পৃষ্ঠাসমূহ

মঙ্গলবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৩

মানুষ যখন মানুষ ছিল

মানুষ যখন মানুষ ছিল
                উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী 

মানুষ যখন মানুষ ছিল-
সবাই তখন মানুষ ছিল;
ধর্ম যখন জন্ম নিল-
কেউ মুসলিম কেউ হিন্দু হলো।

মানুষ যখন মানুষ ছিল-
গরু, শুয়োর সব পশু ছিল;
ধর্ম যখন জন্ম নিল-
কেউ মা কেউ হারাম হলো।

মানুষ যখন মানুষ ছিল-
কর্ম তখন ধর্ম ছিল;
ধর্ম যখন জন্ম নিল-
কর্ম কোথায় হারিয়ে গেল।

মানুষ যখন মানুষ ছিল-
পশুর মাংসে তৃপ্ত ছিল;
ধর্ম যখন জন্ম নিল-
মানুষের মাংস মানুষ খেলো।

শুক্রবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৩

প্রকৃতির মরন কামড়

প্রকৃতির মরন কামড়
                    উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

পাথর কেটে, পাহাড় ভেঙে করতে হবে উন্নয়ন-
সংবিধানের বিশেষ ধারা করা হল তাই উত্তোলন।
খরস্রোতা নদীর বুকে তৈরী দেখো বিশাল বাঁধ,
বাজল ডঙ্কা উন্নয়নের কাঁধের সাথে লাগিয়ে কাঁধ।
পর্যটনে আনতে বিপ্লব হচ্ছে হোটেল, রাস্তা-ঘাট;
চাই নতুন জনবসতি, আজ জঙ্গল তাই খোলা মাঠ।
ভূগোল-বিজ্ঞান ভরেনা পকেট, পুঁজিবাদীর পুঁজি চাই;
বাস্তুতন্ত্রের শ্রাদ্ধ করে আইন বদল হলো তাই।
হিমালয়ের বুক চিরে এগিয়ে গেছে সুরঙ্গ পথ!
উন্নয়নের প্রবল চাপে ধ্বংস-মুখি এ জগৎ।
সভ্যতার হচ্ছে বিকাশ ধ্বংস করে প্রকৃতি-
দিচ্ছে এখন মরন কামড়, জোশীমঠের নেই নিষ্কৃতি।

জবাব দাও

জবাব দাও
         উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

বিশ্বের বৃহৎ গণতন্ত্র
গর্ব মোদের ভারি,
কেউবা চড়ে সোনার রথে,
কেউ পায়না শব-গাড়ি।
এক শতাংশ লোক খাচ্ছে
দেশটা লুটেপুটে
বাকীরা সব চুষছে আঙুল
খাচ্ছে ধান খুঁটে।
বিশ্বসেরা ধনীদের সব
এই দেশেতেই বাস,
ছেলের কাঁধে মায়ের শব
লজ্জায় মুখ লুকাস।
রক্তচোষা বাদুড় ওরা
চোষে গরীবের রক্ত,
ইনকিলাবের আসছে ডাক
মুষ্ঠি করো শক্ত।
বঞ্চনা আর কতোদিন-
জবাব দাও সরকার,
থাকলে চুপ এই‌ জনতাই
বুঝে নেবে তার অধিকার।

শুক্রবার, ২১ অক্টোবর, ২০২২

বঞ্চিতদের হাহাকার

বঞ্চিতদের হাহাকার
        উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

টেট পরীক্ষায় করেও পাশ
পায়নি যারা হকের চাকরি,
তাদেরই এই আন্দোলন,
আর তাতেই যত মারামারি।

ঘুষটা যদি পারত দিতে
ওরাও পেত চাকরির মজা।
যায়নি ওরা অসৎ পথে,
সেই অপরাধেই পাচ্ছে সাজা!

মুখটা তোলো, তাকিয়ে দেখো
বঞ্চিতদের হাহাকার,
পাষাণ মনে জাগাও মায়া,
নামের করো সুবিচার।

মধ্যরাতে পুলিশ দিয়ে-
করলে ওদের লাঠিপেটা!
থাকবে মনে এসব কিছুই,
ইতিহাসে থাকবে লেখা।

যতই তোমরা মারবে ওদের-
শক্ত হবে মুষ্ঠি খানা।
রাষ্ট্রের পোষা গুণ্ডা তুমি,
পুলিশ তোমায় জানাই ঘৃণা।

শনিবার, ২৫ জুন, ২০২২

তোমার পানে চেয়েছিলেম

তোমার পানে চেয়েছিলেম
             উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

শিশির ভেজা শীতের ভোরে-
তোমায় আমি দেখেছিলেম।
উলের বোনা চাদর গায়ে,
বসেছিলে ঘাসের পরে।
দূর হতে বিভোর ভাবে
তোমার পানে চেয়েছিলেম।

বোশেখ মাসের তপ্ত দিনে-
তোমায় আবার দেখেছিলেম।
ছায়ার খোঁজে ছাতার নিচে
বসেছিলে বাসের তরে।
রোদ-চশমার আড়াল হতে
তোমার পানে চেয়েছিলেম।

শ্রাবনের সেই বাদল দিনে
তোমার দেখা পেয়েছিলেম।
বৃষ্টি-ভেজা তুমি তখন
ময়ূর পেখম মেলেছিলে।
তোমার নাচে মত্ত আমি
তোমার পানে চেয়েছিলেম।

সাদা ফুলে কাশের বনে-
তোমায় শেষ দেখেছিলেম।
হলুদ শাড়ি এলো চুলে-
কাত্যায়নী সাজে এলে,
অবুঝ মনে সেই শেষ
তোমার পানে চেয়েছিলেম।

সোমবার, ২০ জুন, ২০২২

একটু ভেবে দেখো

একটু ভেবে দেখো
         উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

কেউ বলে ধর্ম যুদ্ধ,
কেউ বলে জিহাদ।
মানুষের রক্তে রাঙা
বক ধার্মিকদের হাত।

ধর্ম গ্রন্থ বিকৃত আজ-
মগজধোলাই কল,
'ধার্মিক'দের ষড়যন্ত্রে
বিশ্ব জোড়া কোলাহল।

গরুর মাংসে যায় জাত,
আর শুয়োরের মাংস হারাম।
মানুষের মাংস মানুষ খেলে
হয় ধর্মের খুব নাম।

