পৃষ্ঠাসমূহ

বৃহস্পতিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২১

মহারাজের দরবার

মহারাজের দরবার
                   উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

বোর্ডের প্রধান হলেন দাদা,
কোচ রাহুল দ্রাবিড়,
এনসিএ-তে লক্ষণ এলেন,
সাথে স্বর্ণ-যুগ ফের।

দাদার দলে ছিলেন-
আরও রথী-মহারথী,
কুম্বলে, শচীন, জাহির খান-
আসবে সবাই সত্যি

বাকী রইলেন ভাজ্জু, যুবি,
কাইফ, সহবাগ
ওদের জন্যও তৈরী আছে
দাদার সাজানো বাগ।

শৈশবটা আবার ফিরে
পেলাম একবার
তারই সাথে এলো ফিরে
মহারাজের দরবার।

বুধবার, ৩ নভেম্বর, ২০২১

নিরোর রাজ্য

নিরোর রাজ্য
              উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

রোমের রাজা নিরো ছিলেন
                        অতি বড় নির্দয়,
রাজ্যে আগুন লাগিয়ে দিয়ে
                    মজতেন বেহালায়।
এমনই এক নিরোর রাজ্যে
                        করি মোরা বাস,
মানুষ যেথায় মূল্যহীন
                        জীবন হাসফাস।

কর্মহীন রাজ্যে রানীর
                        অন্ন জোটা দায়!
জ্বলছে রাজ্য, পুড়ছে জীবন
                          রাণীর কি যায়?
কর্ম প্রার্থী রাজ্যবাসী
                            সারমেয় সম,
খুন-ডাকাতি সবই মাফ
                     রাণীর হাত থামো।

৬০০ ভরি সোনায় মোরা
                       মা কালির মূর্তি!
উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে
                কেষ্টার বেজায় ফুর্তি।
অর্থাভাবের রাজ্য যেথায়
                     মানুষ ভুখা মরে,
মাটির মূর্তি সেজে ওঠে-
            তিন কোটির অলঙ্কারে।

হে ঈশ্বর এই অনাচার
                     চলবে কতোদিন?
গরীব কেন খেতে পায় না,
                      শিক্ষিত কর্মহীন?
তোমার চোখে সবাই সমান,
                      তবু কেন বৈষম্য?
ইনকিলাবই দিন ফেরাবে,
                     চাই লড়াই অদম্য।

বুধবার, ২০ অক্টোবর, ২০২১

'ধর্ম'-যুদ্ধ

'ধর্ম'-যুদ্ধ
           উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী 

মন্দিরেতে গো-মাংস-
গেল-গেল রব,
ধরা পড়ল হিন্দু যুবক-
নাম তার ভৈরভ।

মূর্তির পায়ে কোরান শরীফ-
হিন্দু নিধন চালায়,
ইকবাল শেষে পড়ল ধরা,
ফায়দা তোলে নেতায়।

মসজিদ ভাঙলে হিন্দুর কি?
মন্দির ভাঙলে মুসলমানের?
তোমরা যদি লড়াই করো-
লাভ হবে শয়তানের।

আম জনতার ধর্ম নেই,
জীবন তাদের যুদ্ধ।
মৌলবাদী ও রাজনেতাদের-
বিনাশ হোক শিকড় সুদ্ধ।

শুক্রবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২১

ধর্ম

           ধর্ম
                   উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

জাতের রং চিনি না আমি, চোখে দেখিনি ধর্ম,
সবার উপরে মানুষ সত্য, মানবিকতাই বর্ম।
মানুষ হয়ে জন্মেছি আমি মনুষ্যত্বের পাহারাদার-
ধর্ম-জাতের ব্যাপারিরা জ্বলে-পুড়ে হোক ছাড়খাড়।

তোমার ধর্ম নরসংহার, আমার ধর্ম প্রেম,
নৃশংসতার পুজারি তুমি, শেম তোমায় শেম।
মানবতার ধারক যে, ধর্ম তাকেই কয়-
নৃশংসতা তোমার নেশা, তা ধর্ম মোটেই নয়।

আল্লাহ নাকি মহাশক্তিমান, ভগবান সৃষ্টিকর্তা!
তোমরা নাকি তাদের রক্ষক, এতোটাই স্পর্ধা!
আল্লাহর নামে মন্দির ভাঙ্গ, রামের নামে মসজিদ,
নিজের ঘরেই অসহায় তারা, দাঙ্গাবাজদের জিত।

যেদিন তোমার ঘর পুড়বে, জ্বলবে তোমার শহর,
তোমার পাশে মানুষই পাবে দাঁড়াবে না কোনো ঈশ্বর।
তাইতো বলি বিভেদ ভুলে মানুষকে করো আপন-
মানুষের পাশে মানুষ থাকবে, দেখি সেই দিনের স্বপন।

বৃহস্পতিবার, ১ জুলাই, ২০২১

প্রযুক্তিগত বেকারত্ব : মানুষের জন্য প্রযুক্তি নাকি প্রযুক্তির জন্য মানুষ?

প্রযুক্তিগত বেকারত্ব : মানুষের জন্য প্রযুক্তি নাকি প্রযুক্তির জন্য মানুষ? 

উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী 


আমাদের সময়ে মাধ্যমিকে বাংলা পরীক্ষায় প্রবন্ধ রচনার একটা খুব সাধারণ বিষয় ছিল 'বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ'। কম বেশি আমরা প্রত্যেকেই এই বিষয়ের উপর রচনা লিখেছি। সেই রচনা লিখতে গিয়ে পরমাণু বিস্ফোড়নের মতো বিজ্ঞানের কিছু কালো দিক যেমন তুলে ধরতাম তেমনই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানব জীবনকে কতটা সহজ করে দিয়েছে তা প্রমাণ করার একটা আপ্রাণ চেষ্টাও থাকত। কারণ আমাদের সেটাই শেখানো হতো। এর বাইরে কিছু ভাবার তেমন অবকাশ বোধহয় আমাদের কারোর তেমন ছিল না। চলুন ছোটবেলায় এই বিষয়ে না ভাবার প্রসঙ্গ গুলোর মধ্যে একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ নিয়ে আজ আলোচনা করি। প্রসঙ্গটা হল- প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার কিভাবে মানুষের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সংকুচিত করে দিচ্ছে এক কথায় প্রযুক্তিগত বেকারত্ব এবং এর ফল কি হতে পারে তা নিয়েও আলোচনা করবো। 

"প্রযুক্তিগত বেকারত্ব" শব্দটি 1930-এর দশকে জন মেইনার্ড কেইন জনপ্রিয় করেছিলেন। প্রযুক্তি ছাড়া মানব জীবন অচল একথা সত্য। মানুষ যেদিন আগুন জ্বালাতে শিখেছে সেদিন থেকেই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এরপর ধীরে ধীরে চাকা আবিষ্কার হয়েছে, ধাতব অস্ত্র আবিষ্কার হয়েছে, মানুষ ঘর-বাড়ি বানাতে শিখেছে, বিভিন্ন যন্ত্র থেকে যানবাহন ইত্যাদির মধ্য দিয়ে মানুষ আজকেই এই তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লবের যুগে এসে পৌঁছেছে। মানুষ নিজের সুবিধার্থে প্রযুক্তিকে প্রতিনিয়ত ব্যাবহার করে এসেছে। প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার যেমন এই গ্রহের আবহাওয়া-জলবায়ু, বাস্তুতন্ত্র তথা সামগ্রিক পরিবেশের ক্ষতি করেছে তেমনই ধীরে ধীরে মানুষের সামনে হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছিল সামগ্রিকভাবে মানবসমাজের উপকারের জন্য এবং একটা সময় পর্যন্ত প্রযুক্তি মানুষের বন্ধুই ছিল কিন্তু কম্পিউটার আবিষ্কারের পর থেকে সম্পর্কের এই সমীকরণটা বদলাতে থাকে। একটা কম্পিউটার একটা নির্দিষ্ট সময়ে একসাথে অনেক মানুষের কাজ করে দিতে সক্ষম এবং এর পিছনে খরচও প্রায় নগণ্য, ফলে উৎপাদন ক্ষেত্র সহ বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের বদলে কম্পিউটার ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে থাকে ফলে ধীরে ধীরে কর্ম সংস্থানের সুযোগ কম থাকে। বিভিন্ন সময় এর বিরুদ্ধ প্রতিবাদ হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন নেতা ও সংগঠন (বিশেষত বামপন্থী সংগঠনগুলো) এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। সত্তরের দশকের শুরুতে ভারতবর্ষে প্রথম কম্পিউটারের আগমন হয়। এই দশকের শেষে ও আশির দশকের শুরুতে ভারত সরকার ব্যাঙ্কিং সেক্টরে কম্পিউটা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে এই ক্ষেত্রে অন্তত ২৩% কর্মসংস্থান হ্রাস হবার পরিস্থিতি তৈরী হয় যার বিরুদ্ধে বিভিন্ন বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি আন্দোলনে নামে, তৎকালীন জনতা দলও ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেছিলেন, "আমি কম্পিউটারের বিরুদ্ধে নই, আমি সেই কম্পিউটারের বিরোধী যে মানুষের অন্ন কেড়ে নেয়।" তবে আশির দশকেই প্রথম নয়, প্রযুক্তিগত বেকারত্ব তার আগেও ছিল। লেখক গ্রেগরি ওরোলের মতে, প্রযুক্তিগত বেকারত্বের ঘটনাটি অন্তত চাকা আবিষ্কার হওয়ার পর থেকেই সম্ভবত বিদ্যমান ছিল। রোমান সম্রাট ভেস্পাসিয়ান তাঁর পারিষদদের কতৃক প্রস্তাবিত ভারী পণ্যের স্বল্প ব্যয়ে পরিবহনের একটি নতুন পদ্ধতিকে অনুমোদন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিলেন, "আপনাদের অবশ্যই আমার দরিদ্র পরিবহন শ্রমিকদের রুটি উপার্জন করতে দিতে হবে।" ষোড়শ শতকের শেষে ইংল্যান্ডের রাণী প্রথম এলিজাবেথ উইলিয়াম লি কে তাঁর আবিষ্কৃত সেলাই মেশিনের পেটেন্ট দিতে অস্বীকার করেন এবং বলেন, "একবার ভেবে দেখেছেন আপনার এই আবিষ্কার আমার গরীব প্রজাদের কতো ক্ষতি করবে? প্রজাদের রোজগার কেড়ে নিয়ে তাদের ভিক্ষুক বানিয়ে ছাড়বে।" 

এই কম্পিউটারের আরও আধুনিক রূপ হলো রোবট, যা মানুষের জন্য আরও ঘাতক হয়ে দেখা দিয়েছে। আমরা যেমন আজকাল শুনছি যে করোনা ভাইরাস জিনগত অভিযোজন করে নিজেকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে ঠিক তেমনই কম্পিউটার অভিযোজিত হয়ে রোবটের রূপ নিয়েছে যা মানুষের ভবিষ্যতকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে। গত ১৬ই জানুয়ারি 'টাইমস অব ইন্ডিয়া'-তে প্রকাশিত একটা প্রতিবেদন অনুযায়ী তথ্যপ্রযুক্তির শিল্পে রোবট ব্যাবহারের কারণে ২০২২ সালের মধ্যে ঐ শিল্পে অন্তত ৩০ লক্ষ কর্মী ছাঁটাই হবে (পড়ুন) এর ফলে তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলো দশ হাজার কোটি ডলার অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করবে। এক একটি রোবট সাতজন দক্ষ কর্মীর কাজ করতে পারে বলে খবরে বলা হয়েছে। এই তথ্যটা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দিচ্ছে। এই প্রসঙ্গে গান্ধীজি বলেছিলেন, "আমি যন্ত্রের বিরোধী নই তবে যন্ত্র ব্যাবহারের পাগলামির বিরোধী। এই পাগলামির জন্য একসময় হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বে, মানুষ না খেতে পেয়ে মরে রাস্তায় পরে থাকবে।" গান্ধীয়ান অর্থনীতিতে বলা হয়েছে যে যতদিন না বেকারত্ব সমস্যার সমাধান হয় ততদিন শ্রম সাশ্রয় মেশিন ব্যাবহারে আপত্তি জানায়। যদিও নেহরু এই মতকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেন। 

একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি গবেষণায় বলা হয়েছে যে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিগত বেকারত্ব বাড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, অক্সফোর্ড অধ্যাপক কার্ল বেনেডিক্ট ফ্রে এবং মাইকেল ওসবার্ন অনুমান করেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 47 শতাংশ চাকরি স্বয়ংক্রিয়তার জন্য ঝুঁকিতে রয়েছে (👉এই বইটির পিডিএফ কিনতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন)। ২০১৭ ২০১৩ সালে ওয়্যার্ড পত্রিকার (Wired (Magazine)) একটি প্রতিবেদন (পড়ুন) অর্থনীতিবিদ জিন স্পার্লিং এবং পরিচালনা অধ্যাপক অ্যান্ড্রু ম্যাকাফি হিসাবে জ্ঞানীদের উদ্ধৃত করে লিখেছে যে স্বয়ংক্রিয়তার ব্যবহারের ফলে বর্তমান ও আসন্ন কর্মসংস্থানের যে ক্ষতি হবে তা সামলানো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে চলেছে। প্রযুক্তিগত বেকারত্বের ফলাফল অতি মারাত্মক হতে চলেছে। প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে মালিক পক্ষ যেমন বহুগুণ মুনাফা কামাচ্ছে তেমন শ্রমজীব মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছে। এক দিকে একদল মানুষ যখন নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে অপর দিকে গুটিকয়েক ব্যাবসায়ীর সম্পত্তি দিন দিন ফুলে ফেঁপে উঠছে। ফলে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যটা প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে দেখা দিচ্ছে। ভারতের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ মানুষ এ দেশের জাতীয় সম্পদের ৭৭ শতাংশের অধিকারী (পড়ুন)। এই একটি তথ্যই ভারতবর্ষের অর্থনীতিকে নগ্ন করে দেয়। এই ভাবে চলতে থাকলে, ধৈর্য্যের বাঁধ একবার ভেঙ্গে গেলে এক সময় না কর্মহীন ক্ষুধার্ত কোটি কোটি মানুষ ক্ষোভে, দুঃখে, পেটের জ্বালায় মরিয়া হয়ে কয়েকশো কোটিপতি ব্যাবসায়ীকে আক্রমণ করবে। শুরু হবে এক ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধ, যা সামলানো কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব হবে না।

এই ভয়ঙ্কর পরিনতি থেকে বাঁচতে দেশ, ভৌগলিক সীমা ভুলে সারা বিশ্বের নেতৃত্বকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। প্রযুক্তি অবশ্যই দরকার কিন্তু যদি মানুষ নাই বাঁচে তাহলে প্রযুক্তি নিয়ে হবে কি? তাই প্রযুক্তির ব্যবহার ও কর্মসংস্থানের সুযোগ এই দায়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন একজন ব্যবসায়ী মুনাফার সবটা নিয়ে চলে না যায়। সরকারকে আইন করে কোনো সংস্থার বার্ষিক লেনদেন ও ঐ সংস্থাতে কর্মরত শ্রমিক বা কর্মচারীদের একটা অনুপাত নির্দিষ্ট করে দিতে হবে তবে যদি এই সমস্যার কিছুটা অন্তত সুরাহা হয়। 

তথ্যসূত্র: গুগল, উইকিপিডিয়া

বৃহস্পতিবার, ২০ মে, ২০২১

রাজা তুমি ছাড়ো গোদি

রাজা তুমি ছাড়ো গোদি
                 উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

অতিমারির অতি ধাক্কায়,
দেশটা যখন যায় গাড্ডায়,
রাজা মোদের নিরো, সে-
'মনের কথা' দেশকে শোনায়।
কে শুনবে প্রজার কথা?
রাজার তাতে কি এসে যায়?

ওষুধ, টীকা নেইকো হেথায়,
শ্বাসটুকুও আজ নেওয়া দায়,
বেডের অভাব হাসপাতালে,
দেশটা গেল রসাতলে।
ঘরে-ঘরে শুধু কান্নার রোল-
খালি কতো মায়ের কোল।

ছোঁয়াচ বাঁচাতে দেশে তালা
প্রাণে বাঁচতে পেটেও তালা
কাজ বন্ধ, ব্যাবসা লাটে
প্রজারা সব খালি পেটে
বন্ধ আজ সব কারবার
রাজ গড়ছেন রাজদরবার।

বালির চড়ে পোঁতা লাস
রাজা তুমি ভীষন বদমাশ।
আধ পোড়া সব মৃতদেহ-
খুবলে খায় সারমেয়।
লাস ভর্তি গঙ্গা নদী,
রাজা তুমি ছাড়ো গোদি।

শনিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২১

ট্রেলার রিভিউ : রাধে

ট্রেলার রিভিউ : রাধে
           উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

            রাধে সিনেমার পোস্টার

না, এটা ঠিক 'মুভি রিভিউ' নয়, সিনেমার রিভিউ দেওয়ার মতো বোদ্ধা আমি নই। কিন্তু সলমন খানের আগামী সিনেমা 'রাধে'-র ট্রেলার দেখার পর আমার মনের ভাবটা প্রকাশ না করে থাকতে পারলাম না।

অনেকের মতোই আমিও দীর্ঘদিন ধরেই এই সিনেমাটার অপেক্ষায় ছিলাম। তবে আমি 'ভাইজান'-র প্রথম দর্শনে সিটি দিয়ে পুরো হল মাথায় করে নেওয়ার মতো কোনো ভাইজান-ভক্ত নই কিন্তু সলমনের সিনেমা আমার বেশ লাগে, ফুল অফ এন্টারটেনমেন্ট। আড়াই-তিন ঘন্টা সিনেমার মজা নাও, হল থেকে বেড়িয়ে ভুলে যাও, ব্যাস। সলমনের সিনেমা যেমন মনে দাগ কাটে না তেমন এতটুকু বোর করে না, 'যুবরাজ' (২০০৮) ছাড়া। তাই আমি সাধারণত মিস করি না।

গত ২২ তারিখ রিলিজ করেছে সলমন খান, দিশা পাটানি, রণদীপ হুড্ডা অভিনীত আসন্ন সিনেমা 'রাধে'-র ট্রেলার। ছবিটি পরিচালনা করেছেন প্রভুদেবা, প্রযোজনায় আছেন সোহেল খান, অতুল অগ্নিহোত্রি ও সলমন নিজে। ট্রেলারটা দেখলাম এবং কোনো ভনিতা না করে প্রথমেই বলে দিই আমার বিন্দুমাত্র ভালো লাগে নি। ট্রেলার দেখে এটা কখনোই সলমন খানের লেবেলের সিনেমা বলে আমার মনে হয়নি। অনেকের মতে এই সিনেমাটা 'ওয়ান্টেড'-র সিকুয়াল, আমারও তাইই মনে হয়েছে। যদিও নির্মাতারা তা মানতে রাজী নন। এই গল্পটা ২০১৭র দক্ষিণ কোরিয়ার সিনেমা 'দ্যা আউটলস'-এর থেকে নেওয়া হয়েছে। দ্যা আউটলস একটি সত্য ঘটনার উপর নির্ভর করে তৈরী সিনেমা যেখানে দেখানো হয়েছিল যে একটি শহরে ড্রাগের দু নম্বরি ব্যাবসা বেড়ে যায় ফলে প্রতিদিন প্রচুর ক্রাইম হতে থাকে, সেই ক্রাইম বন্ধ করার দায়িত্ব পরে এক পুলিশ অফিসারের উপর। তিনি তাঁর নিজস্ব কায়দায় সেই সমস্যার সমাধান করেন। রাধের গল্পও মোটামুটি একই বলে মনে হচ্ছে। ট্রেলারে 'সিটি মার' বলে যে গানটা ব্যাবহার করা হয়েছে সেটা তেলুগু সিনেমা 'ডিজে' (২০১৭) তে ব্যাবহার করা একটি গানের হিন্দি রিমেক। 

