্যক্তি আপনার স্ত্রীর টিকটক গ্রুপেও আছেন। আরও আশ্চর্যের বিষয় ঐ গ্রুপে আপলোড করা ভিডিওগুলোতে আপনার স্ত্রী কিন্তু নিজেকে অবিবাহিতা বলে পরিচয় দিয়েছেন। একটা ভিডিওতে তো আবার আপনার মেয়েকে তাঁর ভাইঝি বলে পরিচয় দিয়েছেন আর কোন ভিডিওতেই ওনার বিবাহের চিহ্ন নেই এমনকি প্রতিটা ভিডিও চ্যাট বা আপলোডেড ভিডিও শুট করার আগে বেশ যত্ন সহকারে সিঁদুর মুছতেন।"
"কি বলছেন স্যার! আমি তো ভাবতেই পারছি না।"
"আপনাকে তো বলেছিলাম, আপনি অনেক কিছুই জানেন না। ঠিক আছে রাখছি।"
ফোনটা রেখে অভয় ধপ করে বসে পরল। তার মাথার ভেতরটা কেমন যেন খালি খালি মনে হচ্ছে। চারিদিক শূণ্য মনে হচ্ছে। সে যেন এক অতল গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে।

বিকালে এসআই সাহার ফোন এলো। থানার নম্বর দেখে অভয়ের মনে একটু আশার আলো খেলল, হয়তো কোন খবর আছে। তবে কি অপরাজিতার খবর পাওয়া গেছে! এসব সাত-পাঁচ চিন্তা করতে করতে তাড়াতাড়ি ফোনটা রিসিভ করল-
"হ্যালো!"
"অভয়বাবু, আমি ইনসপেক্টর সাহা বলছি।"
"বলুন স্যার। নতুন কোনো খবর আছে? অপরাজিতার কি খোঁজ পাওয়া গিয়েছে?"
"তা ধরুন পাওয়া গিয়েছে। তবে ফোনে সব বলা যাবে না। আর তাছাড়া তদন্তের কাজ এখনো একটু বাকি আছে। আপনি এক কাজ করুন, আজ সন্ধ্যা সাতটায় আপনার শ্বশুরমশাই আর শাশুড়িমা কে নিয়ে থানায় চলে আসুন। আর হ্যাঁ, আপনার বন্ধু বিমলকেও সঙ্গে আনবেন। এখন আমি রাখছি।"
অভয় আশা-আশঙ্কায় বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। ইনসপেক্টর কি এমন খবর পেলেন যে এদের সবাই কে নিয়ে যেতে বললেন। তাহলে কি সত্যিই অপুর কারোর সাথে সম্পর্ক আছে? না-না, কি যা তা চিন্তা মাথায় আসছে! এটা হতেই পারে না। অপু আমাকে ছাড়া আর কাউকে ভালো ভাসতে পারে না। চিন্তায় চিন্তায় জর্জরিত অভয় চোখ বন্ধ করে উপরের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, "হে ঈশ্বর, আমাকে এ কোন পরীক্ষার সামনে ফেললে তুমি!"