মন্দির ভাঙো, মূর্তি ভাঙো
জিহাদ তাকেই বলে।
ধর্ম যুদ্ধে মরে 'আখলাক'
গরুর মাংস খেলে।

খালি পেটে মারো কিল
দাড়ি-টিকিদের কি দায়?
কেমনে ভরবে তোমার পেট
ওদের বয়েই যায়।

ধর্ম-ধর্ম-ধর্ম করো
ধর্মে কি ভরে পেট?
খাটলে তবে জুটবে ভাত
কেউ দেবে না ভেট।

হিন্দুর শত্রু মুসলিম আর
মুসলিমের শত্রু খ্রীষ্টান,
সবার শত্রু নাস্তিক গোটায়
বক ধার্মিকদের দোকান।

তোমায় যে ধর্ম শেখায়,
তোমায় ক্ষেপিয়ে তোলে-
তার সন্তান রাজপুত্র,
পড়ে বিদেশি ইস্কুলে।

দিওনা পা ওদের জালে,
ইতিহাস থেকে শেখো।
সভ্যতাকে বাঁচাতে তাই
একটু ভেবে দেখো।

বুধবার, ১৫ জুন, ২০২২

পুত্র দায়গ্রস্থ পিতা

পুত্র দায়গ্রস্থ পিতা
               উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

শোনো তোমায় শোনাই আমি
এক ভীষণ মজার কথা,
একটি গাঁয়ে থাকেন এক
পুত্র দায়গ্রস্থ পিতা।
মেয়ের বাবা এলেন গাঁয়ে
পাকা কথা কইতে,
ছেলের চাকরি হলো কবে
চাইলেন তা জানতে।
ছেলের বাবার গর্ব ভীষণ
বলেন ছাতি মেলে,
"বছর চারেক হলো চাকরি-
হীরের টুকরো ছেলে।"
চমকে উঠে মেয়ের বাবা
বলেন, "দাঁড়ান মশাই,
এই চাকরি থাকবে কিনা
জানে শুধু সিবিআই।
ছেলের আপনার চাকরি যদি
বাম আমলে হতো
চোখ বুজে চারটি হাত-
এক করা যেত।"
ছেলের বাবার মাথায় পড়ল
আকাশ খানা ভেঙে,
বিয়ের বাজারে ছেলের মূল্য
গেছে এতো নেমে!
মূল্য তার নামতে নামতে
হয়েছে এখন শূণ্য,
ঘুষের চাকরি করেছে তার
পাপের ঘড়া পূর্ণ।
ধাক্কা ছিল ভীষণ জোরে,
জবাব দিয়েছে সময়-
গভীর শোকে ছেলের বাবা
চলে গেলেন কোমায়।

বুধবার, ৮ জুন, ২০২২

রোদ্দুর রায়

রোদ্দুর রায়
         উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

হাত পেতে যে ঘুষ নিয়ে
বুক ফুলিয়ে বেড়ায় ঘুরে,
চোখটি বুজে, কানটি চেপে-
জেতাও ভোটে তোমরা তারে।

ঘৃণার বাণী ছড়ায় যারা-
দাঙ্গা লাগায় এক নিমিষে,
আইনসভার আসনগুলো
আলো করে তারাই বসে।

প্রতিবাদের নাম রোদ্দুর রায়
হয়তো সে প্রান্তিক।
বিদ্রোহের আগুন তারই বুকে-
জ্বলছে সদাই ধিক-ধিক। 

ভদ্র ভাষার প্রতিবাদ
রাষ্ট্র কানে তোলে না,
বধির এই রাষ্ট্রকে
ধাক্কা না দিলে জাগে না।

বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধি যখন
সরকারের ঘরে জমা,
রোদ্দুররা তখনই আসে,
কাউকে করেনা ক্ষমা।

ডাকাত নেতা পরলে ধরা
উডবার্নে নেয় আশ্রয়,
রোদ্দুররা হাসতে হাসতে
কারাগারে ঢুকে যায়।

প্রতিবাদের ঐ আগুন রেখো
তোমার ভিতর জ্বলে।
রোদ্দুর রায় তোমায় সেলাম-
রাষ্ট্রের ঘুম ভাঙিয়ে দিলে।

শুক্রবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২২

বঙ্গাব্দের সূচনা করেন কে- রাজা শশাঙ্ক নাকি সম্রাট আকবর? - বিতর্কের নিষ্পত্তি!

বঙ্গাব্দের সূচনা করেন কে- রাজা শশাঙ্ক নাকি সম্রাট আকবর? - বিতর্কের নিষ্পত্তি!
                           উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী


বঙ্গাব্দের সূচনা বিষয়টি একটি বিতর্কিত বিষয় কারণ কেউ কেউ বলেন বঙ্গাব্দ গণনা শুরু করেছিলেন বাংলার রাজা শশাঙ্ক আবার কেউ কেউ বলেন আকবর এর শুরু করেছিলেন। বিভিন্ন ইতিহাসবিদ এ নিয়ে তাঁদের ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। প্রত্যেকের যুক্তিই প্রায় অকাট্য।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক কিংশুক চ্যাটার্জি বিবিসি বাংলাকে বলেন, "শশাঙ্কর আমলে তো বাংলা ভাষাটাই চালু হয়নি। কাজেই তিনি বাংলার জন্য আলাদা অব্দ বা সাল চালু করেছিলেন এটা ভাবাটা বেশ বাড়াবাড়ি। বরং ইতিহাসে আমাদের বলে, মুঘল বাদশাহ আকবর বাংলা জয় করার পর এখানে একটি প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছিলেন। তারা যখন দেখলেন বাংলা থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য একটা ক্যালেন্ডার দরকার, আর সেটাকে হিন্দু শকাব্দর সঙ্গে সংযুক্ত না করে বরং মুসলিম হিজরীর সঙ্গে কানেক্ট করেই ক্যালিব্রেট করা যাক। খুব সম্ভবত সেভাবেই আকবরের দূতরা বঙ্গাব্দ চালু করে গিয়েছিলেন।"