এবার আসি আমার কথায়, ট্রেলার দেখে আমার কি মনে হয়েছে। আমি আগেই বলেছি আমার বিন্দুমাত্র ভালো লাগেনি। ডায়লগগুলো অত্যন্ত জঘন্য, যেন যা হয় উটপটাং একটা বলে দিতে পারলেই হলো। এমনকি সলমনের পুরনো সিনেমার ডায়ালগও ব্যাবহার করা হয়েছে। যে সলমন হিট হিট সব ডায়লগ জন্ম দেন তিনি কেন তাঁর পুরনো ডায়ালগ ব্যাবহার করছেন? তবে কি তাঁর মধ্যে ফ্লপ করার কোনো ভয় কাজ করছে? নির্মাতাদের বোঝা উচিৎ যে একই ডায়ালগের পুনঃ ব্যাবহার কিন্তু মানুষকে বোর করতে পারে, যা থেকে সিনেমা ফ্লপ করার সম্ভাবনা তৈরী হয়। ট্রেলারের এক মিনিট দুই সেকেন্ডে একটি দৃশ্যে নায়ক (সলমন) নায়িকা (দিশা পাটানি)কে তার নাম জিজ্ঞাসা করছে, জবাবে নায়িকা জানাল যে তার নাম দিয়া, উত্তরে নায়ক বলল যখনই তার কোনো বোন হবে তার নাম রাখবেন 'নাদিয়া'। এগুলো কি ধরনের ডায়লগ? কে লেখে এসব? সিলিম সাহেব এগুলো দেখলে নিশ্চিত ভাবেই ব্যথিত হবেন। ৫০-৫৪ সেকেন্ডে একটা ডায়লগ আছে , "আগর আব কোয়ি আগে বারা তো উসকা ব্লাডার কে জাগা ফেপরা হোগা অউর লিভার কে জাগা কিডনি", আর এই ডায়লগটা শেষ হলে সলমনের পেছনে ভিড় করে থাকা লোক জনের রিএক্সন দেওয়ার কথা কিন্তু ডায়লগটা শেষ হওয়ার আগেই তারা রিএক্ট করে দেয়। এতো বড় ব্যানারের ছবিতে এই ধরনের টেকনিক্যাল ভুল কি করে হয়? এই ভুলতো পরিচালকের দক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দেয়! দিশার অভিনয়ে আমি কোনো সাবলীলতা পাই নি, যেন একটু ন্যাকামী বেশি। যদিও দু মিনিটের ট্রেলার দেখে এটা বলা হয়তো ঠিক নয়। তবে ভিলেনের চরিত্রে রণদীপ হুড্ডাকে আমার বেশ লেগেছে। রণদীপের জন্য সিনেমাটা দেখতেই হবে।

'রাধে'-র ট্রেলারকে আমি পাঁচের মধ্যে আড়াই দেবো।

এখন অপেক্ষা ১৩ই মে, ২০২১র যেদিন বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহের সাথে জি৫ ওটিটিতে রিলিজ করবে 'রাধে'।

বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল, ২০২১

তোমার বিকাশ - আমার বিকাশ

তোমার বিকাশ - আমার বিকাশ
                          উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

তোমার মডেল, তোমার বিকাশ
ঐ উচ্চতম মূর্তি -
আমার মডেল, আমার বিকাশ
সিলিন্ডার অক্সিজেন ভর্তি।

তোমার মডেল, তোমার বিকাশ
মন্দির খানা মস্ত -
আমার মডেল, আমার বিকাশ
স্বাস্থ্য-শিক্ষার সুবন্দোবস্ত।

তোমার মডেল, তোমার বিকাশ
ঢংঢং ঘন্টা মন্দিরের -
আমার মডেল, আমার বিকাশ
মিষ্টি শব্দ কারখানার সাইরেনের।

তোমার মডেল, তোমার বিকাশ
ধর্মের নামে খুনোখুনি -
আমার মডেল, আমার বিকাশ
অভুক্ত পেটের কথা শুনি।

তোমার মডেল, তোমার বিকাশ
লাশেরও জাত খোঁজে -
আমার মডেল, আমার বিকাশ
শুধু মানবতার ভাষাই বোঝে।

তোমার মডেল, তোমার বিকাশ
'নিজেরটা নিজে বুঝে নিন' -
আমার মডেল, আমার বিকাশ
গরীবের শ্রমজীবী ক্যান্টিন।

তোমার মডেল, তোমার বিকাশ
মিথ্যা বুলি ঝুড়িঝুড়ি -
আমার মডেল, আমার বিকাশ
সরকারে নাও থাকি, তবু কাজ করি।

তোমার মডেল, তোমার বিকাশ
তোমার কাছেই ঝাপসা।
আমার মডেল, আমার বিকাশ
মানুষের আশা-ভরসা।

সোমবার, ২৯ মার্চ, ২০২১

বুদ্ধবাবু শুনছেন?

বুদ্ধবাবু শুনছেন?
                 উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

বুদ্ধবাবু কি শুনতে পাচ্ছেন?
যারা চেয়েছিল রক্তের ছিটে দিতে-
আপনার ওই সাদা ধুতিতে,
আজ তারাই নিজেদের মুখোশ
ছিঁড়ছে নিজেরাই; আপনি নির্দোষ।

বুদ্ধবাবু আপনি কি শুনছেন?
বাংলার মানুষ আজ বুঝে গেছে,
ষড়যন্ত্রের সব গিঁট খুলে গেছে।
মিথ্যার বুনিয়েদে গড়ে ওঠা ইমারত,
সত্যের চাপে হবেই একদিন ধুলিস্যাৎ।

বুদ্ধবাবু আপনি তো জানেন-
পুকুরের জল নাকি রক্তে লাল,
নাহ্, কেউ দেখেনি কখনো সেই জল,
লরি ভর্তি রাশি রাশি লাসের বোঝা,
নিখোঁজের তালিকা আজও বৃথা খোঁজা।

বুদ্ধবাবু আপনি জিতে গেছেন।
ওনার কথা লাগেনা আপনাকে জেতাতে,
এ সব কথাই লেখা আছে সিবিআই-নথিতে।
প্রমাণিত সব কিছু, আইন দিয়েছে মুক্তি,
জনসমক্ষে এলো আজ অপরাধীর স্বীকারোক্তি।

সোমবার, ১৫ মার্চ, ২০২১

বেসরকারি পরিষেবা

বেসরকারি পরিষেবা
                উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী 

গুপ্তিপাড়ার গুপ্তবাবু মানুষটি ভারি খাসা,
কার্পণ্য অলঙ্কার তাঁর, মাথায় কূটবুদ্ধি ঠাসা।
রামগোরুরের ছানার মতো হাসতে তাঁরও মানা,
'সন্তুষ্টি' শব্দটি তাঁর অভিধানে পাওয়া যায় না।
স্ত্রী, পুত্র, কন্যা থেকে ঝি চাকর আর মুনিষ,
পানটি থেকে চুনটি খসলেই হয়ে যাবে 'ফিনিশ'।

অসন্তুষ্ট বাবু আমার সরকারিকরণে চটা,
কথায় কথায় দেন বাবু পরিষেবার খোঁটা।
ক'দিন আগে টাকা তুলতে ব্যাঙ্কে গেলেন বাবু,
রোদ্দুর মাথায় লাইনের পিছনে দাঁড়িয়ে হলেন কাবু।
ঘর্মাক্ত, বিরক্ত বাবু বাড়ি ফিরলেন হেঁটে,
"বেসরকারি হলে পরিষেবা হতো ভালো বটে"।

এই তো সেদিন বাবুমশাই গেছিলেন কোলকাতা,
ট্রেনে চড়ে উঠলেন বাবু, টিকিট ভারি সস্তা।
ঘন্টা দুয়েকের রাস্তা তাঁর লাগল চার ঘন্টা,
এই বয়সে এতো ধকল! ভেঙ্গে গেল মনটা।
ক্রুদ্ধ বাবু 'যুদ্ধ' শেষে ফেটে পড়লেন ভারি,
"বেসরকারি হলে ভালো পরিষেবা পেতে পারি"।

এমনই সময় বিশ্ব গেল অতিমারির অতলে,
গুপ্তবাবুুও পড়লেন শেষে করোনার কবলে।
পুত্র তাঁর ভর্তি করলেন বেসরকারি হাসপাতালে,
ক্রুদ্ধ বাবু গর্জে উঠলেন, গেল সব রসাতলে।
পরিষেবার নামে ওরা করবে আমার শোষন,
চুলোয় যাক বেসরকারি হোক জাতীয়করণ।

রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

বাম-কং জোট ও কিছু কথা

বাম-কং জোট ও কিছু কথা
                         উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

ভারতবর্ষের রাজনীতিতে বামপন্থীরা ও কংগ্রেসীরা যেন দুই মেরুর বাসিন্দা। নীতি ও আদর্শগত ভাবে এদের একে অপরের থেকে কয়েক যোজন দূরে অবস্থান। কিন্তু এতো বৈষম্য সত্ত্বেও আজকের দিনে এই দুই রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী এক ছাতার তলায় এসে দাঁড়িয়েছে, বলা ভালো পরিবর্তিত পরিস্থিতি এদের এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। মজার বিষয় হলো স্বাধীনতার আগে বামপন্থীরা অনেক ক্ষেত্রেই কংগ্রেসের ভিতরে থেকেই কাজ করতেন, তবে স্বাধীনতার আগের কংগ্রেস আর পরের কংগ্রেসের মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে। যাই হোক, বর্তমান রাজনীতির আকাশে এহেন বাম-কং জোট নিয়ে বহু বিতর্কও আছে। হার্ডকোর বামপন্থীরা বা হার্ডকোর কংগ্রেসীরা এই জোট মেনে নিতে পারেন নি, সেই সাথে তৃতীয়ত পক্ষের কটাক্ষ তো আছেই। আমি এই তৃতীয়ত পক্ষ নামক 'বস্তু'টিকে কোনো গুরুত্বই দিচ্ছি না। আমার এই লেখা সেই সমস্ত হার্ডকোর বাম ও কং সমর্থকদের উদ্দেশ্যে যারা এই জোটকে মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না।

ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত কেউ সপ্নেও বামফ্রন্ট আর কংগ্রেসকে এক (রাজনৈতিক) মঞ্চে দেখে নি। কিন্তু সম্পর্কের এই শীতলতা ক্রমশ কমতে শুরু করে প্রথম ইউপিএ সরকারের সময় থেকে। এর প্রধান কারণ ভারতবর্ষে ফ্যাসিবাদী-সাম্প্রদায়ীক শক্তির উত্থান। সাম্প্রদায়িকতা বা ফ্যাসিবাদ যেকোন সভ্যতার পক্ষেই বিপজ্জনক। কারণ এই মতবাদ মানুষের মনুষ্যত্বকেই নষ্ট করে দেয়। ফলে মানুষ নরখাদকে পরিনত হয়। সুতরাং কোনো দেশ বা সভ্যতার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ফ্যাসিবাদী বা সাম্প্রদায়ীক সংগঠন (রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক)।

"শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু", নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু এই তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন, তাই ব্রিটিশদের পরাস্ত করার জন্য সেই সময়ের কুখ্যাত দুই রাষ্ট্রনেতা জোসেফ স্ট্যালিন ও অ্যাডফ হিটলারের হাত ধরতেও প্রস্তুত ছিলেন। এটাই হওয়া উচিৎ। সবার আগে দেশ ও জনগণের স্বার্থ তারপর সবকিছু। আমার দেশটাই যদি না থাকে তাহলে আমার রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে কি ধুয়ে জল খাবো?

অনেক বাম সমর্থক আছেন যাঁরা হয়তো অতীতে কংগ্রেসের দ্বারা কোনো ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আবার অনেক কংগ্রেস সমর্থক আছেন যাঁরা বামফ্রন্টের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আর তাই তাদের একে অপরের প্রতি ব্যাক্তিগত আক্রোশ থাকতেই পারে, থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাকে ভেবে দেখতে হবে যে আমার কাছে কোনটা বড়, আমার ব্যাক্তিগত আবেগ নাকি দেশের স্বার্থ। এ ব্যপারে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো আমেরিকা আর জাপান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকার পারমাণবিক বোমার আঘাতে পুরো জাপান তছনছ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি এখনো জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে অনেক বিকলাঙ্গ শিশু জন্মায়। এর থেকে বড় ক্ষতি কি কেউ কারোর করতে পারে? না পারে না, কিন্তু বর্তমানে এই দুটি দেশ অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কারণ একটাই, চীন। জাপান নিজের দেশের স্বার্থে আমেরিকার হাত ধরেছে। এটা যদি সম্ভব হয় তবে দেশের স্বার্থে বাম ও কং সমর্থকরা একে অপরের হাত কেন ধরতে পারবে না?

নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারগুলোর মধ্যে অন্যতম। এরা জনগণের প্রতি নূন্যতম দায়বদ্ধতা দেখায় না তাই কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হয় না। গত প্রায় সাত বছরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদী একটাও সাংবাদিক সম্মেলন করেন নি। দেশের প্রায় সমস্ত মিডিয়া হাউসকে 'সাম-দাম- দন্ড-ভেদ' এই নীতিতে কুক্ষিগত করে রেখেছেন, ফলে তারাও সরকারকে প্রশ্ন করার বদলে তাদের গুণগান গাইতেই ব্যাস্ত। এটাই হলো ফ্যাসিবাদ নামক রোগের প্রধান উপসর্গ। সরকারকে প্রশ্ন করলেই তাকে দেশদ্রোহী তকমা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমার আপনার রান্না ঘরে কি রান্না হবে, ফ্রিজে কিসের মাংস থাকবে তাও নাকি এরাই ঠিক করে দেবে! দেশের এই পরিস্থিতি অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। আজ যখন আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রুড অয়েল জলের দরে বিক্রি হচ্ছে তখন দেশে পেট্রোপন্নের দাম আকাশ ছোঁয়া, সেঞ্চুরির দুয়ারে দাঁড়িয়ে, কোথাও কোথাও যদিও সেঞ্চুরি হয়ে গেছে। আর এর স্বপক্ষে বিজেপি নেতাদের যুক্তি - "দেশের স্বার্থে এই মূল্যবৃদ্ধি, সরকার এতো উন্নয়ন করছে (?) তার জন্য টাকা চাই তো।" কি অদ্ভুত যুক্তি, তাই না? টাকা যদি চাই তবে স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারের দ্বারা নির্মিত এতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিক্রি কেন করছে, মূলত দুজন ব্যাবসায়ী, আধানি আর আম্বানিকে। সেটাও নাকি দেশের স্বার্থে। কিভাবে? কেউ জানে না। কেন্দ্র সরকার কৃষি আইন সংশোধন করে কৃষকের পেটে লাথি মেরে ঐ আধানি আর আম্বানির পেট ভরাচ্ছে। দেশের জিডিপি মাইনাসে চলে যাচ্ছে কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর জন্য আট হাজার কোটি টাকার ফ্লাইট আসছে বিদেশ থেকে। সেটার নাকি তাঁর নিরাপত্তার ব্যাপার। তাহলে দেশের জওয়ানদের নিরাপত্তা নেই কেন? কেন পুলওয়ামার মতো ঘটনা ঘটে? না, আপনি উত্তর পাবেন না তবে দেশদ্রোহীর তকমা পেতে পারেন।

বাংলাও এই একই রকম এক ফ্যাসিস্ট, দুর্নীতিবাজ, তুঘলকি সরকারের খপ্পরে পরেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাওয়াই চটি পরে সৎ সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর ওনার দলের নেতা মন্ত্রীরা ফুলে ফেঁপে উঠছে। চিটফান্ডের মাধ্যমে গরীব মানুষের রক্ত জল করা কোটি কোটি টাকা ওনার দলের নেতারা হজম করে বসে আছে। ওনার ভাইপো এক 'রাজ প্রাসাদ' বানিয়েছে, টাকা কোথা থেকে এলো? প্রশ্ন করবেন না, তাহলেই আপনি 'মাওবাদী' হয়ে যাবেন। গত দশ বছরে রাজ্যে সে অর্থে একটাও সরকারি নিয়োগ হয়নি। যতগুলো এসএসসি হয়েছে সবগুলো দুর্নীতির অভিযোগে বিচারাধীন। তৃণমূলের নেতা মন্ত্রীদের বাড়ির কুকুর বেড়ালও চাকরি পাচ্ছে কিন্তু জনগণের চাকরি নেই। শিল্প তো স্বপ্নেও আসে নি।

এগুলো তো খুব মামুলি ব্যাপার, মোদী ও দিদির সরকারের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হল নৈতিকতার অভাব। গত সাত বছরে বিজেপি যত গুলো রাজ্যের ক্ষমতায় এসেছে তার ৯০% ভোটে হেরেও টাকার বলে ক্ষমতা দখল করেছে। এই একই পথের পথিক তৃণমূলও। গত দশ বছরে তৃণমূলও টাকার লোভ দেখিয়ে বা মিথ্যা মামলা দিয়ে একের পর এক বিরোধীদের হাতে থাকা গ্রাম পঞ্চায়েত বা পুরসভা দখল করেছে। এই সংস্কৃতি বাংলার রাজনীতিতে বিরলতম। কথায় বলে কাক কাকের মাংস খায় না কিন্তু কংগ্রেসের সাথে জোটে থাকাকালীনও তৃণমূল কংগ্রেসে এমএলএ, এমপি থেকে নেতা কর্মী সমর্থকদের ভাঙিয়ে নিয়ে গিয়ে কংগ্রেসকে দুর্বল করেছে। বামফ্রন্ট কিন্তু শত বিরোধীতা থাকলেও কংগ্রেসের সাথে কখনোই এই ঘৃণ্য রাজনীতি করেনি। এই রাজনৈতিক মাফিয়াগিরি দুর করতে বাম'-কং জোট চাই।

আজকের দিনে তৃণমূল বাংলার রাজনৈতিক আবহাওয়াকে চরম কলুষিত করেছে। এখন তাদের সাথে জুটেছে বিজেপি। এখন রাজনৈতিক বক্তৃতায় পুলিশকে বোম মারতে বলা হয়, বিরোধীদের খুন করার কথা বলা হয়, বদলার কথা বলা হয়, ধর্ষনের হুমকি দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলা রাজনীতি এতো নোংরা ছিল না। বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস শত বিরোধীতা সত্ত্বেও সর্বদাই সৌজন্যতা ও নৈতিকতার বার্তা বহন করেছে। কমঃ প্রমথ দাশগুপ্ত মারা যাওয়ার পর তাঁর স্মরণে আয়োজিত বামফ্রন্টে ব্রিগেড সমাবেশে বক্তৃতা করেছিলেন প্রয়াত কংগ্রেস নেতা প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী। তেমনই বামফ্রন্ট সরকারের দ্বারা নির্মিত বিধান নগরের নাম রাখা হয়েছিল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা বিধান রায়ের নামে। ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে এমন সৌজন্যের উদাহরণ বহু পাওয়া যাবে। দেশের রাজনীতিতেও এমন সৌজন্যতা ভুরি ভুরি আছে। কিন্তু বর্তমানে বিজেপি ও তার বি-টিম তৃণমূলের জন্য এই সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ যেন স্বপ্ন। আমাদের এই সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশটা ফিরিয়ে আনতে হবে। তার জন্য বাম-কং জোট সফল করতে হবে।

ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে দেশের স্বার্থে সেই সময়কার কংগ্রেসী আর বামপন্থীরা হাতে হাত রেখে এক সাথে লড়াই করেছে এখন আমাদের প্রজন্মের পালা। তাই বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস সমর্থকদের কাছে আমার অনুরোধ চলুন আমরা সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে দেশের শত্রু, রাজ্যের শত্রু ফ্যাসিবাদী, দুর্নীতিবাজ, নীতিহীন মোদী ও মমতার হাত থেকে দেশ তথা রাজ্যকে উদ্ধার করতে আবার একসাথে হাতে হাত রেখে লড়াই করি।

শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২০

ধূর্ত রাজা

ধূর্ত রাজা
            উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী 

স্বপ্ন বেচে, মিথ্যা বলে সিংহাসনে বসলে রাজা!
স্বপ্ন ভাঙল পরলে ধরা, জনগণের এ কি সাজা?
লক্ষ টাকার পোষাক পরে দাও ফকিরির ভাসন,
কর্মহীন, অন্নহীন, লক্ষ্যহীন অর্থাভাবের কু-শাসন।
নতুন আইন আনলে রাজা কৃষকের কথা ভেবে?
তোমায় চিনি হাড়ে হাড়ে, তুমি চলো স্বার্থ মেপে।
অন্নদাতার অন্ন জোটে না, পঞ্চব্যঞ্জন তোমার পাতে,
কোটিপতির পকেট ভড়ছ, কৃষক-মজদুর মারছ ভাতে।
আবেদনে, নিবেদনে টলানো যায় নি তোমার মন,
রাজধানীতেই দেখা হবে, প্রয়াস তাদের প্রাণপণ।
তারা আজ এক হয়েছে, ডাক দিয়েছে 'চলো দিল্লি',
তোমার কপালে বলি রেখা যতই ওড়াও ওদের খিল্লি।
আঠারো থেকে আশি হাঁটছে হাতে শক্ত লাল ঝান্ডা,
পায়ের তলায় ফোসকা আর পিঠে পুলিশের ডান্ডা।
মিছিল ওদের শান্তিপূর্ণ তবুও তুমি অশান্ত,
পুলিশ দিয়ে ব্যারিকেড গড়েও হলে নাকো ক্ষান্ত।
তোমার আছে কাঁদানে গ্যাস, আছে জল কামান
লং মার্চে শপথ আছে, আছে কৃষকের অভিমান।
আমজনতার জেদের কাছে রাজা তুমি পরাজিত,
ইনকিলাব জিন্দাবাদে রাজধানী আজ মুখরিত।
হিসাব সব থাকছে তোলা, জবাব তুমি পাবেই ঠিক
ধূর্ত রাজা, পিশাচ তুমি তোমায় জানাই ধিক, ধিক, ধিক।

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২০

অন্ধ ধর্মবিশ্বাস ও নাস্তিকতা

অন্ধ ধর্মবিশ্বাস ও নাস্তিকতা
                           উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

অন্ধ ধর্ম বিশ্বাস সর্বদাই ক্ষতিকর হয় তা সে বিশ্বাস বা আনুগত্য হিন্দু, ইসলাম, খ্রিস্টান বা নাস্তিকতা যার প্রতিই হোক না কেন। অনেকেই হয়তো প্রতিবাদ করে বলবেন যে নাস্তিকতা আবার কোনো ধর্ম নাকি! আমি বলব অবশ্যই, এটাও একটা ধর্ম।
ধর্ম আসলে কি? ধর্মের ব্যাখ্যা দু ভাবে করা যায়। এক, ন্যায় আর দুই, 'রিলিজিয়ন'। পৃথিবীতে যখন এই রিলিজিয়নের ধারনাটা ছিল না তখন ধর্ম বলতে 'ন্যায়' বা 'সত্য'কে বোঝানো হতো। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ছিল সত্যের বিরুদ্ধে অসত্যে লড়াই, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার লড়াই, এই কারনেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে 'ধর্মযুদ্ধ' বলা হয়। পরবর্তীকালে রিলিজিয়নের ধারনা আসার পর ধর্মের সঙ্গা বদলে গেছে, ধর্ম হয়ে গেছে রিলিজিয়নের সমার্থক।
হিন্দুত্ব, ইসলাম, খ্রিস্টান বা বৌদ্ধ প্রতিটা ধর্মের নির্দিষ্ট একটা মতবাদ আছে, যে মানুষ যে মতবাদে বিশ্বাসী তাকে সেই ধর্মাবলম্বী বলা হয়। ঠিক তেমনই নাস্তিকতারও নির্দিষ্ট কিছু অলিখিত নিয়মাবলী আছে, যে তা মেনে চলবে সেই নাস্তিক হবে। তাই নাস্তিকতাও অবশ্যই একটা ধর্ম।
সুতরাং এটা বোঝা যায় যে প্রতিটা মানুষ কোনো না কোনো ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি আস্থা রাখে এমন কি যে নিজেকে ধর্মহীন বলে দাবি করে সেও একটা ধর্মে বিশ্বাসী। কিন্তু একজন আদর্শ মানুষ সেই হয় যে এই ধর্মীয় বিশ্বাসের ঊর্দ্ধে উঠে মানুষকে তার মনুষ্যত্বের গুণে বিচার করে।
যখন কোনো ব্যক্তি কোনো ধর্মের প্রতি অন্ধের মতো আসক্ত হয়ে পরে তখন সে একটা নেশার ঘোরের মধ্যে থাকে আর সেই নেশা তার বাস্তব বোধবুদ্ধি নষ্ট করে দেয়। সে ভাবে তার ধর্মটাই জগতের শ্রেষ্ঠ আর বাকি সমস্ত ধর্ম ও ধর্মবিশ্বাস নিকৃষ্ট। সে তখন অন্য ধর্মাবলম্বীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, ঘৃণ্য ভাষায় আক্রমণ করে এমনকি শারীরিক আক্রমণ তথা হত্যা করতেও পিছপা হয় না।
এতদিন এই প্রবণতা হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান ইত্যাদি ধর্মাবলম্বীদের ধর্মান্ধদের মধ্যে লক্ষ্য করা যেত কিন্তু এখন এই একই প্রবণতা উদার চিন্তার মানুষ বলে পরিচিত নাস্তিক ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। যা আমাকে ভীষণ আশ্চর্য করে।

মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০

নকশাল

নকশাল
         উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী

গ্রামে এবার শিল্প হবে, ঘরে ঘরে চাকরি হবে-
হাসপাতাল হবে, বিদ্যুত হবে, রাস্তা হবে পাকা।
বটতলাতে বসেছে মিটিং, বলছেন নেতা-মন্ত্রী,
চাষে কি লাভ? এই জমি বেচে পাবে লক্ষ টাকা।
মুখটি করে কাঁচুমাচু উঠে দাঁড়াল বাগদি পাঁচু-
বলল, বাবু কি'করে বেচব পূর্বপুরুষের জমি?
এ যে নয় শুধু ক্ষেত, জড়িয়ে আছে বহু আবেগ,
অনেক স্মৃতি, অনেক আশা ছোট্ট এই ভূমি।
এদিক সেদিক চেয়ে নেতা উঠল চেয়ার ছেড়ে, 
মিটি মিটি হেসে বলল- ধুর বোকা! আবেগ কিরে?
আবেগ দিয়ে জমি আগলে জুটবে না তোর পেটের ভাত,
এর পরেও 'না' বললে, বুঝব তুই হাড় বজ্জাত।
ধমক মেশানো মিষ্টি কথায় শেষ হলো এই সভা;
লোভে-ভয়ে জর্জরিত গ্রামবাসীরা করবে কিবা!
পাঁচুর ছেলে রতনও সেই সভায় ছিল উপস্থিত-
শিক্ষার আলোয় উজ্জ্বল সে, বুদ্ধি তার প্রশ্নাতীত।
প্রখর বুদ্ধির মস্তিষ্ক তার বুঝল নয় এ সরল অতি,
নেতা মন্ত্রীর পকেট ভরবে, গ্রামের হবে চরম ক্ষতি।
সর্বনাশের গন্ধ পেয়ে রতন ডাকল সকলেরে-
শিল্পের নামে জমি মাফিয়া মোদের জমি নেবে কেড়ে।
শিল্প হবে না, চাকরি পাবে না, রাস্তা হবে না পাকা,
ওদের পকেট গরম হবে, মোদের পকেট ফাঁকা।
শিল্পের নামে জমি নিয়ে গড়বে ওরা আবাসন,
তার জন্যই করছে নাটক, দিচ্ছে লম্বা ভাষণ।
দেশের সম্পদ নিজের করো- এটাই ওদের মন্ত্র,
ওদের ফাঁদে পা দিও না, এই শিল্প-গল্প ষড়যন্ত্র।
গ্রামবাসীরা শপথ নাও, প্রাণের বাজি রেখে দাও-
মোদের জমি থাকবে মোদের জীবন তুমি যদিও নাও।
নিজের ভুল বুঝতে পেরে এগিয়ে এলো জনে জনে,
শপথ নিল জমি রক্ষার মারলে মারুক ধনে-প্রাণে।
খবর গেল মন্ত্রিসভায় বেঁকে বসেছে গ্রামবাসীরা,
ওদের মাথা চিবিয়ে খাচ্ছে রতন নামের এক ছোকড়া।
এই না শুনে মন্ত্রীমশাই জ্বলে উঠলেন তেলে বেগুনে,
সব হিসাব মিটিয়ে নেবো পাই পাই গুনে গুনে।
পুলিশ কর্তার ডাক পরল, এলেন তিনি সত্বর,
থামাও ওকে, জেলে পোরো- ব্যাটা বড্ড মাতব্বর।
নকশাল বলে চালান করো, বছর কয়েক খাটুক জেল,
সারা গ্রাম দেখুক এটা তবেই ওদের হবে আক্কেল।
যেমন কথা তেমন কাজ- রতন হলো গ্রেফতার,
কার ঘারে কটা মাথা শাসকের চোখে চোখ রাখবার!

তদন্তকারী অফিসার কাঠগড়াতে এলেন,
সত্যি বলার শপথ তিনি গীতা ছুঁয়ে নিলেন।
বাদি পক্ষের উকিল করলেন প্রশ্ন তাঁকে-
আচ্ছা, নক্সাল বলে সন্দেহ কেন হলো রতনকে?
সন্দেহ নয় প্রমান আছে, এ ব্যাটা নির্ঘাত জঙ্গি,
মার্কস, এঙ্গেলসের লেখা বই এর সর্বক্ষণের সঙ্গী। 
উকিল মশাই জিজ্ঞাসা করলেন বইগুলো কি নিষিদ্ধ?
আমতা আমতা করে অফিসার হলেন ঘর্মাক্ত।
তা নয়, তবে এক মাও নেতার কাছে ছিল একই বই,
প্রমান এটা যথেষ্ট, এ ব্যাটা নকশাল নিশ্চয়ই।
কথায় কথায় বলে ব্যাটা 'লাল সেলাম কমরেড',
এসব কিছুই প্রমান করে ও নকশালদের সাগরেদ।
অফিসার, তা আপনি অন্তর্বাস পরেন অবশ্যই?
মাওবাদীরাও পরে, তাই আপনিও মাওবাদী নিশ্চয়ই।
এই ভাবেই উকিল মশাই কেটে দিলেন সব যুক্তি
সাজানো মামলা খারিজ হলো, রতন পেল মুক্তি।
সরকার থেকে প্রশাসন এরা সব সাম্রাজ্যবাদের দালাল,
গরীবের বুকে জ্বালিয়ে দিয়েছে আজ প্রতিবাদের মশাল।
গরীব মানুষের টুঁটি তোমরা যতই টিপে ধরবে,
ঘরে ঘরে এমন 'নকশাল' বারেবারে জন্মাবে।

শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২০

শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি

শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি
         উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী 

ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আমরা, মানব জাতি,
সৃষ্টিরই করে চলেছি তিলে তিলে ক্ষতি।
জ্ঞান-বুদ্ধি দিলেন ঈশ্বর, পেল সব প্রাণী,
একটি গুণ পেয়ে মানব হলো শ্রেষ্ঠ জানি।
জ্ঞান-বুদ্ধির সাথে মানব পেল মান ও হুঁস,
এই গুণেই তার পরিচিতি, হলো সে মানুষ।
ধর্ম; এক বিষাক্ত প্রাচীর মানুষের দ্বারা সৃষ্ট,
ঈশ্বরও বিভক্ত হলেন- ভগবান, আল্লাহ্, খ্রিস্ট।
ধর্ম-বর্ণ-জাতি-লিঙ্গ সর্বত্রই ভেদাভেদ,
মানব জাতির সৃষ্টিই ঈশ্বরের একমাত্র খেদ।
লোভ, পাপ ও অহঙ্কারে আজ সৃষ্টি পরিপূর্ণ, 
ভক্তি উধাও আরাধনায়, নিষ্ঠা হলো শূণ্য।
লক্ষ লক্ষ লাড্ডু তোমরা রামকে করো নিবেদন,
ভক্তি-শ্রদ্ধার লেশহীন, শুধুই তোলো আলোড়ন।
রাজকন্যা সত্যভামা ছিলেন কৃষ্ণ-পত্নী, 
বৈভবের অহঙ্কারে পরিপূর্ণ মহারানি।
মণি-মাণিক্য, হিরে-জহরত ছিল তাঁর যথেষ্ট,
একটি মাত্র তুলসীপাতায় কৃষ্ণ হলেন তুষ্ট।
নিচু জাতের শবরী মাতা ছিলেন রাম-ভক্ত,
তাঁর নিঃস্বার্থ ভক্তি দেখে শ্রীরাম হলেন মুগ্ধ।
শবরী মাতার এঁটো কুল খেলেন ভগবান,
রাম মন্দিরে নেই ঠাঁই, নেই মান-সম্মান।
রাম-রাজ্যে সুখ ছিল, শান্তি ছিল, ছিল ন্যায়, সত্য,
মূর্খ এই মানুষগুলো মন্দির-মসজিদেই মত্ত।
আল্লাহ্'র নামে কোতল করো, রামের নামে বধ,
ভুলে গেছ মোদের রক্তে 'যত মত তত পথ'।
খিদের জ্বালায় শিশু কাঁদে, পেটের নেই জাত,
ধর্মস্থানে দানের জোয়ার, ওদের জোটে না ভাত।
মানব জীবনের মূল্য নেই, গরুতেই যতো শোক,
পরমহংসে ভাষায় বলি, 'তোদের চৈতন্য হোক'।

ये आजादी झूठी है

ये आजादी झूठी है
              उपेन्द्रनाथ ब्रह्मचारी

ये आजादी झूठी है,
इस देश का बंटवारा किया हे,
पूर्ण स्वराज को ठुकराया है,
ये आजादी झूठी है।

आजादी कि ढोंग रचा,
हुया था एक समझौता,
देशहित का बलि चढ़ाया,
अपना स्वार्थ को वो निभाया।

काश नेताजी वापस आते,
देश का टुकड़ा न होने देते,
धर्म के नाम पर लड़ाइ न होता,
लोगों को भर पेट खाने को मिलता।

स्वास्थ्य-शिक्षा बेहाल हुआ
बेरोजगारी, महंगाई आसमान छुया
देश के लोग भुका है, नंगा है
ये आजादी झूठी है।