সন্ধ্যা ঠিক পৌনে সাতটায় ওরা থানায় পৌঁছে গেল। অভয়ের আর তর সইছে না, তাই একটু আগেই পৌঁছে গেছে কিন্তু ইনসপেক্টর সাহা কোথায়? ওনাকে তো দেখা যাচ্ছে না! অভয় কাউকে জিজ্ঞাসা করে সময় নষ্ট করতে চাইল না তাই সরাসরি সাহাবাবুকেই ফোন করল। ইনসপেক্টর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলল। বাইরে আছে, ফিরছে। মিনিট কুড়ি-পঁচিশ সময় লাগবে। আরও আধ ঘন্টা! অভয়ের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর থানার বাইরে এসে পায়চারি করতে লাগল।
"কি ব্যাপার অভয়বাবু এখানে ঘুরছেন কেন? ভিতরে চলুন", গাড়ি থেকে নেমে এসআই সাহা জিজ্ঞাসা করল
"স্যার আপনি এসেছেন! আমার একেবারেই তর সইছে না। আপনি প্লিজ একটু তাড়াতাড়ি সব বলুন। আগে বলুন আমার অপু কোথায় আছে, ও ভালো আছে তো?" কাতর হয়ে অভয় বলল
ইনসপেক্টর গোঁফের কোলে একবার মুচকি হেসে বলল, "ভিতরে চলুন, সব বলছি।"
ভিতরে গিয়ে অভয় আর ইনসপেক্টর নির্দিষ্ট চেয়ারের বসল। এক গ্লাস জল খেয়ে ইনসপেক্টর সাহা বলতে শুরু করল--
"অভয়বাবু আপনি আজ দুপুরে আমাকে যে নম্বরটা দিয়েছিলেন তার ইতিহাস-ভূগোল আমি খুঁজে বের করেছি। সেটাও হরিয়ানার নম্বর আর ঐ শ্রীভান সিং গুর্জরেরই।"
এই কথা শোনা মাত্র অভয়ের শ্বশুর-শাশুড়ি পরস্পরের দিকে তাকাল।
ইনসপেক্টর আবার বলতে শুরু করল, "ঘটনার দিনে ঐ নম্বরটার টাওয়ার লোকেশন বলছে সকাল এগারোটার সময় স্টেশন বাজারে ছিল, একটার সময় হাওড়া স্টেশনে ছিল। দুপুর তিনটের দিকে কলকাতা এয়ারপোর্ট তারপর আড়াই ঘণ্টা বন্ধ, অন হয় দিল্লি এয়ারপোর্টে। আমি এখানকার স্টেশন ও হাওড়া স্টেশনের সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ চেক করে দেখে বুঝেছি যে আপনার স্ত্রী স্বেচ্ছায় গেছেন।"
"কি বলছেন স্যার! আমি তো এসব কথা ভাবতেও পারছি না!" অভয়ের বাকরুদ্ধ হওয়ার মতো অবস্থা।
"অভয় বাবু, অবাক করার মতো আরও অনেক ঘটনা আছে। ওনার টিকটক গ্রুপে ব্যারাকপুরের এক বিহারি ছেলে আছে। তাকে জেরা করে জানতে পেরেছি যে ওই গ্রুপের সদস্যরা জানে আপনার স্ত্রী অবিবাহিতা ও শ্রীভানের প্রেমিকা। এবং আজ সকালে ওদের দুজনের রেজিস্ট্রি করে বিয়েও হয়ে গেছে।"
"কি? বিয়ে! অপু আবার বিয়ে করেছে? ও ছেলে মেয়ে দুটোর কথা একবারও ভাবল না!" অভয়ের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল
এদিকে তার শ্বশুর-শাশুড়ি আর বিমল মাথা নিচু করে বসে আছে।
ইনসপেক্টর একবার ওদের দিকে তাকিয়ে দেখল তারপর আবার বলতে শুরু করল, "আপনার শ্বশুরমশাই, শাশুড়িমা আর আপনার এই বাল্য বন্ধুটি কিন্তু আগে থেকে সব জানতেন।"
এটা শুনেই অভয় চমকে উঠল, "কি বলছেন ইন্সপেক্টর!"
"একদম ঠিক শুনেছেন আপনি আর আমিও ঠিকই বলেছি। আপনি নিজেই জিজ্ঞাসা করুন না।"
"বাবা! মা! বিমল! ইনসপেক্টর যা বলছেন তা কি সত্যি?
ওরা মাথা নিচু করে বসে রইল। কেউ কোনো কথা বলল না। অভয় আবার চেঁচিয়ে উঠল, "চুপ করে আছেন কেন বাবা? বলুন।"
এসআই সাহা বলল, "আরে ওরা কি বলবে, আমি বলছি শুনুন। সেদিন আপনি থানা থেকে যাওয়ার পর আপনার বন্ধু তার মেসোমশাই কে জানান যে আপনি থানায় এসেছিলেন আর কেসটা আমি দেখছি।"
"বিমল এই বুঝি তোর ইম্পর্টেন্ট কাজ?" অবজ্ঞার সুরে অভয় বলল।
"এই খবর পেয়ে আপনার শ্বশুরমশাই তাঁর পলিটিক্যাল সোর্স ও পাওয়ার কাজে লাগিয়ে আমার উপর প্রেসার দেওয়ান যাতে আমি এই কেসটা কোনো তদন্ত না করে ধামা চাপা দিই। আগেও যেমন করেছেন আর কি" ইনসপেক্টর আবার বলল।
অভয় চমকে উঠে বলল, "আগেও করেছেন মানে?"