কিন্তু আকবর তো বাংলা দখল করেন ১৫৭৬-য়ে রাজমহলের যুদ্ধ জিতে তার আগে বাংলায় কোনো বর্ষ গণনা পদ্ধতি চালু ছিল না তা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।

যাঁরা বলেন যে শশাঙ্কই বঙ্গাব্দের প্রবর্তক তাঁদের একটি যুক্তি, শশাঙ্কের মোটামুটি ভাবে ৫৯০ থেকে ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে রাজত্ব করেন বলে ধারণা করা হয়। আবার খ্রীষ্টাব্দের সাথে বঙ্গাব্দের পার্থক্য ৫৯৩ বছর, অর্থাৎ বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয় ৫৯৩ খ্রীষ্টাব্দে। ইতিহাসবিদদের মতে জুলীয় বর্ষপঞ্জির বৃহস্পতিবার ১৮ মার্চ ৫৯৪ এবং গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির শনিবার ২০ মার্চ ৫৯৪ বঙ্গাব্দের সূচনা হয়েছিল। সুতরাং বঙ্গাব্দের সূচনা যে শশাঙ্কের রাজত্বকালেই শুরু হয়েছিল সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।

তবে এটাও ঐতিহাসিক ভাবে প্রমানিত যে বাংলা দখলের পর আকবর অনুভব করলেন যে হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে এখানে কাজ করতে অসুবিধা হচ্ছে কারন হিজরী পঞ্জিকা চান্দ্র মাসের উপর নির্ভরশীল। চান্দ্র মাস অর্থাৎ চাঁদ পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষীণ করতে যে সময় নেয় (২৯.৫৩ দিন)। এই হিসেবে এক বছর হয় ৩৫৪ দিনে। কিন্তু সূর্য মাস ধরে বছর হয় ৩৬৫ দিনে। ঋতু পরিবর্তনও হয় সূর্যের সাপেক্ষে পৃথিবীর অবস্থানের উপর ভিত্তি করে এখানে চাঁদের কোন ভূমিকা নেই। আর চাষ আবাদ তো ঋতুর ভিত্তিতেই হয়। তাই সম্রাট আকবর বাংলার জন্য একটি সৌর পঞ্জিকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তাই আকবর ইরান থেকে আগত বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে হিজরী চান্দ্র বর্ষপঞ্জিকে সৌর বর্ষপঞ্জিতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব প্রদান করেন। ফতুল্লাহ শিরাজীর সুপারিশে পারস্যে  প্রচলিত ফার্সি বর্ষপঞ্জির অনুকরণে ৯৯২ হিজরী মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আকবর নতুন বর্ষপঞ্জি ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ বা ‘ইলাহী সন’ চালু করেন। তবে তিনি ঊনত্রিশ বছর পূর্বে তার সিংহাসন আরোহণের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এজন্য ৯৬৩ হিজরী সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। ৯৬৩ হিজরী সালের মুহররম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস, এজন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং ১লা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান এবং ভারতীয় শিক্ষাবিদ নিতীশ সেনগুপ্তের মতে বাংলা বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি পরিষ্কার নয়। এই উৎপত্তিতে ইসলামী প্রভাব ও বৌদ্ধ বা হিন্দু প্রভাব দুইই থাকতে পারে।

শামসুজ্জামান খান বলেন, “একে বাংলা সন বা সাল বলা হয়। এই সন ও সাল হল যথাক্রমে আরবী ও ফারসী শব্দ। এটা নির্দেশ করছে এগুলো মুসলিম রাজা বা সুলতান কর্তৃক বাংলায় পরিচিত করানো হয়”। অন্যদিকে নিতীশ সেনগুপ্ত বলেন, এর ঐতিহ্যগত নামটি হল বঙ্গাব্দ। আকবরের সময় এই বর্ষপঞ্জিকে বলা হত তারিখ-ই-ইলাহি। বর্ষপঞ্জির তারিখ-ই-ইলাহি ভারশনে, প্রতিটি দিন এবং মাসের আলাদা আলাদা নাম ছিল, আর এখন যে মাসের নামগুলো দেখা যাচ্ছে তারিখ-ই-ইলাহিতে এরকম মাসের নামের বদলে অন্য মাসের নাম ছিল।

আকবরের সময়ের অনেক শতক আগে নির্মিত দুটি শিব মন্দিরে বঙ্গাব্দ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়। আর এটাই নির্দেশ করে, আকবরের সময়ের আরও অনেক আগেও বাংলা বর্ষপঞ্জির অস্তিত্ব ছিল।

ইতিহাসবিদরা একে অপরের যুক্তি খণ্ডন করার পরিবর্তে যদি একে অপরের যুক্তিগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করেন তবেই এই বিতর্কের অবসান হয়ে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে।

বিভিন্ন ইতিহাসবিদ তথা শিক্ষাবিদের লেখা পড়ে ও তাঁদের যুক্তি ও তথ্য বিশ্লেষণ করে বঙ্গাব্দের সূচনা সম্পর্কে আমার যে ধারনা তৈরী হয়েছে তা হলো, রাজা শশাঙ্কের আমল থেকেই বঙ্গাব্দের গণনা শুরু হয়েছিল তবে পরবর্তীকালে বাংলায় আকবর প্রেরিত কমিটি খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য তাতে কিছু অদল-বদল করে বঙ্গাব্দের পুনর্বিন্যাস করেন, যা আজও চলছে।

সুতরাং বঙ্গাব্দের কৃতিত্ব শশাঙ্ক ও আকবর উভয়কেই দেওয়া উচিৎ বলে আমি মনে করি।

তথ্যসূত্র: গুগল, উইকিপিডিয়া, বিবিসি বাংলা

শনিবার, ৫ মার্চ, ২০২২

যুদ্ধ নয়, শান্তি দাও

যুদ্ধ নয়, শান্তি দাও
                  উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