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২০

মরীচিকা

মরীচিকা
উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী


সকাল থেকে কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল তবুও ভ্যাপসা গরমটা গেল না। বেলা এগারোটা বেজে গেছে, এখনো সূর্যের আলোর দেখা নেই। ভ্যাপসা গরমের জন্য রাস্তা ঘাট প্রায় জনশূন্য। ব্যতিক্রম শুধু সিধুদার চায়ের দোকান। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা বেকার যুবকদের কাছে সিধুদাই ভরসা। সিধুদা সবার দাদা। বাবারও দাদা ছেলেরও দাদা। বয়স আনুমানিক বছর ষাটেক হবে। কিন্তু সবাই সিধুদাকে দাদা বলেই ডাকে। জনশূন্য রাস্তার মোড়ের এই চায়ের দোকানে এই মুহূর্তে পাঁচজন চা-সিগারেট সহযোগে আড্ডা দিচ্ছে। পল্লব, অনিন্দ্য, আশফাক, সৌম্য আর নিশীথ। এরা পাঁচ জন ছোটবেলার বন্ধু। সেই প্রাইমারি স্কুল থেকে গ্র্যাজুয়েশন পর্যন্ত এক সাথে পড়েছে। স্বভাবতই তাদের মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। গত সপ্তাহেই ওদের গ্র্যাজুয়েশনের ফাইনাল সেমিস্টার শেষ হয়েছে। এখন অপেক্ষা রেজাল্টের। এই রেজাল্টই ঠিক করে দেবে পরবর্তী কালে ওরা আর একসাথে থাকবে কি না বা কে কার সাথে থাকবে। পাড়ার মোড়ে সিধুদার চায়ের দোকানের চা বেকার যুবককূলের কাছে খুবই জনপ্রিয়। এতো চায়ের দোকান নয়, যেন প্রাইভেট টিউশন। এক একটা ক্লাসের এক একটা ব্যাচ যায় আবার একটা নতুন ব্যাচ ঢোকে। তবে সিধুদা কিন্তু সবার বন্ধু। সৌম্যদের সেমিস্টার শেষ হওয়ার পরের দিন ওরা পাঁচ জন যখন সিধুদার দোকানে চা খেতে এলো সিধুদা বলেছিল, "এই আরও একদল বেকার তৈরী হলো। এই যে নতুন বেকারের দল আমার চায়ের দোকানে তোদের স্বগত"
"মানে? আমরা কি তোমার দোকানে এই প্রথম এলাম নাকি!" আশফাক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
বড় আধপোড়া সসপ্যানের গায়ে লেগে থাকা দুধের সর চামচ দিয়ে চাঁচতে চাঁচতে সিধুদা মুচকি হেসে বলল "ওরে কাল পর্যন্ত তোরা ছিলি ছাত্র। গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট, মানে আজ থেকে তোরা অফিসিয়ালি বেকার যুবক হলি। মাথায় ঢুকল?"
সিধুদার কথায় ওদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে গেল। কিন্তু কথাটা কেউ ফেলে দিতে পারল না। চায়ে কাপে চুমুক দিয়ে শুরু হল তাদের আড্ডা। পাড়া-ঘর, দেশ-বিদেশ, খেলা, রাজনীতি, সিনেমা - আড্ডার বিষয়বস্তুর যেন কোনো সীমা নেই। অনিন্দ্য বলল, "আমরা এতো কিছু নিয়ে আলোচনা করছি যখন তখন একটা নিজেদের ভবিষ্যত নিয়েও আলোচনা হোক। নাকি ওটা বাদের খাতায়?"
"কিরে সৌম্য, তুই কিছু ভাবলি?" পল্লব জিজ্ঞাসা করল
সৌম্য এক চুমুকে চায়ের কাপের তলানিটা শেষ করে একটা সিগারেট ধরাল, তারপর সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, "নাহ্! সেভাবে কিছু এখনো ঠিক করি নি। তবে আমার ইচ্ছা আছে মাসকমিউনিকেশনে মাস্টার্স করার সে তো তোরা জানিসই। তবে সব কিছু নির্ভর করছে রেজাল্টের উপর"
নিশীথ মুচকি হেসে বলল, "মানে তোর মাথা থেকে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নলিস্ট হওয়ার ভুতটা এখনো নামে নি?"
"না রে শুধু ইনভেস্টিগেটিভ জার্নলিসম নয় ইদানীং আমার আরও একটা বিষয়ে আমার ইন্টারেস্ট জেগেছে। ফরেন রিলেশনশিপ অর্থাৎ বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক সাংবাদিকতা। যাই হোক, এবার তোদের ব্যাপারে বল।"
নিশীথ বলল, "আমার বাবার আর আমাকে পড়ানোর ক্ষমতা নেই। সুতরাং আমার এখানেই দ্যা এন্ড। দেখি কোথাও একটা কাজ-টাজ জোগাড় করতে পারি কিনা।"
পল্লব বলল যে তার এসব নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। রেজাল্টের পর এসব নিয়ে ভাববে। টেনশন করে এই মূল্যবান অবকাশটা সে নষ্ট করতে চায় না।
"আর পরিচালক মশাই আপনি কি সিনেমা পরিচালনা করবেন?" অনিন্দ্য আশফাককে জিজ্ঞাসা করল 
"পরিচালক আশফাকের কাছে আমার একটাই রিকোয়েস্ট আমাকে পাওলি দামের সাথে একবার দেখা করিয়ে দিস। হোয়াট অ্যা সিডাক্টিভ লুক! যেন আমার বুকের ভেতরটা খান খান হয়ে যায়। ভাই দেখা করিয়ে দিবি তো একবার?" সৌম্য চটুল ভঙ্গিমায় আশফাকের কাছে তার অনুরোধ রাখল।
বিরক্তির সুরে আশফাক বলল, "ধুর শালা! ছাড় তো ওসব কথা। আব্বা আমাকে আব্বার ব্যবসায় ঢুকতে বলছে। ওসব পরিচালক হওয়ার ভুত নাকি ঘাড় থেকে নামাতে হবে।"
"কি বললি? আমাদের স্কুল-কলেজে নাটক থিয়েটার পরিচালনা করে প্রশংসা কুড়নো ছেলেটা যার চোখে টলিউডের পরিচালক হওয়ার স্বপ্ন সে কিনা সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে বাপের জুতোর দোকানের কাউন্টারে বসবে! কি যাতা বলছিস এসব?" সৌম্য তেড়েফুঁড়ে উঠল
"আব্বাকে মৌলবী সাহেব বুঝিয়েছে এসব নাকি হারাম। তাই এসব ভুত মাথা থেকে নামিয়ে আমাকে ব্যবসায় ঢোকাতে বলেছে। তোরা চিন্তা কর যে লোকটা নিজে ধর্মের সুড়সুড়ি দিয়ে লোক ঠকিয়ে নিজের পেট চালায় সেই লোকটা নাকি আমার কেরিয়ারের দিক নির্দেশনা করছে! রিডিকুলাস!"
"সৌম্য, ঐ দেখ তোর বাগচি দাদু আসছে। এদিকেই আসছে মনে হচ্ছে" অনিন্দ্য এক বৃদ্ধের দিকে ইঙ্গিত করে বলল
সকলে তাকিয়ে দেখল এক বৃদ্ধ তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। বয়স হবে প্রায় পঁচাত্তর বছর, শরীর এখনো বেশ শক্ত। তবে চোখের নিচে ঝুলে পরা চামড়ায় বয়সের ছাপ স্পষ্ট। গটগট করে হেঁটে তাদের দিকেই আসছে।
সবাই তাড়াতাড়ি করে তাদের হাতের জ্বলন্ত সিগারেটগুলো লুকিয়ে নিল। সৌম্য একটু উচ্চ স্বরে বলল, "ও বাগচি দাদু, রাস্তা ভুল হলো নাকি? আজ এ দিকে কি ব্যাপার?" বাগচিদাদু দূর থেকে ফিরে গেলে আর বাবার পকেট কেটে কেনা সিগারেটটা আধখাওয়া অবস্থা ফেলে দিতে হয় না।
উদ্দেশ্য সফল হলো। দূর থেকেই বৃদ্ধ জানাল যে সৌম্যকে খুঁজতেই আসছিল, সৌম্য যেন সন্ধ্যা বেলায় একবার দেখা করে।
পাঁচজনই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সকলেই তাদের সিগারেট বাঁচিয়ে দেওয়ার জন্য সৌম্যকে ধন্যবাদ জানাল।
"এই বুড়ো কারোর সাথে মেশে না, কাউকে সেভাবে কোনো কথা বলে না কিন্তু তোকে কেন এতো ভালোবাসে বলতো?" পল্লব সৌম্যকে জিজ্ঞাসা করল
"জানি না রে। তবে সেই যে ছোটো বেলায় আমি দাদুর সাইকেলে ধাক্কা খেয়ে পরে গেলাম, আমার মাথা ফেটে গেল তারপর থেকেই দাদু আমাকে খুব ভালোবাসেন। তোদেরকে তো কতবার বলেছি আমার সাথে দাদুর কাছে চ, দেখবি উনি একদম অন্য মানুষ যেমন বাইরে দেখান তেমন মানুষ উনি নন। জানিস ওনার ভিতরে না একটা কোন বড় দুঃখ আছে, কিছু একটা না পাওয়ার দুঃখ আর তার জন্যই উনি নিজেকে গুটিয়ে রাখেন।" সৌম্য প্রায় এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে গেল।
শেষ হয়ে যাওয়া সিগারেটের ফিল্টারটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে আগুন নেভাতে নেভাতে নিশীথ বলল, "মাথা খারাপ! এমনিতেই আমার মা বলে বাঙালরা খুব ফেরোসাস হয় তার উপর এই বুড়োকে দেখলেই কেমন যেন খুনি-খুনি মনে হয়।"
সৌম্যকে দৃশ্যতই বিরক্ত লাগছিল, "নিশীথ দাদুর বয়সী মানুষটাকে একটু সম্মান দিয়ে কথা বল প্লিজ। তখন থেকে বুড়ো-বুড়ো বলে যাচ্ছিস। এটা কি ঠিক?"
"সরি, সৌম্য আমি ঠিক সেভাবে বলতে চাইনি"
"আর একটা কথা বলি নিশীথ, রাতারাতি যে মানুষগুলোর মাথার উপর থেকে ছাদ চলে যায়, কোনওক্রমে জীবন বাঁচিয়ে নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পালিয়ে যেতে হয় আর তারপর সেই দেশে গিয়েও প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করতে হয় তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই একটু ডেসপ্যারেট তো হবেই আর তাদের সেই ডেসপ্যারেটনেশটাকে তোর-আমার মতো তুলনায় সুখী মানুষরা ফেরোসাসনেশ বলে জাজ করি", খুব গম্ভীর হয়ে সৌম্য কথাগুলো বলল। একটা লম্বা টান দিয়ে সিগারেটটা ফেলে দিল সৌম্য, তারপর আবার বলতে শুরু করল, "দেখ কিছু মানুষ আছে যারা মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ভাবে বিভেদ সৃষ্টি করে নিজেদের লাভের জন্য। ধর্মীয় বিভেদ, জাতিগত বিভেদ, ভাষাগত তথা আঞ্চলিকতা বিভেদ, শরীরের রং নিয়ে বিভেদ- যে কোনো বিভেদেই কারোর না কারোর লাভ হয় কিন্তু মানব জাতি তথা এই সৃষ্টির ক্ষতি হয়।
"কি বলছিস! ধর্ম তো ভগবানের সৃষ্টি" অনিন্দ্য সৌম্যর কথায় প্রতিবাদ জানাল।
"আচ্ছা! ঠিক আছে। তাহলে আমাকে বল তো মানুষ, গরু, ছাগল, বাঘ, সাপ, ব্যাঙ, হাতি, পোকা-মাকড় এতো কিছু সব তোর ঐ ভগবানই বানিছে তো?"
"অবশ্যই" দৃঢ় কন্ঠে অনিন্দ্য উত্তর দিল
"আচ্ছা এরা প্রত্যেকেই দেখতে কমপ্লিটলি আলাদা?"
"হ্যাঁ, একদমই তাই"
"তাহলে তোর কথা অনুযায়ী ধর্ম যদি ভগবানের সৃষ্টি হয় তাহলে আলাদা আলাদা ধর্মের মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য আলাদা হওয়া উচিৎ ছিল? তা কেন নয়?"
"এটা তো ভেবে দেখিনি! ভ্যালিড কোয়েশ্চেন।"
"ভাব, ভাব, ভাবতে শেখ। দেখ ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছে আর মানুষ ধর্ম নামের বিষাক্ত প্রাচীর দিয়ে নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। আমার মতে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করাই হল ঈশ্বরের সবচেয়ে বড় অবমাননা।"

"একদম ঠিক বলেছিস সৌম্য, এভাবে আমরা সত্যিই কখনো ভেবে দেখিনি" পল্লব কৃতজ্ঞতার সুরে বলল।
"বন্ধুগন, বেলা একটা বাজে। মা এবার ঝাঁটা নিয়ে আসবে। চল আজকের মতো উঠি" সৌম্য উঠে দাঁড়িয়ে প্যান্টের পিছন ঝাড়তে ঝাড়তে বলল।
সকলে সম্মতি জানিয়ে উঠে পরল।


দরজায় বার দুয়েক টোকা দিয়ে প্রায় মিনিট পাঁচেক ধরে অপেক্ষা করছে সৌম্য। এখনো ভিতর থেকে কোনো সারা আসছে না। অধৈর্য হয়ে চেঁচিয়ে ডাকল "দাদু, ও দাদু! এখনো ঘুমোচ্ছ নাকি?" এবার ভিতর থেকে সারা এলো। আরও মিনিট খানেক অপেক্ষার পর দরজা খুলল। ভিতর থেকে সেই বৃদ্ধ লোকটি বেরিয়ে এলো। মাথার চুলগুলো সব পেকে গেলেও দাঁত একটাও পরে নি। বৃদ্ধের নাম দীপঙ্কর বাগচি। 

"আয় আয়। বোস ওখানে" সোফার দিকে ইশারা করে সৌম্য কে বসতে বলল দীপঙ্কর।
ঘরটা বেশ পরিপাটি করে গোছানো। ঘরে ঢুকে বাঁ দিকের এক কোণে টেবিলের উপর একটা পিকচারটিউব দেওয়া টিভি, তার পাশে একটা বছর চোদ্দ-পনেরোর মেয়ের সাদা-কালো ছবি ফ্রেম করে টাঙানো। টিভির ঠিক উল্টো প্রান্তে সোফা আর তার সামনে একটা কাঁচের টি-টেবিল রাখা। অবিবাহিত দীপঙ্কর বাগচি একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি চাকরি করত। মা-ববাকে নিয়ে তার সংসার ছিল। প্রায় বছর কুড়ি আগে বাবা আর মা দুজনেই মারা গেছে। তাই এখন সে একাই। একটা ওয়ান-বি-এইচ-কে ফ্লাটই তার দুনিয়া। আত্মীয় স্বজন বলতে তার কেউ নেই। কাছের কেউ বলতে একমাত্র পাড়ার ছেলে সৌম্য। এছাড়া সে আর কারোর সাথে সে ভাবে মেশে না। কথাও প্রায় বলে না বললেই চলে। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে যতটা সম্ভব ইশারায় জবাব দেয়। যেন কথা বলতে না হলেই ভালো।
সৌম্য সোফায় বসেতেই দীপঙ্কর রান্নাঘরের ভিতর চলে গেল। মিনিট খানেক পর একটা কাঁচের প্লেটে কয়েক রকমের মিষ্টি আর সিঙাড়া নিয়ে বেরিয়ে এলো।
সৌম্য অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, "দাদু এসব কি? এতো কার জন্য?"
"এখানে তুই ছাড়া আর কে আছে?"
"তুমি পাগল এতো খাওয়া যায় নাকি?"
"খুব খাওয়া যায়। এই বয়সে খাবি না তো কোন বয়সে খাবি! আর তাছাড়া এই সিঙাড়া কিন্তু আমার নিজের বানানো। দোকানের পচা তেলে ভাজা নয়।"
"ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমি চেষ্টা করছি। কিন্তু দাদু এসব কোন খুশিতে?"
"কেন? তোকে কি এমনি কখনো খাওয়াই নি আমি?"
রসগোল্লা চিবোতে চিবোতে সৌম্য বলল, "তা বলছি না তবে আজ তোমাকে একটু অন্যরকম লাগছে। নিশ্চয়ই কোনো ব্যাপার আছে।"
"তা আছে। আজ আমি ভীষণ খুশি। অনেক দিন পর আজ আমার এতো ভালো লাগছে" আবেগে দীপঙ্করের গলা যেন বুজে আসছে
"কি হয়েছে বলো না দাদু।"
"আগে তুই সব খা তারপর বলব।"
"না, না। তুমি বলো আমি খেতে খেতেই শুনছি।"
"তবে শোন। তুই বারবার আমাকে জিজ্ঞাসা করিস না দেওয়ালে টাঙানো ঐ ছবিটা কার?
"হ্যাঁ। কার ছবি ওটা?"
"ওর নাম মীরা। মীরা দেবনাথ। পুরো ঘটনা জানতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে আজ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর আগে।"