"সেটাও বলছি। অভয়বাবু, আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম না যে আপার স্ত্রীর আগে কারোর সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না? তাহলে শুনুন, আপনার স্ত্রী এর আগে দুবার দুজন আলাদা আলাদা ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়েছিলেন। একজনের নাম অমিত রায় আর একজনের নাম আনোয়ার হোসেন।"
কি! এতো বড় কথা আপনারা চেপে গিয়েছিলেন? আমি সেদিনও জিজ্ঞাসা করলাম, এতো করে বললাম সত্যি কথাটা বলতে আর আপনারা নির্দ্বিধায় এরকম নাটক করে গেলেন! আপনারা কি মানুষ? ছিঃ ছিঃ!"
ওরা তিন জনেই মাথা নিচু করে রইল। তদের তো কিছু বলার থাকতেও পারে না।
"আরও চমকে দেবার মতো কথা শুনুন। অভয়বাবু আপনার বন্ধু মধ্যস্থতা করে আপনাদের প্রেমের সম্পর্ককে এরেঞ্জ ম্যারেজের রূপ দিয়েছিলেন, তাই তো?"
"হ্যাঁ, একেবারেই তাই।"
"না, একেবারেই ভুল। এটাও একটা নাটক। আরও পরিস্কার করে বললে একটা বিরাট ষড়যন্ত্র। আপনার স্ত্রীর যা রেকর্ড ছিল তার জন্য ওর বিয়ে দেওয়া মুশকিল হয়ে গিয়েছিল। তখন আপনার শ্বশুর-শাশুড়ি বিমলবাবুকে বলেন যে উনি যদি বিয়ের ব্যবস্থা করিয়ে দেন তাহলে মোটা উপঢৌকন দেবেন। বলতে দ্বিধা নেই যে বিমলবাবু মোটা উপঢৌকন পেয়েওছিলেন। কি বিমলবাবু তাই তো?"
বিমল নিরুত্তর। এখনো মাথা নিচু করেই বসে আছে।
"ওঃ! তাই যাদের দু'বেলা দু'মুঠো খাবার জুটতো না আমার বিয়ের পরেই দেখলাম তাদের দু'তলা পাকা বাড়ি হয়ে গেল, নতুন বাইক চলে এলো! আমার জীবনের তুই এইভাবে সওদা করলি! বিমল, তুই এতো নীচ! আমি তোর ছোটো বেলার বন্ধু আর তুই আমার এতো বড় সর্বনাশ করলি?"