চারিদিকে আগুনের লেলিহান শিখা, বারুদের কটু গন্ধ-
একটানা বেজে চলেছে উদ্ধারকারী গাড়ির সাইরেন,
বিভিশিখাময় দেশটা জুড়ে আজ স্বজন হারানোর হাহাকার,
মাঝেমধ্যেই সব ছাপিয়ে ধেয়ে আসছে বিস্ফোরণে শব্দ।
দূরে ঝলসানো পুতুল হাতে দাঁড়িয়ে এক শিশু কন্যা!
অশ্রুহীন অপলক চোখ দুটিতে যেন একরাশ প্রশ্ন।
মৃত সন্তান কোলে ছুটে আসছে এক অভাগা মা,
আকাশ ভেদি কান্না তার ওদের কানে পৌঁছায় না।
ঐদিকে বিলাপরতা এক যুবতী, তার প্রেমিকের খোঁজে-
যাকে বিদায় জানিয়েছিল যুদ্ধের আগে আলিঙ্গন করে।
রাস্তার পাশে বসে এক দৃষ্টিহীন অশীতিপর বৃদ্ধ-
একমাত্র অবলম্বন তার পুত্র যে করতে গেছে যুদ্ধ।
ক'দিন আগেও ছিল সাজানো বাগানের মতো সবই-
ঝকঝকে রাস্তাঘাট, সারি-সারি ঘরবাড়ি, ঠিক যেন জলছবি।
আজ সে সব অতীত, সব ইঁট-কাঠ-পাথরের ধ্বংসস্তূপ,
কঙ্কালসার চেহারায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বহুতলগুলো।
ধ্বংস লিলা শেষে বন্ধ হবে যুদ্ধ বিমানের কোলাহল,
আর আকাশে ভিড় করবে রাশি রাশি শকুনের দল।
নাহ্, এই দৃশ্য আমরা দেখতে চাই না, হে রাষ্ট্রনেতাগণ-
তোমাদের কোটি টাকার বোমার আঘাতে অসহায় নিরীহ জনগণ।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা হয়েছে ধ্বংস; যুদ্ধবাজ নেতারা হোক নির্বংশ।
যুদ্ধে কারই বা ক্ষতি, কার হয় লাভ, কার পুণ্য আর কে করে পাপ?
চাইনা সেসব হিসেব নিকেশ, চাইনা কোনো অজুহাত-
যুদ্ধ নয়, শান্তি দাও, সাজানো দেশটাকে ফিরিয়ে দাও।

      ছবি সৌজন্যে: Google Image Search

বুধবার, ৫ জানুয়ারি, ২০২২

প্রতিদান

প্রতিদান
          উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

ব্যারিকেড, কাঁটাতার, ছিল জল কামান,
রাস্তায় পেরেক পুঁতে করেছিলে আহ্বান।
ওরা মোদের অন্নদাতা, নয় কোনো সন্ত্রাসী,
ওদের পথ আটকাতে ছিলে ভীষণ আগ্রাসী।
কতো নিষ্পাপ-নিরীহ প্রাণ নিয়েছ তুমি কেড়ে-
কনকনে ঠান্ডায় কামানের জলের তোরে।
ভুলে গেছ সেই অন্ধকারময় দিনগুলো?
অনেক হয়েছে! এবার ঐ মুখোশ খুলে ফেলো।
আজ যারা তোমার পথে দিয়েছে আটকে-
কুর্নিশ তাদের, কুর্নিশ জানাই তাদের বীরত্বকে।
বিফলতার ক্রোধে তুমি কাঁদছ কুমিরের কান্না!
তোমার মুখোশ খুলে গেছে, ওতে চিঁড়ে ভিজবে না।
তুমি ওদের আটকাতে নিয়ছিলে সাতশ প্রাণ!
গণতান্ত্রিক পথে ওরা দিল তারই প্রতিদান।

শুক্রবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২১

গান্ধী-মূর্তীর পাদদেশে

গান্ধী-মূর্তীর পাদদেশে
            উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী


সেদিন বৈকালে গান্ধী-মূর্তীর পাদদেশে
বেশকিছু মানুষের জমায়েত দেখে
এগিয়ে গেলাম, দেখলাম মঞ্চ
আলো করে ধোপ দুরস্তুর রাজবেসে
বক্তৃতা করছে এক নেতা। কুঁচি খানি পকেটে,
পোডিয়ামে মাইক্রফোন, উন্নত তর্জনি;
সততা আর নৈতিকতার গল্প বলছে সে।
বক্তৃতা মন কাড়ল, আর একটু এগিয়ে গেলাম।
নেতার মুখটা খুব চেনা, কোথায় যেন দেখেছি!
হ্যাঁ মনে পড়েছে, টিভিতে গত জানুয়ারি মাসে
ওকেই তো দেখেছিলাম ঘুষ নিতে হাত পেতে!
হায় ঈশ্বর! এতো নির্লজ্জ হতে পারে এরা!
এ কিনা দেয় নৈতিকতার পাঠ! এখানে এসে!
এখানে এরা প্রতিদিন আসে, ভাষণ দেয়-
ভাড়ার ভির জড়ো হয়, তালিও পায়;
লোকে দেখে এই নাটক আর হাসে।
হে গান্ধী, মোদের করো ক্ষমা, মোরা অভাগা
চোরেরা করে শাসন তোমার এই দেশ 
আর যারা দিল বলিদান তারা বঞ্চিত শেষে!
ওরা জানে ওদের কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা
কেউ শুনবে না তাদের কোনো কথা
তাই দল বাঁধে এইখানে, গান্ধী-মূর্তীর পাদদেশে।

বৃহস্পতিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২১

মহারাজের দরবার

মহারাজের দরবার
                   উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

বোর্ডের প্রধান হলেন দাদা,
কোচ রাহুল দ্রাবিড়,
এনসিএ-তে লক্ষণ এলেন,
সাথে স্বর্ণ-যুগ ফের।