সালটা ১৯৭০। সারা বাংলা দেশ তখন যেন বারুদের স্তূপ। এতোটুকু স্ফুলিঙ্গ পেলেই যেকোনো সময় ঘটে যাবে বিরাট বিস্ফোড়ন। বাংলাদেশের আবার-বৃদ্ধ-বনিতা তখন পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীর অত্যাচারের হাত থেকে দেশকে বাঁচানোর স্বপ্ন বিভোর।স্বাধীনতার আশায় সবাই টগবগ করে ফুটছে। তবে আলাদা বাংলাদেশের দাবি ততটা জোড়ালো হয় নি।
আমার বাড়ি ছিল রংপুরের উত্তরে এক গ্রামে। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, এমএ-র ফাইল ইয়ার। আমি থাকতাম ঢাকার বিখ্যাত জগন্নাথ আবাসনে। ঐ আবাসনের কাছেই ছিল মীরার বাড়ি। আমার বয়স কতো আর হবে, এই ধর বছর পঁচিশ আর মীরার বয়স তখন কুড়ি কি একুশ। যদিও মীরার সাথে পরিচয় আমার অনেক আগে থেকেই ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে একটা চায়ের দোকান ছিল, শফিক মিয়ার চায়ের দোকান। সেখানে আমরা চা খেতাম আর সেই চায়ের দোকানের ঠিক লাগোয়া একটা ঘরে মীরার দাদা বিনা পয়সায় গরীব ছেলে মেয়েদের পড়াতো যেখানে সে নিজেও পড়তে আসত। দিনের একটা সময় আমরা ওখানে আড্ডা দিতাম, ঠিক যেমন তোরা ঐ সিধুর দোকানে আড্ডা দিস। তবে আমাদের আলোচনার বিষয় বস্তু ছিল মূলত রাজনৈতিক। আমরা প্রায় প্রত্যেকেই বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা, জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ষড়যন্ত্র, পাকিস্তান আর্মির অত্যাচার, পাকিস্তান পিপলস পার্টি ও তার প্রতিষ্ঠাতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর রণনীতি- এই সব বিষয়েই আলোচনা হতো। আমাদের এই আলোচনা মীরার লুকিয়ে শুনত। একদিন হটাৎই সে আমাকে ডাকে। আমি একটু অবাকই হয়ে গিয়েছিলাম। কাছে যেতে সে আমাকে জানাল যে সে প্রায় প্রতিদিন আমাদের আলোচনা শোনে এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শে সে উদ্বুদ্ধ। আমার কাছে সে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে।
জানিস সৌম্য মীরা যে দেখতে খুব সুন্দরী রূপবতী ছিল তা নয় কিন্তু তার চাঁউনি ছিল অসম্ভব বুদ্ধিদীপ্ত। সাহিত্যের তার অসম্ভব দখল ছিল। আওয়ামী লীগে যোগ দিতে খুব তাড়াতাড়িই সে সবার কাছের হয়ে উঠল। পার্টির নির্দেশ মতো আমরা একসঙ্গে কাজ করতে লাগলাম। এই সময় কখন যে আমরা একে অপরকে ভালোবেসে ফেললাম তা আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি নি।
২৬সে মার্চ, ১৯৬৯ তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আয়ুব খানকে সরিয়ে সেই পদে বসেন পাক আর্মির কমান্ডার ইন চিফ ইয়াহিয়া খান। আর তারপর তিনি ১৯৬২ সালে গৃহীত সংবিধান বাতিল করেন। তখন থেকেই আপামর পূর্ব পাকিস্তানবাসী দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। সেই বছরের শেষের দিকে পার্টির উপর মহল থেকে আমাদের কাছে খবর আসে যে আগামী এক বছরের মধ্যে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে আমরা যেন এখন থেকেই তার জন্য নির্দিষ্ট কর্মসূচি শুরু করে দিই। ফলে আমরা পার্টির কাজে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
সেই বহুকাঙ্খিত ঘোষনা খুব তাড়াতাড়িই হল। ১৯৭০ সালের ৩১ শে মার্চ রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান একটি লিগাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার ঘোষণা করেন যাতে দুই পাকিস্তানের (পূর্ব আল পশ্চিম) একটি অবিচ্ছিন্ন আইনসভার জন্য সরাসরি নির্বাচন করার কথা ঘোষণা করা হয়। ঠিক হয় ভোট হবে ৭ই ডিসেম্বর, ১৯৭০। সারা দেশ খুশিতে মেতে উঠল। আমরা যারা পার্টির কর্মীরা ছিলাম তাদের কর্মব্যস্ততা আরও বেড়ে গেল। লড়াই মূলত দুই দলের- পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগ যার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর পশ্চিম পাকিস্তানের পাকিস্তান পিপলস পার্টি যার নেতা ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো।
সাধারন নির্বাচনের ঠিক এক মাস আগে ঘটে গেল এক ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সে বছর ৩রা নভেম্বর বাংলাদেশের বুকে আছড়ে পড়ল ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণনাশক ঘূর্ণিঝড় 'ভোলা'। কয়েক মিনিটের মধ্যে 'ভোলা' পূর্ব পাকিস্তানকে তছনছ করে দিল। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ প্রাণ হারাল। সে এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য। কোথাও বাচ্ছা শিশু খিদের জ্বালায় কাঁদছে, তার মা-বাবার কোনো খবর নেই। কোথাও সন্তানহারা মা বিলাপ করছে। গাছপালার ভিতর থেকে শুধু লাশ বেরুচ্ছে। আমরা নেমে পড়লাম উদ্ধার কাছে। মীরার নেতৃত্বে তৈরী হলো ত্রাণ সংগ্রাহক কমিটি। তাদের সংগ্রহ করা ত্রাণ আমরা উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা দুর্যোগ কবলিত এলাকায় বিলি করতাম। এদিকে এতো বড় দুর্যোগের পরের ইয়াহিয়া সরকার যেন নির্বিকার। সরকারের তরফ থেকে এতোটুকু সাহায্য পাওয়া গেল না। বাঙালিরা এতো দিনে পরিষ্কার বুঝে গেল যে পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে পূর্ব পাকিস্তানের কোনো মূল্য নেই। আলাদা বাংলাদেশের স্বপ্নটা আরও তীব্র হলো। জেনারেল ইয়াহিয়ার এই অমানবিক আচরণর প্রতিবাদে ও দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসনের দাবিতে ১৯ শে নভেম্বর ঢাকা শহরে ছাত্র মিছিলের ডাক দেওয়া হলো। পুরোধায় যথারীত আমি আর মীরা। প্রতিটা দিন, প্রতিটা আন্দোলন আমার আর মীরার সম্পর্কটা মজবুত করছিল। ভালোবাসারও উপরে আমরা একে অপরকে ভীষণ শ্রদ্ধা করতাম।
এর কিছুদিনের মধ্যেই এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। পূর্ব নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ৭ই ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হল সাধারণ নির্বাচন। তখনও আপামর বাঙালির হৃদয়ে বঞ্চনার দগদগে ঘা স্পষ্ট। বাঙালির যাবতীয় রাগ, বেদনা, ঘৃণা আছড়ে পরল ব্যালট বাক্সে। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬০ আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল আওয়ামী লীগ আর ভুট্টোর পিপিপি পেল মাত্র ৮১ টা আসন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা পূর্ব পাকিস্তানে নেতার হাতে শাসনভার ছেড়ে দিতে রাজি ছিল না। তারা নানা অজুহাতে সরকার গঠনে বাগড়া দিতে থাকল। ভুট্টো বুঝতে পেরেছিল যে অবিভক্ত পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী হওয়া তার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। ফলে সে বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্যে এক সুত্র দিল 'উধার তুম, ইধার হাম', অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু হন আর পশ্চিম পাকিস্তানের ভুট্টো। যা ছিল কার্যত অবাস্তব প্রস্তাব। স্বভাবতই আওয়ামী লীগ তা মেনে নিল না। আর এই প্রস্তাবই বাঙালি মনে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা স্বাধীনতার আগুনকে দাউদাউ করে জ্বালিয়ে দিল।
এর পরেই শুরু হল আরও বৃহত্তর ষড়যন্ত্র। সারা পূর্ব পাকিস্তানে এক কথায় অঘোষিত কার্ফু জারি হয়ে গেল। শুরু হলো সাধারন মানুষের উপর পাক বাহিনীর নির্মম নির্যাতন। তাতে অবশ্য কি বাঙালিও মদত দিয়েছিল। সকলেই তখন বুঝে গিয়েছিল যে এবার আমাদের স্বাধীনতার লড়াইয়ে নামা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। শুধু আনুষ্ঠানিক ভাবে সেই লড়াই শুরু হওয়া বাকি ছিল মাত্র। খুব শিগগিরই তা হয়ে গেল। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জাতির উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সেই ভাষণে বিভিন্ন দাবির উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন, "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম"। তার এই ভাষণ গোটা জাতিকে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উন্মাতাল করে তোলে। শুরু হয়ে যায় স্বাধীনতার লড়াই যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নামে খ্যাত।
এরই মধ্যে আমার কাছে দলের উপর মহল থেকে কয়েকটা দিন গা ঢাকা দেওয়ার নির্দেশ আসে। কিন্তু সেই মূহুর্তে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই মীরা অত্যন্ত গোপনে আমাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তোলে। দিন চারেক আমি তাদের বাড়িতে ছিলাম। সারাদিন আমি আর মীরা গল্প করতাম। কোন দিকে যে সময় কেটে যেত বুঝতেই পারতাম না। চারিদিকের থমথমে পরিস্থিতি আর রাস্তায় আর্মির আধিক্য বলে দিচ্ছিল যে বড় একটা কিছু ঘটতে চলেছে। ২৩শে আমার কাছে অতি সত্বর ঢাকা ছাড়ার নির্দেশ আসে। সেই রাতেই আমি ঢাকা থেকে চলে যাই। মীরাই আমাকে বাসে তুলে দিয়ে আসে। মীরার জিজ্ঞাসা করেছিল যে আবার কবে দেখা হবে, বলেছিলাম স্বাধীন বাংলাদেশ আমাদের হাতছানি দিচ্ছে মীরা, খুব তাড়াতাড়িই আবার আমাদের দেখা হবে। মীরার শেষ কথা ছিল "আমি কিন্তু তোমার অপেক্ষায় রইলাম", আমার চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আসে, বুকে পাথর চাপা দিয়ে স্বাধীনতার লড়াইয়ে নেমে পরি।
অনেক লুকিয়ে চুরিয়ে ২৫ তারিখ সন্ধ্যা বেলায় গ্রামে পৌঁছাই। সেদিন রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর মিটিং ছিল তা বিফল হয়। মধ্যরাতে তিনি নরহত্যার নির্দেশ দিয়ে গোপনে লাহোর ফিরে যান। যে বড় কিছু ঘটার ইঙ্গিত গত কয়েক দিন ধরে নানা জায়গা থেকে আসছিল এবার পালা ছিল সেই ঘটনা ঘটার। মধ্যরাত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী শুরু করে 'অপারেশন সার্চলাইট' নামের গণহত্যাযজ্ঞ। সেই নরসংহারের খবর যাতে পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে না পৌঁছায় সেই উদ্দেশ্যে আগেই সমস্ত বিদেশি সাংবাদিকদের ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। সারা ঢাকা জুড়ে পাক বাহিনী নির্বিচারে হত্যালীলা চালায়। এর দিন দুয়েক পর দলের গোপন দূত মারফত বিস্তারিত খবর পেলাম। জানলাম যে ঢাকার প্রায় সমস্ত ছাত্রাবাসনগুলো ছিল ওদের প্রধান লক্ষ্য। আমাদের জগন্নাথ আবাসন ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলা হয়। প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ ছাত্রকে নির্মমভাবে খুন করা হয়। কিন্তু যে খবরটা আমাকে সবচেয়ে আঘাত করে তা হলো, আমার খোঁজে ওরা মীরাদের বাড়ি গিয়েছিল আর আমাকে না পেয়ে ওদের প্রত্যেককে গুলি করে মেরেছে। এই খবর শোনা মাত্র আমার মাথায় যেন বজ্রাঘাত হলো। বুকের ভিতরটা ভেঙে খানখান হয়ে গেল। আমি স্থবির হয়ে গেলাম। খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিলাম। নিজেকে একটা ঘরে বন্দি করে ফেললাম। আমার মা-বাবা শত চেষ্টা করেও আমাকে স্বাভাবিক করতে পারল না। আমি শুধুই ভাবছিলাম যে মীরাদের এই পরিনতির জন্য আমিই দায়ী। যদি আমি ওকে এসবের মধ্যে না জড়াতাম, যদি আমি ওদের বাড়িতে সেই কটা দিন আশ্রয় না নিতাম তাহলে ওদের এই ভাবে খুন হতে হত না।
এরই মধ্যে ঘটে গেল আর একটা ঘটনা। আমার এক তুতো দাদাকে আমি মনে করে পাক বাহিনীর খুন করল। এই খবরে আমি আবার এক ধাক্কা খেলাম আর এই ধাক্কায় আমার যেন সম্বিত ফিরল। 
সেদিন মধ্যরাতে রংপুরের পার্টির শীর্ষ নেতা শহীদুল ইসলাম ভূইয়া এলেন আমার সাথে দেখা করতে। উনি আমাকে পরামর্শ দিলেন যেন আমি যেন কিছুদিনের জন্য ভারতে চলে যাই। আমিও ভেবে দেখলাম উনি ঠিকই বলেছেন। কিন্তু বাদ সাধল আমার মা। মা আমাকে একা ছাড়তে নারাজ। অগত্যা ঠিক হল আমি, মা আর বাবা কিছু দিনের জন্য ভারতে চলে যাব। পরিস্থিতি বুঝে পরে ফিরে আসব। শহীদুল ভাই আমার ভারতে যাওয়ার যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিলেন। আমাদের গ্রাম থেকে কাছাকাছি ভারতের বর্ডার ছিল কুচবিহার। সেই রাতেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের সঙ্গে ছিল ইশতিয়াক আহমেদ, শহীদুল ভাই-এর বিশেষ পরিচিত। ইশতিয়াক ভাই বর্ডার পারাপার করাতে রীতিমত দক্ষ ছিল। ওনার সাহায্য তিস্তা ও সতী নদী পার করে সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম কুচবিহারের সিতাইয়ে। সেখান থেকে জলপাইগুড়িতে একটা বস্তিতে উঠলাম।
বছর দুয়েক আমরা জলপাইগুড়িতেই ছিলাম। এরই মধ্যে ভারতের সাহায্যে আমাদের মুক্তি বাহিনী পাকিস্তানকে আত্মসমর্পণ করাল, বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ হলো, বঙ্গবন্ধু দেশের সর্বময় কর্তা হলেন। কিন্তু মীরার ঘটনা আমি ভুলতে পারি নি। সেই আঘাত আমাকে যেন একদম বদলে দিল। হাসিখুশি মিশুকে আমি হয়ে গেলাম ঘরকুণো, কারোর সাথে কথা বলতাম না। দেখেছিসই তো আমাকে আমি কেমন।"
এতক্ষণ সৌম্য মন দিয়ে সব শুনছিল, এবার মুখ খুলল, "আরিব্বাস দাদু! এতো সিনেমার গল্প মনে হচ্ছে। আমি জানতাম তোমার কোনো গোপন ইতিহাস আছে কিন্তু তুমি এতো বছর ধরে মনের মধ্যে যে এতো দুঃখ-কষ্ট পুষে রেখেছ তার বিন্দুমাত্র আন্দাজ ছিল না।"
এক গ্লাস জন খেয়ে দীপঙ্কর গ্লাসটা টেবিলে রেখে বলল, "তা তুই ঠিকই বলেছিস। সিনেমাই বটে।"
"কিন্তু দাদু আজ হটাৎ আমাকে খাওয়ালে, এতো খুশি তার কারণ কি?
"এর কারন আমি আমার জীবনের সবথেকে খুশির খবর আজ পেয়েছি।"
"কি খবর?" চোখ দুটো বিস্ফারিত করে সৌম্য জিজ্ঞাসা করল।
"মীরা বেঁচে আছে আর এই কলকাতাতেই আছে" আনন্দে দীপঙ্করের চোখদুটো ভিজে গেল, চোখের কোণে জল চিক চিক করছে।
সৌম্য যেন চমকে উঠল, কয়েক সেকেন্ডে নীরবতার পর বলল, "কিন্তু দাদু তুমি তো বলেছিলে....."
সৌম্যকে থামিয়ে দিয়ে দীপঙ্কর বলল, "না না, মীরা বেঁচে ছিল। সেদিন রাতে ওদের বাড়িতে আক্রমণ হয়েছিল ঠিকই কিন্তু সেই আক্রমণে মীরা আর মীরার মা বেঁচে গিয়েছিল যদিও ওর দাদা আর বাবা মারা গিয়েছিল।"
"কিন্তু দাদু তুমি এই খবরটা কোথায় পেলে?"
"আজ মেডিকেল কলেজে গিয়েছিলাম আমার এক পুরোনো সহকর্মীকে দেখতে। সেখানে গিয়ে হটাৎ দেখা হয়ে গেল আমার এক বন্ধু সাব্বিরের সাথে। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাথে পড়তাম। সে এখন ঢাকাতেই থাকে। এখানে এসেছে তার এক আত্মীয়ের চিকিৎসার জন্য। সেই আমাকে এটা জানাল।"
"কিন্তু দাদু উনি কলকাতায় কেন?"
"সাব্বির বলল, ওরা নাকি শুনেছিল যে আমাকে পাক হানাদাররা খুন করেছে। আসলে আমার নিরাপত্তার কথা ভেবে সেই সময় তেমনই কথা রটানো হয়েছিল। ওরা যে আমার সেই ভাইকে খুন করেছিল সেটা আমি বলেই মুক্তি বাহিনী প্রচার করে। ততদিন আমি অবশ্য এদেশে চলে এসেছি।"
"তারপর?" সৌম্যর গায়ে কাঁটা দিচ্ছে
"তারপর আর কি! স্বাধীন বাংলাদেশে মীরা ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের নেতা হয়ে যায়। বছর দেড়েক পর বাড়ির চাপে শেষমেশ মীরা বিয়ে করে। বিয়ে ঢাকার আওয়ামী লীগেরই এক ব্যবসায়ী নেতা সমীরণ ভাদুড়ির সাথে। সমীরণদার সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল, উনি দলকে আর্থিকভাবে প্রচুর সাহায্য করেছেন। কিন্তু ঈশ্বর বোধহয় কাউকে সুখি দেখতে চান না। কারণ মানুষ সুখি হলে ঈশ্বরকে ভুলে যাবে। তাই মীরার জীবনে নেমে এলো আবার এক অন্ধকার।"
"কেন? আবার কি হলো?" সৌম্যকে জিজ্ঞাসা করল
"এরপর এলো সেই অভিশপ্ত রাত। পঁচাত্তর সালের ১৫ই আগস্ট ভোর রাতে বিদ্রোহী সেনারা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার খুন করল। তার পরেই তারা টার্গেট করল দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের। সমীরণদা আর মীরা দুজনেই ওদের টার্গেট ছিল। ১৭ই আগস্ট সন্ধ্যা বেলায় ওরা সমীরণদার বাড়ি আক্রমণ করল ওদের দুজনকে খুন করার জন্য কিন্তু ভাগ্যবশত সেদিন মীরা তার বছর দুয়েকের ছেলেকে নিয়ে ওর মায়ের বাড়ি গিয়েছিল। তাই সে বেঁচে যায়।"
"উনি কলকাতায় কিভাবে এলেন?"
"পার্টির কিছু নেতা কর্মীদের সাহায্যে মীরা তার ছেলে, মীরার মা আর শাশুড়িকে নিয়ে কলকাতায় চলে আসে। সমীরণদার তো এখানেও বিজনেস ছিল, বাড়িও ছিল।"
"আচ্ছা দাদু তোমার ওনার সাথে দেখা করতে ইচ্ছা করছে না?" উৎসুক গলায় সৌম্য জিজ্ঞাসা করল 
"ওর জীবনে আমি আর ঢুকতে চাইছি না। তাছাড়া এতো বড় কলকাতা ওকে কোথায় খুঁজব!" দীপঙ্করের গলায় হতাশা স্পষ্ট হলো।
"খোঁজার চাপটা তুমি আমার উপর ছেড়ে দাও। তুমি বলো ওনার ছেলের নাম কি তুমি জানো?"
"না, তা কি করে জানবো!"
"আচ্ছা তোমার সমীরণদার বাড়ি কোথায় সেটা কি জানো?"
"শুনেছি তো ভবানীপুরের দিকে কোথাও।"
"ঠিক আছে দাদু, আমি দেখছি। এখন চলি, কমপিউটার ক্লাসে যেতে হবে।"

কমপিউটার ক্লাস থেকে ফিরে সৌম্য তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে পড়ল। আজ খাবার টেবিলেও সৌম্য চুপচাপ ছিল। খেতে খেতে বাবা একবার জিজ্ঞাসা করেছিল যে সে আজ এতো চুপচাপ কেন। সৌম্য 'কিছু নয়' বলে এড়িয়ে যায়। ওর মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছে যে এতো বছর ধরে বাগচি দাদু বুকের মধ্যে কতো কষ্ট বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে, কেউ তা জানে না, আর সে সব না জেনে লোকে কতো কি বলে। মানুষ কারোর ব্যাপারে কিছুই না জেনেই তাকে জাজ করে। শুধু মাত্র আত্মতুষ্টির জন্যই সে এটা করে। এটি মানুষের একটা অন্যতম জান্তব প্রবৃত্তি। এই চিন্তা সৌম্যর রাতের ঘুম কেড়ে নিল। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে কিন্তু ঘুম আসছে না। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, যে করেই হোক দাদুকে তাঁর প্রেম পাইয়ে দিতেই হবে। হটাৎ তার মাথায় এলো সোশাল মিডিয়ার কথা। সঙ্গে সঙ্গে সে ধড়মড়িয়ে বিছানা ছেড়ে নেমে পরল। তারপর পাশের টেবিলে রাখা ল্যাপটপটা চালু করে ফেসবুক খুলল। সার্চে গিয়ে 'ভাদুড়ী ভবানীপুর' বলে সার্চ করতেই অন্তত পঞ্চাশটা প্রফাইল সামনে এলো। সৌম্য মনে মনে ভাবল যে পঁচাত্তর সালে মীরা দেবির ছেলের বয়স যদি দুবছর হয় তবে এখন ওনার বয়স হবে বিয়াল্লিশ। তাহলে সেই মতো প্রফাইলগুলো নির্বাচন করতে হবে। এগারোটা প্রফাইল সে নির্বাচন করল। কিন্তু এই এগারোটা প্রফাইলের মধ্যে কোনটা সেই ব্যক্তির যাকে সে খুঁজছে? বসার ঘরের দেওয়ালে একাকী ঝুলতে থাকা ঘড়িটা ঢং করে একটা শব্দ করে জানান দিল যে রাত একটা বেজে গেছে। নাহ্, এবার শুয়ে পরতে হবে, মা যদি জানতে পারে এখনো জেগে আছে তাহলে ভীষণ বকবে। ল্যাপটপটা বন্ধ করে চিন্তার বোঝা নিয়ে সৌম্য শুয়ে পরল।

আজ সিধুদার দোকানে পল্লব, অনিন্দ্য, আশফাক, নিশীথরা এলেও সৌম্য আসেনি। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর সিধুদা জিজ্ঞাসা, "কিরে আশফাক তোদের পঞ্চপাণ্ডবের আর একটা কই?"
"কি জানি। আমরাও বুঝতে পারছি না গো। এক ঘন্টা হয়ে গেল আমরা এসেছি বাবুর এখনো দেখা নেই", বিরক্তির সুরে আশফাক জবাব দিল
"সিধুদা, আমাদের চারজনকেই আপাতত চা দাও, সৌম্য এলে দেখা যাবে" এই বলে নিশীথ বাকিদের দিকে তাকাতেই সকলে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল
একটা থালায় চারটে মাটির ভাঁড়ে চার কাপ চা এগিয়ে দিয়ে সিধুদা সৌম্যকে ফোন করার জন্য বলল। অনিন্দ্য জানাল যে পল্লব ইতিমধ্যেই অন্ততঃ চারবার ফোন করেছে কিন্তু সৌম্যর ফোন বন্ধ অছে।
"তাহলে তো চিন্তার বিষয়। তোরা যাবার সময় একবার ওর বাড়িতে খবর নিয়ে যাস" সিধুদাকে এখন চিন্তিত লাগছে।
পল্লবদের চা যখন প্রায় শেষের দিকে ঠিক তখনই সৌম্য এসে হাজির। তাকে দেখে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। সে দোকানে ঢুকতেই তার দিকে একের পর এক প্রশ্নের বাণ ধেয়ে এলো-
অনিন্দ্য বলল "কিরে কোথায় ছিলি?"
পল্লব বলল, "এতো দেরি কেন?"
নিশীথ বলল, "আমরা কখন এসেছি জানিস?"
আশফাক বলল, "তোর ফোনটা বন্ধ কেন?"
"সবাই মিলে একসাথে এতো প্রশ্ন করে আমি জবাব দেব কি করে! দাঁড়া আমি এই তো এলাম, দেখতেই পাচ্ছিস আমি ক্লান্ত। একটু বসি দিয়ে সব বলছি" এই বলেই সৌম্য সিধুদাকে এক গ্লাস জল আর একটা সিগারেট দিতে বলল।
সিধুদা জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল, "চা খাবি না?"
"একটু পরে খাব" সিগারেটটা ধরিয়ে সৌম্য পল্লবদের উদ্দেশ্যে বলল "এবার তোদের প্রশ্নের জবাব দিই।"
"কি জবাব দেবে শালা তুমি! কাল সেই যে গেলি তারপর আর ফোন ধরিস নি, আজ আবার আউট অফ রিচ" আশফাক রীতিমতো রেগে আগুন।
"বাই দ্য ওয়ে, আশফাক আমার কোনো বোন নেই" মুচকি হেসে সৌম্য জবাব দিতেই সকলে হেসে উঠল।
"বন্ধুগন এবার একটু সিরিয়াস হতে হবে। ভীষণ জরুরি কথা আছে", সৌম্য ঠোঁটের কোণের মুচকি হাসিটা মিলিয়ে গেল, চোখ দুটো ছোট হয়ে গেল।
"কি এতো জরুরি কথা যে তুই এতো সিরিয়াস হয়ে গেলি?" পল্লব গম্ভীর হয়ে বলল।
"শোন তবে- কাল বাগচি দাদু আমাকে দেখা করতে বলে গেল না? তা আমি কাল গিয়েছিলাম-" এরপর সৌম্য ওদের সমস্ত ঘটনাটা খুলে বলল। সকলে এই ঘটনা শুনে স্তম্ভিত, তাদের মুখে কোনো রা নেই।
"এ তো রীতিমতো রোমহর্ষক সিনেমার গল্প!" নিজেকে একটু সামলে নিয়ে নিশীথ বলল।
"হ্যাঁ, ঠিক তাই। আমি ডিসাইড করেছি মীরা আন্টিকে খুঁজে বের করে এঁদের দুজনকে আবার মিলিয়ে দেব। তোরা কি আমার সঙ্গে থাকবি?"
"মানস স্যারের গাছের আম চুরি করা থেকে কাউকে না জানিয়ে বর্ধমানে ম্যাচ খেলতে যাওয়া- কোনো দিন কি আমরা তোর সঙ্গ ছেড়েছি যে আজ থাকব না?" পল্লবের কথা শেষ হতেই সকলে তাকে সম্মতি জানাল।
সৌম্য তাদের জানাল যে সে এগারোটা ফেসবুক প্রফাইল সিলেক্ট করেছে। তার একটা তালিকা সৌম্য তাদের দিল। ওরা প্রত্যেকে সেই তালিকাটা মন দিয়ে দেখল। কোথা থেকে শুরু করবে তারা? প্রত্যেকেই বেশ চিন্তিত। এমন সময় আশফাক বলল, "সৌম্য আমার সিক্সথ সেন্স বলছে সমীর ভাদুড়ীই হবে। এনাকে দিয়েই আমাদের মিশন শুরু করি আমরা"
"তোর এরকম মনে হওয়ার কারণ?" পল্লব গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞাসা করল
"দেখ, মীরা আন্টির হাজবেন্ডের নাম হল সমীরণ। 'সমীরণ' আর 'মীরা' এই দুটো নামের সাথে 'সমীর' নামটার একটা সামঞ্জস্য আছে। তাই আমার মনে হয় এনাকে দিয়েই আমাদের শুরু করা উচিৎ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই সমীরই সেই ব্যক্তি যাকে আমরা খুঁজছি", আশফাকের চোখে আত্মবিশ্বাসের ঝলক স্পষ্ট।
প্রত্যেকেই আশফাকের যুক্তির সাথে সম্মত হলো। ঠিক হলো আজই বৈকালে সৌম্য আর পল্লব ঐ ঠিকানায় যাবে। বাকিরাও এক একজন এক একটা ঠিকানায় যাবে।