"অভয়বাবু, আপনি চাইলে আপনাকে ঠকানো, আপনাকে ডিভোর্স না দিয়ে আবার বিয়ে করা ইত্যাদি অপরাধের জন্য আপনার স্ত্রীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন। যদি বলেন তো আমি কেস রুজু করতে পারি" এসআই অভয়কে বলল।
জবাবে অভয় বলল, "দেখুন ইনসপেক্টর, আমি ওই কলঙ্কিনিকে তো আর ঘরে তুলব না। ও যেমন আছে থাক। আমার সামনে এখন বিরাট দায়িত্ব। ওসব আইনি জটিলতায় যাওয়ার আমার কোনো ইচ্ছা নেই।"
"অ্যাজ ইউ উইস" ইন্সপেক্টরের ঠোঁটে হালকা হাসির ঝলক। মনে মনে ভাবল একেই বোধহয় ভালোবাসা বলে। অভয়ের শ্বশুরের দিকে একটা কাগজ এগিয়ে দিয়ে বলল, "নিন এটাতে একটা সই করে দিন"
"এটা কি অফিসার?" অভয়ের শ্বশুর জিজ্ঞাসা করল
"এটা একটা এফিডেভিট, এতে লেখা আছে যে আপনার মেয়ে স্বেচ্ছায় অভয় বাবুকে ছেড়ে গেছেন, এই ঘটনার জন্য অভয়বাবু কোনো ভাবেই দায়ী নন, ভবিষ্যতে আপনারা কোনো অভয়বাবুর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনতে পারবেন না।" এসআই জবাব দিল।
"অফিসার, আমার জামাই হীরের টুকরো, ওর কোনো তুলনা হয় না। আমার মেয়ে ওর সাথে সংসার করার যোগ্য নয়। আমি ওর সাথে অনেক অন্যায় করেছি, ওর জীবনটাই নষ্ট করে দিয়েছি। আবার ওর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ কি কখনো করতে পারি? আর কত পাপ করব। দিন কাগজটা আমি সই করে দিচ্ছি।"

ঝোড়ো কাকের মতো অবস্থায় অভয় বাড়ি ঢুকল। ওর বাবা-মা দুজনেই উৎসুক হয়ে বসেছিল। বাড়ি ঢুকতেই বাবা জিজ্ঞাসা করল, "কি রে, কোনো খবর পেলি?"
"বলছি বাবা। মা, এক গ্লাস জল দাও তো।" কোনো রকমে কথা গুলো বলে ঘরের মেঝেতে বসে পরল। মা জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিতেই এক নিশ্বাসে অভয় জলটা খেয়ে নিল। তার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
"কি রে অভি, বল কি খবর পেলি" মা অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করল। অভয় সব কথা তার মা বাবাকে বলল, আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল। বিলাপ করতে করতে সে তার মা-বাবার উদ্দেশ্যে বলল, "আমি তো ভাবতেই পারছি না যে অপু অন্য কারোর সাথে পালিয়েছে। আমাকে ছেড়ে গিয়ে সে অন্য কাউকে বিয়ে করেছে মা! আমার কথা না হয় ছেড়েই দাও ওর কি অজয়-অর্পিতার জন্যও এতোটুকু মায়া হো না? ও পারবে এদের ছেড়ে থাকতে?"
অভয়ের মা বাবার কাছে এর কোনো উত্তর নেই। ওরা ভেবে পাচ্ছে না যে কোন ভাষায় সান্তনা দেবে?
সবাই চুপ, ঘরে এখন নিস্তব্ধতা, যেন শ্মশানের শান্তি। নিজেকে সামলে নিয়ে অভয় তার মা কে জিজ্ঞাসা করল, "মা অজয় আর অর্পিতা কোথায়?" মা বলল পাশের ঘরে আছে।
পাশের ঘরে গিয়ে অভয় যে দৃশ্য দেখল তা ওকে যেন চাবুকের মতো আঘাত করল। এই দৃশ্য যতটাই করুন ততটাই মর্মান্তিক আর ততটাই হৃদয়স্পর্শী। দেখল ছোট্ট অর্পিতার কোলে অজয় শুয়ে শুয়ে কাঁদছে মাকে চাই বলে আর অর্পিতা তার দাদার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে আদো আদো গলায় বলছে, "কাঁদিস না দাদা, মা নেই তো কি হয়েছে? আমি তো আছি। আমি তোকে ঘুম পাড়িয়ে দেব।"
এই দৃশ্য অভয়কে নাড়িয়ে দিল। সে মনে মনে অপরাজিতার উদ্দেশ্যে বলল, "দেখো, দেখো। এই পাঁচ বছরের শিশুটারও মনে মমতার উদ্রেক হয়েছে তা তোমার ভিতরে নেই। নাহ্, তুমি নারী নও, নারীরূপী কোনো মায়াবীনি।

ফেরাতে হাল ফিরুক লাল

ফেরাতে হাল ফিরুক লাল                             উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী কাস্তে হাতুরি তারা হোক সিংহ, ধানের শীষ, কোদাল বেলচা কিংবা তারা - ভ...