দাদার দলে ছিলেন-
আরও রথী-মহারথী,
কুম্বলে, শচীন, জাহির খান-
আসবে সবাই সত্যি

বাকী রইলেন ভাজ্জু, যুবি,
কাইফ, সহবাগ
ওদের জন্যও তৈরী আছে
দাদার সাজানো বাগ।

শৈশবটা আবার ফিরে
পেলাম একবার
তারই সাথে এলো ফিরে
মহারাজের দরবার।

বুধবার, ৩ নভেম্বর, ২০২১

নিরোর রাজ্য

নিরোর রাজ্য
              উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

রোমের রাজা নিরো ছিলেন
                        অতি বড় নির্দয়,
রাজ্যে আগুন লাগিয়ে দিয়ে
                    মজতেন বেহালায়।
এমনই এক নিরোর রাজ্যে
                        করি মোরা বাস,
মানুষ যেথায় মূল্যহীন
                        জীবন হাসফাস।

কর্মহীন রাজ্যে রানীর
                        অন্ন জোটা দায়!
জ্বলছে রাজ্য, পুড়ছে জীবন
                          রাণীর কি যায়?
কর্ম প্রার্থী রাজ্যবাসী
                            সারমেয় সম,
খুন-ডাকাতি সবই মাফ
                     রাণীর হাত থামো।

৬০০ ভরি সোনায় মোরা
                       মা কালির মূর্তি!
উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে
                কেষ্টার বেজায় ফুর্তি।
অর্থাভাবের রাজ্য যেথায়
                     মানুষ ভুখা মরে,
মাটির মূর্তি সেজে ওঠে-
            তিন কোটির অলঙ্কারে।

হে ঈশ্বর এই অনাচার
                     চলবে কতোদিন?
গরীব কেন খেতে পায় না,
                      শিক্ষিত কর্মহীন?
তোমার চোখে সবাই সমান,
                      তবু কেন বৈষম্য?
ইনকিলাবই দিন ফেরাবে,
                     চাই লড়াই অদম্য।

বুধবার, ২০ অক্টোবর, ২০২১

'ধর্ম'-যুদ্ধ

'ধর্ম'-যুদ্ধ
           উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী 

মন্দিরেতে গো-মাংস-
গেল-গেল রব,
ধরা পড়ল হিন্দু যুবক-
নাম তার ভৈরভ।

মূর্তির পায়ে কোরান শরীফ-
হিন্দু নিধন চালায়,
ইকবাল শেষে পড়ল ধরা,
ফায়দা তোলে নেতায়।

মসজিদ ভাঙলে হিন্দুর কি?
মন্দির ভাঙলে মুসলমানের?
তোমরা যদি লড়াই করো-
লাভ হবে শয়তানের।

আম জনতার ধর্ম নেই,
জীবন তাদের যুদ্ধ।
মৌলবাদী ও রাজনেতাদের-
বিনাশ হোক শিকড় সুদ্ধ।

শুক্রবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২১

ধর্ম

           ধর্ম
                   উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

জাতের রং চিনি না আমি, চোখে দেখিনি ধর্ম,
সবার উপরে মানুষ সত্য, মানবিকতাই বর্ম।
মানুষ হয়ে জন্মেছি আমি মনুষ্যত্বের পাহারাদার-
ধর্ম-জাতের ব্যাপারিরা জ্বলে-পুড়ে হোক ছাড়খাড়।

তোমার ধর্ম নরসংহার, আমার ধর্ম প্রেম,
নৃশংসতার পুজারি তুমি, শেম তোমায় শেম।
মানবতার ধারক যে, ধর্ম তাকেই কয়-
নৃশংসতা তোমার নেশা, তা ধর্ম মোটেই নয়।

আল্লাহ নাকি মহাশক্তিমান, ভগবান সৃষ্টিকর্তা!
তোমরা নাকি তাদের রক্ষক, এতোটাই স্পর্ধা!
আল্লাহর নামে মন্দির ভাঙ্গ, রামের নামে মসজিদ,
নিজের ঘরেই অসহায় তারা, দাঙ্গাবাজদের জিত।

যেদিন তোমার ঘর পুড়বে, জ্বলবে তোমার শহর,
তোমার পাশে মানুষই পাবে দাঁড়াবে না কোনো ঈশ্বর।
তাইতো বলি বিভেদ ভুলে মানুষকে করো আপন-
মানুষের পাশে মানুষ থাকবে, দেখি সেই দিনের স্বপন।

বৃহস্পতিবার, ১ জুলাই, ২০২১

প্রযুক্তিগত বেকারত্ব : মানুষের জন্য প্রযুক্তি নাকি প্রযুক্তির জন্য মানুষ?

প্রযুক্তিগত বেকারত্ব : মানুষের জন্য প্রযুক্তি নাকি প্রযুক্তির জন্য মানুষ? 

উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী 


আমাদের সময়ে মাধ্যমিকে বাংলা পরীক্ষায় প্রবন্ধ রচনার একটা খুব সাধারণ বিষয় ছিল 'বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ'। কম বেশি আমরা প্রত্যেকেই এই বিষয়ের উপর রচনা লিখেছি। সেই রচনা লিখতে গিয়ে পরমাণু বিস্ফোড়নের মতো বিজ্ঞানের কিছু কালো দিক যেমন তুলে ধরতাম তেমনই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানব জীবনকে কতটা সহজ করে দিয়েছে তা প্রমাণ করার একটা আপ্রাণ চেষ্টাও থাকত। কারণ আমাদের সেটাই শেখানো হতো। এর বাইরে কিছু ভাবার তেমন অবকাশ বোধহয় আমাদের কারোর তেমন ছিল না। চলুন ছোটবেলায় এই বিষয়ে না ভাবার প্রসঙ্গ গুলোর মধ্যে একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ নিয়ে আজ আলোচনা করি। প্রসঙ্গটা হল- প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার কিভাবে মানুষের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সংকুচিত করে দিচ্ছে এক কথায় প্রযুক্তিগত বেকারত্ব এবং এর ফল কি হতে পারে তা নিয়েও আলোচনা করবো। 