বিকেল তখন সারে পাঁচটা বাজে। সূর্য প্রায় ডুবোডুবো। সৌম্যদের ট্যাক্সিটা মনে রাস্তা থেকে ডান দিকে বাঁক নিয়ে ঢুকে জগবন্ধু আশ্রমের পাশ দিয়ে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে একটা বড় লোহার গেটের সামনে দাঁড়াল। সৌম্য আর পল্লব ট্যাক্সি থেকে নেমে ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে গেটের সামনে এগিয়ে যেতেই দেখল কালো ফলকের উপর সোনালি অক্ষরে লেখা 'ডাঃ সমীর ভাদুড়ী' তার নিচে ডিগ্রির উল্লেখ। সৌম্যরা গেটের দিকে এগিয়ে যেতেই দারোয়ান তাদের জানাল যে ডাক্তারবাবু এখন নেই। সৌম্য সরাসরি জিজ্ঞাসা করল যে ডাক্তারবাবুর মা বাড়িতে আছেন কিনা। অন্ধকারে ছোঁড়া তীরটা ঠিক জায়গাতেই লাগল। ওরা অনুমতি নিয়ে ভিতরে গেল।
এক পরিচারিকা তাদের ভিতরে নিয়ে গেল। বসার ঘরে তাদের বসিয়ে সে চা-জল দিয়ে গেল। চা খেতে খেতে সৌম্য ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘরের চারিদিকটা দেখতে লাগল। ঘরের প্রতিটা আসবাবে আভিজাত্যের ছোঁয়া। এমন সময় এক ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা ঘরে ঢুকলেন। পরনে মেরুন পাড়ের সাদা শাড়ি, চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমা, গায়ের চামড়া কিঞ্চিত শিথিল হয়ে এসেছে তবে মুখের মধ্যে একটা কাঠিন্য আছে। সৌম্য নিশ্চিত ইনিই মীরা। বৃদ্ধা ঘরে ঢুকতেই সৌম্যরা উঠে দাঁড়িয়ে হাত জড়ো করে প্রণাম করল- "আমি সৌম্য, সৌম্য বসু আর ও আমার বন্ধু পল্লব। আপনি নিশ্চয়ই মীরাদেবি?"
"হ্যাঁ, আমার নাম মীরা ভাদুড়ী কিন্তু আমি তো আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না!"
এটা শুনেই সৌম্যর মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠল, চোখ থেকে খুশির ঝলক ঝড়ে পরছে, আনন্দে ওর লাফিয়ে উঠতে ইচ্ছা করছে।
নিজেকে একটু সামলে নিয়ে সৌম্য বলল, "১৯৭০-৭১ সাল, ঢাকা ইউনিভার্সিটি- আপনার কি কিছু মনে পরছে?"
একথা শোনা মাত্রই মীরার মুখের গঠন পারলে গেল, চোখ দুটো কুঁচকে ছোটো করে কয়েক মূহুর্ত কিছু ভাবল তারপর সৌম্যকে জিজ্ঞাসা করল, "তোমরা কারা? কে তোমাদের পাঠিয়েছে? কি উদ্দেশ্য তোমাদের?" তারপর আশঙ্কার সুরে জিজ্ঞাসা করল, "সত্যি করে বলো তোমাদের কি ঐ রাজাকাররা পাঠিয়েছে?"
"না না। আমাদের কেউ পাঠায় নি। তাহলে আমি সরাসরি প্রসঙ্গে আসি। দীপঙ্কর বাগচিকে মনে পরে?"
মীরা চমকে উঠল। বহু বছর ধরে এই নামটা তার মনের মধ্যে পাথর চাপা ছিল। সমীরণের সাথে বিয়ের পর আর কখনোই সে এই নামটা মুখে আনে নি। অনেক চেষ্টা করেছে ভুলে থাকতে কিন্তু মনের এতো গভীরে এর শিকড় চলে গেছে যেই সে কিছুতেই দীপঙ্করকে মুছে ফেলতে পারে নি। মীরার কপালে বলিরেখা গভীর হলো, "কে তোমরা? সত্যি করে বলো তোমাদের কে পাঠিয়েছে।"
"আন্টি আপনার চিন্তার কোনো কারণ নেই" এতক্ষণ চুপ থাকার পর পল্লব মুখ খুলল।
সৌম্য ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলল, "আন্টি আমরা দীপঙ্কর বাগচি অর্থাৎ বাগচি দাদুর কাছ থেকেই আসছি।"
একথা শোনা মাত্র প্রথমে মীরা চমকে উঠল ক্ষণিকের মধ্যেই তার মুখাভিব্যক্তি পরিবর্তন হয়ে গেল, ক্রোধে তার মুখ লাল হয়ে গেল, চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, "বেরিয়ে যাও তোমরা আমার বাড়ি থেকে। আমার দুর্বলতা নিয়ে মজা করার অধিকার তোমাদের কে দিয়েছে! এই মুহূর্তে বেরিয়ে যাও না হলে দারোয়ান দিয়ে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবো।"
পল্লব আর সৌম্য এক চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হলো। ওরা এইরকম কিছু ঘটতে পারে বলে কল্পনাও করে নি। কোনো রকমে সামলে নিয়ে সৌম্য বলল, "আন্টি আপনি শান্ত হন। আমরা মিথ্যা বলছি না।"
"না তোমরা মিথ্যা বলছ। সে অনেক আগেই-" কথা শেষ করতে পারল না মীরা, মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো।
"না না না। আপনি ভুল জানেন, বাগচিদাদু বেঁচে আছেন আর এই কলকাতাতেই আছেন। তবে আমাদের উনি পাঠাননি, উনি জানেনও না আপনি কোথায় থাকেন। সবে কাল উনি জানতে পেরেছেন যে আপনি বেঁচে আছেন আর কলকাতাতেই আছেন", সৌম্য এক নিঃশ্বাসে বলে গেল।
"তোমরা সত্যি বলছ?" কান্না থামিয়ে বলল মীরা
"একশ শতাংশ সত্যি বলছি আমরা। আপনি চাইলে আমরা আপনাকে ওনার ছবি দেখাতে পারি, সৌম্যর মোবাইলে আছে" পল্লবের কথা শেষ হতেই সৌম্য তাড়াতাড়ি পকেট থেকে তার মোবাইলটা বের করে মীরার দিকে এগিয়ে দিল। চোখের জল মুছতে মুছতে ছবিগুলো মীরা যেন প্রাণ ভরে দেখল। হ্যাঁ, সেই মুখ, সেই চোখ, সেই করুন চাঁউনি- এ ছবি তার দীপঙ্করের ছাড়া আর কারোর হতে পারে না। ছবি দেখতে দেখতে মীরা হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলো, যেন তার মনের ভিতরে জমে থাকা বহু বছরের দুঃখ-কষ্ট তার কান্নার মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এলো। সৌম্য কিছু বলতে যাবে এমন সময় পল্লব তাকে ইঙ্গিতে চুপ থাকতে বলল। এই মুহূর্তে মীরাকে তার ইচ্ছা মতো কাঁদতে দেওয়াই উচিৎ তাতে তার মনের ভিতরে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা বেদনা বেরিয়ে যাবে, মন হাল্কা হবে।
মিনিট দশেক হয়ে গেল কেউ কোনো কথা বলে নি, সবাই চুপ। মীরা অনেক কষ্টে কান্না থামিয়ে নিজেকে একটু সামলে নিয়েছে। এই মুহূর্তে ঘরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। সেই নিস্তব্ধতা ভাঙল মীরার কথায়, "সৌম্য, আমি তোমাদের সাথে যাবো, এখুনি।"
অবশ্যই, চলুন। বাকি কথা আমি ট্যাক্সিতে যেতে যেতে বলব।"

দীপঙ্করের আবাসনের সামনে এসে ট্যাক্সিটা থামল। ট্যাক্সি থেকে নেমে পল্লব সৌম্যকে জানাল যে তার ভিতরে যাওয়া উচিৎ হবে না কারন দীপঙ্করের সাথে তার সেভাবে কোনো পরিচয়ই নেই। সৌম্য তাকে বলল সে যেন বাকিদের নিয়ে সিধুদার দোকানে অপেক্ষা করে, সে কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের সাথে যোগ দেবে। মাথা নেড়ে পল্লব সেখান থেকে বিদায় নিল। মীরাকে নিয়ে সৌম্য ভিতরে গেল। ফ্লাটের সামনে গিয়ে সৌম্য কলিং বেল টিপতেই সঙ্গে সঙ্গে দীপঙ্কর দরজা খুলল যেন দরজা খোলার জন্য তৈরীই ছিল।
"কিরে তুই? এমনিতে তো পান-সুপারি দিয়ে নেমন্তন্ন না করলে তুই আসিস না। এখন নিজে থেকেই হাটাৎ কি ব্যাপার?"
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থেকেই সৌম্য জবাব দিল, "দাদু, তুমিও তো দশবার বেল না বাজালে দরজা খোলো না এখন বেল বাজাতে না বাজাতেই খুললে কি ব্যাপার?"
"আরে আমি একটু বেরোচ্ছি। ভাবছি একবার লোকাল থানায় যাব।"
"থানায়! থানা কেন?"
"দেখি মীরাকে খুঁজে বের করতে পুলিশ কোনো সাহায্য করে কি না।"
"তার জন্য থানায় যাওয়ার দরকার নেই। সৌম্য হ্যা না" মুচকি হেসে সৌম্যর বলল
"তুই কি করবি?"
"কি করব নয়, জিজ্ঞাসা করো কি করেছি"
"ঠিক আছে, কি করেছিস?"
"কি করেছি তুমি নিজের চোখেই দেখো" বলে সৌম্য ইশারা করতেই মীরা পাশ থেকে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
"দেখো তো দাদু চিনতে পারো কি না"
দীপঙ্কর বিস্ময় চোখে মীরার দিকে তাকিয়ে রইল। মীরাও বিহ্বল। দুজনের চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়ছে। এ যেন চোদ্দ বছরের বনবাসের পর উর্মিলা আর লক্ষণের মিলন। কিন্তু উর্মিলা ও লক্ষণ দুজনেই জানতেন যে চোদ্দ বছর পর আবার তাদের দেখা হবে কিন্তু দীপঙ্কর আর মীরা এতোদিন দুজন দুজনকে মৃত ভেবে এসেছে তাই তাদের মনের মধ্যে কোথাও দেখা হওয়ার কোনো সম্ভবনাই ছিল না। এহেন অসম্ভব ঘটনা যখন হটাৎই সম্ভব হয়ে যায় তখন তার অনুভূতিটাই আলাদা হয়। এই অনুভূতি ওরা দুজনের কেউই মুখে প্রকাশ করতে পারছিল না।
হটাৎ সৌম্যর ডাকে দুজনের সম্বিত ফিরল, "ও দাদু, তুমি কি আমাদের বাইরেই দাঁড় করিয়ে রাখবে নাকি?"
"তাই তো, দেখেছিস! আয় আয় ভিতরে আয়। মীরা, ভিরতে এসো।"
ভিতরে গিয়ে ওরা সোফায় বসল। দীপঙ্করকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় লাগছে। সে কিভাবে মীরাকে অভ্যর্থনা করবে, কিভাবে এই সন্ধ্যাটা উজ্জাপন করে কিছুই তার মাথায় ঢুকছিল না। মীরা ব্যাপারটা বুঝতে পারল, "এতো ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। তুমি দুদণ্ড বোসো এখানে।" ইতস্ততঃ করতে করতে দীপঙ্কর একটা চেয়ারে টেনে নিয়ে টি টেবিলে উল্টো দিকে বসল।
"আচ্ছা সৌম্য এই অসাধ্য সাধন তু কি করে করলে বল তো" দীপঙ্করের কথা শেষ হতেই সৌম্য কাঁধ ঝাঁকিয়ে জমার কলারটা তুলে মজার ছলে বলল, "দাদু, আমরা হচ্ছি একবিংশ শতাব্দীর যুবক, আমাদের কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়" বলেই হেসে উঠল। সৌম্যর সাথে মীরা ও দীপঙ্কর দুজনেই হেসে উঠল। এতক্ষণে ঘরের ভিতরের গুমোট ভাবটা কেটে যেন একটা শীতল হাওয়া বয়ে এলো। এরপর সৌম্য মীরাকে কি ভাবে খুঁজে পেল সেটা সংক্ষেপে জানাল।
"তোদের যে আমি কি ভাবে ধন্যবাদ জানাব তা আমার জানা নেই। ওদের সবাইকে বলবি যে তোদের আমি একটা এমন পার্টি দেব যে তোরা সারা জীবন ভুলবে না।"
"ঠিক আছে সে দেখা যাবে আমি এখন উঠি।"
"সে কি! কেন? মীরা একটু অবাক হলো
"আন্টি, আমি সেই কখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছি। মা খুব চিন্তা করবে। একবার বাড়িতে দেখা করে আসি। চিন্তা করবেন না আন্টি, আপনা যখন আমি নিয়ে এসেছি তখন আপনাকে পৌঁছে দেবার দায়িত্বও আমার"

দীপঙ্করের বাড়ি থেকে বেরিয়ে সৌম্য সোজা সিধুদার দোকানে চলে গেল। সেখানে ইতিমধ্যেই বাকিরা হাজির। সৌম্য সেখানে পৌঁছতেই সকলে উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকাল।
"কিরে, এতো তাড়াতাড়ি চলে এলি?" আশফাক সৌম্যকে জিজ্ঞাসা করল।
"ওনাদের এতোদিন পর দেখা হলো। ওনাদের মাঝে কি আমার থাকা ঠিক? তাই চলে এলাম।"
নিশীথ আশফাককে বলল, "সত্যি আশু, তো ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়র জোর আছে! এটা আমি তো ভাবতেই পারি নি। কি বল তোরা?"
সকলে সম্মতি জানাল। সৌম্য সিধুদাকে এক কাপ চা দিতে বলে অনিন্দ্যর কাছে একটা সিগারেট চাইল। সিগারেটটা ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিয়ে এক চুমুক চা খেল তারপর ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, "বুঝলি দাদু বলেছে আমাদের একটা পার্টি দেবে, এমন পার্টি যা আমরা সারা জীবন ভুলব না।"
"তাই নাকি! সৌম্য দেখবি যেন বিরিয়ানি থাকে মেনুতে" আবদারের সুরে আশফাক বলতেই সবাই হো হো করে হেসে উঠল।

সৌম্য বেরিয়ে যেতেই দীপঙ্কর মীরাকে বলল, "তুমি বোসো, আমি চা বানিয়ে আনছি।"
"এখানে একা বসে থাকব কেন? আমিও তোমার সাথে তোমার রান্নাঘরে যাই চলো"
চা বানাতে বানাতে দুজনে তাদের স্মৃতির গভীরে ডুব দিল। মীরা দীপঙ্করকে বলল, "তোমার মনে আছ যখন তুমি আমাদের বাড়িতে আন্ডারগ্রাউন্ড ছিলে তখন রান্নাঘরে আমি রান্না করতাম আর সেখানে বসে বসে আমার সাথে গল্প করতে?"
"তা আবার মনে থাকবে না! গল্প করতে করতে ঘন্টার পর ঘন্টা কি ভাবে কেটে যেত জানতেই পারতাম না।"
"আচ্ছা দীপঙ্কর, তুমি বিয়ে করলে না কেন?"
"হুম, আমার আবার বিয়ে। জীবনের একটা বড় সময় তো অবসাদগ্রস্ত হয়েই কাটিয়ে দিলাম। জানো তোমার মৃত্যু খবরটা আমি মন থেকে একদম মেনে নিতে পারে নি। ভীষণ ভেঙে পড়েছিলাম। তোমার স্মৃতি নিয়েই জীবনের এতোটা বছর কাটিয়ে দিলাম।"
দুজনে দু'কাপ চা নিয়ে বসার ঘরে ফিরে এলো।
"আমি কিন্তু একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি"
"কি সিদ্ধান্ত?" জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে দীপঙ্কর মীরার দিকে তাকাল।
"শেষ জীবনটা আমি তোমার সাথেই কাটাতে চাই। আমাকে বিয়ে করবে তো?"
কি বলছ মীরা! তুমি আমাকে বিয়ে করবে? এ তো আমার কাছে স্বর্গ পাওয়া" আবেগে দীপঙ্করের গলা বুজে এলো। সে এটা কল্পনাও করে নি। সারা জীবন যে দুঃখ ভোগ করে শেষ জীবনে তাকে ঈশ্বর হয়তো এভাবেই সুখ ঢেলে দেন। 
এমন সময় সৌম্য ফিরে এলো। সে জানালো রাত সারে আটটা বাজে, এবার তাদের বেরোনো উচিৎ।
মাস খানেক কেটে গেছে, দীপঙ্কর আর মীরা এখন নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ করে। কখনো প্রিন্সেপ ঘাটে, কখনো ময়দানে বা কখনো পার্কস্ট্রীটের কোনো আভিজাত রেস্তরাঁয়। ওরা যেন তাদের যৌবন ফিরে পেয়েছে। দীপঙ্কর আর মীরা ঠিক করল সামনের মাসের পঁচিশ তারিখ কালিঘাটের মন্দিরে তারা বিয়ে করবে। দীপঙ্করের মনে কিন্তু এখনো কিছুটা সংশয় থেকে গেছে। সংশয় অবশ্যই মীরাকে নিয়ে নয় সংশয় মীরার ছেলে সমীরকে নিয়ে। সমীর কি এটা মেনে নেবে? মীরা তো এখনো সমীরকে কিছুই জানায় নি। সে যখন জানবে তখন তার প্রতিক্রিয়া কি হবে, এইসব সাত পাঁচ চিন্তা তার মাথায় ঘুরছে। মীরাকে তার এই সংশয়ের কথা জানাতে মীরা বলেছে বলেছে যে সমীরের কি প্রতিক্রিয়া হবে সে জানে না কিন্তু সে তার সিদ্ধান্তে অটল। মীরার কথা শুনে বোঝা যায় যে তার সাথে সমীর সম্পর্কে তেমন উষ্ণতা নেই বরং শীতলতাই বেশি। তবে দীপঙ্কর এ ব্যাপারে মীরাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেনি। সে যখন এই প্রসঙ্গে কিছু বলা উচিৎ মনে করবে তখন সে নিজেই বলবে। যে কোনো সম্পর্কে ভালোবাসার সাথে একে অপরের প্রতি সম্মান থাকাও অত্যন্ত জরুরী। সেই সম্মান, সেই শ্রদ্ধা যে দীপঙ্কর আর মীরার একে অপরের প্রতি যথেষ্ট আছে তা বলাই বাহুল্য।