"প্রযুক্তিগত বেকারত্ব" শব্দটি 1930-এর দশকে জন মেইনার্ড কেইন জনপ্রিয় করেছিলেন। প্রযুক্তি ছাড়া মানব জীবন অচল একথা সত্য। মানুষ যেদিন আগুন জ্বালাতে শিখেছে সেদিন থেকেই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এরপর ধীরে ধীরে চাকা আবিষ্কার হয়েছে, ধাতব অস্ত্র আবিষ্কার হয়েছে, মানুষ ঘর-বাড়ি বানাতে শিখেছে, বিভিন্ন যন্ত্র থেকে যানবাহন ইত্যাদির মধ্য দিয়ে মানুষ আজকেই এই তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবের যুগে এসে পৌঁছেছে। মানুষ নিজের সুবিধার্থে প্রযুক্তিকে প্রতিনিয়ত ব্যাবহার করে এসেছে। প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার যেমন এই গ্রহের আবহাওয়া-জলবায়ু, বাস্তুতন্ত্র তথা সামগ্রিক পরিবেশের ক্ষতি করেছে তেমনই ধীরে ধীরে মানুষের সামনে হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছিল সামগ্রিকভাবে মানবসমাজের উপকারের জন্য এবং একটা সময় পর্যন্ত প্রযুক্তি মানুষের বন্ধুই ছিল কিন্তু কম্পিউটার আবিষ্কারের পর থেকে সম্পর্কের এই সমীকরণটা বদলাতে থাকে। একটা কম্পিউটার একটা নির্দিষ্ট সময়ে একসাথে অনেক মানুষের কাজ করে দিতে সক্ষম এবং এর পিছনে খরচও প্রায় নগণ্য, ফলে উৎপাদন ক্ষেত্র সহ বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের বদলে কম্পিউটার ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে থাকে ফলে ধীরে ধীরে কর্ম সংস্থানের সুযোগ কম থাকে। বিভিন্ন সময় এর বিরুদ্ধ প্রতিবাদ হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন নেতা ও সংগঠন (বিশেষত বামপন্থী সংগঠনগুলো) এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। সত্তরের দশকের শুরুতে ভারতবর্ষে প্রথম কম্পিউটারের আগমন হয়। এই দশকের শেষে ও আশির দশকের শুরুতে ভারত সরকার ব্যাঙ্কিং সেক্টরে কম্পিউটা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে এই ক্ষেত্রে অন্তত ২৩% কর্মসংস্থান হ্রাস হবার পরিস্থিতি তৈরী হয় যার বিরুদ্ধে বিভিন্ন বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি আন্দোলনে নামে, তৎকালীন জনতা দলও ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেছিলেন, "আমি কম্পিউটারের বিরুদ্ধে নই, আমি সেই কম্পিউটারের বিরোধী যে মানুষের অন্ন কেড়ে নেয়।" তবে আশির দশকেই প্রথম নয়, প্রযুক্তিগত বেকারত্ব তার আগেও ছিল। লেখক গ্রেগরি ওরোলের মতে, প্রযুক্তিগত বেকারত্বের ঘটনাটি অন্তত চাকা আবিষ্কার হওয়ার পর থেকেই সম্ভবত বিদ্যমান ছিল। রোমান সম্রাট ভেস্পাসিয়ান তাঁর পারিষদদের কতৃক প্রস্তাবিত ভারী পণ্যের স্বল্প ব্যয়ে পরিবহনের একটি নতুন পদ্ধতিকে অনুমোদন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিলেন, "আপনাদের অবশ্যই আমার দরিদ্র পরিবহন শ্রমিকদের রুটি উপার্জন করতে দিতে হবে।" ষোড়শ শতকের শেষে ইংল্যান্ডের রাণী প্রথম এলিজাবেথ উইলিয়াম লি কে তাঁর আবিষ্কৃত সেলাই মেশিনের পেটেন্ট দিতে অস্বীকার করেন এবং বলেন, "একবার ভেবে দেখেছেন আপনার এই আবিষ্কার আমার গরীব প্রজাদের কতো ক্ষতি করবে? প্রজাদের রোজগার কেড়ে নিয়ে তাদের ভিক্ষুক বানিয়ে ছাড়বে।" 

এই কম্পিউটারের আরও আধুনিক রূপ হলো রোবট, যা মানুষের জন্য আরও ঘাতক হয়ে দেখা দিয়েছে। আমরা যেমন আজকাল শুনছি যে করোনা ভাইরাস জিনগত অভিযোজন করে নিজেকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে ঠিক তেমনই কম্পিউটার অভিযোজিত হয়ে রোবটের রূপ নিয়েছে যা মানুষের ভবিষ্যতকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে। গত ১৬ই জানুয়ারি 'টাইমস অব ইন্ডিয়া'-তে প্রকাশিত একটা প্রতিবেদন অনুযায়ী তথ্যপ্রযুক্তির শিল্পে রোবট ব্যাবহারের কারণে ২০২২ সালের মধ্যে ঐ শিল্পে অন্তত ৩০ লক্ষ কর্মী ছাঁটাই হবে (পড়ুন) এর ফলে তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলো দশ হাজার কোটি ডলার অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করবে। এক একটি রোবট সাতজন দক্ষ কর্মীর কাজ করতে পারে বলে খবরে বলা হয়েছে। এই তথ্যটা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দিচ্ছে। এই প্রসঙ্গে গান্ধীজি বলেছিলেন, "আমি যন্ত্রের বিরোধী নই তবে যন্ত্র ব্যাবহারের পাগলামির বিরোধী। এই পাগলামির জন্য একসময় হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে, মানুষ না খেতে পেয়ে মরে রাস্তায় পরে থাকবে।" গান্ধীয়ান অর্থনীতিতে বলা হয়েছে যে যতদিন না বেকারত্ব সমস্যার সমাধান হয় ততদিন শ্রম সাশ্রয় মেশিন ব্যাবহারে আপত্তি জানায়। যদিও নেহরু এই মতকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেন। 

একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিগত বেকারত্ব বাড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, অক্সফোর্ড অধ্যাপক কার্ল বেনেডিক্ট ফ্রে এবং মাইকেল ওসবার্ন অনুমান করেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 47 শতাংশ চাকরি স্বয়ংক্রিয়তার জন্য ঝুঁকিতে রয়েছে (👉এই বইটির পিডিএফ কিনতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন)। ২০১৭ ২০১৩ সালে ওয়্যার্ড পত্রিকার (Wired (Magazine)) একটি প্রতিবেদন (পড়ুন) অর্থনীতিবিদ জিন স্পার্লিং এবং পরিচালনা অধ্যাপক অ্যান্ড্রু ম্যাকাফি হিসাবে জ্ঞানীদের উদ্ধৃত করে লিখেছে যে স্বয়ংক্রিয়তার ব্যবহারের ফলে বর্তমান ও আসন্ন কর্মসংস্থানের যে ক্ষতি হবে তা সামলানো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে চলেছে। প্রযুক্তিগত বেকারত্বের ফলাফল অতি মারাত্মক হতে চলেছে। প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে মালিক পক্ষ যেমন বহুগুণ মুনাফা কামাচ্ছে তেমন শ্রমজীব মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। এক দিকে একদল মানুষ যখন নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে অপর দিকে গুটিকয়েক ব্যাবসায়ীর সম্পত্তি দিন দিন ফুলে ফেঁপে উঠছে। ফলে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যটা প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে দেখা দিচ্ছে। ভারতের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ মানুষ এ দেশের জাতীয় সম্পদের ৭৭ শতাংশের অধিকারী (পড়ুন)। এই একটি তথ্যই ভারতবর্ষের অর্থনীতিকে নগ্ন করে দেয়। এই ভাবে চলতে থাকলে, ধৈর্য্যের বাঁধ একবার ভেঙ্গে গেলে এক সময় না কর্মহীন ক্ষুধার্ত কোটি কোটি মানুষ ক্ষোভে, দুঃখে, পেটের জ্বালায় মরিয়া হয়ে কয়েকশো কোটিপতি ব্যাবসায়ীকে আক্রমণ করবে। শুরু হবে এক ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধ, যা সামলানো কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব হবে না।

এই ভয়ঙ্কর পরিনতি থেকে বাঁচতে দেশ, ভৌগলিক সীমা ভুলে সারা বিশ্বের নেতৃত্বকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। প্রযুক্তি অবশ্যই দরকার কিন্তু যদি মানুষ নাই বাঁচে তাহলে প্রযুক্তি নিয়ে হবে কি? তাই প্রযুক্তির ব্যবহার ও কর্মসংস্থানের সুযোগ এই দায়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন একজন ব্যবসায়ী মুনাফার সবটা নিয়ে চলে না যায়। সরকারকে আইন করে কোনো সংস্থার বার্ষিক লেনদেন ও ঐ সংস্থাতে কর্মরত শ্রমিক বা কর্মচারীদের একটা অনুপাত নির্দিষ্ট করে দিতে হবে তবে যদি এই সমস্যার কিছুটা অন্তত সুরাহা হয়। 

তথ্যসূত্র: গুগল, উইকিপিডিয়া

বৃহস্পতিবার, ২০ মে, ২০২১

রাজা তুমি ছাড়ো গোদি

রাজা তুমি ছাড়ো গোদি
                 উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

অতিমারির অতি ধাক্কায়,
দেশটা যখন যায় গাড্ডায়,
রাজা মোদের নিরো, সে-
'মনের কথা' দেশকে শোনায়।
কে শুনবে প্রজার কথা?
রাজার তাতে কি এসে যায়?

ওষুধ, টীকা নেইকো হেথায়,
শ্বাসটুকুও আজ নেওয়া দায়,
বেডের অভাব হাসপাতালে,
দেশটা গেল রসাতলে।
ঘরে-ঘরে শুধু কান্নার রোল-
খালি কতো মায়ের কোল।

ছোঁয়াচ বাঁচাতে দেশে তালা
প্রাণে বাঁচতে পেটেও তালা
কাজ বন্ধ, ব্যাবসা লাটে
প্রজারা সব খালি পেটে
বন্ধ আজ সব কারবার
রাজ গড়ছেন রাজদরবার।

বালির চড়ে পোঁতা লাস
রাজা তুমি ভীষন বদমাশ।
আধ পোড়া সব মৃতদেহ-
খুবলে খায় সারমেয়।
লাস ভর্তি গঙ্গা নদী,
রাজা তুমি ছাড়ো গোদি।

শনিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২১

ট্রেলার রিভিউ : রাধে

ট্রেলার রিভিউ : রাধে
           উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

            রাধে সিনেমার পোস্টার

না, এটা ঠিক 'মুভি রিভিউ' নয়, সিনেমার রিভিউ দেওয়ার মতো বোদ্ধা আমি নই। কিন্তু সলমন খানের আগামী সিনেমা 'রাধে'-র ট্রেলার দেখার পর আমার মনের ভাবটা প্রকাশ না করে থাকতে পারলাম না।

অনেকের মতোই আমিও দীর্ঘদিন ধরেই এই সিনেমাটার অপেক্ষায় ছিলাম। তবে আমি 'ভাইজান'-র প্রথম দর্শনে সিটি দিয়ে পুরো হল মাথায় করে নেওয়ার মতো কোনো ভাইজান-ভক্ত নই কিন্তু সলমনের সিনেমা আমার বেশ লাগে, ফুল অফ এন্টারটেনমেন্ট। আড়াই-তিন ঘন্টা সিনেমার মজা নাও, হল থেকে বেড়িয়ে ভুলে যাও, ব্যাস। সলমনের সিনেমা যেমন মনে দাগ কাটে না তেমন এতটুকু বোর করে না, 'যুবরাজ' (২০০৮) ছাড়া। তাই আমি সাধারণত মিস করি না।