হাতে আর মাত্র এগারোটা দিন। মীরার মনে মনে ভাবল এবার সমীরকে দীপঙ্করের ব্যাপারে জানানো দরকার। সে জানে সমীরের তার প্রতি ভালোবাসা বা সম্মান কিছুই নেই। সে আর তার স্ত্রী চন্দ্রাণীর ভালোবাসা শুধু মাত্র তার সম্পত্তির উপর। এতো বড় বাড়িতে ছেলে, বৌমা, ছোট্ট নাতনি, পরিচারক-পরিচারিকা সকলের মাঝেও সে বড় নিঃসঙ্গ। একাকিত্ব, মানসিক যন্ত্রণা যখন তাকে একটু একটু করে শেষ করে দিচ্ছিল ঠিক তখনই সৌম্যকে যেন ঈশ্বর তাঁর দূত হিসেবে পাঠালেন। সৌম্য এক লহমায় মীরার মনে তার নিজের জীবনের মূল্যায়নটাই বদলে দিল। মীরা যখন তার জীবনকে সুখহীন এক ব্যর্থ জীবন হিসেবে মূল্যায়ন করে ফেলেছে তখনই 'দেবদূত' সৌম্যর মাধ্যমে দীপঙ্করের খবর পাঠিয়ে ঈশ্বর তাকে বুঝিয়ে দিলেন যে সে বড্ড তাড়াহুড়ো করে ফেলেছে, জীবনের এখনো একটা মোড় বাকি আছে যা তাকে সুখে, শান্তিতে ভরিয়ে দেবে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অস্থির মনটাকে শান্ত করার জন্য মীরা কয়েক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল, একটা  দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনটাকে শক্ত করল, আজ সমীরকে সে সব বলবেই। সন্ধ্যাবেলায় সমীর ঘরে ফিরতেই মীরা তাকে বলল যে সে কিছু কথা বলতে চায়। কিন্তু সমীর জানাল যে সে এখন ক্লান্ত, এই মুহূর্তে কোনো ফালতু কথা শোনার মতো সময় বি ইচ্ছা তার কাছে নেই।
কি! আমার কথা ফালতু, তোর কাছে আমার কথার কোনো মূল্য নেই?" চিৎকার করে ক্ষোভে ফেটে পড়ল মীরা তারপর বলল, "তোকে এখুনি শুনতে হবে, এটা আমার ভবিষ্যতের কথা"
"হুম! তোমার কি ভবিষ্যতের কিছু বাকি আছে? বেশ বলো" সমীরের চোখে মুখে অবজ্ঞার ছাপ স্পষ্ট।
মীরা দীপঙ্কর আর দীপঙ্করের সাথে তার সম্পর্কের কথা সব সমীরকে জানাল আর তারপর বলল যে তারা আগামী পঁচিশ তারিখে বিয়ে করছে। একথা শুনে পিছন ঘুরে থাকে সমীর তার মায়ের দিকে একবার ঝট করে ঘুরে দেখল তারপর বলল, "তোমার যা ইচ্ছা করো তবে দয়াকরে এসবের মধ্যে আমাকে টেনো না।"
এতক্ষণে মীরার নিজেকে একটু হাল্কা লাগছে, মনের মধ্যে যে খচখচানিটা ছিল সেটা চলে গেছে।
সমীর গটগট করে উপরে উঠে গেল। শোয়ার ঘরে যেতেই তার স্ত্রী চন্দ্রাণী তাকে বলল, "বুড়ি কি বলছিল?" সমীর চন্দ্রাণীকে সব খুলে বলল তারপর বলল সে জানিয়ে দিয়েছে যে এসবের মধ্যে সে নেই। একথা শোনা মাত্রই চন্দ্রাণী কপাল চাপড়াতে লাগল, "এ কি সর্বনাশ করলে তুমি!" চাপা গলায় বলল চন্দ্রাণী।
"কেন? সর্বনাশের আবার কি করলাম?"
চন্দ্রাণী একবার চট করে ঘরের পর্দাটা সরিয়ে বাইরেটা দেখে নিল, তারপর দরজাটা বন্ধ করে দিয় বলল, "তোমার মাথায় কি গোবর আছে? ভেবে দেখেছ তোমার মা তার ঐ পুরনো নাগরের সাথে বিয়ের পর সব সম্পত্তি যদি তার নামে লিখে দেয় তখন কি হবে?"
"এটা তো আমি ভেবে দেখিনি। আমি এখুনি গিয়ে মাকে বলে আসছি যে এতে আমার মত নেই"
'আ হা রে! উনি বলবেন আর উনার মাও শুনে নেবেন! এ যেন তেল পারা খেজুর গাছ!"
"তাহলে কি করব?"
"খুন" চন্দ্রাণীর চোখদুটো জ্বলজ্বল করে উঠল
"কি বলছ! মাকে খুন করব?" সমীর চমকে উঠল
"তোমার মাথায় সত্যিই গোবর আছে। কি করে যে আমার বাবা তোমার মতো একটা হাঁদারামের সাথে আমার বিয়ে দিল কে জানে! তোমার মা খুন হলে সবার সন্দেহ প্রথমেই তোমার উপর পরবে। তখন এই সম্পত্তি জেলে বসে ভোগ করতে হবে।"
"আহা রাগ করছ কেন? পরিস্কার করে বলোই না।"
"দেখ ঐ বুড়োটার তো কেউ নেই বলছ। সুতরাং বুড়োটা যদি কোন ভাবে অপঘাতে মরে তাহলে কেউ তেমন মাথা ঘামাবে না। পুলিশও ক'দিন নামে মাত্র তদন্ত করবে দিয়ে ফাইল বন্ধ করে দেবে।"
"কিন্তু চন্দ্রাণী, প্রথমে একবার কাউকে দিয়ে বুড়োটাকে শাসানি দিলে হয় না?"
"আচ্ছা গাড়ল তো তুমি? তাহলে সবাই জেনে যাবে না যে তুমি এই বিয়ের বিরুদ্ধে? পড়ে ঐ লোকটা যদি বাথরুমে পড়ে গিয়ে মরে তাহলেও লোকে তোমাকেই সন্দেহ করবে।"
"এটা তো ভেবে দেখিনি। ঠিক আছে আমি ব্যাবস্থা করছি।

বিয়ের আর সপ্তাহ খানেক বাকি। দুজনের ব্যস্ততা তুঙ্গে। তবে বিয়ের যাবতীয় ব্যাবস্থাপনায় আছে 'টিম সৌম্য'। ওরা পাঁচ জনে মিলেই রিসর্ট ভাড়া করা থেকে গাড়ি, ডেকরেশন, ক্যাটারিং সমস্থ কিছু দেখভাল করছে। বিয়েটা কালীঘাটে হবে ঠিকই কিন্তু রিসেপশনের অনুষ্ঠানটা বেশ জাঁকজমকপূর্ণ করার পরিকল্পনা হয়েছে। শহরের উপকণ্ঠে একটা রিসর্ট ভাড়া করা হয়েছে, পাড়া থেকে সকলকে সেই রিসর্টে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুটো লাক্সারি বাসও করা হয়েছে সঙ্গে আরও দুটো এসইউভি। একটা বর-কনের জন্য আর একটা সৌম্যদের পাঁচ জনের জন্য। দীপঙ্করের এমনই নির্দেশ ছিল।
বিকেলে দীপঙ্করের ফ্লাটে সে মীরার সাথে বসে নিমন্ত্রণের তালিকায় একবার অন্তিম বারের মতো চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিল যাতে কেউ বাদ না চলে যায়। ঠিক সেই সময় কলিং বেলটা বেজে উঠল। দীপঙ্কর দরজা খুলতেই অকস্মাৎ তার উপর একজন ঝাঁপিয়ে পড়ল। লোকটা অন্ততঃ ছ'ফুট লম্বা, মুখটা কালো কাপড়ে ঢাকা। দীপঙ্কর এই বয়সেও বেশ শক্তিশালী, যুবক বয়সে অনেক ট্রেনিং, অনেক লড়াই করেছে। দুজনের ধস্তাধস্তি দেখে মীরা ছুটে এসে দীপঙ্করকে বাঁচানোর চেষ্টা করতেই লোকটা বেগতিক বুঝে ভোজালি দিয়ে মীরাকে আক্রমণ করল। এতে মীরার ডান হাতের বাহুটা মারাত্মক আহত হলো। এই দেখে দীপঙ্কর যেন দিক্বিদিক জ্ঞান শূণ্য হয়ে গেল, তার ভিতরকার ঘুমন্ত জানোয়ারটা জেগে উঠল। সে সেই লোকটার হাত থেকে ভোজালিটা কেড়ে নিয়ে হিংস্র প্রাণীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল আর তারপর এলোপাথারি ভোজালির কোপে নৃশংস ভাবে লোকটাকে মেরে ফেলল। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে তাদের সব সপ্ন ভেঙে চুরমার। তাদের আনন্দের মুহূর্তগুলো এক লহমায় সীমাহীন হতাশায় বদলে গেল। সম্বিত ফিরতেই দুজনে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল।

আট মাস হয়ে গেল কোর্টে কেস চলছে। ঘটনার নৃশংসতা যে বর্ণনা কোর্ট শুনেছে আর যা তথ্য-প্রমান পুলিশ কোর্টের সামনে পেশ করেছে তার বিচার করে দীপঙ্করের যে মৃত্যুদণ্ড হবে তা এক প্রকার সবাই নিশ্চিত। এই ঘটনাটা চারিদিকে ভীষণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তাই আজ ২১সে মে রায় বেরোনোর দিন কোর্টে বেশ ভিড় হয়েছে। সাধারণ জনগণ, মিডিয়া থেকে শুরু করে মানবাধিকার কর্মী, এজলাস আজ গমগম করছে। জনগণের সহানুভূতি কিন্তু সম্পূর্ণভাবে দীপঙ্করের পক্ষে কিন্তু কোর্ট তো সহানুভূতিতে চলে না, কোর্টের কাছে সাক্ষ-প্রমাণই শেষ কথা। রায় রায় ঘোষণা হলো, প্রত্যাশা মতোই ফাঁসির আদেশ। আগামী ৩১সে মে ফাঁসির দিন ধার্য হলো তার আগে অবশ্য চাইলে উচ্চ আদালতে আবেদন করার ছাড় দেওয়া হলো।
পরের দিন সকালে মীরা আর সৌম্য গেল জেলে দীপঙ্করের সাথে দেখা করতে। সৌম্য মীরাকে বলল, "আন্টি আপনি আগে দেখা করে আসুন আমি তারপর যাবো।"
মীরা দেখল এক মুখ দাড়ি নিয়ে দীপঙ্কর গারদের রড ধরে দাঁড়িয়ে আছে, মাথাটা একেবারে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। মীরা যেতেই দীপঙ্কর মাথাটা তুলল। নিঃশব্দে চোখ দিয়ে দড়দড় করে জল পরছে। "মীরা কোথা থেকে কি হয়ে গেল বলো তো? কেন লোকটা আমার উপর আক্রমণ করল সেটাও জানতে পারলাম না। মুহূর্তের মধ্যে সব কেমন বদলে গেল!"
মীরার কান্না যেন থামছে না, কোনোরকম বলল, "তোমার ফাঁসি হয়ে গেলে আমিও আত্মহত্যা করব। একা একা বাঁচার আর কোনো ইচ্ছা আমার নেই।"
একথা শোনা মাত্র দীপঙ্করের মুখটা একদম পাল্টে গেল, মীরাকে বলল, "মীরা তুমি আমাকে দারুণ কথা বললে। বেঁচে থেকে না পারলেও মরে গিয়ে তো আমরা মিলিত হতেই পারি। সেখানে কে আটকাবে আমাদের। আঃ শান্তি পেলাম। এখন আর আমার কোনো আফসোস নেই। আমি মরে শান্তি পাবো।"
ঠিক হলো ঠিক যে মুহূর্তে দীপঙ্করের ফাঁসি হবে সেই মুহূর্তেই মীরাও আত্মহত্যা করবে।
মীরা চলে যেতে সৌম্য এলো দেখা করতে বিভিন্ন কথার মাঝে সৌম্য জানাল যে বিভিন্ন সংবাদপত্রে, খবরের চ্যানেলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই রায়ের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছে। দীপঙ্কর মনে মনে ভাবল যে তারা যতই প্রচার চালাক তার ফাঁসি কেউ আটকাতে পারবে না কারন সে উচ্চ আদালতের কোনো আবেদন করবে না। কিন্তু নিয়তির ইচ্ছা বোধহয় অন্যরকম। সে উচ্চ আদালতের আবেদন না করলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলো করল। তারা তাদের আবেদনে আদালতকে বলল যে দীপঙ্কর বাগচি আত্মরক্ষার জন্য এই খুন করেছে আর এই অপরাধে একজন সত্তরোর্ধ মানুষকে ফাঁসি দেওয়া মধ্যযুগীয় বর্বরতা ছাড়া আর কিছুই নয় তাই তাদের অনুরোধ আদালত যেন দীপঙ্কর বাগচির ফাঁসির আদেশ পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এই খবর শুনে দীপঙ্করের মাথায় যেন বজ্রাঘাত হলো। বারবার তার সাথে কেন এমন হয়? কেন সে যেটা চায় তা কখনো পায় না? রাগে, দুঃখে ছটফট করতে লাগল কিন্তু কিছুতেই যেন সে শান্ত হতে পারছে না। কি করবে সে? ভেবে ভেবে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।

আজ ২৭শে মে। আজকের সকালটাও অন্যদিনের মতোই হলো। কিন্তু একটু বেলার পর দিনটা সম্পূর্ণ বদলে গেল। সারা দেশ উত্তাল হয়ে উঠল একটা খবরে। দীপঙ্কর বাগচি তার ফাঁসির আদেশ বহাল রাখার জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে, আজই তার শুনানি হবে, তার হবে সওয়াল করবে প্রখ্যাত ব্যারিস্টার লক্ষণ জালানি। এই খবর সত্যি অবাক করার মতো। কেউ কখনো শুনেছেন যে নিজেকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ানোর জন্য কেউ খরচ করে বড় উকিল নিয়োগ করে! বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমেও এই ঘটনা কভার করা হলো। লক্ষণ জালানি তার জীবনে কোনো কেস হারে নি। এবারও তাই হলো। সুপ্রিম কোর্ট দীপঙ্করের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখাল। খুশিতে দীপঙ্কর দুহাত তুলে নেচে উঠল। সে এখন অপ্রতিরোধ্য। তার মীরার সাথে মীলন কেউ আটকাতে পারবে না। নির্দিষ্ট দিনেই ফাঁসি হবে।

৩০শে মে ঘোষণা হলো পরের দিন সকাল সাতটায় দীপঙ্করের ফাঁসি হবে। সে দিন মীরা এলো জীবিত অবস্থায় শেষ বারের মতো দেখা করতে। দুজনে ঠিক করল পরের দিন সকালে যখন দীপঙ্করকে ফাঁসির মঞ্চে তোলা হবে তখনই মীরা বিষ খাবে। তার সব ব্যবস্থা মীরা করে রেখেছে।

আজ ভোর ভোর দীপঙ্কর উঠে পরেছে যদিও সারা রাত সে দু চোখের পাতা এক করতে পারে নি। এটাই তার এই পৃথিবীতে শেষ রাত। মনের ভিতরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। আর মাত্র দু ঘন্টা, তার পরেই সে এই পৃথিবীকে বিদায় জানাবে আর কেউ তাকে মীরার সাথে মিলিত হতে আটকাতে পারবে না। সকাল ছ'টা বেজে গেছে, আর এক ঘন্টা। এখুনি হয়তো জেলের কর্মীরা চলে আসবে, তাকে স্নান করিয়ে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাবে। সাড়ে ছ'টা বেজে গেল এখনো কেউ এলো না। এবার দীপঙ্কর একটু অস্থির হয়ে উঠল। সাতটায় তার ফাঁসি অথচ পৌনে সাতটাতেও কারোর কোনো উদ্যোগ নেই কেন? সাতটা দশ বাজে, দীপঙ্কর জেলার সাহেবকে তার সেলের দিকে আসতে দেখল। সে এবার নিশ্চিন্ত হলো, এবার নিশ্চয়ই তাকে তৈরী করা হবে, সেজন্যই জেলার আসছেন। মনে মনে ভাবল মীরা হয়তো এতক্ষণ বিষ খেয়ে নিয়েছে। জেলার তার সেলের সামনে আসতেই দীপঙ্কর বলল, "আসুন জেলার সাহেব, আমি তো কখন থেকে অপেক্ষা করছি। এতো দেরি হলো যে, আমার ফাঁসির সময় কি পরিবর্তন হয়েছে?"
জেলার বলল, "দীপঙ্করবাবু আপনার জন্য একটা খবর আছে। আপনার ফাঁসি রোধ হয়ে গেছে। মানবাধিকার কর্মীরা একত্রিত ভাবে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছিল, রাষ্ট্রপতি সেই আবেদন মঞ্জুর করেছেন।"
দীপঙ্কর একথা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেল। পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখ দিয়ে একটাও কথা বেরোচ্ছে না। শরীর যেন ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। এখন তার চিন্তা তার ফাঁসি নিয়ে নয়, চিন্তা মীরার আত্মহত্যা নিয়ে। কাটা পাঁঠার মতো এখন তরফাচ্ছে সে। এ কি সর্বনাশ হয়ে গেল! সে মনেপ্রাণে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছে যেন মীরার কিছু না হয়।
কিছুক্ষণ পর সৌম্য এলো তার সাথে দেখা করতে। কাঁদতে কাঁদতে বলল, "দাদু, সর্বনাশ হয়ে গেছে। মীরা আন্টি আজ সকালে আত্মহত্যা করেছেন। আর সুইসাইড নোটে লিখে গেছেন যে তোমার সাথে পরলোকে মিলিত হবার জন্যই একাজ করলেন। এটাও লিখেছেন যে ওনার সমস্ত সম্পত্তি উনি উইল করে আমার নামে লিখে দিয়েছেন", সৌম্য হাউহাউ করে কেঁদে উঠলো।
নির্বাক দীপঙ্কর ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল।