গত ২২ তারিখ রিলিজ করেছে সলমন খান, দিশা পাটানি, রণদীপ হুড্ডা অভিনীত আসন্ন সিনেমা 'রাধে'-র ট্রেলার। ছবিটি পরিচালনা করেছেন প্রভুদেবা, প্রযোজনায় আছেন সোহেল খান, অতুল অগ্নিহোত্রি ও সলমন নিজে। ট্রেলারটা দেখলাম এবং কোনো ভনিতা না করে প্রথমেই বলে দিই আমার বিন্দুমাত্র ভালো লাগে নি। ট্রেলার দেখে এটা কখনোই সলমন খানের লেবেলের সিনেমা বলে আমার মনে হয়নি। অনেকের মতে এই সিনেমাটা 'ওয়ান্টেড'-র সিকুয়াল, আমারও তাইই মনে হয়েছে। যদিও নির্মাতারা তা মানতে রাজী নন। এই গল্পটা ২০১৭র দক্ষিণ কোরিয়ার সিনেমা 'দ্যা আউটলস'-এর থেকে নেওয়া হয়েছে। দ্যা আউটলস একটি সত্য ঘটনার উপর নির্ভর করে তৈরী সিনেমা যেখানে দেখানো হয়েছিল যে একটি শহরে ড্রাগের দু নম্বরি ব্যাবসা বেড়ে যায় ফলে প্রতিদিন প্রচুর ক্রাইম হতে থাকে, সেই ক্রাইম বন্ধ করার দায়িত্ব পরে এক পুলিশ অফিসারের উপর। তিনি তাঁর নিজস্ব কায়দায় সেই সমস্যার সমাধান করেন। রাধের গল্পও মোটামুটি একই বলে মনে হচ্ছে। ট্রেলারে 'সিটি মার' বলে যে গানটা ব্যাবহার করা হয়েছে সেটা তেলুগু সিনেমা 'ডিজে' (২০১৭) তে ব্যাবহার করা একটি গানের হিন্দি রিমেক। 

এবার আসি আমার কথায়, ট্রেলার দেখে আমার কি মনে হয়েছে। আমি আগেই বলেছি আমার বিন্দুমাত্র ভালো লাগেনি। ডায়লগগুলো অত্যন্ত জঘন্য, যেন যা হয় উটপটাং একটা বলে দিতে পারলেই হলো। এমনকি সলমনের পুরনো সিনেমার ডায়ালগও ব্যাবহার করা হয়েছে। যে সলমন হিট হিট সব ডায়লগ জন্ম দেন তিনি কেন তাঁর পুরনো ডায়ালগ ব্যাবহার করছেন? তবে কি তাঁর মধ্যে ফ্লপ করার কোনো ভয় কাজ করছে? নির্মাতাদের বোঝা উচিৎ যে একই ডায়ালগের পুনঃ ব্যাবহার কিন্তু মানুষকে বোর করতে পারে, যা থেকে সিনেমা ফ্লপ করার সম্ভাবনা তৈরী হয়। ট্রেলারের এক মিনিট দুই সেকেন্ডে একটি দৃশ্যে নায়ক (সলমন) নায়িকা (দিশা পাটানি)কে তার নাম জিজ্ঞাসা করছে, জবাবে নায়িকা জানাল যে তার নাম দিয়া, উত্তরে নায়ক বলল যখনই তার কোনো বোন হবে তার নাম রাখবেন 'নাদিয়া'। এগুলো কি ধরনের ডায়লগ? কে লেখে এসব? সিলিম সাহেব এগুলো দেখলে নিশ্চিত ভাবেই ব্যথিত হবেন। ৫০-৫৪ সেকেন্ডে একটা ডায়লগ আছে , "আগর আব কোয়ি আগে বারা তো উসকা ব্লাডার কে জাগা ফেপরা হোগা অউর লিভার কে জাগা কিডনি", আর এই ডায়লগটা শেষ হলে সলমনের পেছনে ভিড় করে থাকা লোক জনের রিএক্সন দেওয়ার কথা কিন্তু ডায়লগটা শেষ হওয়ার আগেই তারা রিএক্ট করে দেয়। এতো বড় ব্যানারের ছবিতে এই ধরনের টেকনিক্যাল ভুল কি করে হয়? এই ভুলতো পরিচালকের দক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দেয়! দিশার অভিনয়ে আমি কোনো সাবলীলতা পাই নি, যেন একটু ন্যাকামী বেশি। যদিও দু মিনিটের ট্রেলার দেখে এটা বলা হয়তো ঠিক নয়। তবে ভিলেনের চরিত্রে রণদীপ হুড্ডাকে আমার বেশ লেগেছে। রণদীপের জন্য সিনেমাটা দেখতেই হবে।

'রাধে'-র ট্রেলারকে আমি পাঁচের মধ্যে আড়াই দেবো।

এখন অপেক্ষা ১৩ই মে, ২০২১র যেদিন বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহের সাথে জি৫ ওটিটিতে রিলিজ করবে 'রাধে'।

বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল, ২০২১

তোমার বিকাশ - আমার বিকাশ

তোমার বিকাশ - আমার বিকাশ
                          উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

তোমার মডেল, তোমার বিকাশ
ঐ উচ্চতম মূর্তি -
আমার মডেল, আমার বিকাশ
সিলিন্ডার অক্সিজেন ভর্তি।

তোমার মডেল, তোমার বিকাশ
মন্দির খানা মস্ত -
আমার মডেল, আমার বিকাশ
স্বাস্থ্য-শিক্ষার সুবন্দোবস্ত।

তোমার মডেল, তোমার বিকাশ
ঢংঢং ঘন্টা মন্দিরের -
আমার মডেল, আমার বিকাশ
মিষ্টি শব্দ কারখানার সাইরেনের।

তোমার মডেল, তোমার বিকাশ
ধর্মের নামে খুনোখুনি -
আমার মডেল, আমার বিকাশ
অভুক্ত পেটের কথা শুনি।

তোমার মডেল, তোমার বিকাশ
লাশেরও জাত খোঁজে -
আমার মডেল, আমার বিকাশ
শুধু মানবতার ভাষাই বোঝে।

তোমার মডেল, তোমার বিকাশ
'নিজেরটা নিজে বুঝে নিন' -
আমার মডেল, আমার বিকাশ
গরীবের শ্রমজীবী ক্যান্টিন।

তোমার মডেল, তোমার বিকাশ
মিথ্যা বুলি ঝুড়িঝুড়ি -
আমার মডেল, আমার বিকাশ
সরকারে নাও থাকি, তবু কাজ করি।

তোমার মডেল, তোমার বিকাশ
তোমার কাছেই ঝাপসা।
আমার মডেল, আমার বিকাশ
মানুষের আশা-ভরসা।

ফেরাতে হাল ফিরুক লাল

ফেরাতে হাল ফিরুক লাল                             উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী কাস্তে হাতুরি তারা হোক সিংহ, ধানের শীষ, কোদাল বেলচা কিংবা তারা - ভ...