দীপঙ্কর এবং মীরা দুজনেরই মরুভূমির ন্যায় জীবনে সুখ যেন মরীচিকা, তারা যতই সুখের কাছে এগিয়ে যায় সুখ ততই তাদের থেকে দূরে সরে যায়। এখন, যখন দীপঙ্করের একমাত্র সুখ মৃত্যু তখন মৃত্যও তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে আর মীরা সুখের মৃত্যু যখন আলিঙ্গন করল সুখ তার মৃত্যু হাত ছেড়ে দিয়ে চলে গেল বহুদুরে ঠিক মরীচিকার মতোই।
*অঙ্কণ : তন্দ্রা ব্রহ্মচারী
**বিধিসম্মত সতর্কীকরণ - এই গল্পের ঘটনা, স্থান, কাল, পাত্র সবই কাল্পনিক। এর সাথে যদি বাস্তবের কারোর কোনো মিল পাওয়া যায় তা নিতান্তই কাকতালীয় বলে গণ্য হবে। ধূমপান ও মদ্যপান স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর, ইহা ক্যান্সারের কারণ।

রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২০

গণতন্ত্রের মাথায় ঝাঁটা

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে
আক্রান্ত ধনী-গরিব সমানভাবে।
সংক্রমণের সাথে সাথেই-
ধনী যায় হাসপাতালে।
দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে ঘুরেও-
বেড পায় না গরীব হলে।
কঠিন হলেও বাস্তব এটা,
গণতন্ত্রের মাথায় ঝাঁটা।

শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২০

বামপন্থা ও আন্দোলন, বিদ্রোহ তথা বিপ্লবের ব্যাখ্যা এবং এর পিছনে বামপন্থী মতাদর্শের ভূমিকা

বামপন্থা ও আন্দোলন, বিদ্রোহ তথা বিপ্লবের ব্যাখ্যা এবং এর পিছনে বামপন্থী মতাদর্শের ভূমিকা
                   উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী 


আন্দোলন আনে বিদ্রোহ বা বিপ্লব যা সুনেতৃত্বের দ্বারা সংগঠিত হয়ে অভ্যুত্থানের রূপ নেয়। সুতরাং এটা বোঝা যাচ্ছে যে কোনো অভ্যুত্থানই একদিন সংগঠিত হয় না। ক্রমাগত রাষ্ট্র তথা শাসকের বঞ্চনা, অবহেলা ও অত্যাচার জনগণের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করে কিন্তু রাষ্ট্রের ভয় জনগণকে প্রতিবাদ করতে দেয় না। কিন্তু ভয় আর কতদিন? তারও একটা সীমা আছে। যেদিন ভয় তার চরম সীমায় পৌঁছয় সেদিন সে ক্ষোভ বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর অনুঘটকের কাজ করে এবং ক্রমে তা সাহসে রূপান্তরিত হয়। এর ফলে শুরু হয় ছোটো ছোটো প্রতিবাদী আন্দোলন। তখন রাষ্ট্র সাধারণত দুটো অবস্থান নেয়; এক, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস দেখিয়ে সেই প্রতিবাদী আন্দোলনগুলোকে উপেক্ষা করা অথবা দুই, ভয় পেয়ে প্রতিবাদীদের উপর সীমাহীন অত্যাচার বর্ষণ করা যা আমরা ৪ জুন, ১৯৮৯এ চীনের রাজধানী বেইজিং শহরের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে দেখেছি। এই ঘটনা ইতিহাসে তিয়েনআনমেন স্কয়ার গণহত্যা বা ৪ জুন গণহত্যা নামে কুখ্যাত।

    তিয়েনআনমেন স্কয়ারে, ৪ জুন, ১৯৮৯

বামপন্থা ছাড়া কখনোই বা কোনো কালেই কোনো আন্দোলন সংগঠিত হয় নি, হতে পারে না। এই কথা শুনেই দক্ষিণপন্থীরা রে-রে করে তেড়ে আসতেই পারেন। কিন্তু এটাই বাস্তব। কেন এটা বাস্তব তা বোঝার জন্য আগে বামপন্থা কি সেটা জানতে হবে। বেশির ভাগ (ডানপন্থী) মানুষ বামপন্থা বলতেই বোঝেন মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন ইত্যাদি। কিন্তু তাদের এই ধারনা সর্বৈব ভ্রান্ত ও ভিত্তিহীন। তাঁদের মতবাদগুলো বামপন্থার অংশ ঠিকই কিন্তু বামপন্থা মানেই তাঁদের মতবাদ নয়। রাজনীতিতে বামপন্থা ও দক্ষিণপন্থা ধারণার উদ্ভাবন হয় ফরাসি বিপ্লবের সময় (১৭৮৯-৯৯)। সেই সময় ফরাসী এস্টেট জেনারেলে বাম দিকের চেয়ারগুলোতে যাঁরা বসতেন তাঁরা সাধারণত রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করতেন এবং প্রজাতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা তৈরি সহ বিপ্লবকে সমর্থন করতেন। আর যারা ডান দিকে বসতেন তাঁরা পুরনো ও প্রচলিত শাসনব্যবস্থা ও তার ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের সমর্থক ছিলেন। ১৮১৫ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী রাজনীতিতে 'বাম' শব্দের ব্যবহার ব্যাপক হয়। অর্থাৎ ধর্মীয় বা রাজনৈতিক মতাদর্শে যাঁদের গোঁড়ামি নেই এবং যারা প্রচলিত বস্তাপচা ধ্যানধারণার পরিবর্তনপন্থী তাদের "বামপন্থী" বলা হয়। সমাজবাদ, সাম্যবাদ তথা কমিউনিজম (পূর্ণ সাম্য) ইত্যাদি আদর্শ ও মতবাদ গুলো বামপন্থী রাজনীতির ধারক ও বাহক। তবে প্রতিটি মতবাদেরই সময়ের সাথে জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আবশ্যক।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ইংরেজি সাপ্তাহিক 'ফরওয়ার্ড ব্লক'-এর ৫ই আগস্ট, ১৯৩৯এর সংখ্যার সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন-
"'তত্ত্ব' ও 'বিপরীত তত্ত্ব'-র সমন্বয়ে 'সমন্বয় তত্ত্ব'-র জন্ম হয়। এই 'সমন্বয় তত্ত্ব' আবার ক্রমবিকাশের পরবর্তী পর্যায়ে 'তত্ত্ব' হয়ে ওঠে। এই 'তত্ত্ব' আবার 'বিপরীত তত্ত্ব' কে জাগিয়ে তোলে। এবং সেই সংঘর্ষের সমাপ্তি ঘটে আবার এক সমন্বয় তত্ত্ব'-এ। এইভাবে প্রগতির চাকা ক্রমাগত এগিয়ে চলে।"


'তত্ত্ব' ও 'বিপরীত তত্ত্ব'-র উদ্ভাবন ও তার থেকে 'সমন্বয় তত্ত্ব'-র জন্মের এই প্রক্রিয়াকেই 'বামপন্থী কার্যক্রম' বলে তিনি বর্ণনা করেছেন। আন্দোলন, বিদ্রোহ বা বিপ্লব অথবা অভ্যুত্থান তখনই হয় যখন মানুষ প্রচলিত 'তত্ত্ব' থেকে বিমুখ হয়ে 'বিপরীত তত্ত্ব'-র খোঁজে নামে। এটা একটু পরিস্কার করে বোঝাতে আমরা চীনের উদাহরণ দিতে পারি। তৎকালীন প্রচলিত রাজতন্ত্র নামক 'তত্ত্ব'-র বিরুদ্ধে একটি 'বিপরীত তত্ত্ব'-র খোঁজে শুরু হয় আন্দোলন। সেখান থেকে 'বিপরীত তত্ত্ব' হিসেবে উঠে আসে 'একদলীয় শাসনব্যবস্থা' সময়ের সাথে সাথে যা 'সমন্বয় তত্ত্ব' হয়ে বর্তমানে 'তত্ত্ব'-র রূপ নিয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন সময়ে এই তত্ত্বর বিপরীত তত্ত্ব হিসাবে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ছোটো ছোটো প্রতিবাদী আন্দোলন হচ্ছে। এই সমস্ত প্রতিবাদী আন্দোলনকে যারা সমর্থন করবে তারাই বামপন্থী বলে গণ্য হবে আর যারা বর্তমানে প্রচলিত একদলীয় শাসনব্যবস্থাকেই চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে তাদের চিন্তাধারা অবশ্যই দক্ষিণপন্থী।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সমাজে প্রচলিত জাত-পাতের ভেদাভেদ ভুলে সকলকে সমান চোখে দেখার কথা প্রচার করেছিলেন। তিনিই ভারতের প্রথম 'সাম্যবাদ'-এর প্রবর্তক। তাঁর নেতৃত্বে ঘটা সামাজিক আন্দোলনও 'বামপন্থী আন্দোলন' বলেই গণ্য হয়।

রাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় চলতে থাক প্রতিবাদী আন্দোলনগুলো সাধারণত ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্যে পরে। এইসব আন্দোলন গুলোর পিছনের কারনও ভিন্ন হয় কিন্তু এগুলোর প্রতিক্রিয়া হয় একই আর তা হলো জনমনে বারুদের সঞ্চার। প্রতিবাদের এই বারুদে যখন রাষ্ট্রের উপেক্ষা বা অত্যাচারের স্ফুলিঙ্গ পরে তখন সেই আন্দোলন সংগঠিত হয় ফলে জনগণ সেই শাসক তথা সরকার বা 'রাষ্ট্রনেতা' বা ক্ষমতাসীন দলকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে যে সমস্ত কর্মসূচি গ্রহণ করে তাকে বিদ্রোহ বা বিপ্লব বলে আর এই বিপ্লবের একটা বৃহত্তর রূপ হলো 'অভ্যুত্থান'। যদিও বিদ্রোহ ও বিপ্লবের মধ্যে কিছুটা গুণগত পার্থক্য আছে। বিপ্লব বিদ্রোহের আর এক নাম হলেও বিদ্রোহ বিপ্লবের সমার্থক নয়। ব্যাপার একটু বুঝিয়ে বলা যাক, যে সংগঠিত আন্দোলন রাষ্ট্রের শাসক তো পরিবর্তন করে দেয় কিন্তু শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন করে না বা করতে পারে না তাকে বলা হয় বিদ্রোহ। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় জিম্বাবুয়ে ও রবার্ট মুগাবের কথা। 
  জিম্বাবুয়ের সালিসবারি শহরে রবার্ট মুগাবে, এপ্রিল,    ১৯৮০

আফ্রিকার একটি ছোটো দেশ রোডেশিয়ার স্বৈরাচারী ঔপনিবেশিক শাসকদের বিরুদ্ধে সে দেশের জনমানসে পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে পাথেও করে রবার্ট মুগাবে এক রক্তক্ষয়ী আন্দোলন সংগঠিত করে জয়ী হন। তাঁর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় 'রিপাবলিক অব জিম্বাবুয়ে'। সমগ্র আফ্রিকায় তিনি নায়কের সম্মান পেতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই মুগাবেই পরিণত হয়েছিলেন স্বৈরাচারী শাসকে। সীমাহীন দুর্নীতি ও ক্রমাগত মানবাধিকার লঙ্ঘন করে একসময়কার সমৃদ্ধশালী জিম্বাবুয়েকে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করেছিলেন তিনি। অর্থাৎ তাঁর আন্দোলনে শাসকের মুখ পরিবর্তন হলো ঠিকই কিন্তু শাসনব্যবস্থা ও নীতি তথা শাসকের চরিত্রে বদল হলো না। তাই তাঁর দ্বারা সংগঠিত এই আন্দোলনকে বিপ্লব নয় বরং বিদ্রোহ বলা যায়। অপরদিকে যদি আমরা ফরাসি বিপ্লব ও ভিয়েতনাম বিপ্লবের দিকে দেখি সেখানে দেখব মানুষের সংগঠিত আন্দোলন সাম্রাজ্যবাদী ও ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার পতন ঘটিয়ে সম্পূর্ণ নতুন শাসনব্যবস্থার পত্তন ঘটায়। অর্থাৎ এই আন্দোলনগুলোর ফলে রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে যায় তাই এগুলো হলো 'বিপ্লব'। সুতরাং সংক্ষেপে বলা যায়, যে আন্দোলনের উদ্দেশ্য শুধুই ক্ষমতার হস্তান্তর তাকে আমরা 'বিদ্রোহ' বলি এবং যে আন্দোলনের উদ্দেশ্য রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ও আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি করা সেই আন্দোলনকে আমরা 'বিপ্লব' বলি।

    ভিয়েতনাম

কয়েকটি আন্দোলন সংগঠিত হয়ে বিদ্রোহ, বিপ্লব থেকে অভ্যুত্থানে পৌঁছানোর এই সমগ্র প্রক্রিয়া সাফল্যের জন্য যেটা সবথেকে আবশ্যিক তা হলো সু-নেতৃত্ব। দক্ষ নেতা ও তার নির্ভুল রণনীতিই কোনো আন্দোলনকে সংগঠিত করতে ও তার সাফল্য এনে দিতে পারে। আর এর জন্য আবশ্যক সংগ্রামী সৈনিকদের নেতৃত্বে প্রতি অটল বিশ্বাস। তা নাহলে যেকোনো আন্দোলন হয় অঙ্কুরেই বিনাশ হয় অথবা মাঝ পথেই দিশাহীন হয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। যেমনি হয়েছিল নকশালবাড়ি আন্দোলনের ক্ষেত্রে। 

    নকশালবাড়ির আন্দোলনের একটি ছবি, ১৯৬৯(?)

উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রামের কৃষকদের উপর ভূস্বামীদের অত্যাচারের ফলে সৃষ্টি জনরোষকে চারু মজুমদারের সু-নেতৃত্ব ও সুশীতল রায়চৌধুরী, কানু সান্যাল ও জঙ্গল সাঁওতালদের নির্ভীক আপোসহীন ব্যক্তিত্ব সংগঠিত রূপ দেয় যা 'নকশালবাড়ি আন্দোলন' (১৯৬৯-৭১) নামে সারা বিশ্বে পরিচিতি পায়। কিন্তু এর পরেই পরবর্তী সময়ে নেতৃত্ব অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং তা থেকে সৃষ্ট অবিশ্বাস ও বিভাজন এবং সবশেষে চারু মজুমদারের গ্রেফতারী ও রহস্য মৃত্যুর ফলে সেই আন্দোলন সু-নেতার অভাবে দিশাহীন হয়ে পরে। দিশাহীন নকশালবাড়ি আন্দোলন লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে আজকের দেশ ও দেশবাসীর শত্রু 'মাওবাদী জঙ্গি'তে রূপান্তরিত হয়েছে। চীনের বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দাবিতে মাঝে মধ্যেই যে সব ছোটোখাটো আন্দোলন হয় সেগুলো সু-নেতার অভাবে রাষ্ট্রের দমননীতির মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয় ও অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়।

   নকশালবাড়িতে এক সভায় চারু মজুমদার, ১৯৬৭

বর্তমান সময়ে সারা বিশ্ব তোলপাড় করছে আমেরিকার 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' আন্দোলনে। কিন্তু এই এই আন্দোলন এক দিনেই হয় নি। আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের উপর শ্বেতাঙ্গদের বর্বর অত্যাচার আজ নতুন নয়। কলম্বাসের আমেরিকার ভূখণ্ডে পা দেওয়ার পর থেকেই এই বর্বরতা চলে আসছে, তাই অনেকেই কলম্বাসকে ঔপনিবেশিকতা ও ক্রীতদাস প্রথার পথপ্রদর্শক হিসেবে ঘৃণার চোখে দেখেন। ওয়াশিংটন পোস্টের একটা সমীক্ষা অনুযায়ী, আমেরিকায় প্রতি বছর এক হাজারের বেশি ও প্রতিদিন অন্তত এক জন কৃষ্ণাঙ্গের মৃত্যু হয় পুলিশের গুলিতে। সুতরাং মানুষের মনে ক্ষোভ ছিলই।
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকার সানফোর্ডে ট্রেভর মার্টিন নামের এর ১৭ বছরের কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরকে জর্জ জিমারম্যান নামক এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশকর্মী অন্যায় ভাবে গুলি করে হত্যা করে। কিন্তু সানফোর্ড পুলিশ প্রথমে তার বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয় নি। পরে জনরোষের চাপে পুলিশ জিমারম্যানকে হেফাজতে নেই কিন্তু তার বিরুদ্ধে গঠিত চার্জ এতোই দুর্বল ছিল যে সে খুনের দায় থেকে মুক্তি পেয়ে যায়। এর পর সে তার 'বীরত্বের নিদর্শন' ঐ বন্দুকটা নিলামে তোলে যা আড়াই লক্ষ ডলারে বিক্রি হয়। এই অমানবিক ঘটনার পরেই 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' আন্দোলন শুরু হয়। তবে তা বিচ্ছিন্ন ভাবে চলত। এর পরেও মাইকেল ব্রাউন, এরিক গার্নার ইত্যাদি কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গ পুলিশের দ্বারা খুন হয় আর প্রতিটা ঘটনার পরেই মানুষ কৃষ্ণাঙ্গদের বাঁচার অধিকার নিয়ে গর্জে ওঠে।

    'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' আন্দোলনের একটি ছবি

সম্প্রতি আমেরিকার অতিমারি পরিস্থিতির পর্যালোচনামূলক একটা রিপোর্ট প্রকাশ হয়। যে রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে কৃষ্ণাঙ্গরাই এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। আমেরিকার জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ যার মধ্যে ৪৪ শতাংশ মানুষ কাজ হারিয়েছেন, ২২ শতাংশ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং ২৩ শতাংশ মানুষের করোনা আক্রান্তের মৃত্যু হয়েছে। এই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসতেই দেশ মানুষের মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা তৈরী হয় যে পুলিশ-প্রশাসন থেকে করোনা প্রতিক্ষেত্রেই কৃষ্ণাঙ্গদেরই ভুগতে হয়। আর ঠিক এই সময়েই জর্জ ফ্লয়েডের নৃশংস খুনের ঘটনা সামনে আসে যা মানুষের মনে জমে থাকা ক্ষোভের বারুদে স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করে। শুরু হয় বৃহত্তর আন্দোলন। এই আন্দোলন এতোটাই সংগঠিত যা ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুতে সে দেশে ঘটে যাওয়া শ্রমিক আন্দোলনের কথা মনে করায়। এই আন্দোলন ভালো নেতা ও সুপরিকল্পিত রণনীতির দ্বারা পরিচালিত হওয়া ছাড়া সম্ভব নয়। যদিও এখনো নির্দিষ্ট কোনো নেতা বা সংগঠনের নাম এখনো সামনে আসে নি কিন্তু সরকারি রিপোর্ট বলছে এর পিছনে আমেরিকার বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো এর পিছনে আছে, রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ANTIFA নামক একটি বামপন্থী সংগঠনের দিকে আঙুল তুলেছেন। মানুষের জমায়েতে লালপতাকার উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি প্রমান করে যে এই আন্দোলন বামপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

সবশেষে, বামপন্থীরাই মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে তাদের রাষ্ট্রীয় শোষনের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে শেখাতে পারে। 

উপসংহার: প্রতিটা আন্দোলন, বিদ্রোহ তথা বিপ্লবের পিছনে থাকে বামপন্থী মতাদর্শের অনুপ্রেরণা। বামপন্থাই মানুষকে মুক্তির পথ দেখায়।

ফেরাতে হাল ফিরুক লাল

ফেরাতে হাল ফিরুক লাল                             উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্মচারী কাস্তে হাতুরি তারা হোক সিংহ, ধানের শীষ, কোদাল বেলচা কিংবা তারা - ভ...